, ১৩ জুন ২০২১; ৯:২৬ অপরাহ্ণ


স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ গত ১৬ মার্চ এক গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বিদেশ প্রত্যাগত নাগরিকদের “হোম কোয়ারেন্টাইন” নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে করোনা সংক্রমণ মোকাবেলায় গঠিত কমিটির প্রতি ১০টি কার্যক্রম গ্রহণের নির্দেশনা জারি করে। এই বিজ্ঞপ্তির ৯ নং পয়েন্টের নির্দেশনা হচ্ছে- “কোয়ারেন্টাইনে থাকা ব্যক্তিগণ যদি নিয়ম ভঙ্গ করেন তাহলে সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইন, ২০১৮ অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। উক্ত আইনে ‘দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাগণ’ ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।”

◘ এরপরেই আমরা দেখতে পাচ্ছি প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটগণ দেশজুড়ে হোম কোয়ারেন্টাইন নির্দেশনা অমান্যকারীদের শাস্তি দিচ্ছেন, জরিমানা করছেন এবং তাদের উপর বাধ্যতামূলক হোম কোয়ারেন্টাইন কার্যকর করছেন। বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতিতে আইনের এই প্রয়োগকে সবাই সাধুবাদ জানাচ্ছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট আইন ও আইন প্রয়োগের বিচ্যুতি অনেকের দৃষ্টি এড়িয়ে যাচ্ছে।

◘ প্রথমত- করোনা নিয়ে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের উপরোক্ত বিজ্ঞপ্তির আইনগত বৈধতাই প্রশ্নবিদ্ধ। কারন- বিজ্ঞপ্তি টি দেওয়া হয়েছে করোনা বিষয়ে এবং বিজ্ঞপ্তির ৯ নং দফানুসারে সংক্রামক রোগ আইন-২০১৮ হচ্ছে প্রযোজ্য আইন। ২০১৮ সালের সংক্রামক রোগ আইনের ৪ ধারায় ২৩টি সংক্রামক ব্যাধির একটি তালিকা আছে কিন্তু সেখানে কভিড-১৯ বা করোনা ভাইরাসটির নাম নেই। তবে একই আইনের ধারা ৪(ভ) অনুযায়ী- ‘সরকার কর্তৃক, সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা, ঘোষিত কোনো নবোদ্ভূত বা পুনরুদ্ভূত (Emerging or Reemerging) রোগসমূহ এই সংক্রামক ব্যাধির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা যাবে।

গত ১৮ মার্চ করোনা সংক্রান্ত এক রিটের প্রেক্ষিতে ২০১৮ সালের সংক্রামক রোগ আইন সংশোধন করে করোনা ভাইরাসকে সংক্রামক ব্যাধি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে গেজেট জারি করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট ডিভিশন কিন্তু করোনাকে এই আইনে অন্তর্ভুক্ত করার কোন গেজেট এখনো জারি হয়েছে বলে কোথাও খোঁজ পাইনি। তাহলে করোনার সংক্রমণ প্রতিরোধে ২০১৮ সালের সংক্রামক রোগ আইনের অধীন কোয়ারেন্টাইনের বিধান কার্যকর করার বিজ্ঞপ্তির আইনগত কর্তৃত্ব কী? নতুন গেজেট ছাড়া করোনার ক্ষেত্রে সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইন, ২০১৮ আইনত অপ্রযোজ্য।

◘ দ্বিতীয়ত- এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালিত হয়- ২০০৯ সালের মোবাইল কোর্ট আইন অনুযায়ী। এই মোবাইল কোর্ট অ্যাক্ট এর ধারা-৬ অনুসারে তফসিলভুক্ত আইনসমূহের আওতায় কৃত অপরাধের বিচার ভ্রাম্যমান আদালত করার এখতিয়ার রাখে। কিন্তু মোবাইল কোর্ট অ্যাক্ট এর তফসিলভুক্ত ১১৬ টি আইনের মধ্যে কোথাও বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখিত ২০১৮ সালের সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইন টি নেই। অর্থাৎ, সংক্রামক রোগ আইনের আওতায় কৃত অপরাধের বিচার করার এখতিয়ার মোবাইল কোর্টের নেই যতক্ষণ পর্যন্ত মোবাইল কোর্ট আইনের তফসিল সংশোধন করা না হচ্ছে।

◘ তৃতীয়তঃ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখিত সংক্রামক রোগ আইন কার্যকর করতে উক্ত আইনের অধীনে “দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাগণ” আসলে কারা? এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটই কি দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা?

সংক্রামক রোগ আইনের ধারা-২(৩) অনুসারে “ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মচারী’’ অর্থ- ধারা ৩০ এর অধীন ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোনো কর্মচারী। আর ধারা- ৩০ বলছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, প্রয়োজনে, লিখিত সাধারণ বা বিশেষ আদেশ দ্বারা তার উপর অর্পিত কোনো ক্ষমতা অধিদপ্তরের যে কোনো কর্মকর্তাকে অর্পণ করতে পারবেন। স্পষ্টতই- এখানে ক্ষমতা (বা দায়িত্ব)প্রাপ্ত কর্মকর্তা বলতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাকে নির্দেশ করা হচ্ছে- কোন এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটকে নয়! অর্থাৎ, বর্তমান আইনের বিধানুসারে এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটগণ সংক্রামক রোগ আইন- ২০১৮ এর বিধানাবলী প্রয়োগ করার ‘দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা’ হবার এখতিয়ার রাখেন না।

◘ এটি আরো স্পষ্ট হয় যখন- গত ২০ মার্চ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এক চিঠির মাধ্যমে জানিয়েছেন যে, করোনাভাইরাস এর সংক্রমণ রোধে দেশের সব বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইন, ২০১৮ প্রয়োগের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।

চিঠিতে বলা হয়েছে, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য), সব সিভিল সার্জন ও সব উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তারা স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতা নিয়ে আইনটির প্রয়োগ করতে পারবেন। সুতরাং, এটি প্রতিষ্ঠিত যে স্থানীয় মাঠ পর্যায়ে সংক্রামক রোগ আইনে ‘কোয়ারেন্টাইন নির্দেশনা’ প্রয়োগের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তরাই হচ্ছেন “দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি”, এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটগণ নন।

◘ প্রশ্ন জাগতে পারে- তাহলে এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটগণ কোন আইন ও কর্তৃত্ববলে জনগণকে ‘কোয়ারেন্টাইন আদেশ’ অমান্য করার দণ্ড প্রদান করছেন? আমি নিশ্চিত নই তবে অনুমান করছি- নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটগণ ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ২৬৯ ধারানুসারে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে এই সাজা দিচ্ছেন। দণ্ডবিধির ২৬৯ ধারায় যে কোন অবহেলাজনিত কাজ, যার দ্বারা জীবন বিপন্নকারী রোগের সংক্রমণ বিস্তার লাভ করার সম্ভাবনা রয়েছে- সেগুলোকে দণ্ডনীয় ঘোষণা করা হয়েছে। উল্লেখ্য, দণ্ডবিধিতে ‘কোয়ারেন্টাইন’ নামের কিছু নাই।

শেষ আলাপ- আমরা সবাই চাই- এই করোনা সংক্রমণের মতো ক্রান্তিকালীন সময়ে কোয়ারেন্টাইন এর বিধান অমান্যকারীর উপর আইনের কঠোর প্রয়োগ কার্যকর হোক। কিন্তু সেটি করার আইনগত কর্তৃত্ব কার- এই জিজ্ঞাসাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৮ সালে প্রণীত সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইন এর মতো একটি আধুনিক ও বিশেষ আইনের বদলে ১৬০ বছরের পুরনো দণ্ডবিধির বিধান কেন করোনার মতো সর্বাধুনিক একটি সংক্রামক রোগের মোকাবেলায় প্রয়োগ হবে? আর নতুন আইনটি প্রয়োগ করতে চাইলে সেক্ষেত্রে তফসিল সংশোধনের গেজেট দ্রুত প্রকাশ করে করোনাকে সংক্রামক ব্যাধির তালিকাভুক্ত করা হোক এবং যথাযথ ‘দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা’ কর্তৃক এই সুন্দর ও যুগোপযোগী আইনটি প্রয়োগ করা হোক।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন