, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১; ১০:০১ অপরাহ্ণ


পৃথিবীর সাম্প্রতিক সময়ের ইতিহাসের বিবর্তনের দিকে নজর দিলে আমরা দেখতে পাবো এসব পরিবর্তনের লক্ষ্য কেবল ক্ষমতা বা অর্থনীতি কেন্দ্রিক ছিল না; ছিল মূলত দার্শনিক মীমাংসার নিমিত্তে। অর্থনীতি বা বিজ্ঞান এসব বিষয় সেই মীমাংসায় বাহ্যিক নিয়ামক রূপেই কাজ করেছে, যেমন করেছে ‘আধুনিকতা’ নামক মানব কল্পিত এক বিকল্প ঈশ্বরের ধারণা।

আমাদের মনে রাখতে হবে প্রাক- আধুনিক যুগে সারা পৃথিবী মূলত ধর্মীয় প্রভাব বলয়ে ছিল। এবং এই প্রভাবের বিস্তার ছিল ধর্মালয় থেকে রাজধর্ম এবং সামাজিক জীবন থেকে ব্যক্তি শিক্ষার দুয়ার পর্যন্ত। এইসব ধর্মকেন্দ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার মূল নির্দেশ ছিল তিনটি; প্রথমত, ঈশ্বরের ধারণা।অঞ্চল, জাতি এবং ধর্ম নির্বিশেষে এই ধারণার মতপার্থক্য ছিল কিন্তু ঈশ্বর ছিল সব সমাজেই এবং সবার জীবনেই। দ্বিতীয়ত, দেহের পাশাপাশি মানুষের মধ্যে যে আত্মা রয়েছে সেটার ধারণা, এবং খুব মূল্যবান ভাবে এই ধারণা কাজ করত। তৃতীয়ত, মৃত্যুর পরবর্তী সময়ের চিন্তা বা পরকালীন ধারণা। এসব চিন্তা ও বিশ্বাস হাজার হাজার বছর ধরে দুনিয়ার সব সমাজে নানান ভাবে বিরাজ করেছে এবং মানুষের সামাজিক চিন্তা ও কর্মকে খুব নিবিড়ভাবে আলোড়িত করেছে।

মধ্যযুগের ইউরোপ, আরও স্পষ্ট করে বলা ভালো খ্রিস্টীয় চার্চ ও পাদ্রিদের প্রভাবাধীন রাজ্যসমহূহে চরম দুঃশাসনে থাকা ইউরোপ, দুটি প্রবল বাধার সম্মুখীন হয় এবং তা থেকে গড়ে ওঠে বিকল্প অপর দুটি ধারা যা ভবিষ্যত দুনিয়ার চিত্রপট পাল্টে দেয়। একটি ধারা সরাসরি খ্রিস্টীয় ধর্মের প্রভাব রাষ্ট্র ও জনগোষ্ঠীর উপর কমিয়ে দেয় এবং অপর ধারা রাষ্ট্রনীতি এবং অর্থনীতির সাথে সম্পর্কিত হয়ে পড়ে। প্রথম ধারাটি প্রোটেস্ট্যান্ট মতবাদ হিসেবে পরবর্তীতে চিহ্নিত হয়। দ্বিতীয় ধারা থেকেই উৎসরিত হয় তথাকথিত ইউরোপীয় রেনেসাঁ এবং সেকুলারিজম, যার শুরু হিসেবে অনেকে ফরাসি বিপ্লবকে মনে করে থাকেন।

আজ কয়েকশ বছর দূরে দাঁড়িয়ে খেয়াল করলে দেখা যাবে মধ্যযুগীয় ইউরোপে প্রাক-আধুনিক যুগের যত চিন্তাবিদ, দার্শনিক, বিজ্ঞানী ইউরোপে তাদের মতবাদ পেশ করেছেন তারা মূলত কাউন্টার করতে চেয়েছেন বা বিপরীত দর্শন দিতে চেয়েছেন ধর্ম- রাষ্ট্রকেন্দ্রিক রাষ্ট্রচিন্তার মূল দর্শনের বিপরীতে; এক কথায় ভাববাদী দর্শনের বিপরীতে।

প্রাক – আধুনিক দর্শনের কারিগরেরা মানষকে বুঝালেন, ‘ঈশ্বরের কথা শুনতে শুনতে আমরা ক্লান্ত কিন্তু চার্চ এতদিন আমাদের সাথে কি অন্যায় আর জুলুম করেছে’। তাঁরা ধর্ম ব্যবসায়ীদের সব দায় ঈশ্বরের উপরে চাপালেন সরল সমীকরণে। উপসংহারে বললেন, ‘সুতরাং ঈশ্বরের চিন্তা বাদ দিয়ে আমাদের এই দৃশ্যমান বস্তুগত জগতের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে এবং তার উন্নতির মাধ্যমে আমাদের জীবনধারাকে উন্নত করতে হবে, ঈশ্বরের বদলে আমাদের মহাবিশ্ব বা প্রাকৃতিক বিশ্বের দিকে দৃষ্টি ফেরাতে হবে। এবং মানুষ দৃষ্টি ফেরালো বস্তুগত বিশ্বের দিকে। মেহনতের দরুণ স্বাভাবিকভাবেই বস্তুর বিভিন্ন উপকারী দিক সামনে চলে আসে। বস্তু জগতের এই উপকারী শাখার নাম দেয়া হলো বিজ্ঞান, যা পরবর্তীতে মানুষের জীবনযাত্রাকে অনেক সহজ করে দিলো। যদিও এই সহজতার ভয়াবহ মূল্য দিতে হলো মানব সভ্যতাকে। সে আলোচনা একটু পরে করা যাবে।

জ্ঞান জগতে যেই বিজ্ঞান চিরকাল ভৃত্যের মর্যাদা পেয়েছিল তাঁকে হঠাৎ মান্যতা দেয়া হতে লাগলো। আজকের তথাকথিত বিজ্ঞান ভিত্তিক সভ্যতার মেরুদণ্ড গড়ে উঠল সেই সময়ে, নতুন নতুন উদ্ভাবন হলো, বিজ্ঞানের নানা রকম আবিষ্কার ঘুরতে লাগলো মানুষের চারপাশে, যা মানুষের এতদিনের বিশ্বাসী ইন্দ্রিয়কে প্রতারিত করতে ছিল যথেষ্ট। বিজ্ঞান কেন্দ্রিক নতুন নতুন শাস্ত্রীয় শাখার বিকাশ ঘটলো। পাশাপাশি আরও কিছু কাজ হলো।

দুই

বিজ্ঞান ধর্ম কেন্দ্রিক রাষ্ট্রের বিপরীতে সেকুলারিজমকে দর্শন হিসেবে তুলে ধরলো প্রাক – আধুনিক যুগেই। সেক্যুলার মতবাদ বিজ্ঞানের কাঁধে বন্দুক রেখে প্রচার করলো যে, ‘এতদিন ধরে যারা ধর্মের চর্চা করেছে তারা কি উদ্ভাবন করেছে? কিন্তু আজকের এই বিজ্ঞান কত কিছু আবিষ্কার করল, কত নতুন নতুন উদ্ভাবন’। ধর্মীয় বিশ্বাসের ভিত্তিমূল জনমানস থেকে তুলে দেওয়ার জন্য এটা যথেষ্ট ছিল এবং সমাজে কথা প্রতিষ্ঠা করা গেল যে, ‘আমাদের ঈশ্বর বোঝার জন্য সময় ব্যয় না করে সকল মেধা, শক্তি এবং অর্থ এই বিজ্ঞানের উদ্ভাবনের পেছনে ব্যয় করা উচিত’। ঈশ্বর ভাবনাকেই মৃত ঘোষণা করা হলো।

এবার দ্বিতীয় বিষয়ের কথা বলা যাক, আত্মার কথা। পৃথিবীর সব জাতি এবং ধর্ম আত্মাকে বিশ্বাস করতো, মেনে নিত এবং নানান প্রক্রিয়ায় তা বিশ্বাস করত। প্রাক- আধুনিক দার্শনিকেরা সন্দেহের সুরে একথা বলতে লাগলেন, ‘আত্মার অবস্থান কোথায়? আত্মা কি কি দেখা যায়? আমরা আত্মাকে দেখতে পাই না কিন্ত মানব শরীরকে দেখতে পাই। তাই মানব শরীরের সকল ক্রিয়া-কলাপ এবং তার অসুখ মেরামতের ব্যবস্থাতে আমাদের আত্মনিয়োগ করা উচিত। এবং সেখানে কাজে লাগলো বিজ্ঞান। মানব ইতিহাসে গত কয়েক শতকেই মানব শরীরের রহস্য উদঘাটনে সবচাইতে বেশি সময় এবং মেধা ব্যয় করা হয়েছে, মানব আত্মাকে পাশ কাটিয়ে বা অগ্রাহ্য করে।

একই ভাবে পরকালীন জীবনের বিষয়ে মানুষকে একথা বোঝানো হলো, ‘মৃত্যুর পরবর্তীতে কি আছে তা কি আমরা কেউ জানি? কেউ কি দেখে এসেছে? যা কিছু আমরা দেখবো না, যার প্রমাণ নেই সেসবকে আমরা আর বিশ্বাস করবো না। তার চেয়ে চলো আমরা আমাদের এই পার্থিব জীবনেকে উন্নত করার জন্য মানবিক জ্ঞানের সকল শাখাকে ব্যবহার করি। অর্থনীতি থেকে শুরু করে সমাজবিজ্ঞান -সকল ক্ষেত্রেই নতুন নতুন তত্ত্ব ও দর্শনের উদ্ভাবন হতে লাগলো। সেসবে যুক্তি তুলে ধরা হলো, ‘মানুষ এসবের মাধ্যমেই তার রাষ্ট্রের পরিচালনা নীতি উন্নত করতে পারে’। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বিকল্প নানান প্রতিষ্ঠান দাঁড়িয়ে গেলো যারা নতুন ও মসৃণ জীবন প্রণালী তৈরি করতে পারে।

আর এসব অধ্যায়ন তাৎক্ষণিকভাবে ইউরোপে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্ম দিলো। যেমন, নতুন নতুন নগর গড়ে উঠলো, প্রশস্ত রাস্তাঘাট তৈরি হলো, নতুন আকৃতির দালানকোঠা হলো, বাণিজ্য সম্প্রসারণ হলো, শিল্পকে মানুষের আধ্যাত্মিক শূন্যতার ঘাটতি পূরণের জন্য নতুন করে সাজানো হলো। বাণিজ্য ও অর্থনীতি বিকাশের জন্য বিজ্ঞানকে তার সমস্ত শক্তি দিয়ে কাজে লাগানো হলো এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে নতুন পরাশক্তি হিসেবে আমেরিকার উত্থানের আগে ইউরোপে সারা পৃথিবীতে ছড়ি ঘুড়িয়ে গেলো। সামাজিক মর্যাদার নতুন বিন্যাস সমাজে দেখা গেলো, ভাব দর্শনকে প্রায় ছূড়ে ফেলা হলো, বস্ত দর্শন বন্য ঘোড়ার মতো লাফিয়ে ছুটতে লাগলো। ধর্মীয় পণ্ডিতদের মর্যাদা ক্রমে ছাড়িয়ে গেলেন বস্তুবাদী চিন্তার পণ্ডিতেরা। সমাজে স্থপতি, বিজ্ঞানী ইত্যাদি বস্তুবিদ্যার অধিকারীরা অধিক শিক্ষিত বলে ধারণা দেওয়া হতে লাগলো। বস্তু জগত ছাড়িয়ে এই পৃথিবী এবং পৃথিবী ছাড়িয়ে আরো যা কিছু আছে, সব কিছু নিয়ে নাড়াচাড়া হলো এই কয়েক শতকে, কেবল মানুষকে ভুলিয়ে দেওয়া হলো তার নিশ্চিত পরিণাম যে মৃত্যু, তার পরবর্তী ভাবনাকে।

ইউরোপের এসমস্ত ধারণা বা দর্শন ইউরোপ নিজেদের মধ্যে সীমিত রাখলো না। তাদের আপন স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যেই তারা তাদের এই মতবাদগুলো সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিলো এবং বিজ্ঞানের উদ্ভাবনকে কাজে লাগিয়ে তারা দ্রুততম সময়ে পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশ ও অঞ্চল দখল করে ফেলল। দখলকৃত অঞ্চলে তারা শুধু লুটতরাজ করে সম্পদ চুরি করে ক্ষান্ত হলো না; বরং একটা সাংস্কৃতিক বদল ঘটালো এবং সেই বদলকে ইতিবাচক ভাবে দেখানো শুরু করল ‘আধুনিকতার’ নাম দিয়ে।

তিন

কিন্তু এতো সব ডামাডলের মধ্যেও মানুষের মধ্যে যে বিশ্বাসের শূন্যতা ছিল সেই শূন্যতাগুলো যখন প্রশ্নের আকারে বিভিন্ন সময় উত্থাপিত হতো, তখন নানা তথ্য দিয়ে মানুষের মনের শূন্যতাকে ঢাকার চেষ্টা করা হয়েছে। বলা হয়েছে, ‘ঈশ্বর বলে কিছু নেই’, ‘ধর্ম বলে কিছু নেই’, ‘ধর্ম মানুষের সৃষ্টি’, ‘পরকাল’ একটি অলৌকিক ধারণা ইত্যাদি। কিছু মানুষ তখন নাস্তিকতায় দীক্ষিত হতে শুরু করে।

মজার ব্যাপার হলো, ইউরোপের প্রাক-রেনেসার সকল দার্শনিক যদিও ‘নাস্তিকতা কেন্দ্রিক’ বস্তুবাদী দর্শনের চর্চায় রত ছিলেন না, কিন্তু বিজ্ঞানের সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে ফুলে-ফেঁপে ওঠা পুঁজিবাদ সবচেয়ে বেশি প্রচার করল নাস্তিক দার্শনিকদের, কারণ সেখানেই তাদের লাভ ছিল। আজকের পশ্চিমের দিকে দৃষ্টি দিলে দেখা যাবে তাদের সেদিনের চার্চগুলো আজও অনেক যত্নের সংরক্ষিত আছে, যদিও তারা সেখানে যায় না। এসব চার্চ রাখা আধুনিকতার ইতিহাস সংরক্ষণ এবং ইতিহাসকে ভালোবাসা প্রকল্প নয়, ধর্মের সাথে তাদের যে বিচ্যুতি ঘটেছিল তার প্রমাণ স্বরূপ সেগুলো রাখা। সেদিনের সেই ইতিহাসও এখন মৃত ভাষার মতো অচেনা আধুনিক মানুষদের কাছে।

মনে রাখতে হবে মধ্যযুগের ধর্ম ও অর্থনৈতিক সমস্যা সবটাই ছিল পাশ্চাত্যের এবং পাশ্চাত্য তাদের সমাধান করেছে তাদের মতো করে। এটা প্রাচ্যদেশীয় উদ্ভাবিত কোন সমস্যা নয় কিন্তু এই সমস্যার জের জারি থাকলো দুনিয়ার প্রায় সব অঞ্চলে। কারণ খনিজহীন, বিরূপ আবহাওয়ার দেশ ইউরোপিয়ান সাম্রাজ্যবাদীদের হাতে শাসিত হয় প্রায় সারা বিশ্ব। পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা এখনো ইউরোপের সেই সময়ের তৈরি হওয়া ‘সেক্যুলার শিক্ষাব্যবস্থার’ প্রভাবের মধ্যেই বিরাজিত। গত কয়েক শতকে সারা দুনিয়ায় শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে এমন কিছু মানুষকে তৈরি করা হয়, যারা রক্তমাংসে প্রাচ্যদেশীয় বা স্বদেশীয়, কিন্তু মন মেধায় পাশ্চাত্যের অন্ধ অনুসারী।

আধুনিকতা খুব কৌশলে একটি কাজ করল, ধর্মকে তাদের তথাকথিত উদার গণতান্ত্রিক নীতির কারণে মুছে দিল না, রেখে দিলো একটা অবহেলার জায়গায়। বলা হলো, ‘তুমি ঈশ্বরে বিশ্বাস করো, আত্মা বিশ্বাস করো বা পরকালে বিশ্বাস করো- তাতে কিছুই যায় আসে না। কারণ সেগুলো বাস্তব না, বরং বাস্তব হলো বিজ্ঞান, বাস্তব আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থা, যা মানুষকে স্বপ্ন দেখাচ্ছে অমরত্তের এবং বাস্তব হচ্ছে রাজনীতি এবং অর্থনীতির আধুনিক ধারণা সমূহ।

এবং আরো অদ্ভুত কিছু জিনিস ঘটলো এ সময়ে। পুঁজিবাদের বিকাশের স্বার্থে সারা পৃথিবীর অর্থনৈতিক কাঠামো এমনভাবে তৈরি করা হলো যাতে এই আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার তথাকথিত কিছু কাগজ বা সনদ অর্জন না করলে এই কাঠামোতে বেঁচে থাকা অনিশ্চিত হবে। এই কথাই শাসিত কলোনিয়াল দেশগুলোতে শেখানো হলো।

হিন্দুধর্ম, বৌদ্ধধর্ম, খ্রিস্টান ধর্ম, ইসলাম ধর্ম, ইহুদি ধর্ম সব ধর্মেই একইভাবে এর ফল বা প্রভাব দেখা দিতে লাগলো এবং বুঝানো হলো ধর্মীয় শিক্ষা ‘অনুৎপাদনশীল’, সমাজে কাজে লাগে না। ধর্মের যে শিক্ষা বা চর্চা হাজার বছর মানুষের সমাজ সভ্যতার নীতি এবং নৈতিকতার ভিত্তি তৈরি করেছে সেটার বিকল্প হিসেবে আধুনিক রাস্ট্রে রাষ্ট্রীয় সংবিধান ধর্মগ্রন্থের দায়িত্ব পালন করতে লাগলো। অর্থাৎ মানুষের রুচিবোধ, তার চিন্তা, তার বিশ্বাস সবকিছু তৈরি হবে সে সংবিধান দিয়ে। এসব আধুনিক রাষ্ট্রের আধুনিক সংবিধানের আধ্যাত্মিক আত্মা লুকিয়ে আছে ইউরোপের মধ্যযুগের ‘সেই গন্ডগোলের মাঝেই।

চার

কিন্তু সবকিছুর পরেও কিছু রেটরিক দেখা দেয়, যেমন সেকুলারিজম ও পুঁজিবাদ এত চেষ্টা করেও মানুষের মধ্যে থেকে ঈশ্বর ভাবনাকে সরাতে পারছে না। তাই ঈশ্বরের ভাবনা, ঈশ্বরের আদলকে ঈশ্বরের চাওয়াকে ঘুরিয়ে দেওয়া হলো। খ্রিস্টীয় উপধারা প্রটেস্টান্ট এর উৎপত্তির মূল কারণই ছিল ক্যাথলিকরা মনে করতো, অনেকটা হিন্দু ব্রাহ্মণদের মতো, সাধারণ খ্রিস্টানরা বাইবেল পড়ার উপযোগী না। ক্যাথলিক চার্চ সমাজে প্রচার করেছে শুধুমাত্র পোপ এবং পোপের কাছে বায়াতপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের জন্য বাইবেল।

পৃথিবীতে গড মানুষকে পাঠিয়েছেন শাস্তি দিয়ে। মানুষ একসময় স্বর্গে ফিরে যাবে, যেখানে সে অনন্ত সুখ লাভ করবে এবং পৃথিবীর দিনগুলো তাদের জন্য খুব খারাপ কাটবে। এক দুঃখী জীবন কাটবে এবং তেমনি কেটেছিল। মানুষকে বাইবেল থেকে বিচ্ছিন্ন রেখে, মানুষকে সামাজিক ভাবে নিপিড়ন করে জনমানসে এক বিরূপ ধারণার জন্ম দেয় ক্যাথলিক চার্চ। ইউরোপে শাসনকার্য নিয়োজিত রাজকর্মচারী এবং গীর্জার সাথে যারা সম্পর্কিত, তারা ব্যতীত কারো জীবন উন্নত ছিল না মধ্যযুগে।

প্রোটেস্ট্যান্ট মতবাদ সেকুলারিজমের হাওয়া গায়ে লাগিয়ে খ্রিস্টান জনগণের মধ্যে এ কথা বুঝাতে সক্ষম হয় যে, এই পৃথিবীতে বস্তুজগতের উন্নতির মাধ্যমে সম্পদ অর্থ এবং জীবনের অধিকারী হওয়া দোষের নয়। বরং আরো বেশি এটি প্রশংসার, কারণ ‘গড যাকে বেশি ভালবাসেন এই পৃথিবীতে তাকেই বেশি সম্পদ দিবেন’। প্রোটেস্ট্যান্ট এবং ক্যাথলিকদের মধ্যে দর্শনগত ভয়ানক মতপার্থক্য থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রসহ পৃথিবীর অন্যান্য খ্রিস্টান প্রধান অঞ্চলসমূহে চার্চের মাধ্যমে এই প্রপাগান্ডা ছড়ানো হয় যে, ‘পৃথিবীতে মানুষের বস্তুগত সাফল্য, এটা ঈশ্বরের সাফল্য এবং এই দিকেই তাদের মনোনিবেশ করা উচিত।খ্রীষ্টান মিশিনারি সমূহ ভয়াবহভাবে ধর্মকে ব্যবহার করে বস্তুবাদী দর্শনের সম্প্রসারণ ঘটালো, অর্থাৎ ‘আধুনিক’ কৃষ্টি ও মতবাদ বস্তুবাদকে প্রচার করার একটি মাধ্যমে পরিণত হয়েছে।

‘আধ্যাত্মিকতা’ নামে যে বিষয়টি ছিলো, সেটি আজ মনোবিজ্ঞানের চ্যাপ্টার পরিণত হয়েছে এবং তাকে আজ আমরা বিশ্বাস দিয়ে দেখার চেষ্টা করি না, দেখার চেষ্টা করি বস্তুবাদী যুক্তি এবং তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে। কিন্তু মানুষের এই আধ্যাত্মিকতা নামে ‘অদৃশ্য লোকের’ সমাধানে বস্তুবাদী বিজ্ঞানের আবিষ্কার কতগুলো মন ভুলানো উপকরনের মাধ্যমে পূরণ করা হলো, যার করুণ এবং ভয়াবহ ফলাফলের প্রমাণ আজ পৃথিবীর উন্নত দেশগুলো। উন্নত দেশ গুলোর আত্মহত্যার হার জ্বলজ্বলে সাক্ষ্য হয়ে আছে আমাদের সামনে।

আধুনিক মনোবিজ্ঞান মানুষের দার্শনিক বা ভবগত সমস্যার সমাধানে ব্রতী হয়ে একে চিকিৎসা বিজ্ঞানের নজরে দেখতে চায়, যা ‘সেকুলারিজম’ এর শিক্ষা কাঠামো থেকে আগত। যেমন, মানুষের মধ্যে ভালো এবং খারাপ উভয় টুকু বোঝার মত ক্ষমতা রয়েছে। কোন মানুষ যখন কোন অপরাধ করেন তখন তাকে কেউ বলে না দিলেও একাকী তিনি এক অপরাধবোধে ভুগতে থাকেন। আগেকার যুগে মানুষ ধর্মীয় হুজুর বা পাদ্রিদের কাছে তওবা বা কনফেশন করতো। কিন্তু আধুনিক কোন সাইক্রেটিস্ট এর কাছে গেলে তিনি তাকে প্রথমেই বলে দিবেন, ‘আপনার এই অপরাধবোধে ভোগা এটা একটা নেতিবাচক ব্যাপার’। এখান থেকে আপনাকে বের হয়ে আসতে হবে, আপনার নিজেকে সুখী মনে করতে হবে।

এর কারণ খুঁজতে গেলে আমরা দেখব যে প্রাচীন সেমিটিক ধর্ম গ্রন্থ এবং আধুনিক ইসলামেও অপরাধ করার পরে মনোকষ্টে ভোগাকে বলা হয় অপরাধের তওবা বা পাপ মোচনের একটা ধাপ । এটি ঈশ্বর, আল্লাহ, সৃষ্টিকর্তা মানুষের ভিতরে একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দিয়েছেন এবং সকল প্রাচীন ধর্ম যেগুলো পরকালের ধারণা বিশ্বাস করে তারা মানুষের এই অপরাধবোধে ভোগা ব্যথাকে খুব ইতিবাচক হিসেবে দেখে। এটাই মৃত্যুর পরের জীবন বা পরকালের ধারনার একটি উজ্জ্বল প্রমাণ হিসাবে ধরা হতো। আর তাই স্বাভাবিকভাবেই আধুনিক মনোবিজ্ঞান এটাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখেনা, কোন মনোবিজ্ঞানী বলবেনা শরীরের মতই আপনার মনকে সুরক্ষিত পবিত্র রাখতে হবে, শরীরের মতো আত্মার রোগ আছে। কারণ আত্মাকে মেনে নিলে শরীরের মৃত্যুর পরের হিসেব সামনে চলে আসে।

পাঁচ
“এ সময়টি মানব ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, শুধু করোনাভাইরাসের জন্যই নয়, এই পরিস্থিতি বরং আমাদের পৃথিবীর ভুলগুলো বুঝতে সহায়ক হবে, অকার্যকর আর্থসামাজিক ব্যবস্থার গভীরে তাকানোর সুযোগ দেবে, যার পরিবর্তন আবশ্যক, যদি আমরা চাই একটি বাসযোগ্য পৃথিবী”

নোয়াম চমেস্কি

করোনা ভাইরাস (কোভিড ১৯) নামে যাকে অভিহিত করা হয়েছে সেই ভাইরাস আসলে কি? এটি কি কেবলই এক অণুজীব? কেবল মৃত্যুর প্রতীক, নাকি বস্তুবাদী সভ্যতার আড়ালে সম্পদ সঞ্চয়ের নামে আদর্শবাদ প্রচারের নামে সাম্রাজ্যবাদ বিস্তারের নামে শত শত বছর ধরে যে ঘৃণা, হিংসা এবং হত্যার পরিবেশ গড়ে তোলা হয়েছে সেটার রূপক।
রাষ্ট্র সকল যুগেই মানুষের জন্য নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা কায়েম করবে, গঠনগত ভাবে রাষ্ট্রের চরিত্র এমনই। পৃথিবীর মহান সব দার্শনিক বা রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা ‘রাষ্ট্র’ নামক সিস্টেমকে মেনে না নিলেও, শোষণ যন্ত্র থেকে সাধারণ মানুষকে বাঁচাবার কিছু পথ বাতলে দিয়েছেন। হাজার হাজার বছর ধরে চাণক্য কনফুসিয়াস থেকে শুরু করে আজকের নোয়াম চমেস্কি তো একই ভাবে রাষ্ট্রকে মানবিক হতে আহবান করেছেন।

কিন্তু রাষ্ট্র কি তা শুনেছে? রাষ্ট্র বুঝেছে উল্টো। আধুনিক রাষ্ট্র ক্রমে দানবে রূপ লাভ করে প্রতিটি মানুষকে দাসে পরিণত করেছে। রাষ্ট্রের সাথে দ্বিমত পোষণ করা নাগরিকেরা ভাইরাস রাষ্ট্রের তরফে; খেটে খাওয়া মানুষের কাছে, কর্মহীন মানুষের কাছে রাষ্ট্র এক প্রকার ভাইরাস। ধর্মীয় আদর্শে বিশ্বাসীদের কাছে বিপরীত আদর্শের লোকজন ভাইরাস। ভোগবাদী দুনিয়ায় প্রতিযোগিতায় রত প্রত্যেককে ছাড়িয়ে যাওয়া পাশের মানুষ ভাইরাস। আমাদের বিচ্ছিন্নতা, আমাদের আত্মমগ্নতা ভাইরাস। করোনা আসার আগে কি তবে তবে এই মৃত্যু ভয় ছিল না সবার মনে সুপ্ত?

বিশ্বায়নের নামে, সাম্রাজ্যবাদের নামে, মুক্তবাজার অর্থনীতির নামে যে মহাজনী কারবার চলছে জগতময়, মানুষের জীবনের কোনো অর্থই নেই সেখানে। মানুষের বেঁচে থাকার মূল্য নেই। উৎপাদনের একটি ইউনিটে পরিণত হওয়া ছাড়া এখানে কোন ব্যক্তির অবস্থান বা আইডেন্টিটি নিয়ে প্রশ্নই নেই। আধুনিক রাষ্ট্সেমানুষের রুচি এবং কাঠামোকে এমন ভাবে তৈরি করে দিয়েছে, যেন তারা স্বাধীন চিন্তা এবং মত প্রকাশের কথা ভুলে যায়। প্রত্যেকে নিজেকে পৃথক ভাবে, বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো করে থাকে। স্বাধীন মানবিক চিন্তা বলে কিছু থাকে না। এক লেখায় চমেস্কি লিখেছিলেন, ‘ আধুনিক একাডেমিক এডুকেশন আর প্রফেশনাল ট্রেনিং ছাকনির মতো।যে সব মানুষ স্বাধীন ভাবে চিন্তা করতে পারে, যাঁদের নিজস্ব মত আছে তাদের সেই ছাকনিতে ধরে ছুড়ে ফেলা হয়, কারণ তাঁরা সিস্টেমের কাজে লাগে না’।

করোনা ভাইরাস আসার পর যাদের চোখে আমি মৃত্যুভয় সবচেয়ে বেশি দেখেছি তারা হলো সমাজের উচ্চবিত্ত শ্রেণি, যারা কোনভাবেই এখনো বিশ্বাস করতে চায় না যে, মৃত্যু বলে এমন কিছু আছে বাস্তবে যা তাদের বিত্তের চেয়েও শক্তিশালী। ্কোয়ারেন্তাইন এর দিনগুলোতে এঁরা দ্রুত ডিপ্রেশনে আক্রান্ত হচ্ছে কারণ এদের বিত্ত-বৈভবময় জীবনের উপচে পড়া সুখগুলো দেখানোর, কিছু মানুষের প্রতি ঘৃণা এবং তাচ্ছিল্য দেখানোর সুযোগগুলো ক্রমে ক্রমে বন্ধ হয়েছে। বন্ধ হয়েছে বার, শপিং মল, বন্ধ হয়েছে দামী রেস্টুরেন্টগুলো, পার্টি সেন্টার, ডিস্কো ক্লাব, ক্যাসিনো। এরা এখন যাবে কোথায়? এদিকে ঘরে তো এদের জন্য কোন কিছু বাকি নেই আর। মানুষগুলো ঘরে স্বস্তি পাচ্ছে না। এতদিনের বাইরে তাদের কাজ, তাদের শপিং, তাদের মদ্যপান, ঝলমলে পার্টিগুলোতে প্রতিরাতে বিত্তের ছলকে উঠা তাদের উচ্চাকাঙ্খার উদযাপন সব মুছে গেছে। তিলে তিলে গড়ে তোলা এঁদের সাধের বিত্ত দেখানোর শোকেস হঠাৎ গেছে হারিয়ে ।

বস্তুবাদী পৃথিবীর বস্তুবাদী দর্শন মানব সভ্যতাকে শেষমেষ কোথায় নিয়ে দাঁড় করালো? আমরা দেখলাম ইউরোপে বস্তুবাদী বিপ্লবের পরেই পৃথিবীতে ব্যাপক শিল্প কলকারখানা গড়ে উঠলো, বড় বড় ঝলমলে নগর এবং শপিং-মল, বিত্তবৈভব বিলাস দ্রব্যের রমরমা বাজার, এবং অর্থ দিয়ে কিনে ফেলা যায় এমন সব কিছু দিয়ে চারপাশ ভরে ফেলা হলো। মানুষের জীবনের প্রয়োজনের অতিরিক্ত সবকিছুকে প্রয়োজনীয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে ‘কন্সেপশন মানুফেকচারিং’ চলতে থাকলো। চোখের সামনে নানা রকম বিজ্ঞাপন এবং প্রপাগান্ডার মাধ্যমে মানুষকে লালায়িত করা হলো। এর পিছনে ব্যয় করা হলো বিলিয়ন বলিয়ন ডলার। মানুষকে এটা বোঝানো হলো, ‘বেঁচে থাকা মানে তার একান্ত নিজে ভালো থাকা’।

বস্তুবাদ পৃথিবীকে উপহার দিয়েছিলো বিলাস আনন্দ উপভোগের সবকিছু। যেহেতু ধর্মীয় বাধন ছিড়ে গেছে, পৃথিবীতে যৌনতার মহোৎসব শেষ হয়ে যেতে সময় লাগলোনা। স্বাভাবিক যৌনতাও একঘেয়ে ক্লান্ত হয়ে শুরু হয়ে গেল বিকৃত যৌনাচার। যার ফলশ্রুতিতে নানান সময়ে বিভিন্ন রোগের প্রাদুর্ভাব আমরা দেখেছি। এবং একটা ওরাং ওটাং-কে ফরাসি দেশে শৃংখলাবদ্ধ করে বছরব্যাপী ধর্ষণ করা হয় এমন খবর পেপার-পত্রিকায় দেখা যাচ্ছে। বা পেন্দুলার মতো প্রাণীর সাথে মানুষের যৌন কর্মের কথা।

সর্বব্যাপী মানুষের সামনে তৈরি করা হল বাস্তব অবাস্তবের একটা দ্বিধা। এতদিনের পরিচিত এই পৃথিবীতে তার জন্য ভালো কোন কিছু নেই।বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো মানুষ সমাজ থেকে, পরিবার থেকে, এমনকি শেষ পর্যন্ত নিজের থেকেও। এখানে মানুষের ঈশ্বর বলতে আলাদা কিছু নেই। তার কাছে পুঁজি এবং পুজি উদ্ভুত বস্তু পাওয়ার লালসাই ঈশ্বর হয়ে গেছে। তার বাসনা, দামি গাড়ি, দামি বাড়ি, ভালো থাকা, ভালো খাওয়া এবং সেটা একান্ত নিজের। একঘেয়ে অনিচ্ছার জীবন মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে। আধুনিক মানুষ মানুষ একা, বিচ্ছিন্ন, পরিত্যাক্ত। ব্যক্তিগত নিরাপত্তা মাঝেই সবাই চোখ বুজে আছে। করোনা ভাইরাসের মহামারীর এই দিনগুলোতে, ক্রমাগত ঘরে থাকতে মানুষের বন্দি লাগছে। অনেকে ডিপ্রেশনে ভুগছেন। ইউরোপ আমেরিকায় সুইসাইডের হিরিক লেগেছে। কদিন আগে জার্মান অর্থ মন্ত্রী সুইসাইড করলেন।

আধুনিক মানুষ তো চিরকালই বিচ্ছিন্ন। এমনকি আধুনিকতার সংজ্ঞাতে বিচ্ছিন্নতাবোধ আলাদা বৈশিষ্ট্য নিয়ে হাজির। তাদের সামনে থ্রি ডাইমেনশনাল মুভির মতো দুটি আলাদা রকম মায়া বাস্তবতা পর্দা, সিসিফাসের জীবন এবং তাদের ভাগ্য। আধুনিক মানুষের আশ্রয় ছিল না, আশ্রয় থাকে না । কারণ তার বিশ্বাস আর ভালোবাসা ন্যাস্ত বস্তুতে।

বস্তুবাদ পৃথিবীতে পৃথিবীকে উপহার দিল সর্বোত্তম সম্পদ বৈষম্যের। পৃথিবীতে পাঁচ পার্সেন্ট লোকের হাতে কুক্ষিগত হয়ে গেলো পৃথিবীর প্রায় সকল সম্পদ এবং সেই সম্পদের ভাগ- বাটোয়ারা নিয়ে পৃথিবীর পরাশক্তিদের মধ্যে লড়াই চললো। দুটি বিশ্ব যুদ্ধ হলো। কোটি কোটি মানুষ মারা গেলো। এবং এরপরেও বিভিন্ন নামে দুনিয়ার সব প্রান্তে নির্বিচারে মানুষকে খুনের উৎসব চললো। এসব করলেন তাঁরা, সেই সব পরাশক্তি যারা কিনা বিজ্ঞান, বস্তুবাদ এবং সেকুলারিজমের নামে সারা পৃথিবীতে গণতন্ত্র, মানবতার একমাত্র ডিলারশিপ এর কাজ করে চলেন ।

পৃথিবীতে আর সকল মানুষের জীবনের চাইতে ্সেই সব পরাশক্তি এবং তাদের দেশের মানুষের জীবন অতিরিক্ত নিরাপদ বা মূল্যবান নয়- এটা ভাবতে তার ব্যর্থ হয়েছেন। শুধু দেশে দেশে নয়, প্রতিটি মানুষের মাঝে গড়ে উঠেছে বিচ্ছিন্নতার কারা দেয়াল । পৃথিবীতে মানুষ যে সম্মিলিতভাবে একটা মানব সভ্যতা রচনা করেছে মানুষকে ভুলিয়ে দেওয়া হলো উৎপাদনশীলতা আর উন্নয়নের নামে। মানুষকে এটা বোঝানো হলো, তার এই আত্মমগ্ন থাকা- এটাই সবচেয়ে বেশি উৎপাদনশীল । মানুষকে বলা হলো সে মুক্ত এবং এর পরেই তার সামনে নানা রকম বিলাসব্যসন এর লালসা ছড়িয়ে তাকে বন্দী করা হল বাসনা এবং কামনার সহজ শৃংখলে।

ছয়

“করোনা ভাইরাস মহামারী কেবল বাজারকেন্দ্রিক বিশ্বায়নের সীমাবদ্ধতাই উম্মোচন করছে না, এটি তথাকথিত রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের উপর জোর দেয়া ‘আমেরিকাই প্রথম’-এর মত লোকরঞ্জনবাদী জাতীয়তাবাদ নীতির দগদগে ঘা-ও বিশদভাবে উম্মোচিত করছে, যদিও দেখা যাচ্ছে এই সংকটে খোদ আমেরিকাও আন্তর্জাতিক সমন্বয় এবং সহযোগিতা ছাড়া বাঁচতে অক্ষম।-স্লাভোয় জিজেক

‘আধুনিকতা’ নামে যে ধারণাটি পৃথিবীতে গড়ে উঠেছিল তা মানুষকে জানিয়েছিল, মানুষের জীবনকে সুস্থির করার জন্য একটি উন্নত রাষ্ট্র উপহার দিবে আধুনিকতা।বলেছিল, মানবতা, ব্যক্তি-স্বতন্ত্র, উন্নয়ন, প্রগতি এমন কিছু চটকদার শব্দ। স্বপ্ন দেখেছিল মানুষকে দুনিয়াতেই ধর্ম গ্রন্থে বর্ণিত সেই স্বর্গ উপহার দিবে সে।

আধুনিকতার ওয়াদা ছিল মানুষকে বিজ্ঞান চর্চার মাধ্যমে ঈশ্বরের অস্তিত্বকে ভুলিয়ে দিবে, কিন্তু আজ পাশ্চাত্যের দেশে দেশে আমরা দেখতে পাচ্ছি বিজ্ঞানের উৎকর্ষের শীর্ষে থাকা সব দেশগুলোর রাষ্ট্রপ্রধানদের আর্তনাদ; তারা বলছেন, ‘পৃথিবীর সব সমাধান শেষ হয়ে গেছে, সমাধান এখন কেবল আকাশের কাছে’।

আমরা দেখেছিলাম আধুনিকতা মানুষকে আত্মা থেকে ভুলিয়ে তার দেহের প্রতি মনোনিবেশ করতে অনুপ্রাণিত করেছিল। কিন্তু আজ প্রমাণিত হয়ে গেছে চিকিৎসা বিজ্ঞানের তথাকথিত উন্নতির সর্বোচ্চ সীমানাতে এই একবিংশ শতাব্দীতে একটি ভাইরাস এর কাছে গত প্রায় চারশত বছরের বস্তুগত দর্শন, বিজ্ঞান, চিকিৎসা বিজ্ঞান সমস্ত ধারণা ব্যর্থ হয়েছে।

পরকালের জীবন ভাবনাকে ভুলিয়ে দেওয়ার জন্য যেই অবকাঠামোগত উন্নতি হয়েছিল সারা বিশ্বজুড়ে, সেই অবকাঠামোর সবটুকুই মানুষের প্রাণ বাঁচানোর জন্য আজ অপ্রতুল মনে হচ্ছে। আমরা দেখতে পাচ্ছি মৃত্যুর ভীতি মানুষকে পশুদের মতো করে ঘরে ঢুকিয়ে ফেলেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যখন কোন রকম নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে জংলি আইনে পৃথিবীর যেকোন স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের উপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স সহ সব পরাশক্তি সমূহ নির্লজ্জভাবে আগ্রাসন চালিয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা করেছে, তখন অন্য সব দেশ ভক্তিতে অথবা নিজস্ব নিরাপত্তা ভীতিতে চুপ করে ছিল। প্রত্যেকে ভেবছিল কেবল নিজস্ব সম্পদ এবং নিজেদের নিরাপত্তা্র কথা। আজ দুনিয়ার প্রতিটি দেশের দুয়ারে মৃত্যুর ঘণ্টা ধব্বনি।

মানব প্রজাতি সংযুক্ত একটিই প্রজাতি, প্রকৃতির সবকিছুর সাথে মানুষের দেহ এবং আত্মা যেমন লীন এবং পৃথিবীর সব মানুষের নিরাপত্তা এবং বাঁচার অধিকার একই, সবার জীবনের দাম সমান- এই সত্য ভুলে গিয়েছিল অনেকে। মানুষ তার তথাকথিত আধুনিক সভ্যতা তৈরি করার জন্য নষ্ট করেছে প্রকৃতি, বাতাস, পানি, ওজোন স্তর, ক্রমাগত ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে দুই মেরুর বরফ গলে যাচ্ছে, বেড়ে যাচ্ছে সমুদ্রের পানির উচ্চতা, বনাঞ্চল ক্রমে ছোট হয়ে আসছে, পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাচ্ছে অসংখ্য প্রজাতির প্রাণী ও উদ্ভিত। আধুনিক মানুষ স্বপ্ন দেখে খুব বড় একটি শহরে মাত্র কয়েক’শ স্কয়ার ফিটের একটি ফ্ল্যাটে কীটপতঙ্গ, পশুর মতো একটা জীবন যাপনের।

মানুষের ভবিষ্যৎ কি, তার গন্তব্য কোথায়, সে কোথা থেকে এসেছে, সে কোথায় যাচ্ছে- এই সব মৌলিক চিন্তা ও দর্শনের বাইরে বস্তুবাদী দর্শন আর বিজ্ঞানের যে উন্নতি মানুষকে এতদিন নিরাপত্তা, বিশ্বাস আর প্রেরণা যুগিয়েছে, সেই বিজ্ঞান যখন পরাজিত হয়ে যায় কোন অদৃশ্য ছোট অণুজীবের হাতে, তখন পৃথিবীতে গড়ে ওঠা মানুষের নকল সভ্যতার সমস্ত আবরণ খসে পড়ে।

অন্য সব মহামারীর মতো এই মহামারীও হয়ত একদিন চলে যাবে, কিন্তু আত্মমগ্নতার বিচ্ছন্নতার আর বাসনার যে ভাইরাস মানুষ লালন করে আপন মনে তা নির্মূলের কোন ভ্যাকসিন কি মানুষ খুঁজে পাবে কখনো?

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন