শনিবার, ১৮ জুন ২০২১; ২:১৯ অপরাহ্ণ


এই লেখার মুল লক্ষ্য হল করোনা ভাইরাস নিয়ে আমাদের চারপাশে যে স্বপ্ন, মদ ও গজব সম্পর্কিত গুজব চলছে তা বিশ্লেষণ করে দেখা। করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে সরকারের যখন আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ নেয়া উচিত তখন সরকার সমন্বয়হীন পদক্ষেপ নিয়ে শুধু মাত্র প্রেস ব্রিফিং করে মানুষকে ভরসা দিতে চাচ্ছে।

বিপদের সময় এই আশায় গুড়ে বালি। ঠিক একি সময় সাধারণ মানুষ সরকারের উপর গঠণমূলক চাপ তৈরি না করে বরং স্বপ্ন, মদ, ও গজব নিয়ে গুজবে ব্যস্ত হয়ে আছেন। অদক্ষ রাষ্ট্রযন্ত্র ও হুজুগে চলা আবেগী জনগণ গণস্বাস্থ্য সঙ্কটের সময় ভয়াবহ ফলাফল বয়ে নিয়ে আসে।

তাই এই সময়ে আপনাকেই ভাবতে হবে আপনি গজবের গুজবে থাকবেন না কি প্রতিদিনের নামাজ মসজিদে না গিয়ে ঘরে পড়বেন। মদ খেয়ে করোনা প্রতিরোধের চেষ্টা করবেন না কি সন্তানকে স্কুলে পাঠানো থেকে বিরত থাকবেন। মুফতি সাহেবের বয়ান শুনবেন না কি লোকসমাবেশ বর্জন করবেন। আপনার সিদ্ধান্ত আপনাকে ও আপনার প্রিয় মানুষদের নিরাপদ রাখতে ভূমিকা রাখতে পারে।

মুফতি কাজি ইব্রাহিম সাহেব এক ওয়াজ মাহাফিলে বক্তব্য দিয়েছেন। মামুন মারুফ নামের ইটালি প্রবাসি এক ভদ্রলোক স্বপ্ন দেখে তাকে ফোন করেছেন। মামুন সাহেবের দাবী, স্বপ্নে করোনা ভাইরাস তার সাথে কথা বলেছে। করোনা ভাইরাস মামুনকে পৃথিবীতে আসার কারণ বলেছে।

-আয়েশা নামের এক মেয়েকে তিন চীনা সৈনিক ধর্ষণ করেছে। এই নারীর চিৎকারে আল্লাহ্‌ নারাজ হয়ে করোনা ভাইরাসকে পাঠিয়েছে চীনাদের শাস্তি দিতে।

উইঘুর মুসলিমদের সাথে চীন সরকারের আচরণকে পুঁজি করে মুফতি ইব্রাহিম সাহেব মামুন মারুফের স্বপ্নকে একটি বাস্তব রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট দেয়ার চেষ্টা করেছেন। মজলুমের হাহাকার ও আল্লাহ্‌র বিচারের বয়ান উপস্থাপন করে তিনি মানুষকে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন যে আল্লাহ্‌ করোনা ভাইরাসকে গজব হিসেবে প্রেরণ করেছেন। লক্ষাধিক মানুষ এই ভিডিও শেয়ার করেছেন। কেউ মজা করে আর কেউ গভীর বিশ্বাস থেকে।

আরেকটি ভিডিও ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে। ওই ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে পাখিরা কাবা শরীফের চারদিকে চক্রাকারে ঘুরছে। সৌদি সরকার করোনা ভাইরাসের কারনে কা’বা শরীফে মুসলমানদের তাওয়াফ বন্ধ রেখেছে। পাকিস্থানের সামা নিউজ এই নিয়ে রিপোর্ট করেছে। রিপোর্টের বক্তব্য হল, আল্লাহ্‌ মানুষের সাথে নারাজ হয়েছেন, তাই কাবাকে তাওয়াফ করতে দিচ্ছেন না। কিন্তু আসমানের এই পাখিরা যারা নাকি “আবাবিলের বংশধর” তারা তাওয়াফ করে বিশ্ববাসীকে দেখিয়ে দিয়েছে যে কা’বার সম্মান আসলে কত উঁচু! বহু মানুষ ‘আল্লাহ্‌ কত সুমহান!’ ‘সুবহানাল্লাহ্! সুবহা’নাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি সুবহা’নাল্লাহিল আজীম!’ লিখে এই ভিডিও শেয়ার করেছেন।

আমার ফেসবুকে বন্ধু তালিকায় থাকা বেস কয়েক জন শহুরে, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত মানুষ একটা ফেক খবর শেয়ার করছেন। এই খবরের সারমর্ম হল মদ মানুষকে করোনা ভাইরাস থেকে রক্ষা করবে।

আমি ব্যক্তিগত ভাবে তাদের চিন্তা ভাবনার সাথে পরিচিত, সেই জানাশোনা থেকে বলছি। তারা নিজেদের শিক্ষাগত যোগ্যতার কারণে নিজেদের বিশেষ ভাবেন। নিজেদের ধর্মীয় গোঁড়ামির বাইরের মানুষ বলে উপস্থাপন করেন। তাদের কথায় তারা ‘ আধুনিক’ মানুষ।

এই যে ধর্ম ভীরু মানুষের স্বপ্ন, বাইতুল হারামের তাওয়াফ, কিংবা ‘আধুনিক’ মানুষের মদের সাথে করোনা থেকে বাঁচার উপায় সম্পর্কিত খবর শেয়ার করার মধ্যে একটা বিশেষ মিল আছে। ধার্মিক ও আধুনিক এই বাঙ্গালী মুসলমান এর বিরোধ একই সাথে সামাজিক ও রাজনৈতিক। সেই বিশ্লেষণ এখানে প্রাসঙ্গিক নয়।

এখন আমরা দেখি কেন তারা এমন করেছেন। এই বিপদের সময় এরা নিজেদের বিশ্বাস অনুযায়ী আত্মরক্ষার জন্য একটা গণ্ডি বা আশ্রয় কল্পনা করছেন। এতে হয়ত এরা মনের দিক থেকে শান্তি পাবেন। তবে যারা মদের কথা বলছেন, আমার মনে হয় তারা মদের কথা বলছেন এই কারনে ইসলামে মদ পান হারাম। তারা যে সমাজে বসবাস করেন সেই সমাজের অধিকাংশ মানুষের ধর্ম বিশ্বাস যেহেতু মদ পানের বিরুদ্ধে তাই তারা সেই অনুভুতিতে খানিকটা ‘সুড়সুড়ি’ দিতে চান। তারা যেহেতু নিজেদের ‘আধুনিক’ হিসেবে একটা ভিন্ন পরিচয় প্রতিষ্ঠা করতে চান, তাই তারা এই খবর কে সেই ধার্মিকদের জীবন প্রণালির বিরুদ্ধে খোঁচা দেয়ার অস্ত্র হিসেবে ব্যাবহার করেছেন।

প্রশ্ন হল, কেন ধর্মভীরু মুসলমান স্বপ্নের গুজব কিংবা কাবা তাওয়াফের মতন ঘটনা প্রচার করছেন? কেনই বা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজে বসবাস করা এই ‘আধুনিক মানুষরা’ মদ কে করোনা মুক্তির উপায় বলছেন?

এতে কি কারো উপকার হচ্ছে? এই ধরনের প্রচারনা কি করোনা প্রতিরোধে বাংলাদেশকে সাহায্য করবে? যদি উপকার নাই হয় তবে কেন তারা তাদের সময় খরচ করে এমন গুজব ছড়াচ্ছেন?

বাস্তবতা হল, না মামুন মারুফের স্বপ্ন, না বাইতুল হারাম তাওয়াফ কিংবা মদ কোনটাই আমাদের মুসলমানদের এই বিপদ থেকে রক্ষা করবে না। এই মুহূর্তে আমাদের যা রক্ষা করতে পারে তা হল চিকিৎসা বিজ্ঞান, ও রাষ্ট্রের সমন্বিত পদক্ষেপ।

আমাদের সমাজে বিজ্ঞান মনস্কতা বলতে আমরা এর রাজনৈতিক অর্থকে বেশি বুঝি, কেনন স্বভাবগত ভাবেই বাঙ্গালী মুসলমান অনেক বেশি রাজনৈতিক। করোনার মতন ভয়াবহ গণস্বাস্থ্য সঙ্কট মোকাবেলায় বিজ্ঞানের রাজনৈতিক বিতর্ক আমাদের সাহায্য করবে না। পাশাপাশি আমাদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় প্রস্তুতি একেবারেই নেই। কেন নেই ? নেই কারন আমরা বিজ্ঞানকে বিশেষ করে চিকিৎসা বিজ্ঞানকে আমাদের জীবন ও রাষ্ট্র ব্যবস্থায় অপ্রাসঙ্গিক করে রেখেছি।

বাংলাদেশের সমাজে ধার্মিক মুসলমান ও আধুনিক সেকুলার মানুষ বিজ্ঞান কে দর্শনের মধ্যে আটকে রেখেছেন। তাই আমরা সমস্যার সমাধান স্বপ্নে বা মদে খোঁজার চেষ্টা করছি। গুজবের প্রচার মেশিন হিসেবে নিজেদের ব্যাবহার হতে দিচ্ছি। আর যেহেতু আমাদের হাতে আপাতত কোন সমাধান নেই, কিংবা চিকিৎসা বিজ্ঞান আপাতত আমাদের কোন প্রতিষেধক দিতে পারছে না তাই আমরা করোনার ব্যাখ্যায় গুজব তত্ত্ব এনেছি, আত্মবিশ্বাসের জন্য পাখিদের তাওয়াফের গল্প ফেঁদেছি, আর এই ভাবনায় খানিকটা সুড়সুড়ি দিয়ে আত্মতৃপ্তি পেতে মদের গল্পের নিয়ে বসেছি।

বাস্তবে বাঙ্গালী মুসলমান সমাজের এই ধার্মিক বনাম সেকুলার দ্বন্দ্ব আমাদের কোথাও নেবে না। এতে আমাদের বিপদ কমবে না। ধার্মিক মুসলমান যদি মনে করে তিনি আল্লাহ্‌ প্রিয় বান্দা তাই তিনি করোনার গজব মুক্ত থাকবেন তবে তিনি বোকার স্বর্গে বসবাস করছেন। অপরদিকে আধুনিক সেকুলার বাঙ্গালী যদি মনে করেন তিনি কুসংস্কার মুক্ত তাই করোনা তাকে কিচ্ছু করতে পারবে না, তবে তিনিও বোকার স্বর্গের বাসিন্দা। কেননা আপনারা উভয় সমভাবে আক্রান্ত হতে পারেন এবং বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য কাঠামো আপনাদের রক্ষা করবে না।

যদি সেই রকম সময় উপস্থিত হয়, ও চিকিৎসকদের সিদ্ধান্ত নিতে হয় কোন রোগীকে বাঁচাবে আর কোন রোগীকে করোনার হাতে ছেড়ে দেবে, তবে আপনার এই ধর্মচিন্তা কিংবা আধুনিকতা কোনটাই কাজে আসবে না। তা নির্ভর করবে আপনার বয়স ও আপনার বেচে থাকার সম্ভাবনার উপর। তাই একত্রীত হয়ে সরকারকে চাপ দিন, প্রস্তুতি নিতে বলুন। নিজের নাগরিক দায়িত্ব পালন করুন।

সময় থাকতে সিদ্ধান্ত নিন। কথা বলুন। আগামি সপ্তাহের জুম্মার নামার পড়বেন কি না? গণস্বাস্থ্য ঝুকির কথা ভেবে জুম্মার নামাজ স্থগিত করুন। জামাতে নামাজ না পড়ে নিজের ঘরে নামাজ পরেন। যত বড়ই মুফতি হোক না কেন তার দেখা সপ্নে বিশ্বাস করার দরকার নেই। চিকিৎসকদের সাহায্য করেন। সরকাকে তথ্য দিয়ে সাহায্য করেন। সরকারের কাছে স্বচ্ছ তথ্য প্রবাহ নিশ্চিত করার জোর দাবী তোলেন।

পেশাদার সাংবাদিকদের এইখানে বড় দায়িত্ব রয়েছে। যে কোন গনজামায়েত থেকে বিরত থাকেন। স্কুল ও কলেজ বন্ধ করার জন্য সরকারকে চাপ দিন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস বর্জন করেন। সর্বোপরি, আপনি যতই মদ ভালবাসেন না কেন, আপাতত মদ একাই পান করেন। এই নিয়ে অপরকে মানে যিনি মদ পান করেন না তাকে সুড়সুড়ি দিয়েন না। নাগরিক হিসেবে নিজের কর্তব্য পালন করেন।

বর্ডার বন্ধ, আপনারা কেউ অর্থের বিনিময়ে আক্রান্ত বাংলাদেশ থেকে পালাতে পারবেন না।

লেখাটি একটা গল্প দিয়ে শেষ করি। নবী মুহাম্মদ (সা.) আশ্রয়ের আশায় তায়েফ শহরে যান। তায়েফের নেতারা নবী কে শুধু অপমান করেই ফিরিয়ে দেন নি বরং তারা তাদের ভবঘুরে ছেলেদের নবীর বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিল। তিন দিন খাবার নাই, পানি নাই। যুবকরা পাথর মেরে অসহায় নবীকে শহরের বাইরে তাড়িয়ে দেয়। রক্তাক্ত ও ক্লান্ত নবী কোন রকমে শহরের বাইরে এক আঙুর বাগানের প্রাচীরের গা ঘেঁষে বসে আছেন। এমন সময় জিব্রাইলকে এসে নবীকে বললেন আপনি অনুমতি দেন নবী, মক্কার দু’দিকের পাহাড় একত্র করে এই শহরকে ধ্বংস করে দেব। নবী (সা.) বললেন, না-না। তিনি অভিশাপ দিলেন না, গজব চাইলেন না। আল্লাহর কাছে জোড় হাত করে তায়েফবাসীর জন্য ক্ষমা চাইলেন। নবী জিব্রাইলকে বললেন একজন কাফিরও যদি না বাচে তবে আল্লাহকে মানবে কেন। আল্লাহর নবী যেখানে গজব চান নি আর আপনি কেমন করে গজব চান। আপনি কি নবীর থেকে বড় ধার্মিক?

এই দুর্যোগের সময়ে আসেন মনের শান্তির জন্য একে অপরের জন্য দোয়া করি। তবে আবেগী হয়ে হটকারি কাজ না করি। গুজব না ছড়াই। এতে নিজেরাই ক্ষতিগ্রস্ত হব। আপনি যদি ভাবেন করোনা আসলে আপনি ইন্ডিয়া পালাবেন, কিংবা আমেরিকা পালাবেন, তবে ভুল ভাবছেন। এখন আপনার দেশ আপনার একমাত্র ঠিকানা। আপনি না মক্কা না মদিনা না দিল্লী, কোথাও পালাতে পারবেন। সব দরজা বন্ধ। নিজে সচেতন হন, সরকারকে গঠনমূলক চাপ দিন।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন