মঙ্গলবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১; ৭:১০ পূর্বাহ্ণ


…জাহিদ রাজন

এক্সক্লুসিভ হওয়া মানুষের একটা পাগলামি। মানুষের মন একটা বাইনারি সার্চ এলগরিদমের মত- সবকিছু খালি দুই ভাগ করে। একভাগে আমি- আমার মত যারা আছে, যারা এক্সক্লুসিভ ক্লাবের সদস্য হতে পারে। মানুষের মন এক্সক্লুসিভের মধ্যেও এক্সক্লুসিভ খোঁজে।

মানব জাতির ইতিহাস বলে মানুষ অনেক ধরনের খাবার খেয়ে বেঁচে ছিল। কেউ হাই কার্বোহাইড্রেট, কেউ লো-কার্বোহাইড্রেট, কেউ বেশী প্রোটিন, কেউ কম প্রোটিন, কেউ সবজি। ভাইকিংদের বেশী বেশী শাক-সবজি খাওয়ার দরকার পড়ত না, ভারতবর্ষের শাকহারি মানুষদেরও মাংস খাওয়ার দরকার পড়ে নি।

এরপর আসল ওয়েস্টার্ন ডায়েট, মূলমন্ত্র একটাই- মাংস খান বেশী করে, আছে প্রোটিন। আর সব কিছু এখন খুব রিফাইন্ড, সুন্দর সাদা ধবধবে। সব কিছু এফিশিয়েন্ট- ইন্ডাস্ট্রি আপনাকে সব কিছু করে দিবে।

আপনি অফিস থেকে বাসায় আসবেন, খাবার অর্ডার করবেন, আরাম করে খাবেন, রান্নায় কষ্ট করে আপনার কাজ নেই। যা মন চায় অর্ডার দিবেন, যত খুশি। আপনি যদি উপযুক্ত পরিমাণে টাকা দিতে রাজি থাকেন- শিউর, সব সিজনে সব কিছু পাওয়া যাবে, নিমিষেই। কল্পনাকেও যেন হার-মানানো একটা ব্যাপার।

একটা সময় দুনিয়া জুড়ে অনেক অনেক শস্য উৎপাদিত হতো, অনেক জাতের, রঙয়ের, গন্ধের। মানুষের মন বেশীর সন্ধান করতে গিয়ে মানুষ দেখল ভুট্টা আর সয়া- এই দুই জিনিসের মধ্যে আছে লুকানো গুপ্তধন। সূর্যের আলোকে শক্তিতে রপান্তর করতে সবচেয়ে বেশী পারদর্শী এই দুই শস্য। এখন দুনিয়া জুড়ে এই দুই শস্যের ছড়াছড়ি।

আপনার আটাকে সাদা করার দায়িত্ব নিয়েছে ইন্ডাস্ট্রি। আটা সাদা করতে গিয়ে সব মূল্যবান ভিটামিন, মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট বাদ দিয়েছে। এরপর এই ভিটামিন-ই আবার সাপ্লিমেন্ট হিসেবে দিয়েছে। আপনি খাচ্ছেন “স্পেশাল ভিটামিন-যুক্ত আটা/ ময়দা” যেটাতে ভিটামিন সব আগে থেকেই ছিল। লুইস ক্যারোল যেটাকে বলেছিলেন- অনেক দৌড়ে আপনি রয়ে গেলেন সে একই জায়গায়।

আপনার খাবারে ভ্যারাইটি যত কম হবে- আপনার মাইক্রো নিউট্রিয়েন্ট ইন্টেক তত কমে যাবে। বেশী ফলনের লোভে মানুষ যত বেশী সার ব্যবহার করবে- আমাদের মাটি, পানি তত বিষাক্ত হয়ে উঠবে। আপনি বেশী খাবেন, বেশী ক্যালরি নিবেন, মোটা হবেন কিন্ত এরপরেও অপুষ্টিতে ভুগবেন।

মানুষের এক্সক্লুসিভ হওয়ার দৌড়ে মানুষ যদি পারত দুনিয়া থেকে সব গরীব, চাইনিজ, মুসলমান, নাস্তিক অথবা আরও যা যা ডিভিশন আপনি চিন্তা করতে পারেন সব মুছে দিত। শুধু নিজের লোভ, নিজের উপভোগের জন্য থাকবে সব কিছু। এতে যা হয় হোক না। বাড়ুক না পৃথিবীর তাপমাত্রা। যদি আমাজন জঙ্গল উজাড় করে চাষ করতে হয় সেটাই সই। যদি লাখ মানুষের জীবনও যায় যাক কিন্ত আতশবাজির খেলা যেন বন্ধ না হয়- ছোট লোকের প্রাণ যায় যাক, ‘শো মাস্ট গো অন’। পৃথিবীর শেষ গণ্ডারটা মারা যাক, শেষ পাণ্ডাটা দিয়ে যদি সুপ বানানো লাগে তবে তাই হোক কিন্ত এরপরেও এলিটদের পাতে যেন থাকে একটা এক্সক্লুসিভ সুপ।

এরপরেও আল্লাহর দুনিয়ায় কিছু ইকুয়ালাইজার আছে, যেটা মাঝে মাঝে সমানে চলে আসে। ইবোলা, করোনার মত সংক্রামক রোগ- এরকম ইকুয়ালাইজার খুব কঠিন আঘাত হানে। শক্তিমানেরা কিছু দিনের জন্য বুঝতে পারে এক্সক্লুসিভ হওয়ার একটা সীমা আছে। বেড়া দিয়ে, দেয়াল তুলে, এয়ারপোর্ট বন্ধ করেই সব বন্ধ করা যায় না। কারণ উন্নতির এ পুরো মডেলটা দাঁড়িয়ে আছে লীন সিস্টেমে- কোন কিছু অয়ারহাউজে স্টক করার দরকার নেই, চায়নায় উৎপাদিত হবে, আফ্রিকায় হবে, বাংলাদেশে হবে। এরপর কার্গোতে করে, জাহাজে করে চলে আসবে প্রয়োজনমত। কিন্ত যদি আফ্রিকাতে, চীনে রোগ হয় ? তাহলে রোগ বালাইও আসবে সাথে করে।

এরকম এপিডেমিক ভবিষ্যতে পৃথিবীতে আরও আসবে- আসতেই থাকবে সম্ভবত।

এপিডেমিকও বরাবরের মত গরীবের সর্বনাশ। তবে হ্যাঁ- গ্লোবালাইজড পৃথিবীটা সব সময় মানুষের বাইনারি এলগরিদম মেনে চলে না, এটাই সিল্ভার লাইনিং। শুধু আপনি সুস্থ থাকবেন কিন্ত আপনার গরীব প্রতিবেশী মরলে মরুক আপনার ‘এক্সক্লুসিভ ক্লাব রুল’ এখানে আর কাজ করছে না। এপিডেমিক থেকে বাঁচতে হলে আপনার গরীব প্রতিবেশী বা অন্য দেশের অন্য মানুষ, হোক সেটা আফ্রিকা, চায়না বা বাংলাদেশে- তাদের দরকার আছে হেলথ কেয়ার, দ্রুত রোগের ডায়াগনোসিস এবং চিকিৎসা।

এপিডেমিক সামনে তুলে ধরে শরীরের লুকানো রোগকে- আপনার শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতাই আপনার বন্ধু। গ্লোবাল এপিডেমিক সামনে নিয়ে আসে গ্লোবাজাইলড ইনইকুয়ালিটিকে। সবাই একসাথে ভাল থাকলে তবেই আপনি ভাল থাকবেন- নাইলে আপাতত আপনি মাঝে মাঝে আপনার রাজপ্রাসাদে কোয়ারিন্টিনে থাকতে পারেন।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন