মঙ্গলবার, ২ আগস্ট ২০২১; ৭:৪২ পূর্বাহ্ণ


করোনার এই সময়ে মানুষের কর্মের স্বাধীনতা বনাম পূর্ব-নির্ধারণের ধারণার বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে।

যেহেতু আল্লাহ সর্বশক্তিমান এবং তিনি সবকিছু পূর্ব-থেকেই জানেন, সুতরাং কখন কার কোথায় কীভাবে মৃত্যু হবে, বা এক কথায়, ভবিষ্যতে যা কিছু ঘটবে, তা তিনি যেমন জানেন তেমনই ঘটবে, মানুষ তা-ই করে বা করতে পারে, যেমনটি আল্লাহ পূর্ব থেকেই জানেন।কারণ গাছের একটি পাতাও ঝরে পড়ে না, তাঁর জ্ঞান ব্যতীত, (সূরা-আনয়াম-৫৯)। জমীনে বা কোন ব্যক্তির জীবনে যেসব সংকট আসে, সেসব সংঘটিত হওয়ার পূর্বেই কিতাবে লিপিবদ্ধ হয়, আর এটি আল্লাহর জন্য খুবই সহজ। (সূরা হাদীদ-২২)।

আল্লাহর সর্বশক্তিমানতা ও সর্বজ্ঞতার ধারণার সাথে উল্লেখ্য এ ধরণের আয়াতগুলো মিশে মানুষের স্বাধীনতার ধারণাকে নাকচ করে, পূর্ব-নির্ধারণের ধারণার পক্ষে খুবই শক্তিশালী যৌক্তিক ভিত্তি তৈরী করে।

আল্লাহর সর্বশক্তিমানতা ও সর্বজ্ঞতার ধারণার যৌক্তিক ভিত্তি এত জোরালো যে, এর মোকাবেলায় মানুষের স্বাধীনতার ধারণা দার্শনিকভাবে যে জটিলতা সৃষ্টি করে, তাহতে বের হয়ে, “Man is condemned to be free.”– বক্তব্য প্রতিষ্ঠা করার জন্য, জ্যাঁ পল সাত্রে, তাঁর দার্শনিক আলোচনাতে “পদ্ধতিগত নাস্তিকতা” (methodical atheism) গ্রহণ করতে বাধ্য হন।

সামগ্রিকভাবে মানুষের চিন্তার ইতিহাসে যেমন, তেমনি ইসলামের চিন্তার ইতিহাসেও এই বিতর্কের লম্বা ফিরিস্তি রয়েছে। এবং অনেকেই একে, ‘ডিম আগে না মুরগী আগে’ এমন বিতর্কের মতো সমাধানহীন সমস্যা হিসাবে বিবেচনা করেন। যদিও যৌক্তিকভাবে, ডিম নয়, বরং মুরগী আগে, কারণ ডিম আগে আসলে একে তা দিয়ে বাচ্চা ফুটানোর জন্যে মুরগীর প্রয়োজন থাকলেও, মুরগী আগে আসলে, ডিম পাড়া এবং ডিমে তা দিয়ে বাচ্চা ফুটানো দুটোই হয় , তাই মুরগী আগে এই ধারণার পক্ষে যৌক্তিক একটা সমাধান ঠিকই পাওয়া যায়।

আমাদের যুক্তিবোধ সাধারণত হ্যাঁ-না এর দ্বৈততার ভিত্তিতে কাজ করে। মানে, আমরা সাধারণত ধরে নেই কোন কিছুর উত্তর হয় “হ্যাঁ” অথবা “না” হবে। কিন্তু কোন প্রশ্নের উত্তর যদি বলি হ্যাঁ এবং না উভয়ই হবে, তবে সাধারণ যুক্তিবোধ এমন উত্তর নিতে অস্বীকার করে। মানুষের স্বাধীনতা বনাম পূর্ব-নির্ধারণের ধারণার যৌক্তিক বিশ্লেষণ করলে এমনই উত্তর বেরিয়ে আসে, মানে, মানুষ কি স্বাধীন? উত্তর- হ্যাঁ এবং না, সবকিছুই কি পূর্ব-নির্ধারিত? উত্তর- হ্যাঁ এবং না। কেন এমন উত্তর হবে তা বিশ্লেষণ করার স্থান এটা নয় নিশ্চয়ই। এখানে আমরা বরং ঐটুকুই দেখানোর চেষ্টা করবো, মানুষ কি স্বাধীন, না সবকিছুই পূর্ব-নির্ধারিত? এমন প্রশ্নের উত্তরে মানবীয় কোন অবস্থানকে আল-কোর’আন সমর্থন করে, এবং কোন অবস্থানকে সমর্থন করে না।

আল-কোর’আন মানুষের কর্মের স্বাধীনতায় অবিশ্বাস ও পূর্ব-নির্ধারনের ধারণায় বিশ্বাসকে মুশরিকদের বিশ্বাস হিসাবে বর্ণনা করে, “ওরা বলে, করুণাময় ইচ্ছা করলে, আমরা এদের (মূর্তি) পূজা করতাম না।” সূরা যুখরুফ-২০। মানে, মুশরিকরা তাদের নিজেদের মূর্তি পুজা করার কর্মটি আল্লাহর ইচ্ছার প্রতিফলন হিসাবে দাবী করে বলতে চায়, তাদের তো আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে যাওয়ার সামর্থ্য নাই, তাই এই বিষয়ে তাদের স্বাধীনতাও নাই।

আল-কোর’আনে বিষয়টি আরো স্পষ্টভাবে ফুটে উঠে ইবলিস এবং আদম আ. এর ঘটনা বর্ণনায়। আমরা দেখি, ইবলিস যখন আল্লাহর হুকুম অমান্য করে আদম আ. কে সেজদা করতে অস্বীকার করে, তখন তার নিজের এই অবাধ্যতার দায় নিজ কাঁধে নিতে অস্বীকার করে, এবং তার নিজের পথভ্রষ্টতার দরুন আল্লাহকে দায়ী করে। (সূরা আ’রাফ-১৬)। এখানেও ইবলিসের পূর্বানুমানমূলক যুক্তি ছিলো, আল্লাহ কর্তৃক পূর্ব-নির্ধারণের ধারণা। মানে তার যুক্তি হলো, আল্লাহ তো জানতেনই যে, ইবলিস আল্লাহর হুকুম অমান্য করে আদমকে সেজদা করবে না, কারণ এটাই তার পূর্ব থেকে নির্ধারিত নিয়তি, যা আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত, তাই তার অভিশপ্ত হওয়ার জন্য সে মূলত নিজে নয়, বরং আল্লাহ-ই দায়ী। ভয়ঙ্কর যুক্তি নিঃসন্দেহে।

কিন্তু অন্যদিকে আমরা দেখি, আদম আ. কর্তৃক আল্লাহর হুকুম অমান্য করার পরবর্তীতে আদম আ. -এর দোয়া, “হে আমাদের প্রতিপালক, আমরা আমাদের নিজেদের নফসের উপর জুলুম করেছি”, বলে মানুষের কর্মের স্বাধীনতার পূর্ণ স্বীকৃতি প্রদান করে, নিজ কৃতকার্যের দায়-দায়িত্ব নিজ কাঁধে নিয়ে আল্লাহর নিকট অভিশপ্ত না হয়ে ক্ষমা পাওয়ার যোগ্য হিসাবে এবং জমিনে আল্লাহর প্রতিনিধি হওয়ার নিজ যোগ্যতাকে প্রতিষ্ঠা করেন।

ইবলিসের মতো, সকল কিছুর দায় আল্লাহর উপর না চাপিয়ে, বনী-আদম হিসাবে, আমরাও আমাদের নিজেদের কৃতকর্মের দায়-দায়িত্ব নিজ কাঁধে নিতে পারি, এবং স্থান-কাল অনুযায়ী জমিনে যেন আল্লাহর প্রতিনিধি হিসাবে যে যার দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে পালন করতে পারি, এই সংকটময় মুহূর্তে, আরশের মালিকের নিকট আমাদের সম্মিলিত কণ্ঠে উচ্চারিত হোক এই প্রার্থনা!

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন