শুক্রবার, ২ জানুয়ারি ২০২১; ১১:১৫ অপরাহ্ণ


করোনা পরিস্থিতির পর চীনের অবস্থান নিয়ে আবারো শুরু হয়েছে জল্পনা কল্পনা

প্রায় দুই দশক আগে যুক্তরাষ্ট্র নতুন একটা আইডোলজি পৃথিবীতে প্রচলন করে অথবা বলা যায় নতুন একটা মতার্দশের সাথে আমরা পরিচিত হই যা ‘লিবারেল ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্ল্ড অর্ডার নামে পরিচিত। বর্তমানে লিবারেল ইন্টার ন্যাশনাল অর্ডার এবং এর পৃষ্টপোষক দুইজনেই নানা প্রশ্নবানে জর্জরিত এমনঅবস্থায় কেমন হবে পরবর্তী বিশ্ব ব্যবস্থা আর কে হবে পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থার কর্ণধার আলোচনা এখন প্রায় সর্বত্র।

উত্থান আর পতনের অনেকগুলো গল্প আছে,আছে অনেক সমীকরন। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর আমেরিকা তার যে সম্রাজ্য গড়ে তুলেছিল দিনে দিনে বের হয়ে আসছে তার নানা ফাঁকফোকর। এই দুই দশকে পৃথিবীর অনেক কিছুই বদলে গেছে সামরিক এবং অর্থনৈতিক ধারনার ক্ষেত্রে এসেছে নতুন সমীকরন৷

নিম্মবিত্ত আর মধ্যবিত্ত মানুষের সংখ্যা পৃথিবীতে বেড়েছে, বিশ্বায়নের বিরুদ্ধে গড়ে উঠেছে নতুন জনমত, জলবায়ু সমস্যা নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন জটিলতা এবং শক্তিসাম্য ব্যবস্থায় এসেছে নতুন ধরনের পরিবর্তন আর এখন তাই প্রশ্ন আমেরিকা নাকি চীন কে নেতৃত্ব দিবে লিবারেল ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্ল্ড অর্ডার পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থায়?

পুরনো লিবারেল ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্ল্ড অর্ডার হুমকির সম্মুখীন আর নতুন বিশ্বব্যবস্থা আমাদের দরজায় কড়া নাড়ছে। চীন কি পুরনো লিবারেল ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্ল্ড অর্ডারে আস্থা রাখবে নাকি নতুন একটি অর্ডার প্রতিষ্ঠা করবে এটা এখন একটা বড় প্রশ্ন কারন ইতিহাস খুঁজলে দেখা যায় যখন নতুন শক্তি পৃথিবীর নেতৃত্বের আসনে আর্বিভাব ঘটে ঠিক তখন তারা নতুন মতাদর্শ পৃথিবীতে প্রচলন করে। সোভিয়েত ইউনিয়নের সময় দেখা গেছে সারা পৃথিবীতে তারা সামাজতান্ত্রিক আর্দশ প্রচলন করছে আবার যখন আমেরিকা পৃথিবীর ক্ষমতায় আসীন হয়েছে ঠিক তখন তারা মুক্ত অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রচলন করেছে।

কান পাতলেই একটা গুজব প্রায় শোনা যায়-পৃথিবীর শক্তিসাম্য ব্যবস্থায় আসতে যাচ্ছে পরিবর্তন। যুক্তরাষ্ট্র হারিয়ে ফেলছে তার একচ্ছত্র আধিপত্য। আমেরিকাকে তার ক্ষমতা শেয়ার করতে হবে চীনের সাথে। যুক্তরাষ্ট্র নাকি চীন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ভাগ হয়ে গেছে দুই ভাগে। এক পক্ষ বলছে আমেরিকা তার আধিপত্য হারাবে না বিশ্ব ব্যবস্থা থেকে  অন্য দিকে আরেক পক্ষ বলছে  যুক্তরাষ্ট্র হারাতে যাচ্ছে অচিরেই তার আধিপত্য৷ পৃথিবীতে তাই এখন নতুন কোন মতাদর্শ প্রতিষ্ঠিত হবে এই আলোচনায় সরগরম চারদিক।

এটা মানতেই হবে যে আমেরিকার তৈরি করা লিবারেল ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্ল্ড অর্ডার আদতেই এমন একটা আইডিয়া যা নানাভাবে সমালোচনার সম্মুখীন। দিনে দিনে বের হয়ে আসছে বিশ্বায়নের নানা ভুল ক্রটি।মুক্ত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা পৃথিবীতে তৈরি করছে অসাম্য আর এই অসাম্যের ফলে তৈরি হচ্ছে নানা অরাজকতা।কারো কারো মতে আমেরিকার পুরনো  বিশ্বব্যবস্থা ধরে রাখা একরকম অসম্ভব কারন বানিজ্য,আঞ্চলিক রাজনীতি এবং প্রতিবেশীদের সাথে সম্পর্কের দিক থেকে বিবেচনা করলে চীন এগিয়ে আছে।

যুক্তরাষ্ট্রের দিনের পর দিন যেখানে প্রতিবেশীদের সাথে সম্পর্ক খারাপ হচ্ছে সেখানে বাণিজ্য ও আঞ্চলিক কর্তৃত্ব প্রয়োগ আবার অনেক সময় সহযোগিতার মাধ্যমে চীনের সম্পর্ক তার প্রতিবেশীদের সাথে ভাল হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা তাই প্রায়ই বলছেন যুক্তরাষ্ট্রের উচিৎ পুরনো বিশ্বব্যবস্থার যতগুলো ভুল ছিল তা থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন বিশ্বব্যবস্থা সাথে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করা।

ব্রেক্সিট এর পর এই আইডিয়া আরো জোরালো হয়েছে যে লিবারেল ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্ল্ড অর্ডারে আস্থা রাখা কঠিন। লিবারেল ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্ল্ড অর্ডার ভেঙ্গে পড়ছে কারন রাষ্ট্রগুলো সমষ্টিগত শক্তির থেকে বরং নিজেদের রাষ্ট্রের সামগ্রিক শক্তিতে আস্থা প্রদান করছে।

জাতীয়তাবাদ নতুন করে মাথাচাড়া দিচ্ছে,ধর্মের নামে নতুন ধরনের জাতীয়তার উত্থান আমরা চারিদিকে দেখতে পাই। ধর্মের নামে জাতীয়তার মতবাদ আবার ছড়াচ্ছে আবার তারাই যারা গনতান্ত্রিক পদ্ধতিতেই নির্বাচিত হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে যুক্তরাষ্ট্রের দরকার প্রতিজ্ঞা কম করা আর বৈদেশিক  নীতির ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা।  এখন দরকার তার পূর্বের ভুলগুলো থেকে শিক্ষা গ্রহন করা এবং সেই অনুযায়ী ভবিষ্যৎ করনীয় নির্ধারন করা।

অন্য দিকে কিছু রাজনৈতিক বিশ্লেষক মত দিচ্ছেন, চীনের আপাতত কোন পরিকল্পনা নেই যুক্তরাষ্ট্রকে হটিয়ে বিশ্ব নেতৃত্বের চালকের আসনে আসীন হওয়া। চীন আঞ্চলিক রাজনীতির দিকে তার সম্পূর্ণ লক্ষ্য ধরে রেখেছে এবং এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে আপাতত প্রভাব বিস্তার করা ছাড়া চীনের আর তেমন কোন লক্ষ্য নেই৷ চীন এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের জন্য দিনের পর দিন কাজ করে যাচ্ছে। চীন এতদিন ধরে খুব যত্ন সহকারে সকল ধরনের বিবাদ থেকে দূরে ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কারন রাজনৈতিক নেতৃত্ব নয় বরং বাণিজ্যই চীনের মূল লক্ষ্য।

অনেক দিক বিবেচনা করে বলা যায় আমেরিকা তার একছত্র আধিপত্য হারাচ্ছে তার তৈরিকৃত ক্ষমতার বলয় বিশ্বব্যবস্থা থেকে। সামনের দিন গুলোতে হয়তো আমেরিকাকে ক্ষমতা শেয়ার করতে হবে চীনের সাথে। নতুন দশকে যুক্তরাষ্ট্রের  ক্ষমতা শেয়ার করতে হবে আর তাই যুক্তরাষ্ট্রকে পুরনো লিবারেল ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্ল্ড অর্ডার বাদ দিয়ে নতুন পথ খুঁজতে হবে নতুন দশকে নতুন করে পরির্বতিত পৃথিবীর সাথে খাপ খাওয়ানোর লক্ষ্যে৷ ক্ষমতার সমীকরণ বদলে হচ্ছে আর তাই আমেরিকাকে বুঝতে হবে লিবারেল ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্ল্ড অর্ডারের আইডিয়া এখন অনেকটাই অকেজো।

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর যুক্তরাষ্ট্র যে সাময়িক লিবারেল ইণ্টারন্যাশনাল অর্ডার গড়ে তুলেছিল গণতন্ত্র আর মুক্ত অর্থনীতির কথা বলে আজকে গণতন্ত্র আর মুক্ত অর্থনীতি নিজেই সমালোচনার সম্মুখীন কারন দেখা যাচ্ছে গণতন্ত্র অনেক সময় যে ভুল সিদ্ধান্ত নেয় ট্রাস্প আর মোদীর নির্বাচনে জয় তাই তো প্রমান করে!

আর মুক্ত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সৃষ্টি করছে পৃথিবীতে অসাম্য আর তাই তো মুষ্টিমেয় মানুষের হাতে চলে যাচ্ছে পৃথিবীর অর্ধেকেরও বেশি সম্পদ৷ সম্পদের অসম বণ্টন দিনের পর দিন বেড়েই চলছে আর সমাজে এবং দেশে দেশে ধনী গরিবের মধ্যে ব্যবধান বেড়ে চলছে৷

References:

  1. https://www.bbc.com/news/business-51114425
  2. https://www.foreignaffairs.com/reviews/review-essay/how-china-and-america-see-each-other

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন