মঙ্গলবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১; ৮:৫৬ অপরাহ্ণ


File Photo: HSJIAP

আমি বাংলাদেশ নিয়ে চিন্তিত। আমাদের যে অর্থনৈতিক অবস্থা, সরকার ও প্রশাসনের দক্ষতা, এবং সবার উপরে জনগনের সচেতনতা, তা দিয়ে আর যাই হোক, করোনা ভাইরাস সামাল দেয়া প্রায় অসম্ভব।


আপনি আমাকে বলবেন আমি গুজব ছড়াচ্ছি। কিন্তু বিশ্বাস করেন আমি আপনাকে ভয় পেতে বলছি না, কিংবা বলছি না সরকার খারাপ। আমি শুধু বলছি বাস্তবতা মেনে নেন। বাস্তবতা মানলেই কেবল আমরা সমাধানের কথা ভাবতে পারব।

এই বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই যে অতীতের যে কোন সময়ের থেকে বাংলাদেশের উন্নতি হয়েছে। সরকারের স্বদিচ্ছা ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা বেড়েছে। কিন্তু দক্ষতার প্রশ্নে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। আর সেই কারনেই আমাদের বাস্তবতা মেনে সমাধানের কথা ভাবতে হবে।

ডেনমার্ক এর আরহুস শহরে এক প্রান্তে আমার পড়ার ঘরে বসে লিখছি। ডেনমার্কের প্রসঙ্গ আনলাম এই কারনে যে, করোনা মোকাবেলায় এই দেশের প্রস্তুতি চোখে পড়ার মতন। এখানে বড়লোক বলেন আর গরীব বলেন, সবাই বিনে পয়াসায় স্বাস্থ্য সেবা পায়। এমনকি যদি কেউ মনে করেন যে তার মধ্যে করোনার লক্ষণ দেখা দিয়েছে, তিনি ফোন করলে হাসপাতাল থেকে কর্মী এসে পরীক্ষা করার জন্য নমুনা নিয়ে যাবে। খাবার দোকান থেকে শুরু করে, বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি, সবখানে বিনে পয়সার হ্যান্ড সেনিটাইজার দিয়ে দেয়া আছে। প্রতিদিন আপডেট দেয়া হচ্ছে।

সবথেকে বড় কথা এখানে মানুষ সরকারের দেয়া তথ্য বিশ্বাস করে, সরকারকে সন্দেহ করে না। সরকার এদের সত্যি কথা বলে। এতো কিছুর পরেও শুধু মাত্র ১০ মার্চ রাত্রেই করোনায় আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা শতকরা ৫০ ভাগ বেড়ে গেছে।

এখন ফিরে আসি বাংলাদেশের কথায়। আমার মা-বাবা, বন্ধু বান্ধব সবাই বাংলাদেশে। এবার তাদের করোনা ভাবনা বলি।

মওলানা ইব্রাহিম সাহেবের কথা বিশ্বাস করে বসে আছেন আমার মা। তাঁর ধারণা এই ভাইরাসের সমাধান ইব্রাহিম সাহেব স্বপ্নে পেয়েছেন। আমার বাবা গভীর ভয়ে আছেন। প্রথমবারের মতন আমি তাকে বিশ্বাস করাতে সক্ষম হয়েছি যে হোমিও চিকিৎসা দিয়ে করোনা মোকাবেলা সম্ভব না। আমার গ্রামে যারা বিদেশ থেকে ফিরে এসেছেন তারা খুব আনন্দের সাথেই আত্মীয় স্বজনের সাথে দেখা করে বেড়াচ্ছেন। কেউ কেউ বিয়ে করার উদ্যোগ নিয়েছেন ও অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আলাদা থাকা তো দূরের কথা।

এখন ভাবছেন, আমার বাবা-মা কিংবা আমার গ্রামের সেই বিদেশ ফেরত মানুষের চিন্তা পুরনো। সত্যি বলি ভাই, আমার দেশের অধিকাংশ বয়স্ক মানুষ সব সমস্যার সমাধান ধর্মে খোঁজে, বিদেশ ফেরত মানুষ আশপাশের মানুষের কাছে নিজের সমৃদ্ধি দেখাতে চায় । অনেকেই হোমিও খেয়ে আল্লাহ বাঁচাবে বলে বসে থাকেন। রোগবালাই হলে আলাদা থাকার তো প্রশ্নই আসে না।

এবার বন্ধুদের কথা বলি। এরা শহরের মানুষ, শিক্ষিত। রাজনীতি নিয়ে গভীর আগ্রহ। আমার একদল বন্ধু মনে করেন এই করোনা সরকারের দোষ। প্রধানমন্ত্রী ও তার মন্ত্রীরা খারাপ। সব কিছু তাদের অপকর্মের ফসল। এই সরকার রোগ মোকাবেলা করতে সক্ষম না। সরকারের বহু রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যর্থতায় তারা যেমন নিজেদের ধারণা আংশিক বা পুরোপুরি সত্যি হওয়াতে আনন্দিত হয়েছেন তেমনি এই জনস্বাস্থ্য সঙ্কটেও সরকারের ভুলে তারা আনন্দিত হবেন। ফেসবুকে বড় বড় স্ট্যাটাস লিখে নিজের রাজনৈতিক দায়িত্ব পালন করবেন।

অন্যদিকে সরকার দলের বন্ধুরা মনে করেন তারা সব কিছু সামাল দিতে পেরেছেন ও পারবেন। নেত্রীর নির্দেশে তারা করোনা ভাইরাস নির্মূল করবেন। ছাত্রলীগ করোনা বিরোধী মিছিল বের করবেন। বিশ্ববিদ্যালয়য়ের শিক্ষক ও সাংবাদিক মহল চেতনার স্লোগান দেবেন। সরকারি বুদ্ধিজীবী এসে কাগজে কলমে আমরা যে সফল তা প্রমাণ করবেন। আমার জনৈক বন্ধু তো বলেই ফেলল, করোনা মোকাবেলায় বিশ্ব বাংলাদেশ কে রোল মডেল ঘোষণা করবে ও প্রধানমন্ত্রীকে নতুন কোন পুরস্কার দিতে চাইবে।

সমস্যা হল, আমার মা বাবা, বা সরকার পক্ষের ও বিরোধী দলের বন্ধুরা কেউ বুঝেও বুঝতে চাচ্ছেন না যে, করোনা সমস্যা আমাদের কল্পনার বাইরে। বাংলাদেশের বর্ডারের ভিতরে থেকে, আর আবেগি সাংবাদিকের শৈল্পিক রিপোর্ট দেখে বা পড়ে এর ভয়াবহতা বোঝা সম্ভব নয়।

আমার ভরসার জায়গা হল আমাদের ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ডাইরিয়াল ডিজিজ রিসার্চ (আইসিডিডিআরবি)। আমার দেশের অতি দক্ষ, শিক্ষিত ও মেধাবী মানুষরা এতে কাজ করছেন। আরেকটা ভরসার জায়গা হল পৃথিবীর অন্যান্য দায়িত্বশীল দেশগুলো ও আন্তর্জাতিক সংস্থা। বিশেষ করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। সরকার যদি আইসিডিডিআরবি এর পরামর্শে গুরুত্ব দেয় ও বিশ্ব শক্তিধর দেশগুলোর কাছে সাহায্যের জন্য হাত বাড়ায় তবে তারা সাহায্য পাবেই। এই বিপদে আমরা একা নই। একে অপরকে সাহায্য করার বিকল্প নেই।

আপনি দেশে বসে বলছেন আপনার সব প্রস্তুতি আছে, সব রেডি, সরকারের পক্ষে গলাবাজি করে সমালোচনা বন্ধ করতে চান তবে আপনি আপনার রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করছেন। নিজেকে একবার প্রশ্ন করুন দেশের মানুষের স্বার্থ রক্ষা করছেন কি? আফসোস হল যে, এই দেশের মানুষ ও সচেতন নন, এবং এরা নিজেই নিজের জন্য ক্ষতিকর।
আর যারা সরকারের সমালোচনা করে আনন্দিত হচ্ছেন, প্রধানমন্ত্রীকে গালি দিয়ে শান্তির নিশ্বাস নিচ্ছেন তাদেরও বলছি, মাঝে মাঝে সমালোচনার বাইরে আরেকটি কাজও মানুষের উপকার করে, আর তা হল সামাজিক ঐক্য তৈরি করা। নিজের লেখালেখি ক্ষমতা ব্যাবহার করেন ভাই, মানুষকে সচেতন করেন।

মওলানা ইব্রাহিমের মতন যে সকল লোক মানুষের ধর্মবিশ্বাস পুঁজি করে এমন সঙ্কটের সময় পয়সা কামাচ্ছেন, তাদের বিজ্ঞান দিয়ে ভুল প্রমান করেন। গণজমায়েত বন্ধ করেন, হোক তা ইসলামি জলসা কিংবা রাজনৈতিক সভা সমাবেশ, মানুষের কাছে সঠিক তথ্য নিয়ে যান। মানুষকে বোঝান আকাশ থেকে কোন দৈব স্বপ্নই আমাদের রক্ষা করতে আসবে না। আমরাই আমাদের একমাত্র সহায়। পাশাপাশি, সরকারের ও বিরোধীদলের কিছু নেতানেত্রীদের কথা বার্তা এড়িয়ে চলেন। এই নেতানেত্রীরা অন্যান্য সময়ের মতনই উদ্ভট কথা বলবেন, আর আপনার আমার মূল্যবান সময় নিতে চাইবেন। চাইবেন সংবাদমাধ্যমে নিজেকে প্রাসঙ্গিক করে রাখতে।

আপনার দায়িত্ব হল সেই সকল উদ্ভট কথাবার্তাকে কোন রকম গুরুত্ব না দেয়া। ফেসবুকে শেয়ার না করা।

সবথেকে বড় ব্যাপার হল যে বাংলাদেশ চীন নয়। চীন আপাতত সফল হয়েছে কারন তারা কোটি কোটি টাকা খরচ করেছে, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ও বিগ ডেটা দক্ষতার সাথে ব্যাবহার করেছে। আর সেখানে আমার দেশের লোভী কিছু কর্মকর্তা বিমান বন্দরে ৫০০ টাকায় করোনা আক্রান্ত নয় এই সনদ দিচ্ছেন।

এই মুহূর্তে আমাদের দায়িত্ব হল স্বপ্নে পাওয়া ফর্মুলা আর দুর্নীতি করা কর্মকর্তাদের রুখে দেয়া,সরকারকে সাহায্য করা, সবরকম ভাবে। মানছি সরকারের উপর আপনার বিশ্বাস নেই। কিন্তু তার পরও, আপনাকে সরকারকে সাহায্য করতেই হবে। এমন গণস্বাস্থ্য সঙ্কটে একমাত্র সরকার ও রাষ্ট্রই পারে কার্যকর ভাবে মানুষের কল্যাণ করতে। সবথেকে বড় কথা হল, আবেগি হয়েন না, আবেগি হয়ে এই সংক্রমণ মোকাবেলা সম্ভব নয়।

আমাদের দেশ যেমন জনবহুল তেমনি আমাদের বিপদ ও অনেক বেশি। আমাদের সমাজে ধনী গরিবের ব্যাপক ব্যবধান। সকলের জন্য স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত নয়। তার উপর চিকিৎসা সেবা খরচ সাপেক্ষ। ডাক্তার এর সঙ্কট, হাস্পাতালের সঙ্কট তো আছেই। এর উপর সুযোগসন্ধানী ও মুনাফালোভী সিন্ডিকেটের কাজকর্ম। সব মিলিয়ে সময় আমাদের পক্ষে নয়। আর কোন দৈব শক্তি আমাকে ও আপনাকে রক্ষা করতে আসবে না। একজন আরেকজনের কথা না ভাবলে, ও সামাজিক ঐক্য প্রতিষ্ঠা না করলে এই বিপদের মানবিক ক্ষতি কমানো সম্ভব নয়। আপনার পরিচয় এখন আওয়ামীলীগ বা বিএনপি বা জামায়েত না, আপনি বাংলাদেশি আর আপনার দায়িত্ব একজন অপরজনকে সাহায্য করা, পরস্পরের দেখাশোনা করা।

দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে সাহায্য করুন ভুল তথ্য সম্প্রচার বন্ধ করতে। এই সময়ে রাষ্ট্রের উপর আস্থা ও বিশ্বাস খুব জরুরী। এই কঠিন সময়ে আমাদের সামাজিক ঐক্য ও সরকারকে সাহায্য করার বিকল্প নেই।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন