, ১ জানুয়ারি ২০২১; ৪:৪০ অপরাহ্ণ


দিল্লির দাঙ্গা

ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং গত ৬ মার্চ দি হিন্দুতে এক প্রবন্ধে বেশ ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বলেছেন, আমরা যে ভারতকে চিনি ও সযত্নে লালন করছি, সেটি দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। ইচ্ছাকৃতভাবে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়ানো, ব্যাপক হারে অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা ও বাইরের স্বাস্থ্যগত খারাপ অবস্থা ভারতের অগ্রগতি ও অবস্থানকে নাজুক করে ফেলছে। এটি কেবল ভারতের আত্মাকেই ছিন্নভিন্ন করে ফেলছে না, সেইসাথে বিশ্বে অর্থনৈাতিক ও গণতান্ত্রিক শক্তি হিসেবে ভারতের অবস্থানকেই শেষ করে দিচ্ছে।

মনমোহন সিংয়ের এই নৈরাশ্য এসেছে উত্তর-পূর্ব দিল্লির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন দল বিজেপির ইন্ধনে ও সহায়তায় সৃষ্ট মুসলিমবিরোধী দাঙ্গা থেকে।

তবে ভারতে মুসলিমবিরোধী দাঙ্গা নতুন কিছু নয়। এ ব্যাপারে ভারতের প্রখ্যাত লেখক, ইতিহাসবিদ ও সাংবাদিক খুশবন্ত সিংয়ের গ্রন্থ দি এন্ড অব দি ইন্ডিয়ার (পেঙ্গুইন ইন্ডিয়া ২০০৩) কথা বলা যায়। অনেক দশক ধরেই প্রতিটি মুসলিমবিরোধী দাঙ্গা হয়েছিল ইতিহাসের বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি, অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, হিন্দু ডানপন্থী সংগঠনগুলোর বিষাক্ত প্রপাগান্ডা, ক্ষমতায় থাকা দল-নির্বিশেষে রাষ্ট্রীয় পরোক্ষ সমর্থনের ভিত্তিতে।

অবশ্য খুশবন্ত সিং উল্লেখ করেছেন যে বিজেপির শাসনেই মুসলিমরা সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় পড়েছে। কারণ বিজেপি ও সঙ্ঘপরিবার হিসেবে পরিচিত এর মিত্র সংগঠনগুলো নির্লজ্জভাবে কথা ও কাজে সাম্প্রদায়িক।

খুশবন্ত সিং ড. মনমোহন সিংয়ের রাগের বিষয়টি অনুমান করতে পেরেছিলেন এবং নরেন্দ্র মোদির নিজ রাজ্য গুজরাটে মুসলিমবিরোধী দাঙ্গার পর ২০০৩ সালে বেশ কঠোর ভাষায় তা প্রকাশ করেছিলেন। ওই দাঙ্গায় মোদির নিজের সরকারের মদতে ও পুলিশের সহায়তায় দুই হাজারের বেশি মুসলিমকে হত্যা করা হয়।

খুশবন্ত সিং তার গ্রন্থ দি এন্ড অব ইন্ডিয়ায় লিখেছেন, মহান না হয়ে ভারত যাচ্ছে অধঃপতনের দিকে এবং দৈব কোনো ঘটনা আমাদের রক্ষা না করলে দেশটি ভেঙে যাবে। পাকিস্তান বা অন্য কোনো বিদেশী শক্তি আমাদের ধ্বংস করবে না; আমরাই হারা-কিরি করব।

তিনি উল্লেখ করেন যে ‘সাম্প্রদায়িকতার’ ক্যান্সার দেশের রাজনীতির দেহে কয়েক দশক ধরে বাসা বেঁধে আছে। ভারত স্বাধীনতার পর নিজেকে সেক্যুলার গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র হিসেবে পরিচিত করলেও ওই কঠিন রোগ থেকে মুক্তি পায়নি।

তিনি উল্লেখ করেন, একেবারে প্রথম দিকে সাম্প্রদায়িকতা প্রবেশ করে কংগ্রেসে। স্বাধীনতা-পূর্ব কংগ্রেস নেতা বাল গঙ্গাধর তিলক (১৮৫৬-১৯২০) গণপতি ধর্মমতের পুনর্জীবন ঘটান। মোগলবিরোধী যোদ্ধা শিবাজিকে অকুতভয় হিন্দু হিসেবে প্রদর্শন করা হয়। উল্লেখ্য, বিশাল মোগল সম্রাটকে প্রতিরোধ করেছিলেন অনেক কম শক্তির অধিকারী শিবাজি। আরেক হিন্দু নেতা পণ্ডিত মদন মোহন মালব্য হিন্দু-মুসলিম বিভক্তি গ্রহণ করেছিলেন। তিনি ছিলেন বেনারাস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা। এছাড়া ছিলেন লালা লাজপত রায়, ভাই পরমানন্দ ও স্বামী শ্রদ্ধানান্দ। এর আগে প্রখ্যাত বাঙালি লেখক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টপাধ্যায় হিন্দুত্ববাদকে উৎসাহিত করেন।

খুশবন্ত সিং বলেন, সত্যিকার অর্থে হিন্দু জাতীয়তাবাদের জন্ম হয় ১৮৮৬ সালে রেনেসাঁ বাংলায়।

কংগ্রেস নেতারা গণমানুষকে সঙ্ঘবদ্ধ করার জন্য ধর্মীয় বিশ্বাস ও প্রতীকবাদ ব্যবহার করেন। আর হিন্দু ডানপন্থীরা হিন্দুত্ববাদের রাজনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক আদর্শ চিহ্নিত করেন। ভি ডি সাভারকারই হিন্দুত্ব পরিভাষাটির প্রচলন করেন। তিনিই ১৯২৩ সালে দ্বিজাতি তত্ত্বের প্রচলন করেন। জিন্নাহ অনেক পরে এর আশ্রয় নেন। তৃণমূল পর্যায়ে হিন্দু মহাসভা ও রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ তত্ত্বের ঊর্ধ্বে ওঠে এটিকে নিখুঁত করার উদ্যোগ নেয়। হিন্দু ডানপন্থীরা বর্তমানে ক্ষমতা দখল করে হিন্দুত্বের ফায়দা হাসিল করছে এবং আধুনিক ভারতের মতাদর্শকে সংজ্ঞায়িত করছে।

খুশবন্ত সিং বলেন যে বিজেপির বিপরীতে কংগ্রেস খুবই চতুরভাবে সেক্যুলার দাবির আড়ালে মুসলিমবিরোধী নীতি অনুসরণ করে। কংগ্রেস তার দীর্ঘ দিনের শাসনকালে স্বাধীনতার পর হওয়া অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের সুবিধা থেকে মুসলিমদের দূরে রাখে।

মাঝে মাঝেই কংগ্রেস এমনকি মুসলিমবিরোধী দাঙ্গার ব্যবস্থা করত যাতে মুসলিমরা ঘুরে দাঁড়াতে না পারে। তবে কংগ্রেসের মতো তথাকথিত সেক্যুলার পার্টি ও হিন্দু ডানপন্থী দলগুলোর মধ্যে পার্থক্য হলো এই যে প্রথমে উল্লেখ করা দলটি তাদের মুসলিমবিরোধী নীতি গোপন করে থাকে আর পরে উল্লেখ করা দলগুলো এব্যাপারে কোনো রাখঢাক করেনি।

স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে হিন্দু মৌলবাদের পুনর্জীবন প্রথম দেখা যায় রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্র প্রাসাদের ১৯৫১ সালে গুজরাটে সোমনাথ মন্দির পুনঃনির্মাণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হওয়ার ঘটনায়। মন্দিরটি ধ্বংস করেছিলেন এক মুসলিম শাসক। সেক্যুলার প্রধানমন্ত্রী জওহেরলাল নেহরু দৃঢ়ভাবে প্রাসাদকে উপদেশ দিয়েছিলেন উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে না যেতে। কারণ সেক্যুলার রাষ্ট্রের প্রধানের উচিত হবে ধর্মীয় অনুষ্ঠানে উপস্থিত না হওযা। কিন্তু দৃঢ়প্রতিজ্ঞ রাষ্ট্রপতি তাতে উপস্থিত হন এবং হিন্দুত্ববাদের নতুন মাত্রা দেন। এর ফলে হিন্দু চরমপন্থী গ্রুপগুলো শক্তি বাড়াতে শুরু করে।

খুশবন্ত সিং বলেন, বেশির ভাগ হিন্দুই মনে করত বিদেশী শাসনকালে, বিশেষ করে মুসলিম আমলে তারা নির্যাতিত হয়েছিল এবং তারা প্রতিশোধ নিতে চাইত। খুশবন্ত সিং উল্লেখ করেছেন যে অনেক মুসলিম শাসক সত্যিই হিন্দু মন্দির ধ্বংস করেছিলেন, বলপূর্বক ধর্মান্তর করেছিলেন, অমুসলিমদের ওপর জিজিয়া কর আরোপ করেছিলেন।

তিনি সেক্যুলারবাদীদের এই তত্ত্ব প্রত্যাখ্যান করেন যে ব্রিটিশদের আগমনের আগে পর্যন্ত হিন্দু ও মুসলিমরা নিখুঁত সম্প্রীতিতে বসবাস করত এবং ব্রিটিশরা এসে বিভক্ত করা ও শাসন করার নীতি গ্রহণ করেছিল। তিনি বলেন যে ভারতীয়রা আরো আগেই বিভক্ত হয়ে পড়েছিল এবং একে অপরের প্রতি বৈরী ছিল। ফলে ভাগ করে শাসন করতে ব্রিটিশদের কোনো সমস্যা হয়নি।

তিনি বলেন, ভারতীয়রা সবসময়ই তাদের বর্ণ, ধর্ম ও গোত্র নিয়ে অনেক বেশি উদ্বিগ্ন ছিল। তারপর আমরা ভারতীয় নাগরিক হিসেবে জন্মগ্রহণ করেছি। ফলে হিন্দু মৌলবাদের বিশ্বাসের পথে যেই দাঁড়াবে, তাকেই সে ধ্বংস করবে।

তিনি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কথা তিনি বলেছেন। তিনি বলেছেন, প্রতিটি ভারতীয় তার কাজ বা নিস্ক্রিয়তার কারণে এই অবস্থার সৃষ্টির জন্য দায়ী। ফ্যাসিবাদ আমাদের দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়েছে। আমরা কেবল নিজেদেরই এজন্য দায়ী করতে পারি। আমরা বিনা প্রতিবাদে ধর্মীয় উন্মাদদের এগিয়ে যেতে দিয়েছি। তারা যে বই পছন্দ করে না সেটি পুড়িয়ে দেয়, তারা তাদের বিরুদ্ধে যে সাংবাদিক লিখে, তাকে প্রহার করে, তাদের বিরুদ্ধে গেলে তারা সিনেমা হলে আক্রমণ করে, সরকারের অনুমোদনপ্রাপ্ত সিনেমা তৈরীতে প্রস্তুত চলচ্চিত্র নির্মাতাদের সরঞ্জাম তারা গুঁড়িয়ে দেয়।

তারা ভারতের শীর্ষস্থানীয় শিল্পীর (খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার যে তিনি মুসলিম) স্টুডিও ভাংচুর করে তার ছবি নষ্ট করেছে। তারা তাদের আইডিয়া নিশ্চিত করার জন্য ইতিহাস বইয়ে বিকৃতি প্রবেশ করিয়েছে। আমরা তাদেরকে এসব কাজ করার সুযোগ দিয়েছি একথা ভেবে যে আমরা তাদের প্রতিরোধ করা আমাদের কাজ বলে বিবেচনা করিনি। এখন তারা ভিন্ন ঈশ্বরে বিশ্বাসীদের প্রকাশ্যে হত্যা করছে। যাদের সাথেই তারা একমত হয় না, তাদেরকেই গালিগালাজ করে। তাদের কাছে আমরা হলাম ছদ্মবেশী সেক্যুলারবাদী। আমরা প্রত্যাঘাত করতে পারিনি। কারণ আমরা ঐক্যবদ্ধ শক্তি ছিলাম না। আমরা বুঝতে পারিনি যে আমাদের দেশ তাদের হাতে পড়লে কী কঠিন অবস্থার সৃষ্টি হবে। এখন আমাদেরকে মূল্য দিতে হচ্ছে।

ভারতীয় মননে সাম্প্রদায়িকতার বিষয় কতটা গভীরে প্রবেশ করেছে তার একটি ধারণা দিয়েছেন বিচারপতি পিরোশাম মদন। ১৯৭০ সালে ভিওয়ান্দি ও জালগাঁওয়ের দাঙ্গার পর মহারাষ্ট্র সরকার তাকে এ ব্যাপারে প্রতিবেদন দিতে বলেছিল। খুশবন্ত সিং বলেছেন যে বিচারক তার প্রতিবেদনে জানিয়েছেন, এটি ছিল ঘৃণা ও সহিংসতার পথে একাকী, কষ্টকর ও ক্লান্তিকর যাত্রা। যাদের সামনেই পড়েছি, সবাই কোনো ধরনের সহানুভূতি ছাড়াই একই দেশের লোকদের রক্ত পান করতে আগ্রহী। রাজনীতিবিদরা সাম্প্রদায়িক ঘৃণা ও ধর্মীয় উন্মাদনা ছাড়াচ্ছেন। স্থানীয় নেতারা ক্ষমতার জন্য তিক্ততা ও অনৈক্যের বীজ বনন করছেন। পুলিশ অফিসার ও সদস্যরা পুলিশের পোশাক পরার উপযুক্ত নয়।

এই বিচারক যদি মোদির গুজরাট ও ২০২০ সালের দিল্লির দাঙ্গা নিয়ে লিখতেন, তবে ভালোই লিখতে পারতেন। তবে খুশবন্ত সিং বলেছেন, এস বি চ্যাবনের নেতৃত্বাধীন মহারাষ্ট্রের কংগ্রেস সরকার বিচারপতি মদনের প্রতিবেদনটি সব সুপারিশসহ গ্রহণ করে। আর মোদি সরকার ২০০২ সালের দাঙ্গা নিয়ে জাতীয় নাগরিক অধিকার কমিশনের প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে। দিল্লির ঘটনায় মোদি সরকার সব সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করে বলে যে এগুলো যথাযথ নয় ও পক্ষপাতদুষ্ট। খুশবন্ত সিং বলেছেন, ধ্বংসকারী শক্তি দ্বিধাহীনভাবে এগিয়ে চলছে।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন