শুক্রবার, ২ জানুয়ারি ২০২১; ১০:৫১ অপরাহ্ণ


 

এরই মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি’তে এক যুগান্তকারী ঘটনা ঘটে গেল। বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার রক্ষা পরিষদ আয়োজিত এক মতবিনিময় ও আলোচনা সভায় দেশের প্রথিতযশা ও বিবেকবান শিক্ষকগণ ও আন্দোলনকারী সাধারণ শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে এক সংহতি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। কোন আন্দোলন সফল হওয়ার পর এই আন্দোলন নিয়ে বিভিন্ন পক্ষকে একসাথে করে তাত্ত্বিক চিন্তা-ভাবনা ও আন্দোলনের ভালোমন্দ বিবেচনার মতো পরিপক্ক কাজ এই বাংলাদেশে এই প্রথম অনুষ্ঠিত হল।

এমন এক প্রেক্ষাপটে আন্দোলনটি সংঘটিত হয়েছে যখন বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও এর সমাজ নিয়ে গেল কয়েক বছর ধরে কেবল হতাশাব্যঞ্জক বক্তব্যই শোনা যাচ্ছিল। রাষ্ট্রের সামগ্রিক প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক তরুণ চাকুরীপ্রার্থীর জন্য উপযুক্ত কর্মসংস্থানের অভাব যেন রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভিত্তিকেই চ্যালেঞ্জ করছিল। দক্ষ ও স্বচ্ছ প্রাইভেট সেক্টরের অভাবে বিশ্ববিদ্যালয়য়ের মেধাবী তরুণটি যখন স্বপ্ন দেখে একটি সরকারী চাকুরীর সেখানেই অন্যায্য কোটা ব্যবস্থার মাধ্যমে তাদের প্রবেশকে সংকোচিত করে রাখা হচ্ছিল।

দেয়ালে বারবার পীঠ ঠেকে গিয়ে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন সময়ে এর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। ২০০৮, ২০১৩ সালে পুলিশ ও ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনের বাধার মুখে আন্দোলন ক্ষণিকের জন্য থমকে গেলেও ২০১৮ সাল ছিল ব্যতিক্রম। শুরু থেকেই ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনের অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। দলীয় বিচার বিবেচনার উর্ধবে উঠে একদল তরুণ মিশে গিয়েছিল সাধারণ ছাত্রদের সাথে। এই তরুণ নেতৃত্ব প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে ঘোষণা আদায় করে ছাড়ে। বলা যায়, আন্দোলন প্রথম পর্যায়ের সফলতা অর্জন করে যদিও শিক্ষার্থীরা প্রজ্ঞাপন না হওয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত বিজয় মনে করছেন না।

সভায় ছাত্রসমাজের নয়নমণি আমাদের কালের শামসুজ্জোহা বলে খ্যাত অধ্যাপক নাসির আহমেদ বলেন- “দলীয় চিন্তা-চেতনার উর্ধবে এসে ছেলেরা আজ রাস্তায় দাঁড়িয়ে আজ অধিকার ছিনিয়ে আনতে পেরেছে। তবে এটা শুরু মাত্র। আরো অনেক সমস্যা এই ছাত্রসমাজকেই সমাধান করতে হবে। বাংলাদেশের যে জায়গায় মধ্যে সবচেয়ে বেশি অনিয়ম হচ্ছে তা হল দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ শ্রেণীর চাকুরিগুলোতে। যেহেতু অনেক বিশ্ববিদ্যালয় পাশ স্নাতকও এখন এই চাকুরীগুলোতে আবেদন করছে তাই সেখানেও শতভাগ মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হোক। তিনি দাবি করেন, এই আন্দোলনে বাংলাদেশের কোথাও একটি গাড়িও ভাংচুর হয়নি, একটি গাড়িতেও আগুন দেওয়া হয়নি। এতো সহনশীল আন্দোলন বাংলাদেশ এর আগে প্রত্যক্ষ করেনি।

অধ্যাপক নাসির আহমেদ বলেন- মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের বেশিরভাগ গ্রাম পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছে। আমরা বলি ত্রিশ লক্ষ শহীদ ও দুই লক্ষ মা-বোন নির্যাতিত হয়েছে। সেই শহীদ পরিবারের জন্য সরকার কি করছে?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়য়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এম এম আকাশ তার বক্তব্যে বলেন মুক্তিযোদ্ধারা এই কোটার জন্য যুদ্ধ করে নি।

 আন্দোলনে আরো বক্তব্য রাখেন অধ্যাপক রুবায়েত ফেরদৌস, অধাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের মত ব্যক্তিবর্গ। টিএসসি’র প্রধান হল ছিল কানায় কানায় পরিপূর্ণ।

শিক্ষার্থীরা সকল বক্তা ও শ্রোতাদের বক্তব্য পর্যালোচনা করে এ মতবিনিময় সভার সারসংক্ষেপ করেছে নিমোক্ত পয়েন্টগুলোতেঃ

  1. ক্যাম্পাসে সেদিন যারা অস্ত্র হাতে মহড়া দিয়েছিল ও সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের উপর হামলা করেছিল তাদের প্রত্যেককে চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনতে হবে।
  2. আশিকুরের বুকে কে গুলি চালিয়েছিল তাকে চিহ্নিত করতে হবে এবং শাস্তি প্রদান করতে হবে।
  3. ক্যাম্পাসের প্রবেশপথ গুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন ও নিরাপত্তা চৌকি বসাতে হবে। বিশেষ করে রাত ১০টার পর হতে সকাল পর্যন্ত সকল বহিরাগত চলাচল বন্ধ করতে হবে।
  4. কোন যৌক্তিক আন্দোলনে ছাত্রছাত্রীদেরকে আসতে বাধা প্রদান করা যাবেনা।
  5. স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের হাতে সকল নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে হবে।
  6. প্রত্যেক ছাত্রের পড়াশোনার পাশাপাশি তার বাকস্বাধীনতা ও আন্দোলনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন