মঙ্গলবার, ২ আগস্ট ২০২১; ৮:৩৪ পূর্বাহ্ণ


ক্ষমতার রাজনীতিতে গেম সাজাতে এ সরকারের জুড়ি নেই একথা সবাই জানেন এবং মানেন। তবে এ গেম ক্ষমতাসীনকে ক্ষমতায় রাখতে কার্যকর হলেও এর সামাজিক খরচ অনেক বেশি। অহেতুক মানুষে মানুষে শত্রুতা, হিংসা, বিদ্বেষ, বর্ণবাদ ইত্যাদিই যেন শেষ বিচারে এ ধরণের ম্যাকিয়াভেলিন সরকারব্যবস্থার অস্ত্র।

এই যেমন বাংলাদেশে এখন করোনা ভাইরাস কমিউনিটি পর্যায়ে ট্রান্সমিশন হয়ে গিয়েছে। তার মানে এখন সমাজের অন্তর্নিহিত শক্তিতেই করোনা বিস্তার লাভ করবে। এর জন্য এখন দরকার হচ্ছে জোরজবরদস্তিমূলক ক্ষমতা যার মাধ্যমে মানুষকে ঘরে ঢুকাতে বাধ্য করা হচ্ছে। তার চেয়ে বড় বিষয় যতোটা না ঘরে ঢুকানো তার চেয়ে একটা অর্থনৈতিক শাট ডাউন হয়েছে।

আর এর জন্য বলির পাঠা বানানো হচ্ছে কেন প্রবাসী বাংলাদেশীদের। সরকার এবং দেশে থাকা নাগরিক ও সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারীদের কর্মকাণ্ড দেখে মনে হচ্ছে বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার একমাত্র কারণ প্রবাসীরা৷

এমন একটা ভাব যেন প্রবাসীদের মাধ্যমেই দেশে করোনার আমদানি হয়েছে। কিছুদিন পূর্বে সরকারের “মাদকের বিরুদ্ধে চলো যাই যুদ্ধে” অভিযানের সময় যেভাবে মাদক ব্যবসায়ীর বাড়ি বাড়ি গিয়ে লাল পতাকা ও দেয়ালে পুলিশ ও যৌথ প্রশাসন লিখে এসেছিল ঠিক সেভাবেই এখন প্রবাসীদের বাড়িতেও লাল পতাকা টাঙ্গিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

তাছাড়া সরকারের এক মন্ত্রী কিছুদিন পূর্বে সংবাদমাধ্যমেই মন্তব্য করেছেন – “প্রবাসীরা দেশে আসলে নবাবজাদা হয়ে যায়।” মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও বিভিন্ন সময় মিডিয়ায় প্রবাসীদের বাড়ি থেকে বের না হওয়ার জন্য নির্দেশনা দিয়েছেন।

প্রবাসী বাংলাদেশী যাদের রেমিটেন্সের উপর ভর করে বাংলাদেশের অর্থনীতি টিকে আছে, যাদের সরকার রেমিটেন্স যোদ্ধা বলে সবসময় আখ্যা দেয় তারা যদিও কখনোই বাংলাদেশের বিমানবন্দরে, বিমানবালাদের কাছে, বিদেশে বাংলাদেশ হাইকমিশনের কাছে নূন্যতম সম্মানটুকু পায়নি তাদের প্রতি সরকার হঠাৎ করে এতোটা কঠোর কেনো হচ্ছে? এর পেছনে কি প্রবাসীরা দেশে করোনা নিয়ে এসেছেন তাই একমাত্র কারণ?

কিন্তু আমরা বিভিন্ন সূত্রে জেনেছি কেবল প্রবাসী বাংলাদেশীরাই নন পর্যটন, ব্যবসা ও বিভিন্ন কাজের সূত্রে যারা গত কয়েক মাসে বিদেশ ভ্রমণ করেছেন তাদের মধ্য থেকেও করোনা বিস্তারের ঘটনা ঘটেছে। তাহলে সমস্যা কি প্রবাসী শ্রমিক নাকি অন্য কোথাও?

গত বছরের শেষের দিকে চীনের উহান প্রদেশে যখন প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ দেখা দেয় তখন সেখান থেকে বিশেষ বিমানে করে বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের দেশে ফেরত নিয়ে আসা হয়। তখন তাদেরকে বিমানবন্দরের পাশে আশকোনায় হজ্জ ক্যাম্পে নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষার পর বাড়ি পাঠানো হয়।

তার পর কেটে গেছে প্রায় তিন মাস। বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে করোনার ভয়াবহতা বাড়তেই থাকে। কিন্তু ঢাকা এয়ারপোর্টে কেবল চীনা যাত্রী ও চীন থেকে ফেরত আসা যাত্রীদেরই নামকা ওয়াস্তে চেকআপ করা হয়। তখন অবশ্য চীনা রাষ্ট্রদূত জোর দিয়ে বলেছিলেন যাতে সব যাত্রীকেই পরীক্ষা নিরীক্ষার আওতায় নিয়ে আসা হয়, কেবল চীনফেরতদের নয় কেননা তখন করোনা বিশ্বের প্রধানতম শহরগুলোতেও হানা দিয়ে ফেলেছে।

কিন্তু সরকার বিষয়টিকে পাত্তা দিয়েছে বলে তার কর্মকান্ডে প্রমাণ দেয়নি। একটা সময় পুরো বিষয়টি এয়ারপোর্ট কর্তৃপক্ষের কাছে গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে। স্বাস্থ্য পরীক্ষার নামে যাত্রী হয়রানি, ৫০০ টাকা দিয়ে করোনা নেই এমন সার্টিফিকেট ইস্যু করা এমন সব গতানুগতিক ধারায়ই পরিচালিত হতে থাকে দেশের প্রধান বিমানবন্দর।

অন্যদিকে সরকারের ব্যস্ততা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী পালন নিয়ে। দুঃখজনক হলেও সত্য নানান প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে অনুষ্ঠানের পরিসর সংক্ষিপ্ত করে নিয়ে আসলেও ১৭ মার্চ জন্মবার্ষিকী উদযাপনের লগ্ন পর্যন্ত সরকারের কোন বিভাগই বিষয়টিকে গুরুত্ব সহকারে নেয়নি। বরং সরকারীভাবে সঙ্গনিরোধ নীতির প্রচার করা হলেও সরকারীভাবেই জনসমাগম, কনসার্ট ইত্যাদির আয়োজন করা হয়। অবাক বিস্ময়ে এদেশের সচেতন মানুষ প্রত্যক্ষ করে সরকার ও সরকার সমর্থকদের অবিবেচক কর্মকান্ড।

শুধু তাই নয়, এর পর গত ২১ মার্চ, ২০২০ সালে অনুষ্ঠিত হয় সংসদীয় আসনে উপনির্বাচন যখন ইতিমধ্যেই অফিসিয়ালি ২ জন করোনায় মৃত্যুবরণ করে। প্রধানমন্ত্রীর সহাস্য বদনে প্রার্থী ও অন্যান্য সঙ্গীসহ নির্বাচনে ভোটদানের ছবি যখন পত্রিকায় প্রকাশিত হয় এর মধ্যেই প্রথম আলো হেডলাইন করে দেশে করোনা টেস্টের জন্য রয়েছে মাত্র ১৭০০ টি টেস্টিং কিট যে সময়ের ভেতরে পাকিস্তান প্রায় ১৫০০০ টেস্ট করে ফেলেছে।

অন্যদিকে এয়ারপোর্টের ব্যবস্থাপনার সংকটের মধ্য দিয়ে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে বিদেশফেরত লোকজন। উপায় বুদ্ধি না পেয়ে সরকার তখন বাড়ি বাড়ি গিয়ে তদারকি শুরু করে। কিন্তু যে কাজটি এয়ারপোর্টেই করা সম্ভব ছিল সেটা না করে সারাদেশ নিয়ন্ত্রণ করতে যাওয়া যে কি কঠিন ও অবাস্তব তা সাধারণ বুদ্ধিতেই অনুমান করা যায়।

তারপরও অনেক সময় গড়িয়ে গেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ কিভাবে পরিস্থিতি মোকাবেলা করছে তা থেকেও কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট বার্তা পেয়েছে কিন্তু সরকারের টনক নড়েনি। বরং করোনা টেস্টিং এর জন্য তদবির করেও টেস্ট করাতে পারেনি অনেক আক্রান্ত রোগী।

এই যখন দেশের অবস্থা তখন সরকার নিজেদের ব্যার্থতা ঢাকার জন্যই এই কুসংস্করাচ্ছন্ন জনমতকে প্রবাসী ঘৃণার দিকে উস্কে দিচ্ছে। কিন্তু সরকারের বিমানবন্দরে ব্যার্থতার দায় প্রবাসীরা কেনো নেবে? দেশের হাসপাতালগুলো প্রস্তুত নয়, ডাক্তার-নার্সদের সরঞ্জাম পর্যাপ্ত নয়, টেস্টিং কিট পর্যাপ্ত নয়, বাজারদাম আকাশচুম্বী এগুলোর সব দায় তো কেবল প্রবাসীদের!

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন