, ১ আগস্ট ২০২১; ১০:৫২ অপরাহ্ণ


বিশ্বের নতুন মহামারী কোভিড-১৯ বা করোনা ভাইরাস মহামারীর বিরুদ্ধে লড়াউয়ে বহু দেশ একইরকম পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে যাচ্ছে। এই মহামারীটি প্রতি ৫ থেকে ৬ দিনে দ্বিগুণ হারে বিস্তার লাভ করছে। সরকারগুলি চাইলে কোভিড-১৯ এর বিস্তারের হার কমিয়ে দিতে পারে। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক সময় ভাইরাসের মত দ্রুতগতির নয়। এবং পরিস্থিতির আকষ্মিকতায় এই মূহুর্তে পুরো বিশ্ব হতবিহ্বল হয়ে পড়েছে।

বর্তমানে বিশ্বের ৮৫ টি দেশ এবং প্রাদেশিক অঞ্চলগুলিতে এই মহামারী ছড়িয়ে পড়েছে। সপ্তাহখানেক আগেও এই সংখ্যা ছিল ৫০। এ পর্যন্ত ৯৫,০০০ এরও বেশি সংক্রমণ এবং ৩,২০০ মৃত্যুর তথ্য নথিবদ্ধ হয়েছে।

চীনে বিদেশী কোম্পানিগুলো যেসব সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে:

করোনা ভাইরাস যে শুধু চীনের অর্থনীতিকে সমস্যায় ফেলেছে তা কিন্তু নয়। বরং চীনের সাথে যেসব দেশের ব্যবসায়ীক লেনদেন বেশি তারাও সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র। কেননা যুক্তরাষ্ট্রের বড় কিছু কোম্পানি একদিকে চীন থেকে পণ্য ক্রয় করে। আবার একইসাথে চীনেই তারা বিক্রি করে। ফলে এখানে উভয় সঙ্কট সৃষ্টি হচ্ছে। একদিকে তারা চাহিদা মোতাবেক পণ্য পাচ্ছে না। যা তারা চাইলে কোনো দেশে বিক্রি করতে পারে। আরেকদিকে চীনের ক্রেতাদের তারা সাময়িকভাবে হারাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের টেক জায়ান্ট অ্যাপল তাদের অধিকাংশ পণ্যই চীনে সংযোজন করে থাকে। কিন্তু করোনা ভাইরাসে ছড়িয়ে পড়ার পর অ্যাপল তাদের কর্মীদের চীন ভ্রমণের উপর কড়াকড়ি আরোপ করেছে। কোম্পানিটি বর্তমানে দুই ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রথমত, তারা তাদের পণ্যের সরবরাহ সঠিক সময়ে পাবে কি না। আর দ্বিতীয়ত, তারা বছরের প্রথম কোয়ার্টারে চীনে কেমন ব্যবসা করতে পারবে। কারণ চীন অ্যাপলের জন্য বড় একটি বাজার। গত বছর তারা ছয় ভাগের এক ভাগ পণ্য চীনে বিক্রি করেছে। কিন্তু ভাইরাসের কারণে তাদের ৪২টি শাখা বন্ধ করতে হয়েছে।

চীনের একটি বিমানবন্দরের চেক ইন কাউন্টার

বাচ্চাদের খেলনা নির্মাণে শীর্ষে রয়েছে চীন। কিন্তু চীন-মার্কিন বাণিজ্যের যুদ্ধের কারণে এই খাতটি অনেকদিন ধরে বেশ অনিশ্চয়তার মধ্যে দিয়ে গেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প অতিরিক্ত কর বসানোর হুমকি দেওয়ার পর চীনের অনেক কোম্পানি দ্রুত সময়ের মধ্যে ক্রেতাদের চাহিদা মোতাবেক খেলনা তৈরি করেছিল। পাশাপাশি অধিকাংশ খেলনা তারা থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামে মজুদ করে রেখেছিল।

চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চুক্তি হওয়ার পর এখন আর সে ধরনের হুমকি নেই। কিন্তু বর্তমানে তারা করোনা ভাইরাসের সাথে যুদ্ধ করছে। সামনেই জার্মানির নুরেমবার্গে আন্তর্জাতিক খেলনা মেলা হবে। সেখানে চীনের প্রতিষ্ঠানগুলো অংশগ্রহণ করে থাকে। পাশাপাশি তাদের থেকে বিভিন্ন কোম্পানি খেলনা ক্রয় করে থাকে। কিন্তু এই সময়ে চীনের অনেক খেলনা তৈরির কারখানা বন্ধ রয়েছে। ফলে তাদের উপর নির্ভরশীল অনেক কোম্পানিও এক ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে।

অ্যাপলের শো রুমে অলস সময় কাটছে কর্মীদের © Kevin Frayer

তবে করোনা ভাইরাস সবচেয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে পর্যটন খাতে। গতবছর চীন থেকে প্রায় ১৬০ মিলিয়ন পর্যটক বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছে৷ চীনের পর্যটকদের উপর ম্যারিয়ট হোটেল অনেকটাই নির্ভরশীল। যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে চীনই তাদের সর্ববৃহৎ বাজার। ২০১৮ সালে তারা আলিবাবার সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। আলিবাবার মাধ্যমে চীনের পর্যটকরা চীন, হংকং, ম্যাকাও, তাইওয়ানসহ বিশ্বের আরো অনেক দেশে হোটেলের কক্ষ ভাড়া নিয়ে থাকেন।

কিন্তু এবার করোনা ভাইরাসের কারণে ফেব্রুয়ারির ২৯ তারিখ পর্যন্ত চীনের নাগরিকদের বুকিং বাতিল করেছে ম্যারিয়ট। এতে করে শুধু ম্যারিয়টই ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, সেই সাথে চীনের নাগরিকদের যেসব দেশে ভ্রমণের কথা ছিল তারাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কারণ একজন চীনা পর্যটক কোথাও ভ্রমণে গেলে কেনাকাটার জন্য গড়ে ৭৬২ মার্কিন ডলার ব্যয় করে। যেখানে অন্যরা একই কাজে ব্যয় করে গড়ে ৪৮৬ মার্কিন ডলার।

এ বছর চীনের পর্যটনে ধ্বস নেমেছে © Tomohiro Ohsumi

মূল বিষয় হচ্ছে চীন বর্তমানে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দেশ। একইসাথে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ চীনের পণ্যের উপর নির্ভরশীল। আবার অনেক শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানের বড় বাজারও চীন। এখন সেখানে যদি করোনা ভাইরাস নিয়ন্ত্রণ না করা যায়, তাহলে মানবিক ও অর্থনৈতিক দুই ধরনের বিপর্যয়ই ঘটবে। চীনের অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব সারাবিশ্বেই পড়বে। বাংলাদেশের সাথে চীনের ব্যবসায়িক সম্পর্ক বেশ গভীর। ফলে আমাদেরও এর সম্মুখীন হতে হবে।

তবে আশার কথা হলো ২০০৩ সালে চীনে যখন সার্স ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে, তখনও চীনের অর্থনীতি একটা ধাক্কা খেয়েছিল। কিন্তু সে ধাক্কায় তারা ভেঙে পড়েনি। বরং তারা বিস্ময়করভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। সেই সময় চীনে একজনও বিলিওনিয়ার ছিল না। কিন্তু বর্তমানে চীনে ৩২৪ জনের মতো বিলিওনিয়ার।

করোনা ভাইরাস চীন ও বিশ্ব অর্থনীতির অবশ্যই বড় ধরনের হুমকি। তবে এর সবকিছুই নির্ভর করছে করোনা ভাইরাসের স্থায়িত্বের উপর। এই ভাইরাস নির্মূল করতে যত সময় অতিবাহিত হবে, বিশ্ব অর্থনীতি তত বেশি চাপের মধ্যে পড়বে।

চীনে আসা-যাওয়া এবং ভ্রমণের ধরণের বিশ্লেষণ করে দ্য ইকোনমিস্ট আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যে, দেশগুলো ১০জনেরও বেশি আক্রান্ত শণাক্ত করেছে, সেসব দেশে এর বাইরেও শতাধিক করোনা আক্রান্তের অবাধ চলাফেরা থাকতে পারে। ইরান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ইতালির মাধ্যমেও ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ছে।

আমেরিকা ১৪ টি রাজ্যে ১৫৯ টি সংক্রমণ নথিভুক্ত করেছে। তবে ১ মার্চ অবধি দক্ষিণ কোরিয়া যখন ১০ হাজার পরীক্ষা করছিল তখন আমেরিকা মাত্র ৪৭২ জনের পরীক্ষা সম্পন্ন করেছিল। এখন যখন আমেরিকা পরীক্ষার কাজটি যথাযথভাবে শুরু করেছে, এতে করে নিশ্চিতভাবেই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সংক্রমণের সন্ধান পাবে।

তবে ভাইরাস সংক্রমণ যে পর্যায়েই যাক না কেন, এর প্রভাব কমাতে ও এটিকে নির্মূল করতে শুধুমাত্র ডাক্তার এবং প্যারামেডিকরাই যথেষ্ট নয়। স্বাস্থ্যসেবা সিস্টেমগুলি কীভাবে এই মহামারী মোকাবেলা করবে, সে বিষয়ে চীনের কাছ থেকে পাঠ নিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

তারা বলছে, বিশ্বের বাকি দেশগুলোর একই ধরণের চিন্তাভাবনা করা প্রয়োজন, বিশেষত কীভাবে জনগণ ও সংস্থাগুলিকে আর্থিক সুরক্ষা দেয়া যায় যাতে ভুক্তভোগী এবং অসুস্থরা নিজেদের দূরে সরিয়ে না রাখে। এখানে অসুস্থ ভাতার বিষয়টি আসে, একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, গ্যারান্টিযুক্ত অসুস্থ ভাতা আমেরিকাতে ফ্লুর সংক্রমণ ৪০ শতাংশ কমিয়ে দেয়।

তবে মহামরী সংক্রান্ত চিকিৎসা ব্যয়, অসুস্থ ভাতা সরবরাহের ধাক্কা এবং মহামারী আতঙ্ক বিশ্ব অর্থনীতিতে আঘাত হানতে শুরু করেছে। চীনে মাও সেতুংয়ের মৃত্যুর পর প্রথমবারের মতো মার্চ মাসে পুরো অর্থনীতি সঙ্কুচিত হয়ে যেতে পারে।

ওইসিডি আশংকা করছে যে, চলতি বছরে বিশ্বব্যাপী প্রবৃদ্ধি ২০০৯ সালের পরে সবচেয়ে ধীর গতির হবে। অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষাবিদদের মডেল সমীক্ষা বলছে, আমেরিকা এবং ইউরোপের জিডিপি মহামারীর কারণে গতানুগতিকের থেকে ২ শতাংশ কম হতে পারতো। কিন্তু মৃত্যুর হার বেশি হলে তা ফেব্রুয়ারি ১৯ তারিখের শীর্ষ অবস্থান থেকে ৮ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। আর্থিক বাজার ভয়ে ম‚ল্য নির্ধারণ করা হয়।

ওয়াল স্ট্রিটে কর্পোরেট ঋণ প্রদান কমবেশি বন্ধ হয়ে গেছে। সেখানে কোষাগারগুলিতে বিগত দশ বছরে প্রথমবারের জন্য মূলধন ১ শতাংশেরও এর নিচে নেমে গেছে।

সমৃদ্ধ দেশগুলিতে, বেশিরভাগ অর্থনৈতিক প্রচেষ্টা অর্থনৈতিক বাজারকে শান্ত করার জন্য পরিচালিত হয়েছে। গত ৩ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ তার মুদ্রা-নীতি বৈঠকের পক্ষকাল আগে অর্ধ শতাংশের বেশি হারে মূল্য হ্রাস করে। অস্ট্রেলিয়া, কানাডা এবং ইন্দোনেশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলিও এই বিষয়ে কছিু সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ব্যাংক অফ ইংল্যান্ড এবং ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক উভয়ই তাদের নীতিমালা শিথিল করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সঙ্কটময় পরিস্থিতিতে শেষ পর্যন্ত সরকারগুলিকে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। তবে, আজ তারা করোনার গতির থেকেও এত পিছিয়ে রয়েছে যে এই মহামারীর বিস্তার রোধের বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে বলে মত বিশেষজ্ঞদের।  সূত্র : দ্য ইকোনমিস্ট।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন