বৃহস্পতিবার, ১৬ জুন ২০২১; ৫:৩৪ অপরাহ্ণ


লেখকঃ ফাইজ় তাইয়েব আহমেদ

১। বাংলাদেশের জেনারেল হাসপাতাল গুলোর নকশা, সাইজ, স্পেইস ইউটিলাইজেশান, রোগীর চাপ, বেড সংখ্যা, বেড বিন্যাস, কর্মক্ষম আইসিইউ এবং সার্বিক হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা সব মিলে এগুলা সংক্রমণ ব্যাধির কিংবা ব্যাপক পরিসরে কোয়ারেন্টিনের জন্য উপযোগী নয়। দুর্যোগ এবং বিশেষ রোগের প্রাদুর্ভাব ছাড়াই নিয়মিতভাবেই দেশের হাসপাতালগুলোতে সক্ষমতার আড়াই গুণ বেশি রোগীর চাপে থাকে।

এই সাধারণ হাসপাতাল গুলোতে করোনা রোগী নিলে সুরক্ষাহীন চিকিৎসক, নার্সর ও ব্যবস্থাপকগণ ভীত হয়ে স্বভাবিক ভাবেই চিকিৎসা দানে অপারগতা দেখাবেন। দেখানে বরং নিজেদেরকেই সংকটাপন্ন করবেন। তাছাড়া অপরাপর সকল জটিল রোগীর জীবন সংকটাপন্ন করে, অন্য সব ক্রিটিক্যাল রোগীকে বাদ দিয়ে শুধু করোনা রোগীর চিকিৎসা দেয়াও অনৈতিক।

এরই মধ্যে আমরা দেখেছি, চিকিৎসকেদের নিরাপত্তার সারঞ্জাম বা পিপিই সরবারহ করা হয়নি বহু হাসপাতালে, উল্টো ব্যক্তি উদ্যোগে সংগ্রহের নোটিস দেয়া হয়েছে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে।

২। ভাবতে অবাক লাগে, সোয়া পাঁচ লক্ষ কোটি টাকার বাজেটে শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বাজেট সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকার মত, যা বাজেটের ২,৪%। ২০১৯-২০২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে যেখানে দেশের প্রতিরক্ষা বাজেট ২৯ হাজার ৬৭ কোটি টাকা সেখানে স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও পরিবার পরিকল্পনা সংক্রান্ত সব বরাদ্দ মিলিয়ে স্বাস্থ্য বরাদ্দ ২৫ হাজার ৭৩২ কোটি টাকা দেখানো হয়েছে যা বাজেটের ৪,৯%। এই স্বাস্থ্য বাজেটে চিকিৎসা ছাড়াও পরিবার পরিকল্পনা, পুষ্টি, মাতৃসেবা, শিশু কল্যাণ, ওষুধের মান নিয়ন্ত্রণ; জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, চিকিৎসা শিক্ষা, নার্সিং শিক্ষা, জাতীয় জনসংখ্যা, স্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষণা ও প্রশিক্ষণ-সংক্রান্ত কার্যাবলি সহ অন্তত নয়টি সরকারি বিভাগ ও অধিদপ্তরের বরাদ্দ যুক্ত করা আছে।

সুস্পষ্ট ভাবে “সংক্রামক-অসংক্রামক ব্যাধি প্রতিরোধ ও প্রতিকার” এর বরাদ্দও আছে। অথচ আমরা দেখছি ঠিক গত বছরই ব্যাপক আকারে ডেঙ্গুর প্রদুর্ভাবে পড়া দেশে সব মিলে, মাত্র ১৭৩২টি সংক্রামণ টেস্ট কিট আছে (১৭ মার্চ ২০২০)। এবং বেশ দীর্ঘ সময় পেয়েও স্থানীয় গবেষণা উৎপাদন কিংবা বিদেশ থেকে আনার কোন ব্যবস্থাই করা হয়নি।

ফাটাকা উন্নয়নের কথিত রোল মডেলের সরকারের স্বাস্থ্য অবকাঠামো এতটা হীন্মান্য কেন তা আমাদের বোধগম্য নয়। বাংলাদেশের মানুষকে উন্নয়নের ক্রমাগত মূলা দেখিয়ে, এভাবে মৌলিক নাগরিক সেবা খাতকে অবহেলিত রাখা বিস্ময়কর।

৩। করোনা সংক্রামনের গাণিতিক মডেল বিন্যাস করে বাংলাদেশের ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় ও যুক্তরাষ্ট্রের জন্স হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও এপিডেমিওলজিস্টদের লেখা এক গবেষণা প্রতিবেদনে আশঙ্কা করা হয়েছে যে, কভিড-১৯ সংক্রমন থেকে বাংলাদেশে ৫ লাখেরও বেশি মানুষ মারা যেতে পারে।

প্রতিবেদনটি সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকারের নীতিনির্ধারকদের দেওয়া হয়েছে যেখানে বলা হয়েছে, “যদি এই রোগ প্রশমন বা অবদমনের [মিটিগেশন বা সাপ্রেশন] জন্য কোনো পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে ৮ মে পর্যন্ত নতুন রোগীরা আক্রান্ত হতে থাকবে। […২৮ মে নাগাদ] মোট ৮ কোটি ৯১ লাখ মানুষের মধ্যে এই সংক্রমণের লক্ষণ দেখা যেতে পারে। ৩০ লাখ ৩৭ হাজার রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করার প্রয়োজন হতে পারে। ৬ লাখ ৯৬ হাজার রোগীকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে রেখে চিকিৎসা করতে হতে পারে। মারা যেতে পারে ৫ লাখ ৭ হাজার ৪৪২ জন মানুষ।”

যেই গাণিতিক মডেল ব্যবহার করে এই গবেষণা করা হয়েছে, সেটি অনুযায়ী, ১৮ মার্চ যখন বাংলাদেশে প্রথম এই রোগে একজনের মৃত্যু হয়, ততদিনে সারাদেশে ১,৬৮৫ জনের মধ্যে এই রোগের লক্ষণ ছিল। আজ থেকে আগামী ১০ দিনের মধ্যে, অর্থাৎ ৩১ মার্চ নাগাদ, লক্ষণ দেখা যেতে পারে ২১ হাজার ৪৬১ জনের মধ্যে।

৪। বাংলাদেশে প্রতি ১২৫০ জনে একটি সরকারি হাস্পাতাল বেড, সরকারি বেসরকারি মিলে ডাক্তারঃরোগী হচ্ছে ১ঃ ১৮৪৭। প্রতি ৫ হাজার মানুষে একজন নার্স। মোট ৯০ হাজার ডাক্তার, এর মধ্যে সরকারি পদে আনুমানিক ২৪ হাজার।

এমন অপ্রতুল স্বাস্থ্য অবকাঠামো এবং হেলথ রিসোর্স নিয়ে এত বড় মেডিক্যাল ইমার্জেন্সি ব্যবস্থাপনা প্রায় অসম্ভব। এটা উপ্লভদ্ধি করেই হয়ত সরকার করোনা রোগীর হাসপাতালে ভর্তি নিচ্ছে না, সংক্রমণের তথ্য লুকাচ্ছে, সাংবাদিক ও চিকিৎসক পেশাজীবীদের সেন্সরে এনেছে। রোগীদের টেস্ট করাতে বাঁধা দিচ্ছে, সংক্রমণ গবেষণা ও রোগতত্ত্বের আইইডিসিআর ছাড়া আইসিডিডিআরবি ও অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় ল্যাব, হাসপাতালের পিসিআর মেশিন গুলো করোনা টেস্ট উন্মুক্ত করছে না। বলছে টেস্ট কীট নেই।

কিন্তু এতে হীতে বিপরীত হবে। প্রতিটি অনির্ণিত করোনা রোগীর মৃত্যু নতুন করে অন্তত শ খানেক নতুন লোককে সংক্রমণ ঝুঁকিতে ফেলার একটা ভয়াবহ বিপদ তৈরি করছে সরকার নিজেই। এই চেইন এক্সপোনেনশিয়াল সংক্রামণের ব্যাপারে সরকার সৎ আচরণ করুক এটাই কাম্য।

এমতাবস্থায় সরকারকে কয়েকটি ম্যাসিভ সিদ্ধান্ত নেয়া লাগবে, এটা করতে হবে পাবলিক হেলথ এক্সপার্ট, সংক্রমণ বিশেষজ্ঞ বা এপিডেমিওলজিস্ট এবং চায়নার পরামর্শ মত।

ক। সরকার চাইলে কিছু হাসপাতালের যাবতীয় সেবা অন্য হাসপাতালে হস্তান্তর করে সেগুলোকে পুরোপুরি করোনার জন্য উন্মুক্ত করা যেতে পারে।

খ। উত্তরায় দশ হাজার ফ্ল্যাট প্রকল্পের বেশ কটি ভবনের হস্তান্তর হয়নি, সেখানে বা অন্য এমন মেগা এপার্ট্মেন্ট প্রকল্পে অস্থায়ী করোনা হাসপাতাল তৈরি করা যেতে পারে।

গ। ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের জন্য নির্মিত ক্যাম্পকে কোয়ারেন্টাইন কেন্দ্র এবং হাস্পাতল হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে সেখানে ট্রান্সপোর্টেশন, খাদ্য এবং মেডিক্যাল সাপ্লাই সরবারহে বেশ ঝামেলা হবে।

ঘ। টঙ্গী ইজতেমা ময়দান এবং কুর্মিটোলা গলফ ক্লাবের মাঠে আর্মি নেভি বিমান, পুলিশ, আনসার, বিজিবি’র হাতে থাকা তাবু ফ্যাসিলিটি গুলো দিয়ে অতি দ্রুত অন্তত পাঁচ হাজার অস্থায়ী করোনা ক্যাম্প গড়ে তোলা, এমনভাবে যাতে পরে ক্যাপাসিটি বাড়ানো যায়।

চিকিৎসার পাশাপাশি সংক্রমিতকে কোয়ারেন্টিন করে নতুন সংক্রমণ বন্ধের কার্যকর উদ্যোগ না নিলে সরকারের বিপদ কমবে বই বাড়বে না।

মিনটাইম, স্থানীয় ভাবে পিপিই উৎপাদনে শিল্প মালিকদের সাথে দ্রুত উদ্যোগ নেয়া, চায়না থেকে কূটনৈতিক চ্যানেলে টেস্ট কিট সহ মেডিক্যাল সাপ্লাই আনার দ্রুত ব্যবস্থা করা হোক। মেডিক্যাল ইমার্জেন্সি ঘোষণা করে দ্রুত কার্যকর কোয়ারেন্টিন বন্দোবস্ত এবং স্বাস্থ্য সেবার উপকরণ সরবারহ করা হোক।

মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে উদযাপন, নির্বাচন, প্রচার, সম্মিলিত প্রার্থনা, জনসভা করার নির্বোধ ও হীনমান্য কাজগুলোর বিপরীতে হাসপাতালে রোগী ভর্তি না নিবার কৌশল ব্যাক ফায়ার করবে, অবশ্যই। তথ্য লুকিয়ে এবং নাগরিক স্বাস্থ্যের দায়িত্ব নিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে পরিস্থিতি মোকাবেলার সরকারি কৌশল ব্যর্থ হতে বাধ্য।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন