মঙ্গলবার, ২ আগস্ট ২০২১; ১২:০৪ পূর্বাহ্ণ


Yuval Noah Harari

এই ঝড় চলে যাবে। তবে আমরা যে পথে এগুবো সেটাই ঠিক করে দেবে সামনের বছরগুলোতে আমাদের জীবন কেমন হবে।

মানব জাতি এখন একটি বৈশ্বিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সম্ভবত আমাদের প্রজন্মের সবচেয়ে বড় সংকট। মানুষ ও সরকারগুলো পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে যে সিদ্ধান্ত নেবে সেটাই হয়ত সামনের বছরগুলোতে পৃথিবীর গতিপথ ঠিক করবে। সেগুলো শুধু যে আমাদের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে গঠন করবে তা নয় বরং অর্থনীতি, রাজনীতি ও সংস্কৃতিকেও রূপদান করবে। আমাদের অবশ্যই দ্রুত ও স্পষ্টভাবে কাজ করতে হবে। আমাদের উচিত হবে আমাদের কাজের দীর্ঘমেয়াদী ফলাফলকে আমলে নেওয়া। আমরা যখন বিকল্প ঠিক করতে যাব তখন আমাদের নিজেদেরকে শুধু এটা জিজ্ঞাসা করলেই হবে না যে আমরা কীভাবে এই অত্যাসন্ন হুমকি মোকাবিলা করবো, বরং এই ঝড় চলে যাওয়ার পর আমরা কী ধরনের পৃথিবীতে বাস করবো সেটাও ভাবতে হবে। হ্যাঁ, ঝড় চলে যাবে, মানব জাতি টিকে থাকবে, আমরা অধিকাংশই বেঁচেবর্তে থাকবো — কিন্তু আমরা এক ভিন্ন পৃথিবীতে বাস করবো।

অনেক স্বল্পমেয়াদী জরুরী ব্যবস্থা আমাদের জীবনের একটি নিয়মে পরিণত হবে। জরুরী অবস্থার ধরনটাই এমন। তারা ঐতিহাসিক প্রক্রিয়াগুলোকে দ্রুত সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়। স্বাভাবিক সময়ে যেসব সিদ্ধান্ত কয়েক বছরের অনুধ্যান শেষে গৃহীত হয় তা কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে নেওয়া হয়। অপরিপক্ব ও এমনকি বিপজ্জনক প্রযুক্তিগুলোকে ত্বরিৎ গতিতে কাজে নামানো হয় কারণ হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকার বিপদ আরো ভয়ানক। সমগ্র দেশই বৃহৎ সামাজিক নিরীক্ষার গিনিপিগ হিসেবে পরিগণিত হয়। যখন সবাই বাসায় বসে কাজ করে এবং একটা দূরত্ব বজায় রেখে যোগাযোগ করে তখন কী ঘটে? স্বাভাবিক সময়ে সরকার, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষা বোর্ডগুলো কখনোই এমন নিরীক্ষা চালাতে সম্মত হবে না। কিন্তু এখন স্বাভাবিক সময় নয়।

সংকটের সময় আমরা বিশেষত দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্পের সম্মুখীন হই। প্রথমটি হচ্ছে সর্বগ্রাসী নজরদারি বনাম নাগরিক ক্ষমতায়ন। দ্বিতীয়টি হচ্ছে জাতীয়তাবাদী বিচ্ছিন্নতা বনাম বৈশ্বিক একাত্মতা।

কঠোর নজরদারি

এই মহামারী থামানোর জন্য সমগ্র জনগোষ্ঠীর বিশেষ নির্দেশনাসমূহ মেনে চলার দরকার হয়। এটা অর্জন করার দুটো প্রধান পন্থা আছে। একটি পদ্ধতি হচ্ছে যেখানে সরকার জনগণকে তদারকি করবে এবং যারা নিয়ম ভঙ্গ করবে তাদেরকে সাজা দেবে। আজ মানব ইতিহাসে প্রথমবারের মত প্রযুক্তির মাধ্যমে সবাইকে একই সময়ে তদারকি করা সম্ভব। পঞ্চাশ বছর আগে কেজিবি ২৪ কোটি সোভিয়েত নাগরিককে ২৪ ঘণ্টা অনুসরণ করতে পারতো না, এবং সংগৃহীত তথ্যকে কার্যকরভাবে প্রক্রিয়াকরণ করার আশাও করতো না কেজিবি। কেজিবি নির্ভর করতো মনুষ্য প্রতিনিধি ও বিশ্লেষকদের উপর, এবং তাদের পক্ষে প্রত্যেক নাগরিককে অনুসরণ করার জন্য কেবল একজন মানব প্রতিনিধিকে নিয়োজিত করা সম্ভব হতো না। তবে এখন সরকার রক্ত-মাংসের গুপ্তচরদের পরিবর্তে সর্বব্যাপী সেন্সর ও ক্ষমতাশালী এলগরিদমের উপর ভরসা করতে পারে।

করোনা ভাইরাস প্রাদুর্ভাবের বিরুদ্ধে লড়াই কিছু সরকার ইতোমধ্যে নজরদারির নতুন যন্ত্র নিয়োগ করেছে। সবচেয়ে লক্ষণীয় ঘটনাটি ঘটেছে চীনে। মানুষের স্মার্টফোনকে খুব নিবিড়ভাবে তদারকি করার মাধ্যমে, কয়েক লক্ষ মুখমণ্ডল-নির্ধারক ক্যামেরা ব্যবহার করার মাধ্যমে এবং মানুষের শরীরের তাপমাত্রা ও চিকিৎসার অবস্থা চেক করতে ও রিপোর্ট করতে বাধ্য করার মাধ্যমে চীনা কর্তৃপক্ষ শুধু  সন্দেহভাজন করোনা ভাইরাস বাহককে শনাক্ত করতেই সক্ষম হয়নি, বরং তাদের চলাচলকে অনুসরণ করতে পেরেছে এবং যারা তাদের সংস্পর্শে এসেছে তাদেরকেও চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছে। একগুচ্ছ মোবাইল অ্যাপ নাগরিকদেরকে তাদের সন্নিকটে থাকা সংক্রমিত রোগীদের ব্যাপারে সতর্ক করে দেয়।

এ ধরনের অ্যাপগুলো পূর্ব এশিয়াতে সীমাবদ্ধ নয়। স্বাভাবিক সময়ে সন্ত্রাসীদের মোকাবিলা করার জন্য বরাদ্দকৃত নজরদারির প্রযুক্তিকে করোনা ভাইরাস রোগীদের অনুসরণ করার জন্য নিয়োগের ব্যাপারে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু সম্প্রতি ইসরায়েলি নিরাপত্তা সংস্থাকে অনুমোদন দিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট সংসদীয় সাব-কমিটি যখন ব্যবস্থাটি অনুমোদন করতে অস্বীকৃতি জানালো তখন নেতানিয়াহু একটি “জরুরী ঘোষণা”র মাধ্যমে একে কার্যকর করলেন। আপনি হয়ত বলবেন এসব তো নতুন কিছু নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরকার ও কর্পোরেশন উভয়ই জনগণকে অনুসরণ, নজরদারি ও নিপুণভাবে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য অধিকতর জটিল প্রযুক্তি ব্যবহার করে আসছে। আমরা যদি সাবধান না হই,  তারপরেও এই মহামারী হয়ত নজরদারির ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ হয়ে থাকবে। যেসব দেশ এ পর্যন্ত গণ-নজরদারির যন্ত্রগুলোকে প্রত্যাখ্যান করেছে সেসব দেশেও এর নিয়োগকে শুধু স্বাভাবিক করে তুলবে তা নয়, বরং এর চেয়েও বেশি কিছু করবে কারণ এটা “চামড়ার উপর” থেকে “চামড়ার ভেতরে”র নজরদারির নাটকীয় স্থানান্তরকে তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে।

আগে আপনি যখন আঙ্গুল দিয়ে আপনার স্মার্টফোনের স্ক্রিন স্পর্শ করতেন ও একটি লিংকে ক্লিক করতেন, তখন আপনার আঙ্গুল কীসে ক্লিক করছে তা সরকার জানতে চাইতো। তবে করোনা ভাইরাসের কারণে আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু অন্যত্র সরে গেছে। এখন সরকার আপনার আঙ্গুলের তাপমাত্রা ও আঙ্গুলের চামড়ার ভেতরের রক্তচাপ জানতে চায়। 

জরুরী অবস্থার পুডিং

নজরদারির বিষয়ে আমাদের অবস্থানকে বুঝতে গেলে আমরা অন্যতম যে সমস্যার মুখোমুখি হই তা হচ্ছে আমরা কেউই জানি না কীভাবে আমরা নজরদারির শিকার হচ্ছি এবং সামনের বছরগুলো কী বয়ে আসবে। নজরদারির প্রযুক্তি অদম্য গতিতে বিকশিত হচ্ছে এবং দশ বছর আগে যা বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী মনে হতো সেটাই আজ পুরনো খবর। চিন্তার খোরাক হিসেবে এমন একটি সরকার চিন্তা করুন যারা প্রত্যেক নাগরিককে একটি বায়োমেট্রিক ব্রেসলেট পরার কথা বলে, যার মাধ্যমে দিনে ২৪ ঘণ্টা শরীরের তাপমাত্রা ও হৃদকম্পন তদারকি করা যায়। সরকারি এলগরিদমের মাধ্যমে ফলাফলের উপাত্ত জড়ো করা হয় ও বিশ্লেষণ করা হয়। আপনি যে অসুস্থ তা আপনার জানার পূর্বেই এলগরিদম জেনে নেবে এবং আপনি কোথায় গিয়েছেন ও কার সাথে দেখা করেছেন তাও জানবে। সংক্রমণের শৃঙ্খল নাটকীয়ভাবে ছোট হয়ে আসবে এবং এমনকি সবমিলিয়ে তা ছিন্ন হবে। এমন একটি সিস্টেম অগ্রসরমান মহামারীকে কয়েক দিনের মধ্যে থামিয়ে দিতে পারে। দারুণ শোনাচ্ছে, তাই না?

অবশ্যই ক্ষতিকর দিকটি হচ্ছে যে এর ফলে একটি ভীতিকর নতুন নজরদারি ব্যবস্থাকে মান্যতা দেওয়া হবে। উদাহরণস্বরূপ, আপনি যদি জানেন যে আমি সিএনএন-এর একটি লিংকে ক্লিক করার বদলে ফক্স নিউজের একটি লিংকে ক্লিক করেছি তাহলে এটা আমার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং সম্ভবত আমার ব্যক্তিত্ব সম্বন্ধেও আপনাকে কিছু ধারণা ধারণা দেবে। তবে ভিডিও ক্লিপ দেখার সময় আপনি যদি আমার শরীরের তাপমাত্রা, রক্তচাপ ও হৃদকম্পনের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে পারেন তাহলে আপনি জানতে পারবেন কোন জিনিসটা আমাকে হাসায়, কোনটা কাঁদায় এবং কোনটা আমাকে সত্যি সত্যি খুব রাগিয়ে তোলে।

এটা স্মরণে রাখা দরকার যে আপনার রাগ, আনন্দ, বিষণ্ণতা ও ভালোবাসা হচ্ছে জ্বর ও কাশির মতই  জৈবিক প্রপঞ্চ। যে প্রযুক্তি কাশিকে চিহ্নিত করতে পারে তা হাসিকেও চিহ্নিত করতে পারে। কর্পোরেশন ও সরকার যদি গণহারে আমাদের বায়োমেট্রিক উপাত্তকে সংগ্রহ করতে আরম্ভ করে তাহলে আমাদের নিজেদের চাইতে তারা আমাদেরকে অনেক ভালো করে চিনবে, এবং তারা শুধু আমাদের অনুভূতিগুলোকে অনুমান করতে পারবে তা নয় বরং আমাদের অনুভূতিগুলোকে সুনিপুণভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে এবং তাদের ইচ্ছামত যেকোনো কিছু আমাদের কাছে বিক্রি করতে পারবে — হোক তা একটি পণ্য কিংবা একজন রাজনীতিবিদ। বায়োমেট্রিক নজরদারির কল্যাণে কেমব্রিজ এনালিটিকার ডেটা হ্যাকিং কৌশলকে প্রস্তর যুগের ব্যাপার মনে হয়। ২০৩০ সালের উত্তর কোরিয়াকে কল্পনা করুন, যেখানে প্রত্যেক নাগরিককে ২৪ ঘণ্টা বায়োমেট্রিক ব্রেসলেট পরতে হয়। আপনি যদি গ্রেট লিডারের কোনো ভাষণ শোনেন এবং ব্রেসলেটটি ক্ষোভের প্রকাশ্য লক্ষণকে উসকে দেয়, তাহলে আপনি শেষ।

আপনি অবশ্যই বায়োমেট্রিক নজরদারির বিষয়টিকে জরুরী অবস্থার সময়ে একটি অস্থায়ী ব্যবস্থা হিসেবে গণ্য করতে পারেন। জরুরী অবস্থা যখন থাকবে না তখন সেটা চলে যাবে। কিন্তু অস্থায়ী ব্যবস্থাগুলোর একটি বাজে অভ্যাস হচ্ছে এগুলো জরুরী অবস্থাকে ছাপিয়ে যায়, বিশেষ করে যখন একটি নতুন জরুরী অবস্থা দিগন্তে উঁকি দিচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আমার জন্মভূমি ইসরায়েল ১৯৪৮ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে জরুরী অবস্থা ঘোষণা করেছিলো, যেটা সংবাদপত্রের সেন্সরশিপ ও ভূমি বাজেয়াপ্তকরণ থেকে শুরু করে পুডিং বানানোর বিশেষ বিধি (আমি মজা করছি না) পর্যন্ত একগুচ্ছ অস্থায়ী ব্যবস্থাকে বৈধতা দিয়েছিলো। স্বাধীনতা যুদ্ধ অনেক আগেই জেতা হয়ে গেছে, কিন্তু ইসরায়েল কখনো জরুরী অবস্থার সমাপ্তি ঘোষণা করেনি এবং ১৯৪৮ সালের অনেক “অস্থায়ী” ব্যবস্থাকে বিলুপ্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে (জরুরী পুডিং-এর আদেশটি দয়াপরবশ হয়ে ২০১১ সালে বিলুপ্ত করা হয়েছে)।

করোনা ভাইরাস থেকে সংক্রমণ যখন শূন্যের কাছাকাছি থাকবে, তখনও ডেটা-বুভুক্ষু কিছু সরকার বলতে পারে যে তাদের বায়োমেট্রিক নজরদারি ব্যবস্থাগুলো জারি রাখা দরকার কারণ তারা করোনা ভাইরাসের পুনরাগমনের ভয়ে ভীত কিংবা মধ্য আফ্রিকাতে ইবোলার একটি নতুন স্ট্রেইন বিবর্তিত হচ্ছে কিংবা… বুঝতেই পারছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমাদের গোপনীয়তার উপর একটি বড় যুদ্ধ চালানো হচ্ছে। করোনা ভাইরাস সংকট হতে পারে যুদ্ধের শীর্ষ স্থান। মানুষকে যদি স্বাস্থ্য ও গোপনীয়তার মধ্যে একটিকে বেছে নিতে বলা হয় তাহলে তারা সাধারণত স্বাস্থ্যকে বেছে নেবে। 

সাবান পুলিশ

আদতে সমস্যার গোঁড়া হচ্ছে মানুষকে গোপনীয়তা ও স্বাস্থ্যের মধ্যে একটিকে বেছে নিতে বলা। কারণ এটি একটি মেকি সিদ্ধান্ত। আমরা গোপনীয়তা ও স্বাস্থ্য দুটোই পেতে পারি এবং আমাদের তা পাওয়া উচিত। সর্বগ্রাসী নজরদারি সরকার পত্তনের মাধ্যমে নয়, বরঞ্চ নাগরিকদের ক্ষমতায়ন করার মাধ্যমে আমরা আমাদের স্বাস্থ্য রক্ষা করতে পারি ও করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বন্ধ করতে পারি। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে করোনা ভাইরাস প্রাদুর্ভাব রুখতে সবচেয়ে সফল প্রচেষ্টাগুলোর কয়েকটি দেখা গেছে দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান ও সিঙ্গাপুরে। এসব দেশ যখন ট্র্যাকিং অ্যাপগুলোর কিছু ব্যবহার নিশ্চিত করেছে, তখন তারা অনেক বেশি নির্ভর করেছে সম্প্রসারিত পরীক্ষণের উপর, সৎ রিপোর্টিং এর উপর, এবং ওয়াকিবহাল জনগণের আন্তরিক সহযোগিতার উপর। 

মানুষকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা মেনে চলতে বাধ্য করার জন্য কেন্দ্রীভূত পর্যবেক্ষণ ও কঠোর শাস্তিই একমাত্র পথ নয়। মানুষকে যখন বৈজ্ঞানিক তথ্য জানানো হয় এবং যখন এসব তথ্য তাদেরকে জানানোর জন্য মানুষ সরকারি কর্তৃপক্ষের উপর আস্থা রাখে তখন নাগরিকরা তাদের কাঁধের উপর ছড়ি ঘোরাতে থাকা বড় ভাইকে ছাড়াই সঠিক কাজটি করতে পারে। স্বপ্রণোদিত ও অবগত জনসাধারণ সচরাচর সংস্কারাচ্ছন্ন, অজ্ঞ জনসাধারণের চেয়ে অনেক বেশি ক্ষমতাশালী ও কার্যকরী। 

উদাহরণস্বরূপ, সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার কথাই ভাবুন। এটি মানুষের স্বাস্থ্যবিধিতে সবচেয়ে বড় অগ্রগতির মধ্যে একটি। এই সাধারণ কাজটি প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন বাঁচায়। আমরা যখন একে মুফতে ধরে নেই, বিজ্ঞানীরা কেবল ১৯ শতকে সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার গুরুত্ব আবিষ্কার করেছিলেন। আগে ডাক্তার ও নার্সরাও তাদের হাত না ধুয়েই এক সার্জিক্যাল অপারেশন থেকে অন্যটিতে অগ্রসর হতেন। এখন কোটি কোটি মানুষ প্রতিদিন নিজেদের হাত ধৌত করে, সাবান পুলিশের ভয়ে নয়, বরং তারা সত্যটা জানে। আমি সাবান দিয়ে আমার হাত ধুই কারণ আমি ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার কথা শুনেছি, আমি বুঝি যে এই ক্ষুদ্র প্রাণীগুলো রোগ ছড়ায়, আর আমি জানি যে সাবান এদেরকে ধ্বংস করতে পারে।

কিন্তু এমন পর্যায়ে প্রতিপালন ও সহযোগিতা অর্জনের জন্য আপনার ভরসা থাকা দরকার। মানুষের বিজ্ঞানের প্রতি আস্থা রাখা দরকার, সরকারি কর্তৃপক্ষের প্রতি আস্থা রাখা দরকার, এবং মিডিয়ার প্রতি আস্থা রাখা দরকার। বিগত কয়েক বছরে দায়িত্বজ্ঞানহীন রাজনীতিবিদরা ইচ্ছাকৃতভাবে বিজ্ঞানের প্রতি, সরকারি কর্তৃপক্ষের প্রতি ও মিডিয়ার প্রতি আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছেন। জনগণ যে সঠিক কাজটিই করবে সেটা আপনি বিশ্বাস করতে পারেন না, এই যুক্তি দিয়ে এখন একই দায়িত্বজ্ঞানহীন রাজনীতিবিদরা হয়ত কর্তৃত্ববাদের পথে যাওয়ার জন্য প্ররোচিত হতে পারেন।        

স্বাভাবিকভাবে বহু বছর ধরে যে আস্থার ক্ষয় হয়েছে তা রাতারাতি পুনর্গঠিত হবে না। তবে এটা স্বাভাবিক সময় নয়। সংকট মুহূর্তে খুব দ্রুত মনের পরিবর্তন হতে পারে। আপনার ভাই-বোনের সাথে আপনার কয়েক বছর ধরে তিক্ত তর্কাতর্কি হতে পারে, কিন্তু যখন জরুরী অবস্থা উদ্ভূত হয় তখন আপনি আচমকাই ভরসা ও সৌহার্দ্যের একটি গুপ্ত আধার খুঁজে পান এবং আপনারা একে অপরের সাহায্যে ছুটে যান। একটি নজরদারির সরকার গড়ে তোলার পরিবর্তে বিজ্ঞানের প্রতি, সরকারি কর্তৃপক্ষের প্রতি ও মিডিয়ার প্রতি জনগণের আস্থা পুনরায় গড়ে তোলার জন্য এটা খুব বেশি বিলম্ব হয়ে যায় না। আমাদের অবশ্যই নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার করা উচিত, এসব প্রযুক্তির উচিত নাগরিকদের ক্ষমতায়ন করা। আমি আমার শরীরের তাপমাত্রা ও রক্তচাপ তদারকির অধীনে রাখার পক্ষপাতী কিন্তু একটি সর্বশক্তিশালী সরকার তৈরি করার কাজে সেই উপাত্ত ব্যবহার করা উচিত নয়। বরং আমাকে আরো বেশি জ্ঞাত ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যাপারে এবং সরকারকে তার সিদ্ধান্তসমূহের জন্য জবাবদিহি করতে সেই উপাত্ত ব্যবহার করা উচিত।

আমি যদি দিনে ২৪ ঘণ্টা আমার নিজের চিকিৎসার অবস্থা অনুসরণ করতে পারি তাহলে আমি অন্যদের জন্য স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছি কিনা শুধু তাই নয় বরং আমার স্বাস্থ্যে কোন কোন অভ্যাসগুলোর অবদান আছে তা জানতে পারব। আর আমি যদি করোনা ভাইরাস বিস্তারের নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান অধিগত করতে পারি ও বিশ্লেষণ করতে পারি, তাহলে সরকার আমাকে সত্য বলছে কিনা এবং তারা মহামারীর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য সঠিক নীতিমালা গ্রহণ করেছে কিনা তা আমি বিচার করতে সক্ষম হব। মানুষ যখন নজরদারি নিয়ে কথা বলবে তখন মনে রাখবেন একই নজরদারির প্রযুক্তি  সাধারণত কেবল সরকার দ্বারা ব্যক্তিবিশেষের পর্যবেক্ষণের জন্য ব্যবহৃত হয় না — বরং ব্যক্তিবিশেষের দ্বারা সরকারকে পর্যবেক্ষণের জন্যও ব্যবহৃত হয়।

করোনা ভাইরাস মহামারী তাই নাগরিকত্বের একটি বড় পরীক্ষা। সামনের দিনগুলোতে আমাদের প্রত্যেকের উচিত হবে অপ্রতিষ্ঠিত ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ও ধান্দাবাজ রাজনীতিকদের বদলে বৈজ্ঞানিক উপাত্ত ও স্বাস্থ্যসেবা বিশেষজ্ঞদের প্রতি ভরসা রাখা। আমরা যদি সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হই তাহলে আমরা আমাদের সর্বাধিক মূল্যবান স্বাধীনতাকে হয়ত হারিয়ে ফেলবো, আর ভাববো যে এটাই আমাদের স্বাস্থ্য রক্ষার একমাত্র পথ।

আমাদের প্রয়োজন একটি বৈশ্বিক পরিকল্পনা

আমরা দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ যে বিকল্পের মুখোমুখি হয়েছি সেটা হচ্ছে জাতীয়তাবাদী বিচ্ছিন্নতা বনাম বৈশ্বিক সংহতি। খোদ মহামারী ও উদ্ভূত অর্থনৈতিক সংকট উভয়ই বৈশ্বিক সমস্যা। একমাত্র বৈশ্বিক সহযোগিতার দ্বারা এগুলো কার্যকরভাবে সমাধান করা যায়।

প্রথমত ও প্রধানত, ভাইরাসকে পরাজিত করতে হলে বিশ্বব্যাপী আমাদের তথ্য আদান-প্রদান করতে হবে। এটিই ভাইরাসের তুলনায় মানুষের বড় সুবিধা। মানুষকে কীভাবে সংক্রমিত করবে সে ব্যাপারে চীনের করোনা ভাইরাস ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের করোনা ভাইরাস কৌশল অদল-বদল করতে পারে না। তবে করোনা ভাইরাসের ব্যাপারে চীন যুক্তরাষ্ট্রকে অনেক মূল্যবান জিনিস ও কীভাবে একে মোকাবিলা করতে হয় সে ব্যাপারে শেখাতে পারে। একজন ইতালীয় ডাক্তার মিলানে সকাল সকাল যা আবিষ্কার করলেন সেটা হয়ত বিকেলের মধ্যে তেহরানে কয়েকজনের প্রাণ বাঁচাতে পারে। যুক্তরাজ্যের সরকার যখন কতিপয় নীতিমালার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে তখন তারা কোরিয়ানদের পরামর্শ নিতে পারে যারা ইতোমধ্যে এক মাস আগে একই রকম উভয় সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। তবে এর জন্য আমাদের বৈশ্বিক সহযোগিতা ও আস্থার চেতনার থাকা দরকার। 

দেশগুলোর মুক্তভাবে তথ্য আদান-প্রদান ও বিনীতভাবে পরামর্শ চাওয়ার ব্যাপারে আগ্রহী হওয়া উচিত, এবং উপাত্তের প্রতি এবং সেখান থেকে পাওয়া সম্যক দৃষ্টির প্রতি আস্থা রাখতে পারা উচিত। মেডিকেল সরঞ্জাম, প্রধানত টেস্টিং কিট ও শ্বাস-প্রশ্বাসমূলক যন্ত্রের উৎপাদন ও বিতরণেও আমাদের বৈশ্বিক প্রয়াস থাকা দরকার। প্রতিটি দেশের এটি স্থানীয় পর্যায়ে করা ও যেকোনো সরঞ্জাম পাওয়ার পর তা মজুদ করার পরিবর্তে একটি সমন্বিত বৈশ্বিক প্রয়াসই পারে ব্যাপকভাবে উৎপাদন ত্বরান্বিত করতে ও জীবন রক্ষাকারী সরঞ্জামের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করতে। যুদ্ধের সময় দেশগুলো যেমন প্রধান শিল্পগুলোকে জাতীয়করণ করে তেমনি মানুষের করোনা ভাইরাস-বিরোধী যুদ্ধে আমাদের গুরুত্বপূর্ণ প্রোডাকশন লাইনগুলোকে “মানবিকীকরণ” করার প্রয়োজন আছে। কম সংখ্যক করোনা ভাইরাসের সংক্রমণসম্পন্ন একটি ধনী দেশের যদি ও যখন সাহায্যের প্রয়োজন তখন অন্য দেশগুলো তার সহায়তায় এগিয়ে আসবে এই ভরসা রেখে বেশি সংখ্যক সংক্রমণসম্পন্ন একটি দরিদ্র দেশে অমূল্য সরঞ্জাম পাঠানোর ব্যাপারে আগ্রহী হওয়া উচিত।

মেডিকেল পেশাজীবী সংগ্রহ করার ব্যাপারে আমাদের একই রকম বৈশ্বিক প্রচেষ্টার কথা বিবেচনা করার দরকার হতে পারে। বর্তমানে যেসব দেশ কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সেসব দেশ পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলগুলোতে তাদের প্রয়োজনের সময় সাহায্য করার জন্য ও মূল্যবান অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য মেডিকেল কর্মী পাঠাতে পারে। মহামারীর কেন্দ্র যদি পরবর্তীতে অন্য দিকে স্থানান্তরিত হয় তাহলে  বিপরীত দিকে সাহায্য প্রবাহিত হতে শুরু করবে।

অর্থনৈতিক খাতেও বৈশ্বিক সহযোগিতা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। অর্থনীতির ও সরবরাহ শৃঙ্খলের বৈশ্বিক প্রকৃতির প্রেক্ষিতে প্রত্যেক সরকার যদি অন্যদের সম্পূর্ণ অবজ্ঞা করে নিজেদের কাজ করতে থাকে, তার ফলাফল হবে বিশৃঙ্খলা ও গভীর সংকট। আমাদের একটি বৈশ্বিক কর্মপন্থা থাকা দরকার এবং এটি খুব তাড়াতাড়ি দরকার। আরেকটি প্রয়োজন হচ্ছে ভ্রমণের উপর একটি বৈশ্বিক ঐকমত্যে পৌঁছানো। কয়েক মাসের জন্য সকল আন্তর্জাতিক ভ্রমণ বাতিল করলে প্রচুর টানাপোড়েন দেখা হবে এবং করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইকে বাধাগ্রস্ত করবে। অন্তত সামান্য সংখ্যক ভ্রমণকারী যেমন বিজ্ঞানী, ডাক্তার, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ীদের সীমান্ত পারাপার অব্যাহত রাখার জন্য তাদেরকে অনুমতি দেওয়ার ব্যাপারে দেশগুলোর সহযোগিতা করা প্রয়োজন। ভ্রমণকারীদেরকে তাদের স্বদেশ থেকে প্রি-স্ক্রিনিং করার ব্যাপারে একটি বৈশ্বিক ঐকমত্যে পৌঁছানোর মাধ্যমে এটি করা যেতে পারে। আপনি যদি জানেন যে যত্নসহকারে বাছাইকৃত ভ্রমণকারীদেরকে একটি উড়োজাহাজে অনুমোদন করা হয়েছে তাহলে আপনি তাদেরকে আপনার দেশে গ্রহণ করতে আরো বেশি আগ্রহ পোষণ করবেন।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে বর্তমান সময়ে দেশগুলো এগুলোর কোনোটিই করছে না। একটি সম্মিলিত অসাড়তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে জেঁকে ধরেছে। মনে হচ্ছে রুমের ভেতর প্রাপ্তবয়স্ক কেউ নেই। যে কেউ ইতোমধ্যে কয়েক সপ্তাহ আগেই একটি সাধারণ কর্মপন্থা বের করার জন্য বিশ্ব নেতাদের একটি জরুরী সভা দেখার আশা করতে পারতো। জি-সেভেন নেতৃবৃন্দ কেবল এই সপ্তাহে একটি ভিডিও কনফারেন্স আয়োজন করতে পেরেছেন এবং ফলাফল হিসেবে এসব কোনো পরিকল্পনা দেখা যায়নি।

পূর্বের বৈশ্বিক সংকটগুলোতে — যেমন ২০০৮ সালের আর্থিক সংকট ও ২০১৪ সালের ইবোলা মহামারী — মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব নেতার ভূমিকা নিয়েছিলো। কিন্তু বর্তমান মার্কিন প্রশাসন নেতার ভূমিকাকে প্রত্যাখ্যান করেছে। এটি খুব পরিষ্কারভাবে দেখিয়ে দিয়েছে যে, এটি মানবতার ভবিষ্যতের চেয়ে আমেরিকার মহত্ত্বকে অনেক বেশি গুরুত্ব দেয়।

এই প্রশাসন তাদের ঘনিষ্ঠতম মিত্রদেরও প্রত্যাখ্যান করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে সকল ভ্রমণ নিষিদ্ধ করার সময় এই আকস্মিক ব্যবস্থার বিষয়ে ইইউ-র সাথে পরামর্শ তো করেইনি, এমনকি ইউরোপীয় ইউনিয়নকে অগ্রীম নোটিশ দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি। কোভিড-১৯ এর একটি নতুন প্রতিষেধকের একচেটিয়া অধিকার কিনে নেওয়ার জন্য একটি জার্মান ওষুধ কোম্পানিকে ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার দিতে চাওয়ার মাধ্যমে তারা জার্মানিকে কলঙ্কিত করেছে। বর্তমান প্রশাসন যদি অবশেষে পথ পরিবর্তন করে এবং একটি বৈশ্বিক কর্মপন্থা নিয়ে আসে, তারপরও খুব কম দেশই এমন নেতাকে অনুসরণ করবে যে দায়িত্ব নেয় না, যে ভুল স্বীকার করে না, এবং যে অন্যদেরকে শুধু  দোষারোপ করে নিয়মিত সকল কিছুর কৃতিত্ব নিজে গ্রহণ করে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শূন্যস্থান যদি অন্য দেশগুলো পূরণ না করে তাহলে শুধু এই মহামারী বন্ধ করাই যে আরো বেশি কঠিন হবে তা নয়, বরং এর পরম্পরা সামনের বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে কলুষিত করতে থাকবে। তবুও প্রতিটি সংকটই একেকটি সুযোগ। আমরা অবশ্যই আশা করবো যে এই মহামারী মানব জাতিকে বৈশ্বিক অনৈক্য থেকে উদ্ভূত প্রবল বিপদকে অনুধাবন করতে সাহায্য করবে।

মানব জাতির একটি সিদ্ধান্তে আসা দরকার। আমরা কি অনৈক্যের পথে এগুবো নাকি বৈশ্বিক সংহতির পথে হাঁটবো? আমরা যদি অনৈক্যের পথে যাই তাহলে এটি শুধু সংকটকেই প্রলম্বিত করবে তা নয় বরং ভবিষ্যতে ঘোরতর দুর্যোগে পর্যবসিত হবে। আমরা যদি বৈশ্বিক সংহতির পথে যাই তাহলে শুধু করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে বিজয় হবে না, বরং ভবিষ্যতের মহামারী ও সংকটের বিরুদ্ধেও বিজয় হবে যা একুশ শতকে মানব জাতিকে জর্জরিত করতে পারে।

ইউভাল নোয়াহ্হারারিস্যাপিয়েন্স’, ‘হোমো দিউসটুয়েন্টি ওয়ান লেসনস্ফর দ্য টুয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরিগ্রন্থসমূহের রচয়িতা

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন