, ১ আগস্ট ২০২১; ১০:৫০ অপরাহ্ণ


কার্ল মার্ক্সের মূল প্রস্তাবনা ছিল প্রকৃতির সাথে মানুষের সম্পর্ক বিচার। মার্ক্স বলেছিলেন, মানুষ প্রকৃতির সাথে উৎপাদনের সম্পর্কে আবদ্ধ থাকে। এটাকেই বলেছিলেন উৎপাদন সম্পর্ক। মার্ক্স কোন স্থির বিষয় নয় যে তাঁর সবকিছুই টেক্সট বইয়ে খুঁজে পাওয়া যাবে। পুঁজি গ্রন্থ লিখতে গিয়ে উনার প্রাণশক্তির অধিকাংশ ব্যয়িত হয়ে যাওয়ায় তিনি যা যা লিখতে চেয়েছিলেন সেটা তিনি শেষ করতে পারেননি।তাঁর নিজের লেখাতেও এই চিন্তার বিবর্তন ধরা পড়েছে। যেমন- কমিউনিস্ট ইশতেহারে “শ্রেণী” আছে দুটো আবার পুঁজিতে “শ্রেণী” আছে তিনটে। তাহলে মার্ক্সের মতে পুজিবাদে শ্রেণী কয়টা? মার্ক্স তাই সবসময় সৃজনশীল পাঠ। এটা মার্ক্সেরই শিক্ষা। মার্ক্স পাঠের সময় এটা মাথায় রাখতে হবে মার্ক্স ছিলেন হেগেলের শিষ্য আবার ফয়েরবাখের অনুবর্তী তাই জর্মন দর্শনে চিন্তার যেই প্রশ্ন গুলো হেগেল বা ফয়েরবাখ ফয়সালা করতে চেয়েছেন সেটার পরম্পরা ক্রিটিক বা বিচার অর্থে মার্ক্সের লেখায় আছে।

ক্যাপিটাল বইয়ে সাত অধ্যায়ে প্রথম পরিচ্ছদে মার্ক্স লিখছেন, “শ্রম হচ্ছে এমন একটি প্রক্রিয়া যাতে মানুষ এবং প্রকৃতি উভয়েই অংশ গ্রহন করে, এবং যেখানে মানুষ স্বেচ্ছায় তার নিজের এবং প্রকৃতির মধ্যেকার মিথস্ক্রিয়ার (metabolic interaction with nature) সূচনা করে, নির্ধারন করে, নিয়ন্ত্রন করে। প্রকৃতির উৎপাদন –সমূহকে তার বিবিধ অভাবের সঙ্গে উপযোজিত আকারে আত্নীকৃত করার উদ্দেশ্যে সে নিজেকে প্রকৃতির বিপরীতে স্থাপন করে প্রকৃতিরই অন্যতম শক্তি হিসাবে। এইভাবে বাহ্য জগতের উপরে কাজ করে এবং তাকে পরিবর্তিত করে, সে সঙ্গে তার নিজের প্রকৃতিরও পরিবর্তন ঘটায়। সে তার সুপ্ত শক্তিগুলিকে বিকশিত করে এবং সেগুলিকে বাধ্য করে তার নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করতে।”

মানুষ শ্রমের মাধ্যমে প্রকৃতির সাথে যুক্ত থাকে, এবং প্রকৃতির সাথে যুক্ত থাকলেই সেটা শ্রম নয়। প্রকৃতির শক্তি হিসেবেই মানুষ নিজেকে প্রতিস্থাপন করে। মানুষ এবং প্রকৃতির মধ্যে পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়াই শ্রম। Marx and the Rift in the Universal Metabolism of Nature শিরোনামে প্রবন্ধে মার্ক্স লিখিত মেটাবোলিজম বিষয়টি ব্যাখ্যা করার জন্য John Bellamy Foster লিখেছেন, “Marx’s use of the metabolism concept in his work was not simply (or even mainly) an attempt to solve a philosophical problem but rather an endeavor to ground his critique of political economy materialistically in an understanding of human-nature relations emanating from the natural science of his day.”

বাংলা অর্থ- “মার্ক্স তাঁর কাজে মেটাবলিজম শব্দটা ব্যবহার করেছেন শুধুমাত্র (অথবা প্রধানত) একটা দার্শনিক সমস্যার সমাধানের জন্যই নয় বরং অর্থশাস্ত্রের বস্তুবাদি বিচারের একটি ভিত্তি তৈরির জন্য যেন আজকের দুনিয়ার প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের উদ্ভুত মানুষ ও প্রকৃতি সম্পর্ককে বুঝা যায়।“

মার্ক্স ক্যাপিটালে “Metabolic Rift” (Karl Marx, Capital, vol. 3 (London: Penguin, 1981), 949.) শব্দটা ব্যবহার করেছেন মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্ক বিচারে (Paul Burkett, Marx and Nature (New York: St. Martin’s Press, 1999)। মার্ক্স উৎপাদন সম্পর্ক বিষয়টা প্রথমে লেখেন জার্মান ভাবাদর্শে, এরপরে “দর্শনের দারিদ্র” বইয়ে। আবার এই প্রসঙ্গ এসেছে “অর্থশাস্ত্র বিচারের ভুমিকা” বইয়ে এবং সর্বশেষে “ক্যাপিটাল” বইয়ের তৃতীয় খন্ডে ৪৮ অধ্যায়ে ও পরিশেষে “Wage Labour and Capital” নামক বইয়ে। অর্থশাস্ত্র বিচারের ভুমিকা বইয়ে উৎপাদন সম্পর্ক বিষয়টি উল্লেখ থাকলেও সুনির্দিষ্ট করে কিছু বলা ছিল না।

জার্মান ভাবাদর্শের ইংরেজি অনুবাদের সম্পাদক লিখছেন, “মার্কস ও এঙ্গেলস দেখিয়েছেন যে বস্তুগত বিনিময়- সম্পর্ক ও সর্বোপরি উৎপাদন প্রক্রিয়ায় মানুষের বিনিময়- সম্পর্কই প্রত্যেক অন্য আর সব বিনিময়- সম্পর্কের রূপের ভিত্তি গড়ে দেয়।Verkehrs-form’(বিনিময়- সম্পর্কের রূপ), ‘Verkehrs-weise’ (বিনিময়- সম্পর্কের ধরণ), “Verkehrs-verhaltnisse” (বিনিময়- সম্পর্কের পারস্পরিক সম্পর্ক বা শর্ত), এবং “Produktions-und Verkehrs-verhaltnisse” (উৎপাদন ও বিনিময় সম্পর্কেরপারস্পরিক সম্পর্ক বা শর্ত), এসব শব্দাবলীর যা ঐসময়কালে তাঁদের মাথায় দানা বাঁধছিল তা মার্কস ও এঙ্গেলসের হাতে জর্মান ভাবাদর্শে ব্যবহৃত হয়েছে ‘উৎপাদন সম্পর্কের ধারণা হিসাবে। পরবর্তীকালে মার্কসের রচনায় এসব ধারণা “উৎপাদন সম্পর্ক” শব্দ ব্যবহার করে রচিত হয়েছে।”

[ সম্পাদকের এই ভাষা উল্লেখের কারণ হল – “জার্মান ভাবাদর্শ” মার্ক্স ও এঙ্গেলসের জীবদ্দশায় প্রকাশিত হয়নি। যখন এই পুরনো পাণ্ডুলিপি উদ্ধার করা হয়েছিলো তার অনেকটাই পোকায় কেটে নষ্ট করেছিল। তাই সম্পাদকের ভুমিকা এখানে ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ]

দর্শনের দারিদ্র্যে উৎপাদন সম্পর্ক সম্পর্কে মার্ক্স লিখেছেন, “এম. প্রুধোর ন্যায় অর্থনীতিবিদ খুব ভাল করেই বোঝেন যে, উৎপাদনের নির্দিষ্ট সম্পর্কের মধ্যে মানুষ কাপড়-চোপড়, পাট বস্ত্র, শণ বস্ত্র কিম্বা রেশমি দ্রব্যসামগ্রী প্রস্তুত করে থাকে। কিন্তু যা তিনি বোঝেননি তা হলো এই যে, এই সব সুনির্দিষ্ট সামাজিক সম্পর্ক ঠিক যেমন মানুষের দ্বারা উৎপন্ন হয় তেমনিভাবে উৎপন্ন হয় পাট, শন, ইত্যাদির দ্বারাও। সামাজিক সম্পর্কগুলো উৎপাদিকা শক্তিসমূহের সীমানায় সীমাবদ্ধ। নতুন উৎপাদিকা শক্তি অর্জন করতে গিয়ে মানুষ তাদের উৎপাদন প্রনালী পরিবর্তন করে; এবং তাঁদের উৎপাদন প্রনালী পরিবর্তন করতে গিয়ে, তাঁদের জীবিকা অর্জনের পদ্ধতি পরিবর্তন করতে গিয়ে তারা তাঁদের তামাম সামাজিক সম্পর্ক পরিবর্তন করে থাকে।”

মার্ক্সের অর্থনৈতিক চিন্তাধারাঃ পুঁজিবাদী সমাজের গতিধারা উদঘাটন করেন মার্ক্স। তিনি দেখান কিভাবে  মূল্যতত্ত্বের সাথে উদ্বৃত্ত মূল্যের ব্যপারটা জড়িয়ে থাকে। এডাম স্মিথ ও  ডেভিড রিকার্ডো যে মূল্যের শ্রমতত্ত্ব আবিষ্কার করেন মার্ক্স তাকে আরও  কয়েক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যান এবং বিকশিত করেন।

‘তিনি দেখান যে পণ্য  (পুঁজিবাদী সমাজে পণ্য উৎপাদনই প্রধান। মার্ক্সের ‘পুঁজি’ গ্রন্থও তাই শুরু  হয়েছে পণ্যের আলোচনা দিয়েই) উৎপাদনে সামাজিক ভাবে যে আবশ্যক শ্রম-সময়ের  ব্যয় হয়েছে, তা দিয়েই তার মূল্যের নির্ধারণ হয়’। মার্ক্স তাঁর নিজস্ব সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারার আলোকে পুঁজিবাদী সমাজের  উৎপাদন ব্যবস্থার মৌলিক কিছু ত্রুটির কথা উল্লেখ করেছেন। এ বিষয়ে ‘উদ্বৃত্ত  মূল্যতত্ত্ব’ নামে তিনি একটি মৌলিক তত্ত্বের আবিষ্কার করেন। তিনি অন্যান্য  পণ্যের ন্যায় মানুষের শ্রম শক্তিকে একটি পণ্য বলে বিবেচনা করে বলেছেন যে,  অন্যান্য পণ্যের মত শ্রমেরও দ্বিবিধ মূল্য বিদ্যমান যা বিনিময় মূল্য এবং  ব্যবহারিক মূল্য বলে অভিয়িত করা যায়। শ্রম সংগ্রহ করার জন্য শ্রমিককে যে  মূল্য দেওয়া হয় তা বিনিময় মূল্য। কিন্তু শ্রমিকের শ্রমের ফলে সৃষ্ট  দ্রব্যাদি বাজারজাত করে যে মূল্য পুঁজিপতিরা অর্জন করে তা হলো শ্রমের  ব্যবহারিক মূল্য।

মার্ক্স এখানে দেখান যে, শ্রমের বিনিময় মূল্য অর্থাৎ  শ্রমিককে প্রদত্ত পারিশ্রমিকের চেয়ে শ্রমের ব্যবহারিক মূল্য সব সময় বেশী  থাকে। ব্যবহারিক মূল্যের এই উদ্বৃত্ত অংশকে তিনি ‘উদ্বৃত্ত মূল্য’ বলে  অভিয়িত করেছেন। বুর্জোয়া সমাজে একজন পুঁজিপতি উদ্বৃত্ত আহরণ করে মুনাফার মাধ্যমে।  ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসাবে একজন পুঁজিপতি উৎপাদনের উপকরণের মালিক হয়, এবং  তাই একজন শ্রমিক-কে, যে নাকি উৎপাদনের উপকরণ থেকে বিচ্ছিন্ন, তার শ্রমশক্তি  সেই পুঁজিপতির কাছে বিক্রি করতে হয় গ্রাসাচ্ছাদনের জন্যে। এর ফলে  সংশ্লিষ্ট পুঁজিপতি একাধারে হয়ে ওঠে উৎপাদনের উপকরণের মালিক, উৎপাদন  প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত সংশ্লিষ্ট শ্রমিকের শ্রমশক্তির মালিক, এমনকি উৎপাদিত  দ্রব্যেরও মালিক! শ্রম দিবসের একটা অংশের জন্য সেই শ্রমিক মজুরি পায়, আর  একটা অংশের জন্য পায় না। এই বিনা মজুরির অংশটাই উদ্বৃত্ত মূল্য সৃষ্টি  করে। মজুরি দিয়ে দেওয়ার পর ঐ পুঁজিপতি আগে বলা বিষয়ের সাথে সাথে  উদ্বৃত্ত মূল্যেরও মালিক হয়ে বসে। মালিকপক্ষ অনেক সময় শ্রমদিবস বাড়িয়ে  (extend) বা মজুরি কেটে উদ্বৃত্ত আহরণের চেষ্টা করে। অন্যান্য শ্রেণীবিভক্ত  সমাজেও সামাজিক উদ্বৃত্ত তৈরি হয় ঠিকই, কিন্তু একমাত্র পুঁজিবাদী সমাজেই  তা পুঁজির রূপ ধারণ করে। আবার পুঁজির সঞ্চয় আগেভাগেই ধরে নেয় উদ্বৃত্ত  মূল্যের সম্ভাবনা। ‘উদ্বৃত্ত মূল্য ধরে নেয় পুঁজিতন্ত্রী উৎপাদনের  উপস্থিতি এবং পুঁজিতন্ত্রী উৎপাদন পূর্বাহ্ণেই ধরে নেয় পণ্য-উৎপাদনকারীর  হাতে প্রচুর পরিমাণ পূঁজি ও শ্রমশক্তির অস্তিত্ব।’ মার্কস এই প্রক্রিয়াকে  বলেছেন “দুষ্টচক্রের নিয়ত আবর্তন” বা  “পুঁজিপতিদের চৌর্যবৃত্তির  মাধ্যমে অর্জিত মূল্য” বলে গণ্য করেছেন।

মার্ক্সের তত্ত্ব অনুসারে, মানব সমাজের প্রতিটি রাজনৈতিক অবস্থা তার  বিশেষ বিশেষ অর্থনৈতিক উৎপাদন ব্যবস্থার ফলশ্রুতি। অর্থাৎ, অর্থনৈতিক  উৎপাদনের মাধ্যমগুলো যখন যে শ্রেণীর হাতে সংরক্ষিত থাকে তখন সেই শ্রেণী  সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে প্রাধান্য লাভ করে এবং তদানুসারে সামাজিক ও  রাজনৈতিক জীবন ব্যবস্থার গতি প্রকৃতি নির্ধারিত হয়। এই উৎপাদন ব্যবস্থায়  মানব সমাজ পুঁজিপতি ও প্রলিতারিয়েত-এই দুই শ্রেণীতে বিভক্ত হয় এবং এদের  মধ্যে সংঘর্ষ দেখা দেয়।

তাঁর মতে, প্রচলিত সকল সমাজের ইতিহাস  শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাস। শ্রেণী সংগ্রাম সম্পর্কে তিনি বলেন, শিল্প  বিপ্লবের পর থেকে আধুনিক সমাজগুলো সুস্পষ্ট দুটি শ্রেণীতে বিভক্ত। একটি হলো  পুঁজিপতি শ্রেণী আর অন্যটি হলো প্রলিতারিয়েত বা শ্রমিক শ্রেণী।  পুঁজিপতিদের ক্রমাগত শোষণের ফলে প্রলিতারিয়েত বা শ্রমিক শ্রেণী তাদের দুঃখ ও  হতাশা সম্পর্কে যখন পুরোপুরি সচেতন হয়ে উঠবে তখন বিপ্লবের  সূচনা হবে এবং  আবহমান কাল ধরে যারা শ্রমিকদের শোষণ করে পুঁজিপতি হয়েছে তারা নিঃস্বত্ব হয়ে  যাবে। রাষ্ট্রের যাবতীয় ক্ষমতা যখন প্রলিতারিয়েত হাতে চলে আসবে তখন তারা  সে ক্ষমতাকে ব্যবহার করে তাদের মধ্যের বৈষম্য দূর করার চেষ্টা করবে।

এই প্রক্রিয়া থেকে আমরা অনুমান করতে পারি পুঁজির সঞ্চয় শুরু হওয়ার আগে  পুঁজির আদিম সঞ্চয়ের অস্তিত্ব। এই আদিম সঞ্চয় সম্পর্কেও মার্কস  যুগান্তকারী দিকনির্দেশক দিয়ে গেছেন। তিনি বলেছেন ‘উৎপাদনের উপায়সমুহ  থেকে উৎপাদক-কে সম্পূর্ণ ভাবে বিচ্ছিন্ন করার উপরেই’ আদিম সঞ্চয়ের  ব্যাপারটা প্রতিষ্ঠিত এবং ‘জমি থেকে কৃষক-কে উৎখাত’ ক’রে তাকে স্বাধীন  শ্রমিকে রূপান্তরিত করাই এর ভিত্তি। মার্ক্সীয় সমাজতন্ত্রের বিকাশের পথে প্রলেতারিয়েতদের একনায়কত্ব একটি  অন্তর্বর্তীকালীন অবস্থা মাত্র। মার্ক্সের সমাজতন্ত্রের মূল্য লক্ষ্য হলো  শ্রেণীহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। যখন সমাজ ব্যবস্থা থেকে সকল শ্রেণী বৈষম্য  দূর হবে তখন প্রলিতারিয়েত শ্রেণী তার শ্রেণী চরিত্র হারিয়ে ফেলবে এবং  রাষ্ট্রের আর কোন প্রয়োজন থাকবে না। শ্রেণীহীন সমাজ প্রতিষ্ঠিত হওয়ায়  মানুষের শাসনের জায়গায় প্রতিষ্ঠিত হবে বস্তুর শাসন এবং রাষ্ট্রহীন সমাজ  প্রতিষ্ঠিত হওয়া্য় মার্ক্সীয় দ্বন্দ্ববাদেরও অবসান ঘটবে। এখানে ব্যক্তি  যোগ্যতা অনুসারে সমাজকে দান করবে এবং প্রয়োজন অনুসারে ব্যক্তি পাবে  সমাজের  কাছ থেকে।

মার্ক্সের প্রাক-পুঁজিবাদী সমাজের বিচ্ছিন্নতাবাদের তত্ত্বঃ  উৎপাদনের উপকরণের উপর কর্তৃত্ব না থাকার  ফলে কিভাবে একজন শ্রমিক অনুৎপাদক শ্রেণীর জন্য শ্রম দিতে দিতে তার উৎপাদিত  দ্রব্য থেকে ও তার কাজ থেকে বিযুক্ত এবং বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তা প্রথম  আবিষ্কার করেন কার্ল মার্ক্স। তিনি লক্ষ করেন, এই বিযুক্তীর কারণে একজন  শ্রমিক তার মানবীয় সত্তা হারিয়ে ফেলে এবং বিস্মৃত হয় যে  পশুবৃত্তির—‘খাদ্যগ্রহণ, বংশবিস্তার, অথবা খুব বেশি হলে বাস এবং বেশভূষার’  ব্যাপার—বাইরেও তার একটা বিশেষ প্রজাতি-সত্তারয়েছে। অর্থাৎ সে তার নিজের  থেকেই নিজেকে বিচ্ছিন্ন ক’রে ফেলে। এর থেকে মার্ক্স সিদ্ধান্তে আসেন যে এই  তিন ধরণের বিচ্ছিন্নতার কারণে একজন শ্রমিক ক্রমশ বিযুক্ত হয়ে পড়ে  অন্যান্য মানুষের থেকে।

মার্ক্স লিখছেন— ‘মানুষ তার শ্রমের উৎপাদন হতে  বিচ্ছিন্ন, বিচ্ছিন্ন তার জীবন ক্রিয়া হতে; বিচ্ছিন্ন প্রজাতি সত্তা হতে –  এই সত্যতার প্রত্যক্ষ ফলাফল হচ্ছে মানুষের সঙ্গে অপর মানুষের বিচ্ছিন্নতা।  মানুষ যখন নিজের সম্মুখে দাঁড়ায়, তখন সে আসলে অন্য একটা মানুষের  মুখোমুখি দাঁড়ায়। এই কথাটাই খাটে মানুষের সঙ্গে তার সম্পর্কের ক্ষেত্রে।  একই কথা খাটে একটা মানুষের সঙ্গে অপর মানুষের সম্পর্কের বেলায়, সেই  মানুষের শ্রম ও শ্রমের বিষয়ের জায়গায়।’

শ্রমবিভাজনও বিচ্ছিন্নতার  একটা কারণ। এর প্রভাবে মানুষ তার সম্পূর্ণতাকে হারিয়ে ফেলে, একটা  নির্দিষ্ট বৃত্তির চক্রাবর্তে ঘুরতে থাকে এবং খণ্ডিত মানুষে পরিণত হয়।  উল্লেখ করা প্রয়োজন যে বিচ্ছিন্নতা শ্রেণীহীন সমাজ ছাড়া দূর হওয়া সম্ভব  নয়। কারণ একমাত্র সেখানেই উৎপাদনের উপকরণের সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠিত  হয় এবং শ্রম সংযুক্ত হয় জীবনের প্রাথমিক প্রয়োজন হিসাবে। আইন করে  ব্যক্তিগত সম্পত্তির বিলোপ বিচ্ছিন্নতা দূর করে না। কারণ শুকনো অর্থনৈতিক  সমাজবাদ মানব সংস্কৃতির জগতে, তাঁর মনে কোনো প্যারাডাইম শিফট-এর সম্ভাবনা  তৈরি করতে পারে না। পুঁজিবাদী সমাজে এই বিচ্ছিন্নতার প্রভাব সবচেয়ে তীব্র।  এসব ছাড়াও মার্ক্স যে শুধু সমাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক-অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা  করেছেন তাই নয়, বরং এর সাথে তিনি সমাজের ভিন্নতাকেও বুঝাতে অনেক  সাহায্য করেছেন।

‘গোথা কর্মসূচী’-র সমালোচনা করতে গিয়ে মার্ক্স  তুলে ধরেন যে পুঁজিবাদী  সমাজের গর্ভ থেকে জন্মলাভ করা কম্যুনিস্ট সমাজে। অর্থাৎ সমাজতন্ত্রের  প্রাথমিক পর্যায়ে বুর্জোয়া সমাজের অবশেষ রয়ে যাবে এবং সেটা  সমাজতন্ত্রের উচ্চ পর্যায়ের অবস্থা থেকে পৃথক হবে। এই নতুন সমাজের  প্রাথমিক অবস্থায় একজন মানুষ ব্যক্তিগতভাবে সমাজকে যতটা শ্রম দেবে, তার  মর্মে সে একটা প্রমাণপত্র পাবে। আর তা দিয়ে সে সমাজের ভোগ্যবস্তুর ভাঁড়ার  থেকে তার শ্রম মূল্যের সমপরিমাণ ভোগ্যবস্তু লাভ করবে। অর্থাৎ সে সমাজকে  যতটা দেবে, অন্যরূপে ঠিক ততোটাই ফেরত পাবে। কিন্তু কম্যুনিস্ট ব্যবস্থার  উচ্চ পর্যায়ে এই নিয়ম পরিবর্তিত হবে কেননা তখন শ্রম জীবনধারণের উপায়ের  বদলে জীবনের প্রাথমিক প্রয়োজন হয়ে দেখা দেবে, শ্রমবিভাগের জাঁতাকল থেকে  মানুষ মুক্ত হবে এবং দৈহিক আর মানসিক কাজের পারস্পরিক বৈপরীত্য আর থাকবে  না। এই নতুন ব্যবস্থায় প্রত্যেকে তার ক্ষমতা মতো শ্রম দেবে এবং তার  প্রয়োজন মতো দ্রব্য পাবে।

এরপরে ক্যাপিটালের তৃতীয় খন্ডে ৪৮ অধ্যায়ে মার্ক্স লিখেছেন, “ধনতান্ত্রিক উৎপাদন পদ্ধতি হচ্ছে সাধারণভাবে উৎপাদনের সামাজিক প্রক্রিয়ার একটি ঐতিহাসিক ভাবে নির্ধারিত রূপ। পরবর্তীটি যে পরিমাণে মানব জীবনের বস্তুগত অবস্থাবলির উৎপাদন – প্রক্রিয়া সেই পরিমাণে সেটি এমন একটি প্রক্রিয়া এমন একটি প্রক্রিয়া, যা ঘটে নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ও অর্থনৈতিক উৎপাদন সম্পর্কের অধীনে, উৎপাদন ও ও পুনরুৎপাদন করে খোদ এই উৎপাদন সম্পর্ক সমূহকে, এবং সেইসঙ্গে এই প্রক্রিয়ার বাহকগুলিকে, তাঁদের অস্তিত্বের বস্তুগত অবস্থাবলি ও পারস্পরিক সম্পর্ক সমূহকে, অর্থাৎ তাদের বিশেষ সামাজিক অর্থনৈতিক রূপটিকে। কেননা সম্পর্কসমূহের, এই যে সর্বমোট সমষ্টি, যার মধ্যে প্রকৃতিও ও পরস্পরের প্রতিপ্রেক্ষিতে এই উৎপাদন প্রতিনিধিবর্গ অবস্থান করে, এবং যার মধ্যে তারা উৎপাদন করে, তা-ই হচ্ছে সমাজ-যদি তাকে বিচার করা যায় তার অর্থনৈতিক কাঠামোর দৃষ্টিকোণ থেকে।”

কার্ল মার্ক্স তাঁর “মজুরী,শ্রম ও মুনাফা” বইয়ে “উৎপাদন সম্পর্ক” বিষয়ে তাঁর ধারণা ব্যাখ্যা করেছেন, “উৎপাদনের প্রক্রিয়ায় মানুষ শুধু প্রকৃতির ওপর কাজ করে না, তারা একে অন্যের ওপরও কাজ করে। তারা উৎপাদন করে কেবলমাত্র একটি নির্দিষ্ট কায়দায় ও নির্দিষ্ট প্রকারে পরস্পরের মধ্যে তাদের বিনিময় তৎপরতার মাধ্যমে একসঙ্গে কাজ করার ভেতর দিয়ে। উৎপাদনের জন্যে তারা একের সাথে অন্যে নির্দিষ্ট সংযোগ ও সম্পর্কের মধ্যে প্রবেশ করে এবং একমাত্র ঐ সামাজিক সংযোগ ও সম্পর্কই প্রকৃতির ওপর তাদের প্রভাব ফেলতে পারে অর্থাৎ উৎপাদন হতে পারে।”

উৎপাদন সম্পর্ক মানে যে প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক সেটা এখানে মার্ক্স স্পষ্ট করেছেন। মার্ক্সের মূল চিন্তার জন্য জার্মান ভাবাদর্শ খুব গুরুত্বপূর্ণ। জার্মান ভাবাদর্শ পড়লেই বুঝতে পারা যায় মার্ক্স “পুঁজি” তে তিনি কী লিখবেন। মার্কস মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্ক তাঁর কাছে জ্ঞানতাত্তিক সম্পর্ক না থেকে হয়ে উঠল ‘উৎপাদন সম্পর্ক’ : ভোগ, উৎপাদন, বিতরণ ও বিনিময়ের সম্পর্ক। মানুষ হয়ে উঠল উৎপাদন সম্পর্কের ঐতিহাসিক বিবর্তনের ফল। উৎপাদনের ইতিহাস হিয়ে উঠল মানুষের ইতিহাস। পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্ক হয়ে ওঠে পুজিতান্ত্রিক সম্পর্ক। মার্কসের কাছে ‘পুঁজি’ হচ্ছে এই সম্পর্কেরই সবচেয়ে বিকশিত ঐতিহাসিক রূপ এবং ইতিহাসের কর্তা। ইতিহাসে যখন কোন পুঁজির আবির্ভাব ঘটল, পুঁজির ইতিহাসই হয়ে উঠল মানুষের ইতিহাস।

মূল কথাঃ – অর্থশাস্ত্র যে আসলে মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্ক বিচার,তা মার্কস তাঁর ‘পুঁজি’ হতে ‘জার্মান ভাবাদর্শ’-এর ঐতিহাসিক সংকীর্নতা থেকে বেরিয়ে মানুষ ও প্রকৃতির বিচারের বিস্তৃত পরিসরে প্রবেশ করেছেন।  তাই আজ আমরা প্রতিযোগিতামূলক পুঁজিবাদের স্তর ডিঙিয়ে  সাম্রাজ্যবাদী  যুগের প্রথম এবং মাঝের স্তর পেরিয়ে এর শেষ স্তরে  দাঁড়িয়ে আছি।

তথ্যসুত্রঃ

  • (01) Manifesto of the Communist Party, Karl Marx and Friedrich Engels.
  • (02) Capital, Vol-1,2,3, Karl Marx.
  • (03) A Contribution to the Critique of Political Economy, Karl Marx.
  • (04) Economic and Philosophic Manuscripts of 1844, Karl Marx.
  • (05) Wage Labour and Capital, Karl Marx.
  • (06) Value, Price and Profit, Karl Marx.
  • (07) The Poverty of Philosophy, Karl Marx.
  • (08) Grundrissel , Karl Marx.
  • (09) Theories of Surplus Value, Vol-1,2,3, Karl Marx.
  • (10) The German Ideology, Karl Marx.
  • (11) Critique of the Gotha Program, Karl Marx.
  • (12) Marx and the Rift in the Universal Metabolism of Nature, John Bellamy Foster.
  • (13) Marx and Nature, Paul Burkett.

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন