শুক্রবার, ২ জানুয়ারি ২০২১; ১১:৩৬ অপরাহ্ণ


একুশ মনে করিয়ে দেয় ভাষার জন্য বাঙালির রক্ত ঝরেছিল। কিন্তু বাঙালির প্রাত্যহিক জীবন ও প্রাতিষ্ঠানিক বলয়ে বাংলা এখনো গৌরবের আসন নিতে পারেনি। কৃষক, শ্রমিক, কুলি, মজুর, জেলে, শ্রমজীবী ও সর্বসাধারণের প্রাণের ভাষা স্বত্ত্বেও উচ্চপর্যায়ে বাংলা আজো অবহেলিত ও নিষ্পেষিত। বাঙ্গালির রাষ্ট্রের এটা এক কলঙ্কজনক অধ্যায়।

অবশ্য ইতিহাসের খুব কম সময়ই বাংলার জন্য সুসময় ছিল। ব্রাহ্মণ্যবাদী শাসনের শুরু থেকেই এখানে সংস্কৃত ছিল রাজভাষা। পরবর্তীতে পাল রাজারাও সংস্কৃতকেই গ্রহণ করে নেয়। বাংলাভাষায় সাহিত্য চর্চা খুব দ্রুত বিকশিত হতে শুরু করে সুলতানি শাসনামলে। তখনও রাজভাষা ছিল ফারসি, তবে এই সময়ে সম্রাটরা শাসননীতির অংশ হিসেবে বাংলা ভাষার পৃষ্ঠপোষকতা শুরু করেন। ড. এনামুল হক, ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, প্রভাতকুমার বন্দোপাধ্যায়, দীনেশচন্দ্র সেন মনে করেন সুলতানি আমলেই একটি লোকভাষা থেকে পরিপূর্ণ ভাষায় বিকশিত হয় বাংলা। ব্রিটিশ শাসনামলে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজকে কেন্দ্র করে বাংলা ভাষার আধুনিকায়ন ঘটে এবং এই সময়ে বাংলা গদ্য সাহিত্য বিকাশ লাভ করে। বলা বাহুল্য, বাংলা ভাষা উন্নয়নের এই পর্যায়গুলোতে বাংলা কখনোই রাজভাষা কিংবা প্রধান ভাষা ছিল না।

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির পেছনে বাঙালি মুসলমান উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছিল। প্রত্যাশা ছিল, মুসলমানদের জন্য আলাদা দেশ হলে তাদের সব দুঃখ ঘুচে যাবে। বাংলা ভাষাও হয়তো নিভৃতে এই আশায়ই বুক বেঁধেছিল। তাই আমরা দেখি, পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই ভাষার প্রশ্নে বাঙ্গালিদের সচেতন অবস্থান। ‘তমদ্দুন মজলিশ’ প্রতিষ্ঠা তার উৎকৃষ্ট নজির। বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষার দাবিতে ১৯৫২ সালের আন্দোলন রাষ্ট্রক্ষমতার বলয়ে বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার প্রথম আন্দোলন।

বাংলার জন্য রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দরকার ছিল ভাষার সাথে ক্ষমতার আষ্টেপৃষ্ঠে আত্মীয়তার কারণে। অবশ্য রাষ্ট্রক্ষমতা যে ভাষার ক্ষতিসাধন করে না তা নয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রাষ্ট্র ভাষার বহমান স্বতস্ফূর্ত নদীর গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। এই নিয়ন্ত্রণ অনেক ক্ষেত্রেই প্রমিতকরণের জন্য হয়ে থাকে যেখানে একটা পক্ষ-বিপক্ষ থেকে যায়। তা স্বত্ত্বেও পৃথিবীতে যে ভাষাগুলোর দ্রুত বিকাশ ঘটেছে সবগুলোতেই রাষ্ট্রক্ষমতার প্রচ্ছন্ন অবদান ছিল। এবং রাষ্ট্রের ক্ষমতা ও অর্থনীতির বিকাশের সাথে সাথে ভাষারও দ্রুত বিকাশ ঘটেছে।

এক হিব্রু তো মৃতপ্রায় অবস্থা থেকে জ্ঞানবিজ্ঞানের প্রধান ভাষা হয়ে উঠেছে ইজরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। এটি রাষ্ট্রের সাথে ভাষার সম্পর্ককে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার সুযোগ করে দিয়েছে। আধুনিক জাতিরাষ্ট্রে ব্যবসা-বানিজ্য, শিক্ষাব্যবস্থা, সংস্কৃতি ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান সবই রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ তত্বাবধানের মধ্যে চলে এসেছে। পূর্বেকার সময়ের ব্যক্তির জীবন-জীবিকা থেকে আধুনিক রাষ্ট্রের নাগরিকের জীবন সম্পূর্ণ ভিন্ন। নাগরিকের জীবনের প্রায় সর্বক্ষেত্রেই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের শক্তিশালী প্রভাব উত্তরোত্তর বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে কোন ভাষা জনপ্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে তাও কার্যত রাষ্ট্রের চরিত্র দ্বারাই নির্ধারিত হয়।

একুশে ফেব্রুয়ারির আন্দোলন সংঘটিত হয়েছিল রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক ক্ষমতাবলয়ে বাংলাকে স্থান দেওয়ার জন্য। এখন আমরা বিশ্বজুড়ে মাতৃভাষা দিবস পালন করে থাকি। মাতৃভাষা দিবসের প্রতিপাদ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে মাতৃভাষার সংরক্ষণ করা। অথচ একুশের চেতনা নেহাত মাতৃভাষাকে রক্ষা করা নয়। বরং সংখ্যাগরিষ্টের মুখের ভাষাকে রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ সম্মান দিয়ে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়া এবং রাষ্ট্রীয় পরিমণ্ডলে ভাষিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। ভাষার অস্ত্র দিয়ে বিভাজন ও জুলুম বন্ধ করাই একুশের চেতনা।

এই দৃষ্টিকোণ আমরা দেখি যে স্বাধীন বাংলাদেশে ভাষাগত জুলুম বেড়েছে। সমাজে সাইফুর’স এর আবির্ভাব ঘটেছে। সাইফুর’সের বিজ্ঞাপনগুলোর দিকে তাকালে বাংলার কঠিন দূরাবস্থা স্পষ্ট হয়ে উঠে। ভালো লাগুক আর মন্দ লাগুক এটাই এই বাংলাদেশের প্রতিবিম্ব। খোদ রাষ্ট্রীয় পৃষ্টপোষকতায় এখানে ইংরেজির হেজেমনি তৈরি করা হচ্ছে। সরকারীভাবে ‘ইংরেজি ভার্সন’ সৃষ্টি করে সরকারের শীর্ষজনদের শহীদ মিনারে ফুল নিয়ে যাওয়া এক ধরনের প্রহসন।

বাংলার রাষ্ট্রভাষা না হওয়ার সুযোগে শিক্ষা থেকে শুরু করে চাকরির বাজারসহ সর্বত্র যে হারে অরাজকতা ও বৈষম্য বৃদ্ধি পাচ্ছে তা চলতে থাকলে বাংলাদেশ রাষ্ট্র এক সময় অস্তিত্বের হুমকিতে পড়বে। বাংলা ভাষায় মানসম্মত জ্ঞানচর্চা ও প্রকাশনাকে উৎসাহিত করা সহ বাংলা চলচ্চিত্র ও শিল্প মাধ্যমগুলোকে সমৃদ্ধ করার জন্য রাষ্ট্র যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করলে একটি সংহত বাংলা ও বাঙালি সমাজ প্রতিষ্ঠা আজো সম্ভব।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন