, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১; ১০:০৬ অপরাহ্ণ


গত সোমবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘোষণা করেছে যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আগামী সপ্তাহের নির্ধারিত বাংলাদেশ সফর স্থগিত করেছেন। কারণ যে অনুষ্ঠানে তার উপস্থিত হওয়ার কথা ছিল, সেটি বাতিল করা হয়েছে।

রোববার অপ্রত্যাশিতভাবে বাংলাদেশ জানায় যে দেশে  তিনজন কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত হওয়ার প্রেক্ষাপটে ১৭ মার্চ দেশের প্রতিষ্ঠাতা শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীর মূল অনুষ্ঠান স্থগিত করা হয়েছে।

অবশ্য গুঞ্জন রয়েছে যে এর পেছনে আরেকটি ঘটনা কাজ করছে। আর তা হলো খোদ মোদির উপস্থিতি। গত শুক্রবার বাংলাদেশের বিভিন্ন নগরীতে বিশাল বিশাল বিক্ষোভ সমাবেশে মোদিকে জানানো আমন্ত্রণ বাতিল করার জন্য হাসিনা সরকারের প্রতি দাবি জানানো হয়। ঢাকা ট্রিবিউনে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, বিক্ষোভকারীরা মোদিকে নগরীতে প্রবেশে বাধা দিতে ঢাকা বিমানবন্দর ঘেরাও করারও পরিকল্পনা করছে।

এই প্রেক্ষাপটে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান বাতিলের ফলে বাংলাদেশ সরকার একটি অপ্রীতিকর অবস্থা এড়ানোর সুযোগ পেয়ে যায়।

বাংলাদেশে অন্য অনেক দেশের মতো তীব্রভাবে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়নি। তাছাড়া এই রোগের কারণে দেশে বড় অন্য কোনো সমাবেশ বাতিলও করা হয়নি।

বাংলাদেশী জুজু

ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) তার পূর্বাঞ্চলীয় প্রতিবেশীর সাথে সম্পর্কে যে ক্ষতি করেছে, বিক্ষোভগুলোতে সেটিরই আরেক ইঙ্গিত ছিল। অনেক দশক ধরেই বাংলাদেশের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রক্ষা করে চলেছিল ভারত। এর জের ধরে এখানকার জনসাধারণের মধ্যে বিপুল বন্ধুত্বপূর্ণ মনোভাব উপভোগ করে আসছিল।

কিন্তু এখন সেটা বানচাল হতে বসেছে। বিজেপির রাজনৈতিক গলাবাজীর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের দাবি হলো, তারা তাদের দেশ থেকে নথিহীন বাংলাদেশীদের বহিষ্কার করবে। জোরাল প্রমাণ তেমন না থাকলেও দলটি দাবি করছে যে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশী সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে গেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এমনকি এসব বাংলাদেশীকে ‘উইপোকা’ হিসেবেও অভিহিত করেছেন।

এই দাবি প্রমাণ করার জন্য বিজেপি বারবার জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (এনআরসি) সারা ভারতে প্রয়োগ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছে।

উত্তেজনা আরো বাড়িয়ে ডিসেম্বরে ভারতের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন পাস করে। এতে পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও বাংলাদেশ থেকে অমুসলিম অবৈধ অভিবাসীদেরকে দ্রুত ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রদান করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর কারণ হিসেবে বিজেপি বলেছে যে এই তিন দেশে হিন্দুদের ওপর ধর্মীয় নির্যাতন করা হয়।

ভারতে বাংলাদেশবিরোধী গলাবাজীর বিষয়টি অপ্রত্যাশিত নয়। আর এটিই ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করেছে। ২০১৯ সালের জুলাই মাসে প্রথমবারের মতো ভারতের এনআরসি প্রক্রিয়া নিয়ে বাংলাদেশ প্রকাশ্যে উদ্বেগ প্রকাশ করে। এর জবাবে ভারত বারবার ঢাকাকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছে যে এনআরসি প্রক্রিয়াটি এই সম্পর্কে প্রভাব বিস্তার করবে না।

এনআরসি বিতর্ক

ভারতের নাগরিকত্ব উদ্যোগটি বাংলাদেশ সরকারের জন্য খারাপ সময়ে এসেছে। বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে দেশের স্বাধীনতায় ধাত্রীর ভূমিকা পালন করেছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শেখ মুজিবুর রহমানের মেয়ে এবং রাজনৈতিক বৈধতার দিক থেকে তার বাবার বিশাল কৃতিত্বের ওপর নির্ভরশীল। এর ফলে বাংলাদেশ জন্মশতবার্ষিকীর জন্য বিপুল প্রস্তুতি নেয়। ওই উৎসবের জন্য হোর্ডিংয়ে ঢাকা নগরী ছেয়ে ফেলা হয়।

কিন্তু সফর বাতিলের ঘটনা থেকে পরিষ্কার যে ভারতের সাথে ঘনিষ্ঠতার কারণে হাসিনা প্রশাসন এখন চাপের মুখে রয়েছে। ২০০৯ সালে নবনির্বাচিত হাসিনা সরকার ভারতের সাথে সম্পর্ককে নতুন মাত্রায় নিয়ে যেতে চেয়েছিল। সবসময় ভারতের ঘনিষ্ঠ আওয়ামী লীগ ভারতের নিরাপত্তা লক্ষ্য হাসিলে সবকিছু করেছে। নিষিদ্ধ লিবারেশন ফ্রন্ট অব আসামের (উলফা) বিরুদ্ধে চূড়ান্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন হাসিনা। দলটির চেয়ারম্যান অরবিন্দ রাজখোয়াকে গ্রেফতার করে ২০০৯ সালে ভারতের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ২০১৫ সালে উলফার সাধারণ সম্পাদক অনুপ চেটিয়াকে গ্রেফতার করে ভারতের কাছে হস্তান্তর করা হয়। আরো তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, বাংলাদেশ উলফার বিপুল তহবিল জব্দ করেছে। ফলে একসময়ের ভীতিকর সংগঠনটি এখন প্রায় মৃত্যুর মুখে চলে গেছে।

ভারত ২০১৪ সালেও আনুকূল্য প্রদর্শন করে। ক্ষমতাসীন হাসিনা সরকারের অধীনে হওয়া বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচন প্রহসনেই পরিণত হয়। কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই অর্ধেকের বেশি আসনের ফলাফল ঘোষিত হয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও নয়া দিল্লি হাসিনাকে সমর্থন করে এবং নির্বাচনকে বৈধতা দেয়। এর ফলে আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় থাকা নিশ্চিত হয় এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের নতুন সরকারের বৈধতা নিয়ে গুঞ্জন বন্ধ হয়।

এই ব্যবস্থা নিশ্চিতভাবেই ২০১৮ সালের আগে পর্যন্ত বেশ ভালোভাবেই চলছিল। কিন্তু তারপর বাংলাদেশী অভিবাসী ইস্যু নিয়ে চাপ বাড়াতে থাকে বিজেপি। ফলে পরিস্থিতি সামাল দেয়া হাসিনার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। সূত্রঃ সাউথ এশিয়ান মনিটর।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন