রবিবার, ১৯ জুন ২০২১; ৩:২৭ পূর্বাহ্ণ


মোজাম্মেল হোসেন তোহা

আজ থেকে ৯ বছরের আগের এই দিনটিতে, ২০১১ সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারি, শুরু হয়েছিল গাদ্দাফীর বিরুদ্ধে আন্দোলন, যার ধারাবাহিকতায় আট মাস পর ঘটেছিল বেয়াল্লিশ ধরে ক্ষমতায় থাকা লৌহ মানব গাদ্দাফির পতন। কিন্তু ঠিক কী কারণে, কীভাবে শুরু হয়েছিল এ বিদ্রোহ? আর ঠিক কীভাবেই পতন হয়েছিল গাদ্দাফীর?

এক. বিদ্রোহের পটভূমি

ঘটনার শুরু ১৯৯৬ সালে। আফগানিস্তান ফেরত তিন লিবিয়ান যোদ্ধার স্থান হয় ত্রিপলীর আবু সেলিম কারাগারে। সে সময় ঐ কারাগারে প্রায় ১৭০০ বন্দী ছিল, যাদের অধিকাংশের বিরুদ্ধেই অভিযোগ ছিল হয় আফগানিস্তানে আল ক্বায়েদা এবং অন্যান্য জিহাদী সংগঠনের হয়ে যুদ্ধ করার, অথবা গাদ্দাফীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকার।

কারাগারে খাবারের করুণ অবস্থা, বন্দীদের উপর গার্ডদের কঠোর নির্যাতন এবং বিচার ছাড়াই বছরের পর বছর আটকে রাখার সংস্কৃতি অনুধাবন করতে পেরে ঐ তিন যোদ্ধা সিদ্ধান্ত নেয়, যে করেই হোক তাদেরকে সেখান থেকে পালাতে হবে।

তাদেরকে বেশিদিন অপেক্ষা করতে হয় না। জুন মাসের ২৮ তারিখেই তারা সুযোগ পেয়ে যায়। সেদিন বিকেলে তারা অসতর্ক অবস্থায় থাকা এক গার্ডকে আটকে ফেলে এবং তার কাছ থেকে চাবি নিয়ে সবগুলো সেলের দরজা খুলে দিতে শুরু করে।

মুহূর্তের মধ্যেই শতশত বন্দী তাদের সেল থেকে বেরিয়ে আসে। ছাদের উপরে থাকা গার্ডদের গুলিতে ঘটনাস্থলেই মারা যায় ৭ জন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয় স্বয়ং গাদ্দাফীর ভগ্নীপতি, গোয়েন্দা বাহিনীর প্রধান আব্দুল্লাহ সেনুসী। তার কঠোর হুমকি এবং বিভিন্ন সংস্কারের আশ্বাসে ২৯ তারিখ ভোরের দিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।

সকালের দিকে গার্ডরা কারাগারের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর বন্দীদেরকে বিভিন্ন ব্লক এবং সেলে পুনর্বিন্যাস করতে থাকে। যারা কম ঝুঁকিপূর্ণ অপরাধী ছিল এবং যারা সেল থেকে বের হয়নি, তাদেরকে সরিয়ে সিভিল এবং মিলিটারি ওয়ার্ডে নিয়ে যাওয়া হয়। আর যারা সেল থেকে বেরিয়ে বিদ্রোহে অংশ নিয়েছিল, তাদেরকে পলিটিকাল উইংয়ের ব্লকগুলোর মাঝে অবস্থিত খোলা মাঠে হাঁটাচলার সুযোগ দেওয়া হয়।

এরপর বেলা পৌনে এগারোটার দিকে শুরু হয় পৃথিবীর ইতিহাসের বর্বরতম গণহত্যাগুলোর মধ্যে একটি। ছাদের উপর থেকে মাঠের বন্দীদের উপর প্রথমে পরপর দুইটি গ্রেনেড চার্জ করা হয়। এরপরই শুরু হয় অবিরাম মেশিনগানের গুলি বর্ষণ। মাত্র দুই ঘণ্টার মধ্যেই আবু সেলিম কারাগারের ১৭০০ বন্দীর মধ্যে ১২৭০ বন্দীকেই নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

আবু সেলিম হত্যাকাণ্ডের শিকার ১২৭০ বন্দীর একজন ছিল পূর্বাঞ্চলীয় শহর বেনগাজীর আইনজীবী ফাতহি তারবিলের ভাই ইসমাঈল তারবিল, যে ইসলামপন্থী মৌলবাদীদের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে ১৯৮৯ সালে গ্রেপ্তার হয়েছিল। এছাড়াও ঐ হত্যাকাণ্ডে নিহত হয়েছিল তার শ্যালক এবং চাচাতো ভাই।

অন্য অনেকে ভয়ে চুপ করে থাকলেও ফাতহি ছিল ব্যতিক্রম। সে তার ভাই এবং অন্য বন্দীদের ভাগ্যে কী ঘটেছিল, সেটা জানার চেষ্টা করতে থাকে। বলা বাহুল্য, গাদ্দাফীর সরকার তার এই কর্মকাণ্ডকে সুনজরে দেখেনি। ফলে তাকে বারবার গ্রেপ্তার বরণ করতে হয়।

২০০৯ সালে সে নিহত বন্দীদের আত্মীয়-স্বজনদেরকে আইনি সহায়তা দেওয়ার জন্য “দ্যা অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্যা মার্টায়ার্স অফ দ্যা আবু সেলিম ম্যাসাকার” নামে একটি সংগঠন চালু করে। কিন্তু সরকারের চাপে শেষ পর্যন্ত তাকে সেটা বন্ধ করে দিতে হয়। ২০১১ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে ফাতহিকে মোট পাঁচবার গ্রেপ্তার করা হয়, যার মধ্যে একবার তাকে সর্বোচ্চ দুই বছর বিনা বিচারে বন্দী থাকতে হয়েছিল।

সে সর্বশেষ গ্রেপ্তার হয় ২০১১ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি, ঠিক গাদ্দাফী বিরোধী অভ্যুত্থানের প্রাক্কালে। আর তার এই গ্রেপ্তারের প্রতিবাদের মধ্য দিয়েই সূচিত হয় ২০১১ সালের আরব বসন্তের লিবীয় সংস্করণ।

দুই. বিদ্রোহ থেকে গৃহযুদ্ধ

২০১১ সালের শুরুর দিকে আরব বসন্তের উষ্ণ বাতাস লিবিয়ার গায়েও দোলা দিতে শুরু করে। প্রথমে তিউনিশিয়া এবং এরপর মিসরের সরকার বিরোধী আন্দোলনের সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে লিবিয়ানদের একাংশ, বিশেষ করে গাদ্দাফী সরকারের হাতে নিহত এবং নির্যাতিতদের আত্মীয়-স্বজনরা এবং বিদেশে নির্বাসিত অ্যাকটিভিস্টরা লিবিয়াতেও সরকার পতনের স্বপ্ন দেখতে শুরু করে।

জানুয়ারির শেষের দিক থেকেই তারা ফেসবুক, টুইটার এবং ইউটিউবে গাদ্দাফী বিরোধী প্রচারণা চালাতে শুরু করে এবং ১৭ই ফেব্রুয়ারি, বৃহস্পতিবার, বিভিন্ন সংস্কার এবং অধিকতর স্বাধীনতার দাবিতে দেশব্যাপী “ইয়াওমুল গাযব” তথা ক্ষোভ দিবস পালনের আহ্বান জানাতে থাকে।

১৭ই ফেব্রুয়ারি তারিখটা নির্বাচনের পেছনেও অবশ্য একটা ঐতিহাসিক পটভূমি আছে। ২০০৬ সালের এই দিনে একটি ড্যানিশ পত্রিকায় রাসূল (স) এর ব্যঙ্গাত্মক কার্টুন ছাপানোর প্রতিবাদে বেনগাজীতে বিক্ষোভের আয়োজন করা হয়। এক পর্যায়ে বিক্ষোভ সহিংসতায় রূপ নিলে পুলিশ বাধা দেয়। বাধা পেয়ে বিক্ষোভকারীরা গাদ্দাফী বিরোধী শ্লোগান দিলে পুলিশ গুলি চালায় এবং ঘটনাস্থলেই অন্তত ১২ জন নিহত হয়।

২০১১ সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারি আসার আগেই গাদ্দাফীর সরকার সতর্ক অবস্থান নেয়। ১৫ই ফেব্রুয়ারি বিকেলের দিকে গোয়েন্দা বিভাগের লোক ফাতহি তারবিলকে তার বাসা থেকে গ্রেপ্তার করে বেনগাজীর হাওয়ারির ইন্টারনাল সিকিউরিটি অফিসে নিয়ে যায়। ১৭ তারিখে বিক্ষোভের পরিকল্পনা থাকলেও তারবিলের গ্রেপ্তারের সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পরপরই শতশত বিক্ষুব্ধ মানুষ তার মুক্তির দাবিতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ইন্টারনাল সিকিউরিটি অফিসের সামনের রাস্তায় জড়ো হতে থাকে।

আবু সেলিম হত্যাকাণ্ডের শিকারদের বৃদ্ধা মায়েরা শ্লোগান দিতে থাকে, “নূদি, নূদি, ইয়া বেনগাজী।” অর্থাৎ, জাগো, জাগো, হে বেনগাজী। শুরু হয় পুলিশের সাথে সংঘর্ষ। পুলিশ নিরস্ত্র মিছিলের উপর লাঠিচার্জ, জল-কামান এবং রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে মিছিল ছত্রভঙ্গ করে দেয়। প্রচুর হতাহতের ঘটনা ঘটে।

১৫ তারিখের মিছিলে মাত্র কয়েকশত মানুষ উপস্থিত হলেও পরদিন গ্রেপ্তারকৃত এবং আহতদের আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবেরা যোগ দেওয়ায় মিছিলের আকার বৃদ্ধি পায়। ১৭ তারিখে কয়েক হাজার নিরস্ত্র মানুষ শুধু পাথর এবং লাঠি হাতে বেনগাজীর “কাতীবা” তথা মিলিটারি ব্যারাকের সামনে জড়ো হয়ে ভেতরে পাথর নিক্ষেপ করলে ভেতরে অবস্থিত গাদ্দাফীর সেনাবাহিনী মেশিনগান এবং অ্যান্টি-এয়ারক্রাফটের ১৪.৫ এবং ২৩ মিলিমিটারের বুলেটের মাধ্যমে তার জবাব দেয়। নিহত হয় প্রচুর সাধারণ মানুষ।

১৭ তারিখ থেকে পূর্বাঞ্চলীয় শহর দার্‌না, আল-বেইদা, আজদাবিয়া এবং তবরুকেও সরকার বিরোধী মিছিল বের হয়। বিক্ষোভকারীরা লাঠি এবং পাথর নিক্ষেপ করে এবং পুলিশ স্টেশনে আগুন ধরিয়ে দেয়। প্রাথমিকভাবে পুলিশের গুলিতে শতাধিক বিক্ষোভকারী নিহত হলেও পরবর্তীতে বিপুল সংখ্যক পুলিশ বিক্ষোভকারীদের সাথে যোগ দেওয়ায় এবং পূর্বাঞ্চলের জনগণের বড় একটা অংশের সমর্থন বিক্ষোভকারীদের পক্ষে থাকায় ১৮ তারিখের মধ্যেই আল-বেইদা, তবরুক এবং দার্‌না সহ বিস্তীর্ণ পূর্বাঞ্চল সরকারের নিয়ন্ত্রণ হারায়। বাকি থাকে শুধু বেনগাজীর কাতীবা।

১৫ তারিখ থেকে ১৯ তারিখ পর্যন্ত বেনগাজীতে মিছিলগুলো ছিল নিরস্ত্র সাধারণ জনতার, যাদের সম্বল ছিল শুধু লাঠি আর পাথর। কিন্তু মাত্র পাঁচ দিনের সংঘর্ষেই দুই শতাধিক মানুষ নিহত হওয়ায় জনগণ ছিল মরিয়া। ২০ তারিখ সকালের দিক থেকেই পুলিশ এবং সেনাবাহিনীর সদস্যরা জনগণের কাতারে যোগ দিতে থাকে। শুরু হয় সশস্ত্র বিদ্রোহ।
সরকারের কাছে ভারী মেশিনগান, অ্যান্টি-এয়ারক্রাফট গান, আর পদত্যাগকারী বিদ্রোহী সেনাদের কাছে কালাশনিকভ রাইফেল। সেদিন বিকেলে মাহদী মোহাম্মদ জিউ নামে এক যুবক তার গাড়িতে দুটো গ্যাস সিলিন্ডার নিয়ে কাতীবার দেয়ালের সামনে গিয়ে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আত্মাহুতি দেয়। ভেঙ্গে পড়ে কাতীবার দেয়াল।

ভেতরে থাকা গাদ্দাফীর সেনাদের অধিকাংশই পালিয়ে যায়। অবশ্য পালিয়ে যাওয়ার আগে তারা ভেতরে থাকা সেনা, যারা বিদ্রোহীদের উপর গুলি করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল, তাদেরকে একটা রুমের মধ্যে আটকে আগুন ধরিয়ে দিয়ে যায়। অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যায় অন্তত আটজন।

জিউর আত্মত্যাগের বিনিময়ে বেনগাজী গাদ্দাফীর নিয়ন্ত্রণ মুক্ত হয়। বিদ্রোহী জনতা কাতীবার ভেতরে প্রবেশ করে। তাদের হস্তগত হয় গাদ্দাফীর সেনাদের ফেলে যাওয়া বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র। বেনগাজী সহ সমগ্র পূর্বাঞ্চল কার্যত স্বাধীন হয়ে পড়ে। যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল এক আইনজীবীর মুক্তি, কিছুটা সংস্কার, কিছুটা স্বাধীনতার জন্য, সেই আন্দোলন পুরাদস্তুর গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন