মঙ্গলবার, ২ আগস্ট ২০২১; ৮:৪৪ পূর্বাহ্ণ


ঠিক এক বছর আগে ভারত-পাকিস্তান সামরিক উত্তেজনার সূত্রে দুই দেশ একে অপরের সীমানার মধ্যে পাল্টাপাল্টি বিমান হামলা করেছিল এবং নিজের সীমানার মধ্যে ভারতের একটি বিমানকে ভূপাতিত করেছিল পাকিস্তান এবং বিমানের পাইলটকে আটক করেছিল। ওই ঘটনার পর ভারতের ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নীতি নির্ধারকরা শপথ নিয়েছিলেন যে, তারা আগের চেয়েও জোরালোভাবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করবেন।

ভারতের নীতি নির্ধারকরা দেখতে চেয়েছিল যে তাদের নীতি কাজ করছে এবং পাকিস্তানকে কালোতালিকাভুক্ত করেছে এফএটিএফ। কিন্তু তাদের আশা পূরণ হয়নি।

‘পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার’ নীতি যে ব্যর্থ হয়েছে, তা আরও স্পষ্ট হয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভারত সফরের আগে ও সফরকালে। সব ধরনের তোষণ ও প্রদর্শনীর মধ্যেও ট্রাম্প পাকিস্তানকে ‘বন্ধু’ বলাটাকেই উপযুক্ত মনে করেছেন এবং বলেছেন যে, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে পাকিস্তান তাদের মিত্র। তার এই বক্তব্য ভারতের অবস্থানের সম্পূর্ণ বিপরীত, কারণ পাকিস্তানকে সবসময় ‘সন্ত্রাসের পৃষ্ঠপোষক’ আখ্যা দিয়ে আসছে ভারত।

ভারতের ক্ষতে আরও নুন দিয়ে ট্রাম্প বলেছেন যে, তিনি আশা করেন [কাশ্মীরকে ঘিরে] দক্ষিণ এশিয়ার উত্তেজনা প্রশমিত হবে, এবং এটা পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় আরও বৃহৎ স্থিতিশীলতা ও সম্প্রীতি নিয়ে আসবে।

হতে পারে যে এটা শুধুই একটি রাজনৈতিক বক্তব্য। এরপরও নিশ্চিতভাবে পাকিস্তানের জন্য এটা গুরুত্বপূর্ণ বিশেষ করে ‘বয়ানের যুদ্ধের’ ক্ষেত্রে। কারণ পাকিস্তান কাশ্মীর ইস্যুকে আন্তর্জাতিকীকরণের চেষ্টা করে আসছে আর ভারত বলে আসছে যে, কাশ্মীর তাদের ‘অভ্যন্তরীণ ব্যাপার”।

ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ‘গভীর সম্পর্ক’ রয়েছে মর্মে ট্রাম্প আর মোদি যে দাবি করেছেন, তা সত্বেও উপরোক্ত কথা দুটি বলেছেন ট্রাম্প। মোদির ভাষায়, “ট্রাম্প এবং তার পরিবারের আগমণের মধ্য দিয়ে বোঝা গেছে যে, দুই দেশের মধ্যে পরিবারের মতো সম্পর্ক রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র আর ভারতের মধ্যে সম্পর্কটা আরেকটি অংশীদারিত্বের মতো নয়, এই সম্পর্কটা অনেক বড় ও গভীর”।

তবে, ‘গভীর সম্পর্কের’ বাগাড়ম্বরের পেছনে রয়েছে উত্তেজনা এবং পরিবর্তিত আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির বিভিন্ন দিক।

প্রথমত, ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য সম্পর্ক এখনও দ্বন্দ্বের মধ্যেই রয়েছে এবং দুই দেশের মধ্যে কোন বাণিজ্য চুক্তি হয়নি। এমনকি ভারতের উদ্দেশে রওয়ানা দেয়ার আগেও ভারতের বাণিজ্য শুল্ক নিয়ে সমালোচনা করেছেন ট্রাম্প। ফলে সফরের সার্বিক উদ্দেশ্য নিয়েই প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল। এই লুকানো বাণিজ্য উত্তেজনা দ্বারা বোঝা যায় যে, ট্রাম্প কেন ভারতের নীতিকে চ্যালেঞ্জ করে পাকিস্তানকে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে মিত্র হিসেবে তুলে ধরেছেন।

ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে বলতে গেলে এটা সম্পন্ন হওয়াটা কঠিনই রয়ে গেছে। সেটা শুধু চুক্তির টেকনিক্যাল সমস্যার কারণে নয়, বরং ট্রাম্প আর মোদির মধ্যে জাতীয়তাবাদী যে মনোভাব রয়েছে, সেটিও এখানে অন্যতম কারণ। উভয়েরই লক্ষ্য হলো কোন ছাড় না দিয়ে নিজেদের জাতীয় অর্থনৈতিক স্বার্থকে রক্ষা করা। এটা থেকেই বোঝা যায় যে, কেন ‘বাণিজ্য যুদ্ধ’ শুরু হয়েছিল এবং কেন এ ব্যাপারে কোন সমাধান পাওয়া যাচ্ছে না।

একদিকে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ‘আমেরিকা প্রথম’ নীতি, আর অন্যদিকে নরেন্দ্র মোদির ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ প্রচারণা। এই দুইয়ের কারণে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য চুক্তিটা আরও কঠিন হয়ে গেছে। এই নীতিগুলো না থাকলে হয়তো চিত্র এ রকম হতো না।

যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত যদিও এক সময় বিষয়টি মিটিয়ে ফেলতে পারবে, কিন্তু এখন যে দ্বন্দ্বটা উভয়ের মধ্যে চলছে, সেটা ভারতের সমান্তরালে আঞ্চলিক অবস্থান সংহত করার ক্ষেত্রে পাকিস্তানকে সরাসরি উপকার করেছে। বিশেষ করে এমন একটা সময় যখন ভারত যুক্তরাষ্ট্রকে প্ররোচিত করার চেষ্টা করছে যাতে তারা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আরও ‘কঠোর’ হয়।

তবে যুক্তরাষ্ট্র কেন পাকিস্তানের ব্যাপারে উচ্চ ধারণা জানাচ্ছে, সেই কারণে একটা অংশ মাত্র ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের নেতিবাচক বাণিজ্য সম্পর্ক দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়।

যুক্তরাষ্ট্র-তালেবান আলোচনা এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে পাকিস্তানের গঠনমূলক এবং কার্যত কেন্দ্রীয় ভূমিকা নিঃসন্দেহে পাকিস্তান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের গতি পাল্টে দিয়েছে। পাকিস্তানের ব্যাপারে ট্রাম্পের নিজের বক্তব্য বদলে যাওয়া দেখলেই সেটা স্পষ্ট হয়।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ক্ষমতায় আসার পরপরই ট্রাম্প পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলেছিলেন যে, পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে প্রায় ৩১ বিলিয়ন ডলার নিলেও আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তারা কিছুই করেনি। আজ, যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘতম যুদ্ধের পরিসমাপ্তির জন্য পাকিস্তানকে অনিবার্য অংশীদার হিসেবে দেখছে যুক্তরাষ্ট্র।

এটাকে সঠিকভাবেই ‘আঞ্চলিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে পাকিস্তানের বিজয়ের মুহূর্ত’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পাকিস্তান এই পরিস্থিতিটাকে সম্ভাব্য সকল উপায়ে নিজের সুবিধায় কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে। আফগানিস্তানের ব্যাপারে ভারতের যে পরিকল্পনা এবং তালেবানদের ক্ষমতার বাইরে রাখার তাদের যে আকাঙ্ক্ষা, সেটা মোকাবেলার ক্ষেত্রেও পাকিস্তান তাদের এই সুযোগটাকে কাজে লাগাচ্ছে।

পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী যখন এদিকে ইঙ্গিত করেছেন তখন কোন অস্পষ্টতা রাখেননি তিনি। তিনি বলেছেন যে, “এই অঞ্চলের কিছু পক্ষ সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্র আর তাদের মিত্রদের সতর্ক থাকতে হবে, যারা [আফগানিস্তানে] অব্যাহত সঙ্ঘাত থেকে উপকৃত হয়। আমি তাকে সতর্ক করে দিচ্ছি যে, এই পক্ষগুলো আমাদের শান্তি প্রচেষ্টার অগ্রগতি ধ্বংস করে দেয়ার জন্য মরিয়া হয়ে আছে”।

একই সাথে, আফগানিস্তানের শান্তি প্রক্রিয়ায় পাকিস্তানের সম্প্রসারিত ভূমিকার কারণে এফএফটিএফ পুনর্গঠনের কঠিন পথ পারি দেয়াটা পাকিস্তানের পক্ষে সম্ভব হয়েছে। পাকিস্তান যদিও এখনও এফএটিএফের কর্মপরিকল্পনা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করেনি, কিন্তু আফগানিস্তানে তারা যে ভূমিকা রাখছে, সেটা এফএটিএফের সদস্যদেরকে অনেকটা সন্তুষ্ট রেখেছে। মনে হচ্ছে, তারা এমনটা হিসেব করেছেন যে, পাকিস্তানকে (ভারতের লবিংয়ের কারণে) এফএটিএফের কালো তালিকাভুক্ত করলে আফগান শান্তি প্রক্রিয়া ভেস্তে যেতে পারে।

ভারতের নীতি নির্ধারকদের কাছে এই পরিস্থিতিটা এমন একটা অনিবার্য বাস্তবতা নিয়ে এসেছে, যেখানে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ‘কঠোর’ হওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বোঝানোর বিষয়টি ক্রমেই তাদের পক্ষে কঠিন হয়ে উঠছে।

আফগান আলোচনার পরবর্তী ধাপ – আফগান-অভ্যন্তরীণ আলোচনার ক্ষেত্রেও পাকিস্তান একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে থাকবে। এর অর্থ হলো আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে প্রাসঙ্গিক থাকবে পাকিস্তান। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের দিক থেকে বিবেচনা করলে, সেনা প্রত্যাহারের পরও আফগানিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গুরুত্বপূর্ণ থাকবে, কারণ নতুন ‘সেন্ট্রাল এশিয়া স্ট্র্যাটেজির’ অধীনে যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানের মাধ্যমে মধ্য এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর সাথে যুক্ত হতে চায়, যাতে তারা রাশিয়া আর চীনের প্রভাব মোকাবেলা করতে পারে।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন