মঙ্গলবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১; ৫:৪৯ অপরাহ্ণ


দৃশ্যত এবং বাস্তবিক করোনা ভাইরাস নিয়ে শুরু থেকে এখন অব্দি সংবাদ-মিডিয়ার পাদপ্রদীপের কেন্দ্রে আছে সরকারের ‘রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (IEDCR)’ এবং এটির পরিচালক মীরজাদী সেব্রিনা। প্রাথমিক পর্যায়ে করোনার সংক্রমণ সনাক্ত এবং গণসচেতনতা তৈরিতে অবদানের জন্য নিশ্চয় এই দুই- সত্ত্বা কৃতিত্ব এবং কৃতজ্ঞতা লাভের যোগ্য দাবিদার।

কিন্তু দেশে করোনার বিস্তার এখন ২য় পর্যায়ে অর্থাৎ নিজেরা বিদেশে না গিয়েও গতকাল পর্যন্ত করোনা আক্রান্ত ১০ জনের মধ্যে ৬ জন স্থানীয়ব্যক্তি বিদেশ ফেরত ব্যক্তির সংস্পর্শে এসে সংক্রমিত হয়েছেন। বিপুল সংখ্যক প্রবাসীকে দেশে প্রবেশের সুযোগ দেয়া হয়েছে এবং তাদের জন্য নির্দেশিত হোম-কোয়ারেন্টিন আদেশ অনুসৃত হচ্ছে না বলে বিস্তর অভিযোগ। তারমানে আমরা এখন তৃতীয় ও চূড়ান্ত পর্যায়ের দিকে দ্রুত আগাচ্ছি যেখানে কমিউনিটি বেইজড সংক্রমণ শুরু হবে অর্থাৎ স্থানীয়ব্যক্তি থেকে আরেক স্থানীয়ব্যক্তি সংক্রমিত হবে এবং এটি মাল্টিপ্লাই হতেই থাকবে।

HONG KONG, CHINA – FEBRUARY 03: Medical workers hold a strike near Queen Mary Hospital to demand the government shut the city’s border with China to reduce the spread of the coronavirus on February 3, 2020 in Hong Kong, China. Hong Kong has 15 confirmed cases of Novel coronavirus (2019-nCoV), with over 17,000 confirmed cases around the world, the virus has so far claimed over 300 lives. (Photo by Anthony Kwan/Getty Images)

এই বিপুল সম্ভাব্য রোগীর করোনা সনাক্ত ও তাদের চাপ সামলানোর সক্ষমতা কি IEDCR এর আছে? বর্তমান তথ্য উপাত্ত বলছে সেটি তাদের নেইঃ

◾IEDCR একলা চলার নীতি আঁকড়ে আছে। এর ল্যাবরেটরিতেই শুধু করোনা সনাক্তের পরীক্ষা হচ্ছে। অথচ একই ল্যাব সুবিধা ও প্রস্তুতি নিয়ে বসে আছে ICDDRB এর মতো সুনামধন্য প্রতিষ্ঠান যেটি অতীতে নিপাহ ভাইরাস সনাক্তের কাজে IEDCR এর সঙ্গে সাফল্যের সহযোগী ছিল। করোনা সনাক্ত ও সামলানোর একক দায়িত্ব IEDCR নিজের কাঁধ থেকে কিছুতেই সরাচ্ছে না।

◾একসঙ্গে ১ হাজার নমুনা পরীক্ষার সক্ষমতা থাকলেও IEDCR গতকাল পর্যন্ত ৫৫ দিনে মাত্র ৩২৬ জন সন্দেহজনক ব্যক্তির নমুনা পরীক্ষা করেছে!

◾দেশে করোনার ২য় পর্যায়- স্থানীয় সংক্রমণ শুরু হওয়া সত্ত্বেও সাম্প্রতিক বিদেশ ফেরত না হলে বা বিদেশ ফেরত ব্যক্তির সংস্পর্শে না আসলে, স্থানীয়ভাবে কেউ করোনা সংক্রমণের শিকার- এমন সন্দেহকে IEDCR পাত্তা দিচ্ছে না এবং নমুনা পরীক্ষার আওতামুক্ত রাখছে।

◾যারা শর্তপূরণ করছে তারাও সরাসরি IEDCR এ উপস্থিত হয়ে পরীক্ষা করাতে পারছে না। সরাসরি এসে পরীক্ষা করার সুযোগ বন্ধ করে দিয়েছে! IEDCR এর হটলাইনে ফোন করে নমুনা পরীক্ষার অনুরোধ এবং IEDCR এর সন্তুষ্টি সাপেক্ষে পরীক্ষার সুযোগ মিলছে। এই হটলাইনে কানেকশান পাওয়াটাই তো এখন বিরল সৌভাগ্যের ব্যাপার!

◾দেশের ১৬ কোটি জনগণের করোনা সনাক্তের জন্য IEDCR এর হাতে আছে মাত্র ১৭৩২ কিট যা তারা বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা থেকে পেয়েছে। নতুন কিট কবে আসবে বা আদৌ আসবে কিনা- কোথাও কোন তথ্য নেই। তাই এই বিদেশি কিটগুলোকে যক্ষের ধনের মতো আগলে রাখা IEDCR এর জন্য স্বাভাবিক।

◾আনন্দের ব্যাপার- করোনা ভাইরাস টেস্টিং কিট তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশের গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র! IEDCR যে বিদেশী কিট দিয়ে নমুনা পরীক্ষা করছে তাতে সময় লাগছে ৩-৪ ঘন্টা। অন্যদিকে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র উদ্ভাবিত দেশি কিট- এ সময় লাগবে মাত্র ১৫-২০ মিনিট! আর দাম? মাত্র ২০০ টাকায় এটি সরবরাহযোগ্য! কী দারুন ব্যাপার! ঔষুধ প্রশাসন অনুমতি দিলেই উৎপাদন শুরুর অপেক্ষায় গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র।

◾IEDCR জানিয়েছে, ভবিষ্যতে নমুনা পরীক্ষায় অন্য প্রতিষ্ঠানের সাহায্য নিলেও বেসরকারি কোন প্রতিষ্ঠানকে এই পরীক্ষার অনুমতি দেবে না। কেন? এই নমুনা পরীক্ষার কর্তৃত্ব কি কারো কোন তালুকদারি নাকি জমিদারি যে বুকে আগলে রাখতে হবে?

◾ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মতো জায়গায় পর্যন্ত করোনা সনাক্তের ব্যবস্থা নেই। করোনা আতংকে চিকিৎসা অবহেলায় একটি মেয়ে মারা গেলো, এটি দুর্ভাগ্যজনক। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা বারবার বলছে- করোনা প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হচ্ছে- পরীক্ষা, পরীক্ষা এবং পরীক্ষা! আল জাজিরা বলছে- করোনা আক্রান্ত দক্ষিণ কোরিয়াতে ২ লাখ ২২ হাজার নমুনা পরীক্ষা হয়েছে, আমাদের প্রতিবেশী ভারতে বর্তমানে করোনার নমুনা পরীক্ষা হচ্ছে ৬২ টি কেন্দ্রে! আমরা কীসের আশায় IEDCR এর একক মুখের দিকে তাকিয়ে বসে আছি!

◾করোনা সংক্রান্ত খবর নিয়ে IEDCR এর প্রতিনিয়ত ক্যামেরা আর টিভির সামনে হাজির হওয়ার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে- করোনা সনাক্তের পরীক্ষার ব্যবস্থা ও সরঞ্জাম বিকেন্দ্রীকরণ করা ও দেশের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে দেওয়া। প্রতিটি জেলা ও উপজেলা হাসপাতালকে করোনা সনাক্ত পরীক্ষার অনুমতি দেওয়া হোক, দ্রুত ICDDRB কে করোনা মোকাবিলার অংশীদার করা হোক, গণস্বাস্থ্যকেন্দ্র উদ্ভাবিত কিট দ্রুত উৎপাদন ও স্থানীয় পর্যায়ে সরবরাহের ব্যবস্থা করা হোক, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও প্রয়োজনে করোনা শনাক্তের আয়োজনে যুক্ত করতে হবে।

করোনা একটি ঘোষিত বৈশ্বিক মহামারি। এই দুর্যোগ মোকাবেলার দায় ও দায়িত্ব আমাদের সবার; কারো একক নয়। আল্লাহ সবাইকে হেফাজত করুন।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন