শুক্রবার, ২ জানুয়ারি ২০২১; ১১:৪১ অপরাহ্ণ


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসরুমে কিছুদিন পূর্বে একটি ঘটনা ঘটেছে যেটি নিয়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। একজন শিক্ষক কর্তৃক ক্লাসের নারী শিক্ষার্থীকে নেকাব পরার কারণে ক্লাসে অনুপস্থিত ধরে নেওয়া হয়েছে। কাজটি নেক্কারজনক এবং একজন শিক্ষকের কাছে কোন অবস্থাতেই এই ধরণের ব্যবহার সমাজ আশা করে না। এই ঘটনা সমাজে হরহামেশাই ঘটে, তবে জল সবসময় একদিকেই গড়ায় না এই যা। সংশ্লিষ্ট অধ্যাপকের সম্মানার্থে এর নাম দেওয়া যেতে পারে ‘আজিজ সিন্ড্রোম’।

প্রশ্ন হচ্ছে আজিজ সিন্ড্রোম কি? এর লক্ষণ হল নিজের সিদ্ধান্তকে একমাত্র সঠিক সিদ্ধান্ত মনে করে অন্য জনের উপর চাপিয়ে দেয়া , এমন এক মতামত পোষণ করা যার কারনে ব্যক্তির পোশাক বা চেহারার কারনে তাকে তার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা।

যেমন, আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক শিক্ষক দেখেছি যারা মেয়েদের এমন কি ছেলেদের উপর নিজের পোশাক সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত সরাসরি চাপিয়ে দেন । যারা পিতা বলে মাথা পেতে নেন আমি তাদের দলে নেই , তাই আমি ব্যাপারটিকে ক্রিটিকালি দেখতে চাচ্ছি। এই যে যেমন, মনোবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক আজিজ সাহেব, তার নিজের ‘তথাকথিত’ প্রগতিশীল ভাবনা তার ক্লাসের ছাত্রীর উপর চাপিয়ে দিলেন , হিজাব/নেকাব খুলে মুখ দেখাতে হবে, নইলে উপস্থিতি নেই । এই ক্ষেত্রে পোশাক পছন্দ হল সেই ছাত্রীর অধিকার, আর ক্লাসে থাকলে উপস্থিতি তার প্রাপ্য ।

তাহলে কি দেখলাম, আজিজ সাহেব সেই ছাত্রীর ব্যক্তিস্বাধীনতা চর্চার কারনে তার প্রাপ্ত সুযোগ অর্থাৎ উপস্থিতি থেকে বঞ্চিত করলেন । তিনি অবশ্য তার মতন যুক্তি দিয়েছেন, তবে আমার কাছে তা অযৌক্তিক মনে হয়েছে, নিরাপত্তা নিয়ে এতই যদি শঙ্কা থাকে, তবে ক্লাস এ ডিজিটাল উপস্থিতি চালু করার সুপারিশ করতে পারতেন, সেই ক্ষেত্রে সত্যিকার অর্থেই নিরাপত্তার শঙ্কা দূর করা যেতে ।

এখন কথা হচ্ছে ‘আজিজ সিন্ড্রোম’ কি শুধু বোরখা/নেকাব খোলার ক্ষেত্রেই দেখা যায়, না কি নেকাব পরানোর ক্ষেত্রেও দেখা যায় । আমি বলব এটা পরানোর ক্ষেত্রেও দেখা যায়। বিশ্ববিদ্যালয়েই আমরা এমন শিক্ষক পাবো যারা ছাত্রীকে ইসলামি পোশাক পরাতে চান, ছাত্রী কি চান তা বড় ব্যাপার না। অর্থাৎ আমি বলতে চাচ্ছি আমাদের সমাজে এই আজিজ সিন্ড্রোম প্রকট ভাবেই বর্তমান । তাদের একদল নেকাব খোলায় ব্যস্ত আরেক দল নেকাব পরানোতে ব্যস্ত।

মাঝখান থেকে পোশাক যে কারো ব্যক্তি স্বাধীনতার সাথে জড়িত তা তারা মনেই রাখেন না। তাই এমন আজিজ সাহেব যেমন বিশ্ববিদ্যালয়ে আছেন তেমনি মাদ্রাসায় আছেন, আমাদের পরিবারে আছেন, আমাদের সমাজে আছেন। এখন কথা হচ্ছে আমরা এদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ কেমন করে করছি। আজিজ সাহেবের ঘটনা নিয়ে তাকে যে সমালোচনা করাই উচিত, তার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানানো আমাদের নাগরিক দায়িত্ব।

তিনি রাষ্ট্রের ভেতরের একজন, বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রের টাকায় চলে, তাই ব্যাপারটিকে শুধু বিভাগের সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই, এই সিন্ড্রোমকে বড় ফ্রেমে দেখতে হবে। কিন্তু ভয়ানক ব্যাপার হল যারা তার সমালোচনা করছিলেন, তাদের ভাষার ভয়ানক কদর্য । সমালোচকদের খুব বড় একটা অংশ, আমার ধারনা মতে, তাদের জানা ও নতুন করে শেখা গালিগালাজের চর্চা করে নিয়েছেন যা কোন ভাবেই সমালোচনার ভাষা হতে পারে না।

আবার যারা এইখানে ধর্ম অবমাননার কথা বলছেন, আমার বিশ্বাস তাদের অধিকাংশই এই আজিজ সিন্ড্রোম এ ভুগছেন, কারন তারা যেমন নেকাব খোলানোর প্রতিবাদ করছেন তেমনি তারাই যে নেকাব পরে না তাকে নেকাব পরাতে জিহাদে নেমে পড়বেন।

অর্থাৎ দুই দলই নারীর শরীরের উপর নারীর অধিকার স্বীকার করে না, বরং ধর্মের বা প্রগতিশীলতার দোহাই দিয়ে পুরুষের অধিকার ফলাতে চায়। সব থেকে হতাশার কথা হল, এই পুরো বিতর্কে খুব কম মানুষ অধিকারের প্রশ্নে আজিজ সিন্ড্রোম এর সমালোচনা করেছেন। এরা সংখ্যালঘু, কারন হতে পারে আমাদের সমাজে ধর্ম আর প্রগতিশীলতার বাইরে মানুষের অধিকার নিয়ে ক্রিটিক্যাল ডিসকোর্স গড়ে উঠে নি, শিক্ষা ব্যবস্থার দেউলিয়াপনার কারনে।

দ্রষ্টব্যঃ উল্লিখিত লেখাটি ২০১৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘটিত ঘটনার প্রেক্ষাপটে। 

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন