, ১ জানুয়ারি ২০২১; ৩:০৯ অপরাহ্ণ


তুর্কি বংশোদ্ভূত অভিবাসীদের টার্গেট করে জার্মানির একটি সিসা বারে চালানো বন্দুক হামলায় নিহত হয়েছেন ৯ জন। এ ঘটনায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন দেশটির সংখ্যালঘু মুসলিম সমপ্রদায়। সামপ্রতিক বছরগুলোতে জার্মানিতে রক্ষণশীল ডানপন্থিদের উত্থান ছিল চোখে পড়ার মতো।

এ নিয়ে আগে থেকেই সেখানকার মুসলিমদের মধ্যে শঙ্কা দানা বাঁধছিলো। সঙ্গে দেশটিতে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বিদেশ থেকে আসা মুসলিমদের টার্গেট করে চলা সামপ্রদায়িক হামলার সংখ্যা। এমন অবস্থায় নিরাপত্তা শঙ্কায় থাকা মুসলিম সমপ্রদায়ের নেতারা বলছেন, জার্মানিতে তারা কখনই এত অনিরাপদ বোধ করেননি।

জার্মান গণমাধ্যমের খবর থেকে এটি নিশ্চিত যে, অভিবাসীদের ওপর প্রচণ্ড ঘৃণা থেকেই এ হামলা চালানো হয়। দেশটির সবথেকে বড় ট্যাবলয়েড বিল্ড জানিয়েছে, হামলাকারী সেখানে দায় স্বীকার করে একটি চিঠি রেখে যায়। সেখানে তার ডানপন্থি উগ্র দর্শনের প্রমাণ পাওয়া যায়।

ইতিমধ্যে জার্মান সরকারও বলছে, বর্ণবাদী উগ্র আদর্শের কারণেই এই হামলা হয়েছে। যেই সিসা বার দু’টিতে হামলা হয়েছে সেগুলোতে মূলত ওই শহরের অভিবাসীদের আনাগোনা ছিল। নিহতের মধ্যেও প্রায় সবাই তুর্কি বংশোদ্ভূত। এ হামলাই প্রমাণ করে জার্মানিতে মুসলিম ও ইহুদিদের প্রতি ঘৃণার যে বিস্তার সমপ্রতি চোখে পড়ছে তা কত ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে।

এ নিয়ে আতঙ্কিত দেশটির মুসলিম সমপ্রদায়। দেশটিতে থাকা মসজিদগুলোর সবথেকে বড় সংস্থা ডিটিব। তারা জানিয়েছে, বছরে জার্মানির মসজিদগুলোকে লক্ষ্য করে ছোট-বড় প্রায় ১০০ হামলা হয়ে থাকে। শুধুমাত্র গত কয়েক সপ্তাহেই উনা, হাগেন, এসেন ও বিয়েলফেল্ডে একাধিক মসজিদে হামলার হুমকি দেয়া হয়েছে।

এমন অবস্থায় মসজিদগুলোতে নিরাপত্তা চান মুসলিমরা। এগুলোকে সুরক্ষিত রাখতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন জার্মান মুসলিমদের কেন্দ্রীয় কাউন্সিল আইজিএমজি’র নেতা আইমান মাজিয়েক। তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে এখনই জার্মান রাষ্ট্রের ভাবা উচিত।

যেসব জায়গায় ইতিমধ্যে হামলা হয়েছে সেগুলো বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। সরকারের উচিত সেখানে পুলিশের উপস্থিতি বৃদ্ধি করা। জার্মান গণমাধ্যম ডয়েচে ভেলেকে দেয়া সাক্ষাৎকারে আইজিএমজি’র মহাসচিব আবদাস সামাদ ইয়াজিদিও একই কথা বলেন। তার ভাষায়, মুসলিমরা জার্মানিতে এখন খুবই অনিরাপদ বোধ করছে। ডানপন্থিদের এমন উত্থান আগে কখনো দেখা যায়নি।

নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা এর আগেও বেশ কয়েকবার জানিয়েছেন মুসলিম নেতারা। গত বছরের অক্টোবরে ডানপন্থিরা হামলা চালায় জার্মানির হাল শহরের একটি ইহুদি সিনাগগে। ইহুদিদের উপাসনালয়ে হওয়া ওই হামলায় নিহত হয়েছিলেন ২ জন।

ঘটনার পর আইমান মাজিয়েক উদ্বেগ জানিয়েছিলেন। ইহুদিদের ওপর হামলার নিন্দা ও ভিক্টিমদের প্রতি সহমর্মিতা জানিয়েছিলো মুসলিমদের সংগঠন আইজিএমজি। আইমান তখনই বলেছিলেন, আজ ইহুদিদের ওপর যে হামলা হয়েছে তারাই মুসলিমদের ওপর হামলা চালাতে পারে। অবস্থার অবনতি তখনই সপষ্ট হয়ে গিয়েছিল।

বিশ্বজুড়ে ইসলাম ও ইহুদি ধর্মাবলম্বীদের লক্ষ্য করে বেড়ে চলেছে হামলার সংখ্যা। গত বছর নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চসহ বেশ কয়েক জায়গায় উগ্র ডানপন্থিদের হামলার শিকার হয়েছে মুসলিম ও ইহুদিরা। জার্মানিতেও বেড়েছে এ ধরনের উগ্রবাদ।

দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের হিসেবে ২০১৮ সালে শুধু মুসলিমদের লক্ষ্য করেই অন্তত ৯৮০টি হামলা হয়েছে। এতে ওই বছর আহত হয়েছিলেন ৪০ জনেরও বেশি মুসলিম। এ নিয়ে আইজিএমজি জানায়, এ সংখ্যা দিয়ে ঘটনার প্রকৃত অবস্থা বোঝা যাবে না। হামলা ছাড়াও সমাজে ডানপন্থিদের উত্থান হচ্ছে তার প্রভাব সংখ্যালঘুরা এড়াতে পারছে না।

এই বক্তব্যের প্রমাণ পাওয়া যায় অন্য গবেষণাগুলোতেও। এরোফোর্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এ নিয়ে একটি গবেষণা করেছেন। এতে তিনি দেখতে পান, শতকরা ৫০ ভাগেরও বেশি জার্মান মুসলিমদের ব্যাপারে ভীতি প্রদর্শন করেন। প্রথমদিকে প্রান্তিক পর্যায়ে ছড়িয়ে থাকলেও এখন সমগ্র জার্মানি জুড়েই বাড়ছে ইসলামভীতি।

জার্মানির এন্টি ডিসক্রিমিনেশন এসোসিয়েশনও জানিয়েছে, ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের প্রতি সৃষ্ট ভয়ের কারণেই তাদের ওপরে হামলা বেড়ে চলেছে। সরাসরি হামলাই নয় শুধু, ইহুদি ও মুসলিমদের দিকে রাস্তায় হাঁটার সময় থুতু দেয়া, কড়া দৃষ্টিতে তাকানো কিংবা মৌখিক নিপীড়নের ঘটনা বাড়ছে দেশটিতে।

এ নিয়ে দেশটির মুসলিম নেতারা অভিযোগ করেছেন, অবস্থা এতটাই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, জার্মানিতে মুসলিম নারী ও শিশুরা একা মসজিদে আসতে ভয় পাচ্ছেন। শুক্রবারের নামাজে যাওয়ার দিন তারা আতঙ্ক বোধ করে। কেউ কেউ এ ভয়ে মসজিদে যাওয়াই ছেড়ে দিয়েছেন। মানুষের মুক্তচিন্তার অধিকার রক্ষায় বিশ্বব্যাপী জার্মানির যে সুনাম রয়েছে এসব ঘটনায় তা মুছে যেতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন মুসলিম নেতারা।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন