মঙ্গলবার, ২ আগস্ট ২০২১; ৭:৩৪ পূর্বাহ্ণ


(চিত্র: বাংলা অঞ্চলে প্রধাণ তিনটি ফিনোটাইপের নারী ভার্শনের ছবি দেয়া হল। বাম থেকে ডানে এগুলো যথাক্রমে ইন্ডিড, ইন্দো-মেলানিড ও ভেড্ডিড ক্যাটাগরির গ্রেসাইল ইন্ডিড, কোলিড ও নর্থ গন্ডিড ফিনোটাইপ। এই ছবিগুলো এভারেজ চেহারা, আর এগুলো নেয়া হয়েছে তুলনামূলক আইসোলেটেড গোষ্ঠী থেকে যারা খুব একটা মিশ্রিত হয়নি। বাংলার মানুষের মধ্যে মিশ্রণ খুব সাধারণ ব্যাপার, তাই এখানকার মানুষের চেহারা এনলাইসিস করলে এই তিন প্রধান ফিনোটাইপের মধ্যকার মিশ্রণের কথা বিবেচনা করতে হবে। বাংলাদেশ ও আসামে এদের মিশ্রণের পরিমাণ অনেক বেশি (ইসলামে যৌনতা ও সন্তান উৎপাদনে কাস্টের বাধা নেই বলে) অনেকে এখানে এই তিন ফিনোটাইপের মিশ্রণে "ইস্ট বেঙ্গলিড" নামে আরেকটা ফিনোটাইপের কথা বলেন, সেই ছবি এখানে আর দিলাম না, গুগলে পেয়ে যাবেন। ফিনোটাইপগুলোর আইডেন্টিফিকেশন বিভিন্ন রিসার্চের দ্বারাই হয়েছে, চাইলে রেফারেন্সও দেয়া যাবে।)
(চিত্র: বাংলা অঞ্চলে প্রধাণ তিনটি ফিনোটাইপের নারী ভার্শনের ছবি দেয়া হল। বাম থেকে ডানে এগুলো যথাক্রমে ইন্ডিড, ইন্দো-মেলানিড ও ভেড্ডিড ক্যাটাগরির গ্রেসাইল ইন্ডিড, কোলিড ও নর্থ গন্ডিড ফিনোটাইপ। এই ছবিগুলো এভারেজ চেহারা, আর এগুলো নেয়া হয়েছে তুলনামূলক আইসোলেটেড গোষ্ঠী থেকে যারা খুব একটা মিশ্রিত হয়নি। বাংলার মানুষের মধ্যে মিশ্রণ খুব সাধারণ ব্যাপার, তাই এখানকার মানুষের চেহারা এনলাইসিস করলে এই তিন প্রধান ফিনোটাইপের মধ্যকার মিশ্রণের কথা বিবেচনা করতে হবে। বাংলাদেশ ও আসামে এদের মিশ্রণের পরিমাণ অনেক বেশি (ইসলামে যৌনতা ও সন্তান উৎপাদনে কাস্টের বাধা নেই বলে) অনেকে এখানে এই তিন ফিনোটাইপের মিশ্রণে “ইস্ট বেঙ্গলিড” নামে আরেকটা ফিনোটাইপের কথা বলেন, সেই ছবি এখানে আর দিলাম না, গুগলে পেয়ে যাবেন। ফিনোটাইপগুলোর আইডেন্টিফিকেশন বিভিন্ন রিসার্চের দ্বারাই হয়েছে, রেফারেন্সও চাহিদামাফিক।)

সুমিত রায়

এক বন্ধু বলছিলেন নিজের দেশে থাকতে তিনি নিজের সৌন্দর্য বুঝতে পারেননি, বাংলাদেশের সৌন্দর্যের মানদণ্ডে তিনি অসুন্দর ছিলেন, কিন্তু পাশ্চাত্যে আসার পরে কয়েকজন পুরুষ তাকে প্রেম প্রস্তাব দেয়, তার মনে সৌন্দর্যের মানদণ্ডের বিকাশ ঘটে, তিনি নিজেকে সুন্দর মনে করা শুরু করেন।

তার চিন্তাকে একটু বিশ্লেষণ করা যাক – তিনি বলছেন আগে নিজের সৌন্দর্য বুঝিনি, এখন বুঝেছি, এবং আমার পরের ধারণাটি ঠিক। (আগে সুন্দর শব্দের অর্থ জানতাম, কিছু নির্দিষ্ট ক্যাটাগরিকে সুন্দরের সেটে ফেলতাম, এখন অবস্থান পরিবর্তিত হয়েছে, এখন আগের চেয়ে বেশি ঠিক)। মানে সৌন্দর্যবোধের বিকাশ ঘটছে।

এখানে সৌন্দর্যবোধকে মোটা দাগে দুটো শ্রেণীতে ফেলা যায়, নিম্ন সৌন্দর্যবোধ, যেটা আগে ছিল, ছোটবেলায় সবার থাকে, আর এদেশের লোকেদের মধ্যে রয়েছে (তার অভিজ্ঞতা অনুযায়ী)। আর উচ্চ সৌন্দর্যবোধ যা এখন হয়েছে, পাশ্চাত্যের লোকেদের আছে বলে মনে হচ্ছে।

সৌন্দর্যবোধের এরকম দ্বিবিভাজন দর্শনে খুব সাধারণ। সবসময়ই এখানে ইন্দ্রিয়জ সৌন্দর্য আর বুদ্ধিবৃত্তিক সৌন্দর্যকে আলাদা করা হয়েছে, আর এস্থেটিক্স কাজ করেছে মূলত বুদ্ধিবৃত্তিক সৌন্দর্যতেই। সেই প্লেটোর দর্শন থেকেই এই পার্থক্য দেখা যায়। আর এখানেও আসে উপরে বর্ণিত নিম্ন ও উচ্চ সৌন্দর্যবোধের কথা। কেবল ইন্দ্রিয়জ সৌন্দর্য নিম্ন হবে, কারণ তাতে বুদ্ধিবৃত্তি লাগে না, আর যেখানে বুদ্ধিবৃত্তির ব্যবহার আছে তা উন্নত। অনেক দার্শনিক বলছেন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য, অর্থাৎ যা প্রকৃতির দান তা উপভোগ করার সৌন্দর্যবোধ তা হয় মূলত ইন্দ্রীয়ের উপর ভিত্তি করে। আর মানুষের সৃষ্টি, অর্থাৎ শিল্পকে বুঝতে বুদ্ধিবৃত্তিরও প্রয়োজন হয়, বুদ্ধিবৃত্তির সাহায্যে শিল্পের গভীর ও তাৎপর্যময় সৌন্দর্য উপলব্ধি করতে হয়। আধুনিক কালে বমগার্টেনের দ্বারা এস্থেটিক্স শাখার বিকাশের পর সৌন্দর্যবোধের ক্ষেত্রে দার্শনিকেরা বুদ্ধিবৃত্তিতেই জোর দেয়া শুরু করে।

আচ্ছা মানুষের চেহারার সৌন্দর্য নিয়ে যে আলোচনা করা হচ্ছে, সেই সৌন্দর্য বোঝার জন্য কি ইন্দ্রিয় যথেষ্ট?

বলতে পারেন – মানুষের চেহারা যেহেতু প্রাকৃতিক তাই ইন্দ্রিয়জ অনুভূতি যথেষ্ট হবে, তাই মানুষের সৌন্দর্য অন্তর্নিহিতভাবেই নিম্নসৌন্দর্যবোধ সংক্রান্ত, এখানে উচ্চ সৌন্দর্যবোধের সম্ভাবনা নেই। কিন্তু কথাটা পুরোপুরি মেনে নেয়া যায় না। মানুষের এপিয়ারেন্সে প্রকৃতির অবদান আছেই, কিন্তু সবটুকু না। মানুষের চেহারার এক্সপ্রেশন, বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি, তার হাসি, তার চাহনি – এসব প্রকৃতি নয়, তার নিজেরি সৃষ্টি। এগুলোর সৌন্দর্যকে বুঝতে হলে বুদ্ধিবৃত্তির প্রয়োজন হয়। একজন কবি যখন সেই সৌন্দর্যকে অবলোকন করে তার লেখায় তার প্রতিফলন দেখান তখন বারবার দরকার হয় তার বুদ্ধিবৃত্তির। কবি যখন বলেন, “সে যতই কালো হোক, দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ।” তখন গাঁয়ের লোকের সৌন্দর্যবোধের সাথে কবির সৌন্দর্যবোধের পার্থক্য হয় বুদ্ধিবৃত্তিতেই, তাই যে সৌন্দর্য অন্যদের চোককে এড়িয়ে যায় তা ধরা পড়ে কবির চোখে।

সেই সাথে আমাদের মধ্যে থাকা বিভিন্ন ধারণা (আমি যার নাম দিয়েছি বিউটি আইডিওলজি) আমাদের ইন্দ্রিয়জ সৌন্দর্যবোধেও বাঁধার সৃষ্টি করে। সেই সৌন্দর্যবোধে ফিটনেস আইডিওলজি, রেশিয়াল আইডিওলজি থাকতে পারে। আইডিওলজি বলে আমরা সমাজে থেকে এগুলোর প্রভাব এড়াতে পারিনা। এই বাধাগুলো দূর করার জন্যেও প্রয়োজন হয় বুদ্ধিবৃত্তির। সামগ্রিকভাবে এই ধরণের বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশ হল সৌন্দর্যবোধ ও শিল্পবোধেরই বিকাশ।

যাই হোক, সৌন্দর্যের এরকম বিকাশের ধারণা থেকে প্রশ্ন আসবে কেন এই দেশের লোকেদের মধ্যে সৌন্দর্যবোধের বিকাশ হচ্ছে না? বা কোন কোন বিষয় বাংলাদেশের জনসাধারণের মনে সৌন্দর্যবোধের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে?

আমি এর কারণ হিসেবে মূলত দুটো বিষয়কে শনাক্ত করেছি :

প্রথম কারণ হল সাধারণের মধ্যে শিল্প ও শিল্পসচেতনতার অভাব। শিল্পের কলাকৈবল্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে (ইমানুয়েল কান্ট এই মতবাদের জনক) শিল্পের কাজ (একমাত্র) মানুষের শিল্পবোধের বিকাশ করা, মানুষের অবধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি করা (রোমান্টিসিস্ট এপিস্টেমোলজি), ও মানুষের স্বাধীনতা বিস্তৃত করা। এই মতবাদ অনুসারে শিল্প মানুষের সৌন্দর্যবোধের বিকাশ ঘটায়। বাংলাদেশে অসাধারণ শিল্প তৈরি হয়েছে, বিকাশ ঘটেছে কিন্তু বর্তমানে এগুলো জনসাধারণের কাছে পৌঁছচ্ছে না বা পৌঁছতে দেয়া হচ্ছে না। জনগণের এরকম শিল্প থেকে বিচ্ছিন্নতার শর্ত হিসেবে জীবনযাত্রার নিম্ন মান, রাষ্ট্র ও বুদ্ধিজীবীদের দ্বারা হাই আর্টের কাল্ট তৈরি, শিল্প বিরোধী ধর্মীয় আইডিওলজির প্রভাব বৃদ্ধি, অনুন্নত পপকালচারের বাজার বৃদ্ধি এসব রয়েছে।

দ্বিতীয় কারণ হল বাংলায় ঐতিহাসিকভাবে বিভিন্ন অভিপ্রয়াণের কারণে মানুষের একাধিক ফিনোটাইপের অস্তিত্ব আছে বাংলায় (যেমন গ্রেসাইল ইন্ডিড, কোলিড, নর্থ গন্ডিড)। এই বাস্তবতা বাংলায় ঐতিহাসিকভাবে রেসিজমের উত্থান ঘটায় যা কাস্টিজমের সাথে অনেকটা সম্পর্কিত হলেও পুরোপুরি এক নয়। পরিবেশ ও প্রকৃতির ইন্টারেকশনে এটি মানুষ এই ফিনোটাইপগুলোর মধ্যে নির্দিষ্ট এক ফিনোটাইপকে অন্যগুলোর থেকে বেশি আকর্ষণীয় মনে করেছে (এই অঞ্চলের মানুষ গ্রেসাইল ইন্ডিড ফিনোটাইপকে অন্যগুলোর তুলনায় বেশি আকর্ষণীয় মনে করে)। কাস্টিজম বিরোধিতা বাংলার কাস্ট সিস্টেম, ব্রাহ্মণ্যবাদ ইত্যাদির বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি করেছে, কিন্তু এই কাস্টিজমের মূলে যে রেসিজম প্রোথিত, মানুষের সৌন্দর্যচেতনায় যে রেইসিস্ট একপাক্ষিকতা রয়েছে তাকে বাংলায় বুদ্ধিবৃত্তিক বা সাংস্কৃতিকভাবে কখনও টারগেট করা হয়নি, যা পাশ্চাত্যে বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলনগুলো টারগেট করতে পেরেছিল।

সৌন্দর্যের যে কেবল ফিনোটিপিকাল দিকটাই একমাত্র দিক তা না, সৌন্দর্যের আরও বিভিন্ন দিক আছে যা নিয়ে একপাক্ষিকতা রয়েছে, “রেশিয়াল আইডিওলজি” ছাড়াও অন্যান্য বিভিন্ন “বিউটি আইডিওলজি” রয়েছে। কিন্তু আমার মতে প্রাচ্যে, বিশেষ করে এই উপমহাদেশে বিউটি আইডিওলজিগুলোর মধ্যে রেশিয়াল আইডিওলজি সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করে সৌন্দর্যের ক্ষেত্রে, পাশ্চাত্যে এই রেশিয়াল আইডিওলজির ব্যাপারটা কম, সেখানে ফিটনেস আইডিওলজিটা বেশি, যা আবার এই উপমহাদেশে কম। পাশ্চাত্যে এই ফিটনেস আইডিওলজি পুনরুৎপাদন ও প্রাচ্যে রেশিয়াল আইডিওলজির পুনরুৎপাদনের শর্তের মিলটা হল মিডিয়া, পপ কালচার ও কনজিউমারিজমে, আর অমিলটা কোথায় তা এই ২ নং পয়েন্টেই মোটামুটি বলা হয়েছে।

উপমহাদশে নারীদের অবস্থার বিশ্লেষণে দ্বিতীয় কারণটি নিয়ে কিছু আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে –

এই রেইসিস্ট মানসিকতায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় মেয়েরাই। আমার মতে দুইভাবে তারা মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় তার ব্যাখ্যাটা নেয়া যায় বারবারা ফ্রেডরিকসন ও টমি এন থমাস এর অবজেক্টিফিকেশন থিওরি থেকে।

তারা বলেছিলেন নারীরা এর ফলে থার্ড পারসনের সৌন্দর্য নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গিকে দিয়ে নিজের সৌন্দর্যকে বিচার করে। অর্থাৎ অন্যের দৃষ্টিভঙ্গিকে “ইন্টারনালাইজ” করে নেয় নিজের মধ্যে। ফলে তারা নিজেদের শরীরকে নিজের ব্যক্তিসত্তার বাইরের বিষয় বলে মনে করতে শুরু করে, পারসন থেকে বডিকে আলাদা করে ফেলে, নিজের শরীরকে একটি অবজেক্ট ভাবতে শুরু করে।

বারবারা আর রবার্টস এই সেলফ অবজেক্টিফিকেশনের ধারণা এনেছিল সেক্সুয়াল অবজেক্টিফিকেশন থেকে, তারা বলেন এই সেক্সুয়াল অবজেক্টিফিকেশনের কারণে তারা থার্ডপারসোনের ভিউ নিজেদের মধ্যে ইন্টারনালাইজ করে। আমি এখানে তাদের থেকে ইন্টারনালাইজেশনের কনসেপ্টটা ধার করেছি, কিন্তু এই ইন্টারনালাইজেশন সেক্সুয়াল অবজেক্টিফিকেশনের জন্য হচ্ছে না, হচ্ছে রেশিয়াল আইডিওলজির জন্য। যাই হোক এই সেলফ অবজেক্টিফিকেশনের পরিণতি খারাপ –

(ক) নারী নিজের শরীর নিয়ে উদাসীন হয়ে যাবে, মনে করবে এই শরীর অসুন্দর, এটা নিয়ে ভাববার কোন দরকার নেই। সৌন্দর্যহীনতার জন্য নিজের ভাগ্যকে দায়ী করবে, অসুন্দর হবার ব্যাপারটা মেনে নেবে, ডিপ্রেশনে ভুগবে, প্রয়োজনীয় শরীরের যত্ন নেয়া ছেড়ে দেবে। এটা আমার মতে একধরণের এলিয়েনেশন, সমাজ থেকে নয়, নিজের থেকেই।

(খ) নিজেকে শরীর সর্বস্ব মনে করবে। শরীরের উপর বেশি গুরুত্ব দেবে। কৃত্রিমভাবে শারীরিক সৌন্দর্য বৃদ্ধি করার চেষ্টা করবে, অনেক সময় বেশি বেশি করে শো-অফ করার প্রবণতাও তৈরি হতে পারে।

(গ) বারবারা আর রবার্টস বলছেন, নারীরা এজন্য নিজেদের এপিয়ারেন্সকে বারবার চেক করতে থাকে, এটা নিশ্চিত করতে যে তাদেরকে প্রেজেন্টেবল লাগছে কিনা। এর ফলে তাদেরকে সেক্সুয়াল ভিক্টিমাইজেশন অর্থাৎ রেইপ ও সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্টের শিকার হতে হয়।

(ঘ) তারা এও বলছেন, এর ফলে অতিরিক্ত আত্ম-সচেতনতা, অতিরিক্ত বডি এনজাইটি, অতিরিক্ত বডি শেইম তৈরি হতে পারে। সেই সাথে ডিপ্রেশন, এনোরেক্সিয়া নারভোসা, বুলিমিয়া ও সেক্সুয়াল ডিসফাংশনের মত মানসিক সমস্যারও সৃষ্টি হতে পারে। লার্নড হেল্পলেসনেস থিওরি এভাবে ডিপ্রেশনে ভোগাটা সমর্থন করে।

(ঙ) এটি নষ্ট করছে নারীদের ফ্রি টাইমের একটা বড় অংশকে (মেকাপের জন্য, ফেইসবুকে নিজের বেস্ট ছবিটি আপলোড দেয়ার জন্য, ভাল লাইক-কমেন্টের পুনরুৎপাদনের জন্য নতুন নতুন সুন্দর ছবির পুনরুৎপাদনের জন্য) নষ্ট করছে। উৎপাদন ব্যবস্থার শর্ত হিসেবে পুরুষের শ্রম সময়ের সাথে নারীর শ্রম সময়েরও গুরুত্ব অনেক বেশি (এমনকি যেসব সমাজে পুরুষই রোজগার করে সেইসব সমাজেও, কিভাবে সেই আলোচনায় যাব না এখন)। তাই এই সেলফ অবজেক্টিফিকেশনের ব্যাপারটা সমাজের জন্যেও মঙ্গলজনক নয়।

তো সমাজে এই রেশিয়াল আইডিওলজি সৃষ্টির কারণ কী?

অনেকে বলে মানুষ প্রাকৃতিক ভাবেই রেইসিস্ট। প্রাকৃতিকভাবেই আমাদের মধ্যে একটি সৌন্দর্যবোধ তৈরি হয়, হতেই পারে কোন একটি রেইসকে অন্য রেইসের লোকেদের চেয়ে ব্যক্তির বেশি সুন্দর লাগছে, হাইব্রিডদের ক্ষেত্রে যার মধ্যে পছন্দের রেইসের পারসেন্টেজ বেশি তাকে বেশি সুন্দর লাগছে, এটা বিল্ট ইন, তাই এইরকম সৌন্দর্যবোধও বিল্ট ইন। না, আমি এরকমটা যে হতে পারে তা অস্বীকার করছি না।

সোনালি চুল বা ব্লন্ড হেয়ার ও নীল চোখের উদ্ভব হয় র‍্যান্ডম মিউটেশনের ফলে, কিন্তু কেবল এডাপ্টিভ সিলেকশনের ফলে এর যে পরিমাণে ছড়িয়ে যাবার কথা ছিল এটি তার থেকে বেশি ছড়িয়ে গেছে, এর মানে এখানে সেক্সুয়াল সিলেকশনের ব্যাপার ছিল, পুরুষের সোনালী চুল ও নীল চোখের মেয়েদের কোন কারণে ভাল লেগেছে তাই এর সংখ্যা এখন এত বেশি।

আজ পুরুষদের মধ্যে সোনালী চুলের ডিমান্ড কেমন তা পর্নোগ্রাফিক সাইটগুলোতে গেলেই বোঝা যায় যেখানে ব্লন্ড একটা পর্ন জঁরা। মানুষেরা আফ্রিকা থেকে এশিয়া ইউরোপে গেলে সেখানে নিয়ান্ডারথাল, দেনিসোভানের মত আর্কাইক হিউম্যান স্পিসিজের সাথে মিলিত হয়। নন-আফ্রিকান মানুষের জিনোমে নিয়ান্ডারথাল জিন রয়েছে, যা আমাদের নির্দেশ করে, মানুষেরা নিয়ান্ডার্থালদের সাথে সঙ্গম করে ফার্টাইল অফস্প্রিং তৈরি করেছিল, এরা নিয়ান্ডারথালদের জিন নিয়ে নতুন পরিবেশে টিকে থাকার সক্ষমতা অর্জন করে। পরে এরাই টিকে ছিল অন্যেরা সব মারা গেছে, যেসব মানুষ নিয়ান্ডারথালদের সাথে সঙ্গম করেনি তারা আর তাদের বংশধরও টেকে নি।

এখন এমনটা এখনও আবিষ্কার হয়নি, কিন্তু এটা অসম্ভব নয় যে মানুষের মধ্যে প্রয়োজনে ভিন্ন স্পিসিজের সাথে সঙ্গমের জন্য সিলেকশন প্রেশার কাজ করে থাকতে পারে, যাতে মানুষ ভিন্ন একটি স্পিসিজেরর প্রতি আকর্ষণ বোধ করে। আর এর ট্রেইট আমাদের মধ্যে পাস করে ভিন্ন ফিনোটাইপের প্রতি আকর্ষণ বোধ করার সাইকোলজিও তৈরি করতে পারে।

আবার অনেকে চেহারায় ডাইভারসিটির বিবর্তনের সাথে সৌন্দর্যকে সম্পর্কিত করেন। এসব চিন্তা সঠিক হতেও পারে, নাও হতে পারে, (এখনও কিছু পাওয়া যায়নি, পাওয়া গেলে জানাবেন) কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হচ্ছে, হোক বা না হোক তাতে কিছুই আসে যায় না। আর নেচার যা করেছে তার ভিত্তিতে নৈতিক সিদ্ধান্ত নেয়াটাও নেচারালিস্টিক ফ্যালাসি (পড়ুন জি. ই. মুর)।

তাছাড়া কোন কিছুরই স্রেফ বায়োলজিকাল হওয়া সম্ভব নয়। সেই সাথে এও বলা সম্ভব নয় যে কতটা বায়োলজি আর কতটা এনভায়রনমেন্ট এর প্রভাব ছিল। যেটা জানা যেতে পারে তা হল নির্দিষ্ট একটি সাইকোলজিকাল ট্রেইট ডেভলপমেন্টের ক্ষেত্রে বায়োলজি ও এনভায়রনমেন্ট কি করে ইনটারেক্ট করে এই অবস্থায় এসেছে। সেটাই বিশ্লেষণও করা উচিৎ।

যাই হোক আমাদের মধ্যে কাজ করা আইডিওলজিতে নেচারের ভূমিকা থাকতেই পারে। আর আইডিওলজির ধারণা নেচারকে সম্পর্কিতও করে। আইডিওলজি নেচার বহির্ভূত বিষয় নয়। (এই কথাটি শুনে যারা ভ্রূ কুচকাবেন তাদের জন্য বিষয়টি নিয়ে একটু বিস্তারিত আলোচনা লেখাটির শেষে করেছি।) এছাড়া আমি আগেই নিম্ন সৌন্দর্যবোধের কথা বলেছি, এটি নেচারের সাথে কোন কারণে সম্পর্ক থাকলে সেটা সেই নিম্ন সৌন্দর্যবোধই তৈরি করবে, কিন্তু উপরে উল্লিখিত সমস্যাগুলোর জন্য এই নিম্ন সৌন্দর্যবোধ সমস্যার যেখানে এই রেশিয়াল আইডিওলজি ইনকরপোরেটেড থাকে, তাই উচ্চ সৌন্দর্যবোধের বিকাশের প্রয়োজন। কাজেই এখানে প্রকৃতির ভূমিকা থাকলেও এভাবে জাস্ট চলতে পারেনা।

এবারে আসি একে কেন রেশিয়াল আইডিওলজি বলছি। নেচারের সাথে সম্পর্ক থাকলেও এর সাথে শোষক সমাজের সম্পর্ক রয়েছে, যা প্রকৃতিকে ব্যবহার করতে চায় প্রোফিটের কারণে, আর তাই এটা পরিণত হয় একটি আইডিওলজিতে। এই আইডিওলজি মানুষের মধ্যে রেশিয়াল আইডিওলজির পুনরুৎপাদন করে, মানুষের নিম্ন সৌন্দর্যবোধকে টিকিয়ে রাখে আর তার সৌন্দর্যবোধের বিকাশে বাধার সৃষ্টি করে।

কিভাবে শোষক সমাজ কর্তৃক এই রেশিয়াল আইডিওলজির পুনরুৎপাদন হতে পারে দেখা যাক –

(১) ফেয়ারনেস ক্রিম, বিভিন্ন কসমেটিক্সের ইন্ডাস্ট্রিগুলোর প্রভাব – ফেয়ারনেস ক্রিমগুলোর পুনরুৎপাদনের শর্তই হল সমাজের এই রেসিস্ট আইডিওলজি। এডভারটাইসমেন্টগুলোর মাধ্যমে এগুলো মেয়েদেরকে বোঝায় যে ফরসা হওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ। এই ফেয়ারনেস ক্রিমগুলো রেইসিস্ট আইডিওলজির পুনরুৎপাদন করে। উদ্দেশ্য প্রোফিট।

(২) মেইনস্ট্রিম টিভি ও ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি – নায়িকাদের সিলেক্ট করা হয় একপাক্ষিকভাবে গ্রেসাইল ইন্ডিড চেহারার নারীদের থেকে, এর কারণও সমাজে রেইসিস্ট আইডিওলজি। দেশে সম্পত্তি ডিস্ট্রিবিউশনটা এমন যে বেশিরভাগ সম্পত্তি পুরুষের হাতে, তারা এই অর্থ খরচ করবে তাদের স্বার্থ অনুযায়ী, তাদের কাছে গ্রেসাইল ইন্ডিড ফিনোটাইপের ডিমান্ড বেশি তাদের নিজেদের রেসিস্ট আইডিওলজির জন্য। এরফলে মিডিয়াতে এই মেয়েরাই আসবে, ফল হবে রেশিয়ালি একপাক্ষিক সেলিব্রিটি কাল্টের নির্মাণ। পুঁজিবাদ তার প্রোফিটের স্বার্থেই এটা করবে। তারা এই সেলিব্রিটি কাল্ট নারীর মধ্যে রেশিয়াল আইডিওলজির পুনরুৎপাদন করবে। উল্লেখ্য, সাউদ ইন্ডিয়ার ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিগুলোকে এখন নর্থ ইন্ডিয়ার নর্থ ইন্ডিড, গ্রেসাইল ইন্ডিড মেয়েদেরকে নিয়ে এসে নায়িকার চরিত্র দিতে দেখা যাচ্ছে, কারণ তারা ফরসা।

(৩) সোশ্যাল মিডিয়া – সোশ্যাল মিডিয়ায় মানুষ এমন এপিয়ারেন্স দেখায় যা তার নিজের আসল রূপ নয়। মেয়েরা বিশেষ অনুষ্ঠানে বা অন্য কোন কারনে সাজছে, সেই ছবিগুলোই কেবল সোশ্যাল মিডিয়ায় দিচ্ছে, সেখানে ভাল ভাল লাইক-কমেন্ট পাচ্ছে, আর তারা এরকম ছবি আপলোড করতে আরও বেশি উৎসাহিত হচ্ছে। এর ফলে তাদের সেলফ এস্টিম বৃদ্ধি পাচ্ছে, কিন্তু এই জিনিসটা নেসেসারিলি ভাল না। তারা মনে করতে শুরু করে যে সোশ্যাল মিডিয়া আসলে এমন একটা জিনিস যা তারা নিজের হাতে কনট্রোল করতে পারে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সোশ্যাল মিডিয়াই তাদেরকে কন্ট্রোল করে। তারা বারবার নিজের সেই ছবিটাই দেখে আর সেই ছবিগুলো দেখাতেই উৎসাহ বোধ করে যা তার নিজের রূপই নয়, বরং রেশিয়াল আইডিওলজি সহ অন্যান্য বিউটি আইডিওলজিগুলোর আরোপিত রূপ। আর এভাবে ইন্টারনালাইজেশনের মাধ্যমে তৈরি হয় সেলফ অবজেক্টিফিকেশন।

(৪) পপ কালচার – পপ কালচারের ক্ষেত্রে যেকোন শিল্প উপাদানের ক্ষেত্রে আর্টিস্টিক এক্সেলেন্স নয় বিক্রিটাই গুরুত্বপূর্ণ। কালচার ইন্ডাস্ট্রি এর দ্বারা এই পপ কালচার বা মাস কালচারকে প্রতিনিয়ত উৎপাদন করা হয়। এখানে শিল্প সাহিত্যের ভাল মন্দের বিচার করা হয় বাজারে কতটা বিক্রি হল তার উপর ভিত্তি করে। ভাল উপন্যাসের মর্যাদা বিবেচিত হয় তা বেস্ট সেলার কিনা তার ভিত্তিতে, ভাল গানের মর্যাদা বিবেচিত হয় তা রেটিং চার্টের উপরের দিকে আছে কিনা তার ভিত্তিতে। এই কালচার ইন্ডাস্ট্রিগুলোর মধ্যে পড়ে পাবলিশিং হাউজ, মুভি ইন্ডাস্ট্রি, রেকর্ড ইন্ডাস্ট্রি, ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া ইত্যাদি। (এই বিষয়ে ভাল করে জানার জন্য এডর্নো, হর্কহেইমার, ওয়াল্টার বেঞ্জামিনের লেখা পড়তে পারেন)। বিক্রি হওয়াটাই যেখানে শিল্পকর্মের মূল লক্ষ্য তখন মানুষের সৌন্দর্যবোধের বিকাশ ঘটে না। মানুষেরা চলে যায় কনজিউমার কালচারের রসাতলে। এগুলো মানুষের শিল্পবোধ, সৌন্দর্যবোধের বিকাশকে ব্যাহত করে রেশিয়াল আইডিওলজিকেই রক্ষা করে চলে।

(৫) ধর্ম – রেশিয়াল আইডিওলজি তৈরিতে ধর্মের বড় প্রভাব আছে। হিন্দুধর্মে কাস্ট সিস্টেম আছে। হিন্দুধর্মের কাস্ট সিস্টেম গড়ে উঠেছিল বিভিন্ন ফিনোটাইপের সমাজে উদ্ভূত রেইসিজমের প্রভাবে। ইন্ডিডদের নিয়ে উচ্চবর্ণ ও অন্যান্য ফিনোটাইপ যেমন ইন্দো-মেলানিড, ভেড্ডিডদের নিচু জাতিতে ফেলা হয়। তবে ফিনোটাইপ পুরোপুরিভাবে কাস্ট সিস্টেমকে রিপ্রেজেন্ট করেনা। কেননা পরবর্তীতে বহিরাগত অনেক “ককেশয়েড” টাইপ লোককে নিচু জাতিতে ফেলা হয়েছিল, আবার অনেককে উঁচু জাতি থেকে নিচু জাতিতে ফেলে দেয়া হয়েছিল বিভিন্ন কারণে, কিন্তু তবুও ফিনোটাইপের সাথে কাস্টিজমের বড় সম্পর্ক আছেই। ধর্ম বর্ণপ্রথা মেইন্টেইনিং এর মাধ্যমে রেশিয়াল আইডিওলজির পুনরুৎপাদন ঘটায়। এদিকে ইসলাম ধর্ম শিল্পকে সমর্থন করেনা, এটাও মানুষের শিল্পবোধের বিকাশে ও সর্বোপরি সৌন্দর্যবোধের বিকাশে বাঁধার সৃষ্টি করে, রেশিয়াল আইডিওলজি টিকে থাকে।

যাই হোক, এখান থেকে বোঝা যায় রেশিয়াল আইডিওলজির সাথে এভাবে সম্পর্কিত হয় শোষক শ্রেণীর শোষণ। উপরের পাঁচটি পয়েন্টের প্রথম চারটির উদ্দেশ্য মূলত প্রোফিট অর্জন, পরেরটির উদ্দেশ্য আনুগত্য অর্জন। শোষক শ্রেণী এভাবে তাদের প্রোফিট বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে রেশিয়াল আইডিওলজির প্রমোশন ঘটায়, মেইন্টেইন করে, পুনরুৎপাদন করে, আর তাতে ভুক্তভোগী হয় সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নারীরা। এভাবে চলতে পারেনা, এই বিরুদ্ধে কালচারাল রেভোল্যুশন দরকার।

নিজের এপলোজেটিক্স-

অনেকেই এই লেখার সমালোচনা করে মন্তব্য করতে চাইবেন। আমি আগে ভাগেই লেখাটিকে ডিফেন্ড করার জন্য কিছু লিখে রাখলাম। মন্তব্য করার আগে এগুলো আশা করি পড়ে নেবেন।

১। সেলফ অবজেক্টিফিকেশনের ধারণাটা সেক্সুয়াল অবজেক্টিফিকেশনের ধারণার সাথে সম্পর্কিত, আর এই ধারণাটি পুরুষকে ভিলেইন বানায়। – আমি নারীর এই সমস্যার জন্য চিহ্নিত করেছি সমাজের রেশিয়াল আইডিওলজিকে যা একটি শোষক ভাবাদর্শ, যাকে পুঁজিবাদী শোষক সমাজ তাদের প্রোফিটের স্বার্থে উৎপাদন ও পুনরুৎপাদন করে পপ কালচার, মিডিয়া, এডভারটাইসমেন্ট, সোশ্যাল মিডিয়া এর মাধ্যমে। নাওমি ওলফ যেমন তার বিউটি মিথ গ্রন্থে এই ব্যাপারটাকে সেক্সুয়াল অবজেক্টিফিকেশনের সাথে সম্পর্কিত করেছেন আর ব্যাখ্যা করেছেন নারীকে পুরুষের পছন্দ অনুযায়ী সৌন্দর্যকে ধারণ করতে হয়, পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে নারী নিজের সৌন্দর্যবোধ তৈরি করে ও সেলফ অবজেক্টিফাই করে, সেলফ অবজেক্টিফিকেশনের এই ব্যাখ্যা আমার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। সেলফ অবজেক্টিফিকেশন সম্পর্কিত বারবারা ফ্রেডরিকসন ও টমি এন রোবার্টস এর মতই আমার কাছে অধিকতর গ্রহণযোগ্য যেখানে নারীর এই সেলফ অবজেক্টিফিকেশন হয় “থার্ড পারসন” এর দৃষ্টিভঙ্গি নিজের মধ্যে গ্রহণের ফলে। বারবারা আর টমি-এন যাকে থার্ড পারসন বলেছেন তাকেই আমি বলেছি রেশিয়াল আইডিওলজি, আর আমি একে সম্পর্কিত করেছি শোষক সমাজের সাথে।

২। আইডিওলজি ও প্রকৃতি সম্পর্ক – বস্তুত আইডিওলজি ব্যাপারটা প্রকৃতি বিচ্যুত নয় কখনই। মার্ক্সীয় আইডিওলজির কনসেপ্টটা ফলস কনশাসনেসের সাথে সম্পর্কিত হতে পারে, যা মার্ক্সীয় ভিত্তি-উপরিকাঠামোর ধারণায় উপরিকাঠামোতে অবস্থান করে। কিন্তু একথাও সত্য যে মার্ক্স কখনও বলেননি যে সর্বদা উৎপাদন ব্যবস্থা হিসেবে ভিত্তি উপরিকাঠামোকে নিয়ন্ত্রণ ও নির্ধারণ করবে, এই ধারণাটি সোভিয়েত ইউনিয়নের স্ট্যালিন এর সময় থেকে। (এই নিয়ে প্রয়োজনে আমি বড় রকমের আলোচনা ও ডিবেটেও যেতে পারি, সমকালীন নারীবাদ প্রসঙ্গে সেই ডিবেটটিও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণই হবে)।

মার্ক্সীয় চিন্তা-ঐতিহ্যে যে উপরিকাঠামো ভিত্তিকে প্রভাবিত করতে পারে এরকম চিন্তাধারাও দেখা যায়, যদিও ভিত্তি-উপরিকাঠামোর আন্তঃসম্পর্ক মার্ক্সীয় সাহিত্যে খুব ভাল করে দেখানো হয়নি। এর সম্প্রসারণের চেষ্টা করেছেন স্ট্রাকচারালিস্ট মার্ক্সিস্ট আলথুজার। তিনি স্ট্রাকচারালিস্ট মার্ক্সিস্ট কারণ তার মার্ক্সিজম ছিল স্ট্রাকচারালিজমের ধারণার দ্বারা প্রভাবিত। তিনি এই স্ট্রাকচারালিজমের ধারণাকে ব্যবহার করেই মার্ক্সীয় ভিত্তি-উপরিকাঠামোর আন্তঃসম্পর্ক ব্যাখ্যা করার প্রয়াস করেন ও মার্ক্সীয় আইডিওলজির ধারণাকে সম্প্রসারণ করেন। ক্লদ লেভিস্ট্রস হচ্ছে সেই স্ট্রাকচারালিজমের জনক (বেশিরভাগের মতে, বাকিরা সস্যুরেকে জনক ভাবেন)। আর লেভিস্ট্রস কখনই কেবল পরিবেশকে স্ট্রাকচার সৃষ্টির কারিগর ভাবেন নি, পরিবেশ ও প্রকৃতি উভয়ের সংগঠনেই সোশ্যাল স্ট্রাকচার তৈরি হয়। আমার এই রেশিয়াল আইডিওলজির ধারণাটি লুই আলথুজেরের আইডিওলজির সাথে মিলিয়ে চিন্তা করতে হবে।

৩। রেশিয়াল আইডিওলজি যদি আলথুজের বর্ণিত আইডিওলজি হয়ে থাকে তাহলে তো এর সাথে শক্তিশালী রাষ্ট্রসম্পর্কের প্রয়োজন, কিন্তু এখানে তো রাষ্ট্রের ভূমিকা সেভাবে দেখা যায় না। তাহলে আলথুজেরের সাথে এই আইডিওলজিকে সম্পর্কিত করা যায় কিকরে? হ্যাঁ, সেটা করা যায় না বলেই আমি এই জায়গায় আলথুজেরের ধারণা থেকেও কিছুটা সরে আসব। আলথুজের আইডিওলজিকে দেখেছেন কেবলই রাষ্ট্র কর্তৃক তৈরিকৃত ও বণ্টনকৃত বিষয় হিসেবে যার জন্য এটি ব্যবহার করে আইডিওলজিকাল স্টেইট এপারেটাসগুলোকে। তার মতে প্রাইভেট ও পাবলিক যা আছে সবই স্টেইট এপারেটাসের অংশ। তিনি প্রাইভেট ও পাবলিকের বিভাজনই করেন না। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আমি প্রাইভেট ও পাবলিকের বিভাজনে বিশ্বাসী। আলথুজেরের সময়ে হয়তো এর দরকার ছিল না, কিন্তু এখন এর একটা প্রয়োজন আমি বোধ করছি। বুর্জোয়া প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানসমূহ কেবল তার প্রফিটের জন্য তার প্রয়োজনীয় আইডিওলজিগুলোর উৎপাদন ও পুনরুৎপাদন করতে পারে রাষ্ট্রের সহায়তা ছাড়াই আর এর জন্য প্রয়োজনী এপারেটাসগুলো তাকে রাষ্ট্রের থেকে ধারও নিতে হয়না, এগুলো তারা একাই নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এই এপারেটাসগুলো হল মেইনস্ট্রিম মিডিয়া, সোশ্যাল মিডিয়া, টিভি এডভারটাইসমেন্ট ইত্যাদি।

রাষ্ট্র এগুলোকে একেবারে যে নিয়ন্ত্রণহীন হিসেবে ছেড়ে দেয় তা নয়, রাষ্ট্র এগুলোও নিয়ন্ত্রণ করে, কখনও কখনও নিজের স্বার্থেই কাজে লাগায়, কিন্তু এগুলো পুরোপুরি অর্থে স্টেইট এপারেটাস নয়, বরং প্রোফিটের জন্য ক্যাপিটালিস্ট এপারেটাসই। আলথুজেরের সময়ে মিডিয়ার এরকম রূপ ছিল না, ফেইসবুক-টুইটার-ইউটিউব এর মত সোশ্যাল মিডিয়া তো ছিলই না। অবশ্য এটাও ঠিক যে রাষ্ট্র ও পুঁজিবাদ খুব ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্ক। পুঁজিবাদের লাভ হলে রাষ্ট্রের লাভ হবেই, যেহেতু রাষ্ট্র হল পুঁজিবাদী উৎপাদন সম্পর্কের পুনরুৎপাদনকারী, এক্ষেত্রে এই আইডিওলজিকেও আলথুজেরের আইডিওলজির ধারণার সাথে সম্পর্কিত করা যায়, আমিও করি, কিন্তু প্রাইভেট ও পাবলিকের আলাদা মেকানিজমকে স্বীকার করে তারপর, আলথুজেরের মত প্রাইভেট-পাবলিক বিভাজনকে বিলোপ করে নয়।

৪। যদি রেশিয়াল আইডিওলজি পুঁজিবাদী শোষক সমাজের বিরুদ্ধে চাপানো হয়, আর এর বিরুদ্ধেই কেবল আন্দোলনের প্রয়োজন হয় তাহলে নারীরা এই আন্দোলন করলে তা কেন নারীবাদ বলে বিবেচিত হবে? কেবলই নারীরা এর সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী সেজন্য? – কেউ বলেনি যে এটাকে নারীবাদ বলতে হবে। কিন্তু নারীরা এক্ষেত্রে প্রধান ভুক্তভোগী ভেবে একে নারীবাদী আন্দোলনের মধ্যে ফেলতে পারে, আর এভাবে এটা নারীবাদী আন্দোলনের নামও নিতে পারে পুঁজিদাদ বিরোধী বা সাম্যবাদী আন্দোলনের নাম না নিয়ে। কেন পারে কিভাবে পারে এই ব্যাখ্যা দেবার জন্য আরেকজনের চিন্তাধারা এখানে টেনে নিয়ে আসাটা জরুরি, তিনি হলেন জ্যা ফ্রাসোঁয়া লিওতার্দ (যাকে পোস্টমডার্নিজমের অন্যতম পুরোধা ধরা হয়)। কিন্তু সেই আলোচনায় আপাতত যাব না।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন