শনিবার, ২ জানুয়ারি ২০২১; ১২:১৪ পূর্বাহ্ণ


তথ্যভিত্তিক উন্নয়ন প্রতিনিধিত্বকারী চিত্র

উন্নয়ন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। উন্নয়নের মানে এক একজনের কাছে এক এক রকম। তবে সামগ্রিক অর্থে উন্নয়ন শব্দটি ইতিবাচক অর্থেই বেশি ব্যবহৃত হয়ে থাকে।

ইতিবাচক অর্থে উন্নয়ন হল মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, গুণগত সমৃদ্ধি, দেশের সার্বিক আইন পরিস্থিতির উন্নয়ন, পরিবেশের সংরক্ষণ ও তার টেকসই ব্যবহার  এবং সমাজ বা রাষ্ট্রের ক্রমবিকাশ।

যে সকল আর্থ-সামাজিক চিন্তা এবং তার কার্যক্রমের বাস্তবায়নের মাধ্যমে গণ-মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আসে তাকে উন্নয়ন বলে মনে করা হয়ে। উন্নয়নের বিপরীত যাত্রাকে অপ-উন্নয়ন নামে কেউ কেউ চিহ্নিত করেছেন। আবার উন্নয়নের মাত্রা কোন সমাজে কতটুকু হচ্ছে সেটি সেই সমাজের শ্রেণি চরিত্রের বিকাশ দেখলে বুঝা যায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উন্নয়ন সমাজের উপর শ্রেণি থেকে নির্ধারিত হয়।

এই প্রসঙ্গে প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ বলেছেন, উন্নয়ন শব্দটি সকলের জন্য একই অর্থ বহন করে না। উন্নয়ন কি সকলের জীবনকে সমৃদ্ধ করবে নাকি বহুজনের জীবন ও প্রকৃতির বিনিময়ে কতিপয়কে দানব বানাবে-সেটি পরিস্কার না হলে উন্নয়ন থেকে কতিপয় গোষ্ঠীর জন্য; সেই উন্নয়ন হবে আংশিক অথবা মুষ্টিমেয় লোকের জন্য সীমাবদ্ধ (মুহাম্মদ ২০১৭)।

এক সময় উন্নয়ন বলতে মূলত বুঝাত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের পন্থাসমূহকে। উনবিংশ শতাব্দীতে এসে উন্নয়নের ধারণায় যুক্ত হয়েছে সামাজিক সূচকের ধারণা। পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রেখে অর্থনৈতিক কাজ চালানো যার উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে টেকসই উন্নয়নকে প্রশমিত করা।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাতিসংঘ কর্তৃক উন্নয়ন নীতিমালার মডেল সমগ্র ইউরোপে প্রভাব ফেলে। ১৯৯০ সনের পর নব্য ধারার অর্থনৈতিক চিন্তা তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহকে প্রচন্ড ধাক্কা দেয়। বাংলাদেশ আজও সেই উন্নয়ন মডেলের বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। চলমান উন্নয়ন মডেলে সব শাসক গোষ্টীই হচ্ছে আধিপত্য বিস্তারকারী শক্তি যাদের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে উন্নয়নের জন্য ব্যবহৃত সম্পদকে কেন্দ্রীভবন করা। এ থেকেই জন্ম নিচ্ছে সহিংসতা যা পাওলো ফ্রেইরি সুন্দর করে বলার চেষ্টা করেছেন।

পাওলো ফ্রেইরি তার The Practice of Freedom গ্রন্থে বলেছেন, তার ভাষায়, “Every relationship of domination, of exploitation, of oppression, by its definition is violent, whether or not the violence is expressed by drastic means. In such a relationship, dominator and dominated alike are reduced to things- the former dehumanized by an excess of power and later by lack of it”. অর্থাৎ তিনি বলেছেন প্রতিটি সমাজে আধিপত্য, শোষণ এবং নিপীড়নের সম্পর্ক নিজ থেকে সহিংস; হয়তো সহিংসতা সেখানে কিছুটা লুকিয়ে আছে বা খোলাখুলিভাবে উপস্থিত থাকে। এই রকম অবস্থায় দুই পক্ষই বস্তুতে পরিণত হয়। আধিপত্য বিস্তারকারী ক্ষমতার আতিশয্যে অমানুষ, আর দ্বিতীয় দল ক্ষমতার অভাবে মানুষের জীবন থেকে ছিটকে পড়ে। উন্নয়ন মডেলে দুই পক্ষ্যের অসম উপস্থিতির জন্য বাংলাদেশের উন্নয়ন মডেলে সহিংসতা একটি সাধারণ ঘটনা।

বাংলাদেশের উন্নয়নের মডেল বনাম উন্নয়ন সহিংসতা

বাংলাদেশ এখন এককালের ‘তৃতীয় বিশ্বে’র দেশসমূহের কাছে উন্নয়নের রুল মডেল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার প্রাপ্ত অর্মত্য সেন, কৌশিক বসু থেকে শুরু করে বাংলাদেশের অধ্যাপক আতিউর রহমান সহ বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নকে দক্ষিণ এশিয় উন্নয়ন মডেল আগাম ঘোষণা দিয়েছেন।

একই সাথে অনেকে বলেছেন দেশের অভ্যন্তরে দুর্বল রাজনৈতিক মত পার্থক্য বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার জন্য দৃষ্টান্ত হতে বাধা দিচ্ছে।

তারও আগে, ১৯৭০ দশকে, বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের পর্যবেক্ষণ ছিল A Test Case যাকে হেনরি কিসিঞ্জার Bottomless Basket বলেছেন, সেই দেশ এখনকার অর্থনীতিবিদদের মতে একটি মডেল হিসেবে দেখা দিয়েছে। এই উন্নয়ন মডেলে সার কথা হচ্ছে জিডিপি কেন্দ্রিক উন্নয়ন বিশ্লেষণ এবং পরিসংখ্যানগত ভাবে মানুষকে বার্ষিক গড় আয় বৃদ্ধিকে পরিমাপ করা। জিডিপি এবং মাথাপিছু আয়ের ভিত্তিতে উন্নয়ন পরিমাপ করার যে অনেক সমস্যা আছে সেগুলো সচেতন ভাবে এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে।

এই জিডিপি এবং মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির জন্য টেকসই উন্নয়নের কোন শর্তই পূরণ করা হচ্ছে না। অন্যদিকে, বাংলাদেশের আয় বন্টনের কোন সঠিক চিত্রই পাওয়া যায় না বলে মত দিয়েছেন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। ফলে বিপুল পরিমাণ জিডিপি কেন্দ্রীভূত হয়েছে হলমার্ক কেলেঙ্কারিতে, ডেসটিনির বেআইনী পুজি সংগ্রহে, শেয়ার বাজার পতনের মাধ্যমে, সরকারি বেসরকারি ব্যাংকসমূহ থেকে নামে বেনামে ঋণ দেওয়ার মাধ্যমে এবং সর্বশেষ ব্যাংকের পুজি বাঁচিয়ে রাখার জন্য বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বেইল-আউট পদ্ধতি।

বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পগুলো নিয়ে যখনই কোন বিরোধ বা সমালোচনার সুত্রপাত হয়, তখনই সরকারি তরফ থেকে ঘোষণা আসে “বর্তমান সরকারের চেয়ে বড় দেশ প্রেমিক আর কেউ নাই”। সমাজবিজ্ঞানের পরিভাষায় যাকে Narcissism of Patriotism বলে অভিহিত করা যায়। এই দেশ প্রেমের নমুনা পাওয়া যায় সুন্দরবনের আশেপাশে দেশি বিদেশি সরকারি বেসরকারি, ব্যক্তিমালিকানাধীন আর্থিক প্রতিষ্টানের কাছে উন্নয়ন প্রকল্পের নামে সুন্দরবন বিনাশের উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে।

সরকারের নীতিমালা যেহেতু শুধুমাত্র জিডিপি অর্জনের দিকে সেখানে দেশে সেতু, সড়ক, ফ্লাইওভার, বহুতল ভবন, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র ইত্যাদি নির্মানের নামে কত নদী-খাল-জলাশয় নর্দমায় পরিণত হল তার দিকে খেয়াল নাই। উন্নয়ন নীতি পুঁজিপতিদের দ্বারা পরিচালিত হওয়ায় উন্নয়নের সাথে ধবংস বা বিপন্নতার পার্থক্য করতে এ দেশের উন্নয়ন চিন্তকেরা বারবার ব্যর্থ হচ্ছেন।

এই ব্যার্থতা আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশের রুল মডেলকে রুটেন মডেলে রূপান্তর করতে পারে। কারণ বিশ্ব এখন উন্নয়ন মাপছে টেকসই উন্নয়নের স্কেল দিয়ে, নিছক প্রবৃদ্ধি বা মাথাপিছু আয়ের দিকে এখন আর কারো আস্থা নেই বললেই চলে।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন