মঙ্গলবার, ২ আগস্ট ২০২১; ৮:৩১ পূর্বাহ্ণ


ফটোঃ Sultan Mohammed Zakaria

সুলতান মোহাম্মদ যাকারিয়া যুক্তরাজ্যভিত্তিক এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের দক্ষিণ এশিয়া গবেষক।

১। আগামী দুই/তিন সপ্তাহের জন্য সবকিছু লকডাউন করে দেন। যেকোনো প্রকার জমায়েত (উপাসনালয়সহ) নিষিদ্ধ করেন। সকল প্রকার জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচন স্থগিত করেন। ইতোমধ্যে কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন, বাকীগুলোও দৃঢ়তার সাথে নিন। এই মুহূর্তে দেশে দৃঢ় ও শক্তিশালী নেতৃত্ব প্রয়োজন। জাতীয় সংহতি প্রয়োজন। সকল পক্ষের সাথে কথা বলুন। সহায়তা চান।

২। করোনা ভাইরাসে বয়স্ক, দুর্বল মানুষ সবচেয়ে বেশি মৃত্যু ঝুঁকিতে (প্রায় ১৫ শতাংশ মৃত্যুহার) – তাদের রক্ষায় পরিবারের শিশু ও অন্যান্য প্রাপ্তবয়স্করা যাতে নিজ-নিজ বাসায় সর্বোচ্চ সচেতন, সংবেদনশীল আচরণ করে তার জন্য প্রচার-প্রচারণা চালান। আমাদের দেশে নিঃসঙ্গ বৃদ্ধদের যাওয়ার খুব জায়গা নেই। মানসম্মত বৃদ্ধাশ্রমের ঘাটতি প্রকট। যেসব বৃদ্ধ মানুষ একা থাকেন তাদের বিশেষ পরিচর্যার জন্য কতটুকু কী করা যায় ভেবে দেখেন।

৩। রোহিঙ্গা ক্যাম্প , কারাগার ও বিভিন্ন বস্তিতে গুলোতে অনেক মানুষ আবদ্ধ অবস্থায় থাকে। এই স্থান গুলো সব চেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। এই এলাকায় গুলোতে করোনার বিস্তার প্রতিরোধে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নিতে হবে। নিয়মিত টেস্ট করে, স্বপ্রণোদিত হয়ে রোগী চিহ্নিত করে তাদের বিচ্ছিন্ন করতে হবে।

৪। সরকারি-বেসরকারি সকল টিভি/ বেতারকে বাধ্যতামূলকভাবে ভাইরাস মোকাবেলায় সামাজিক সচেতনতামূলক প্রচারণার কাজ চালাতে হবে। ।

৫। ডাক্তার, নার্স, কর্মী সহ সকল ধরনের মেডিক্যাল স্টাফদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে প্রতিটি হাসপাতালে ব্যক্তিগত প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহ করতে হবে।

৬। সরকারি-বেসরকারি সকল হাসপাতালের নির্বাহীদের ডেকে সমন্বিতভাবে কিভাবে এই মহামারী মোকাবেলা করা যায় তার কর্মকৌশল নির্ধারণ করুন।
এর মধ্যে রয়েছে: পরীক্ষা-নিরীক্ষা পদ্ধতি ও চিকিৎসা বিকেন্দ্রীকরণ করে দিন।
হাসপাতালগুলোকে প্রয়োজনীয় উপকরণ, লজিস্টিকস, অন্যান্য সহায়তা দিন।
বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে সরকার কিভাবে উপকরণ কিংবা নগদ সহায়তা দিয়ে সহায়তা করবে দ্রুত তার ফ্রেমওয়ার্ক প্রণয়ন করুন।

যুদ্ধাবস্থার মতো দেশের সরকারি-বেসরকারি প্রতিটি হাসপাতাল এক নির্দেশনায়, এক কর্মকৌশল বাস্তবায়নে কাজ করবে।

৭। প্রতিদিন সকল হাসপাতালে সকল পরীক্ষার ফল এবং কোন এলাকার কতজন আক্রান্ত হয়েছে সকল তথ্য টিভি/বেতারে জনগণকে তাৎক্ষণিকভাবে অবহিত করুন।
এতে করে জনগণ জানবে কোন কমিউনিটি বেশি আক্রান্ত এবং তাদের আশু করণীয় কী। অবাধ তথ্য এই লড়াইয়ের একটি বড় অনুষঙ্গ।

৮। কারা আক্রান্ত হয়েছে তাদের সংস্পর্শে কারা-কারা ছিলো তার বিস্তারিত তথ্যব্যাংক তৈরি, সংরক্ষণ ও ফলো আপ করুন। এই কেন্দ্রীয় তথ্যব্যাংক সরকারের চোখ হিসেবে কাজ করবে যে কোথায় এটি দ্রুত ছড়াচ্ছে, কোথায় কমে আসছে এবং কোথায় কোন রিসোর্স, লজিস্টিক্স প্রয়োজন। আই ফোন এবং এন্ড্রয়েড এপ্সের মাধ্যমে এই তথ্য গুলো জনগণকে নিয়মিত আপডেট করুন।

৯। জাতীয় পর্যায়ে সকল স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনকে মোবিলাইজ করুন ও কাজে লাগান।
জনসংখ্যার ঘনত্ব, স্বল্প সম্পদ, ও দুর্বল জনস্বাস্থ্য অবকাঠামো বিবেচনায় বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ পৃথিবীর যেকোনো দেশের চেয়ে বেশি। সুতরাং আমাদের পদক্ষেপও অনন্য হতে হবে।

১০। এই মহামারীর পরোক্ষ প্রভাব সুদূরপ্রসারী এবং ভয়াবহ। আগামী ২/৩ মাস ব্যবসা-বাণিজ্য উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিশ্বে মহামন্দার পদধ্বনি। তবে এ মন্দা ভয়াবহ, সারা পৃথিবীর মানুষকে ভোগাবে। বড়-বড় ব্যবসায়ীদের রপ্তানী কমবে। বহু কারখানা বন্ধ হবে। তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা। এদের জন্য অর্থনৈতিক প্রণোদনা প্যাকেজ তৈরি করুন। এটি হতে পারে তাদের সুদ বা ঋণ মওকুফ করে দিয়ে, স্বল্প বা বিনাসুদে ঋণ দিয়ে। তবে এই মুহূর্তে তাদের ব্যবসা বন্ধ। রুটি-রুজি নেই। আমেরিকা, কানাডাসহ ধনী দেশগুলো মানুষকে সরাসরি নগদ অর্থ সহায়তা দিচ্ছে। এমনকি আমাদের প্রতিবেশী ভারতের উত্তর প্রদেশের সরকারও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে নগদ অর্থ সহায়তা দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছে। আমরা কতটুকু কী করতে পারি সে কৌশল নির্ধারণ করুন। বড়-বড় অর্থনীতিবিদদের নিয়ে অর্থমন্ত্রী বসুক। মানুষের বিপদে পাশে দাড়াতে হবে, মানুষকে কিছু একটা সহায়তা দিতে হবে। না হয় এর প্রভাবে সমাজে দীর্ঘমেয়াদী অস্থিরতা তৈরি হবে।

১১। কলকারখানা বা ক্ষুদ্র ব্যবসা বন্ধের ফলে বহু চাকুরিজীবি মানুষ, মধ্যবিত্ত চাকুরি হারাবে। তাদের জন্য কী করণীয় নির্ধারণ করুন। ক্ষুদ্র ব্যবসায়িদের মতো তাদের জন্যও সরাসরি নগদ সহায়তা, বিনা সুদের ঋণ প্রদান একটি বিকল্প হতে পারে।

১২। অতি দরিদ্র মানুষের জন্য অন্তত আগামী দুই মাস রেশন সহায়তা কার্যক্রম, নগদ অর্থ বিতরণ প্রভৃতি পদক্ষেপ নিতে হবে।

১৩। ক্রয়াদেশ, রপ্তানি বাতিলের ফলে বড়-বড় ব্যবসায়ীদের বিপুল ক্ষতি গুণতে হবে। তাদের জন্য করছাড়সহ কী সুবিধা দেওয়া যায় বিবেচনা করতে পারেন।

১৪। এসব কাজে নেতৃত্ব প্রদানে সরকারের সবচেয়ে সৎ, দক্ষ, কর্মঠ এবং দৃঢ় অঙ্গীকার সম্পন্ন একজন রাজনীতিক/প্রশাসককে প্রধান করে জাতীয় নিরাপত্তা পর্ষদের মতো একটি সর্বদলীয় টাস্কফোর্স গঠন করুন।

১৫। মনে রাখতে হবে এটা একটা জাতীয় দুর্যোগ। শত বছরে এ ধরনের দুর্যোগ এক-দু’বার আসে। এই রোগ কয়েক মাস স্থায়ী হলে সমগ্র পৃথিবীর রাজনীতি, অর্থনীতি ওলটপালট হয়ে যাবে। এই রোগের পিছনে সরকারের হাত নেই, কিন্তু জনগণের এই মহা-দুর্যোগে তাদের পাশে দাড়ানো কিংবা সঠিকভাবে এর ব্যবস্থাপনা করতে না পারলে যেকোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থা ধ্বসে পড়বে।


এই দুর্যোগ নিয়ে দেকোন ধরনের রাজনীতি না করে সবাই মিলে আমরা দেশের এই কঠিন পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে। এবং আমরা কতটুকু পারবো বা ব্যর্থ হবো সেটি নির্ভর করবে সরকারের দক্ষতার উপর। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন