বুধবার, ১৫ জুন ২০২১; ১১:১৭ অপরাহ্ণ


‘দেয়ার আর পিরিয়ড ইন হিস্টরি ওয়েন কুলিং ইস দা বেস্ট মিনস অফ কম্মুনিকেশন’- এই হামাগুড়ি দেওনের পাল্লায় ইন্টেলেকচুয়ালরা সকলের আগে থাকে’ – অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক

দেশ কোন বিমূর্ত ধারণা না। এর মানচিত্র আছে , মানুষ আছে , পরিচালনা পদ্ধতি আছে। নিজের সুবিধার জন্যই মানুষ নিজের মতো করে দেশ গঠন করে। সুবিধার প্রাপ্তি আর প্রত্যাশায় বেশি পার্থক্য হলে দেশ ভেঙ্গে নতুন দেশ গড়ে। দেশ মানষের চিন্তায় সর্বদা ভাঙা-গড়ার মাঝেই থাকে, এটা চিরন্তন কিছু না।তাই যারা বলেন আমি দেশের কাছে সুবিধা চাই না, কেবল জনগণের সেবা করতে চাই, তাদের সাথে দেশের লুটপাট তন্ত্রের গোপন আঁতাত আছে, তারাই সুবিধাবাদী আর দেশ বিরোধী। অবশ্যই আমি দেশের কাছে সুবিধা চাই, অন্তত যেই সকল শর্তে দেশ গঠন হয়েছিল সেগুলো। তা নাহলে দেশ দিয়ে আমি কি করব?

এটা তো গেলো ব্যক্তিগত হিসেব। কিন্তু ব্যাক্তির স্বতন্ত্র চাওয়া-পাওয়ার বাইরেও সমাজের আর সব মানুষের চাওয়া পাওয়া থাকে। সামাজিক সেই সব মানুষের মধ্যে সামান্য সুবিধা ভোগী ব্যতিরেকে প্রায় সবাই শিক্ষা ও সুবিধা কেন্দ্রিক সিস্টেমের কবলে পড়ে নিজেদের অধিকার বা প্রাপ্তির হিসেব বোঝেন না। এবং তাঁদের প্রাপ্তির পথে অন্তরায় যেই দানবীয় সিস্টেম অস্তিত্বমান, সেটার অপকৌশল ও অপতৎপরতা সম্পর্কে উদাসীন। এমনকি সেই সিস্টেমকে যে প্রশ্ন করা যায়, সেটার পরিবর্তন সমাজের মানুষের ইচ্ছের অধীন, সে সম্পর্কেও বেশিরভাগ ‘সাধারণ মানুষ’ সচেতন নন। প্রশ্ন জাগে তাহলে এই সব অসেচেতন অশিক্ষিত দুর্বল মানুষদের অধিকারের দাবিকে রাস্ট্রের কাছে নিয়ে যাবে কে? কে সমাজের দাবিকে, মজলুমের দাবিকে আপন কন্ঠে ধারণ করবেন? এই মহৎ কাজ যিনি করতে পারবেন তিনিই ‘বুদ্ধিজীবী’- এটা মোটা দাগের কথা। এছাড়া দুনিয়ায় বুদ্ধিজীবীর নানান সংজ্ঞা ও সূত্র তো রয়েছেই।

“দ্যা রেস্পন্সিবিলিটি অফ ইন্টেলেকচুয়াল” নামে একটা প্রবন্ধ আছে- নোয়াম চমেস্কির লেখা! ১৯৬৭ সালে ভিয়েতনাম যুদ্ধে আমেরিকার তাবত দালাল বুদ্ধিজীবীরা মার্কিন প্রশাসনকে যখন সমর্থন জানায়- সেই প্রেক্ষিতে মূলত এটি লেখা! ১৯৬৭ সালের ২৩শে ফেব্রুয়ারি নিউইয়র্ক টাইমস এ এটি প্রথম প্রকাশিত হয়!


বুদ্ধিজীবী কারা- সেই প্রশ্নে মোটা দাগে কিছু কথা সেখানে বলা যা আমার পূর্বোক্ত কথা সাক্ষী হিসেবে পেশ করা যায়। চমেস্কির মতে বুদ্ধিজীবির অনেক গুলো বৈশিষ্ট্যের মধ্যে অন্যতম হলো- “বুদ্ধিজীবী তিনিই, যার সাথে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব থাকবে “। কারণ ক্ষমতা চিরকাল দুর্বল, অসহায় ও অসচেতন মানুষের অধিকারকে দলিত করে! বুদ্ধিজীবীর কাছে নিপীড়িত ও মজলুমের অধিকার আমানত হিসেবে থাকে! তাই ক্ষমতার সাথে বুদ্ধিজীবীর দ্বন্দ্ব চিরন্তন সব দেশে, সব কালে!

দুই
“The intellectuals role generally is to uncover and elucidate the content, to challenge and defeat both an imposed silence and the normalied quiet of unseen power. Where ever and whenever possible.” – এডওয়ার্ড সাঈদ


সাধারণভাবে ‘বুদ্ধিজীবী’ শব্দটির মাধ্যমে সামাজিক ও রাষ্ট্রিক সংকটকালে ‘বৌদ্ধিক পরামর্শ দান ও যথার্থ দিকনির্দেশকারী পণ্ডিত’ বোঝানো হয়। এঁদের বোঝাতে রাশিয়ায় উনিশ শতকের ষাটের দশকে প্রথম ‘intelligentsia’ শব্দটি ব্যবহৃত হত। তখন রাশিয়ার একটি গোষ্ঠী হিসেবে তাঁরা নিজেদের বিদ্বৎসমাজের সদস্য বোঝাতে এ শব্দটি ব্যবহার করতেন। মজার ব্যাপার হলো তাঁদের এই স্বাতন্ত্র্যসূচক আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গি Nikolay Chemyshevsky-র কাল্পনিক উপন্যাস Chtodelat (১৮৬৩) দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়।

উপন্যাসটির শিরোনামের অর্থ ‘কি করণীয়?’। এটি পড়ে বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় ঘোষণা করেন যে, সমাজতন্ত্রের প্রচারে সাহিত্য একটি কৌশল হওয়া উচিত। ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে রাশিয়ার ক্ষমতা দখলকারী লেনিন ও স্টালিনসহ বিখ্যাত বলশেভিক নেতাদের অনেকেই এই সম্প্রদায়ের সদস্য ছিলেকিন্তু টলস্টয়, দস্তয়েভস্কি এবং চেখভের মতো রাশিয়ার সবচেয়ে খ্যাতিমান লেখকদের অধিকাংশই ‘বৌদ্ধিক অসহিষ্ণুতা, অতিশয় তত্ত্বপ্রিয়তা এবং বিপ্লবের পক্ষে উপযোগিতা বিচারে নৈতিকতাকে মূল্যায়ন’ করার কারণে এই বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের নিন্দা করতেন।

Oxford English Dictionary শব্দটিকে সংজ্ঞায়িত করেছে: ‘The class consisting of the educated portion of the population and regarded as capable of forming public opinion.’ কিন্তু পরবর্তীতে বুদ্ধিজীবী শব্দটির ব্যাপক অর্থ গোড়ে ওঠে। বুদ্ধিজীবী’ শব্দটির বিস্তার ও ব্যাপ্তি নিয়ে ব্রিটিশ সমাজতাত্ত্বিক ও ইতিহাসবিদ রেমন্ড উইলিয়ামস বলেছেন : “বিংশ শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত বুদ্ধিজীবী, বুদ্ধিজীবিতা ও বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় শব্দগুলোর ব্যবহারের ক্ষেত্রে অসুবিধাজনক হলেও ইংরেজি ভাষায় এসবের যথেষ্ট প্রভাব ছিল, এবং সে প্রভাব এখনও বিদ্যমান।\\”

অ্যান্টোনিও গ্রামসি তাঁর ‘Selections from Prison Notebooks’ বইয়ে বুদ্ধিজীবীদের সম্পর্কে লিখেছিলেন, “সমাজের সকলেই বুদ্ধিজীবী এক অর্থে কিন্তু খুব কম জন এই বুদ্ধিজীবীর দায়িত্ব পালন করে থাকে”। এর অর্থ , ‘বুদ্ধিজীবী হয়ে ওঠা’ ও ‘বুদ্ধিজীবী হয়ে থাকা’ এই দুইয়ের মধ্যে অনেক পার্থক্য বিরাজ করে। গ্রামসী সুন্দর করে এর ব্যাখ্যা হাজির করেছেন এই ভাবে যে, ‘সমাজে যে স্থিতিবস্থা সেটা বজায় রাখতে যে বুদ্ধিবিত্তিক তৎপরতা প্রয়োজন, এসব যারা পুরণ করেন কিন্তু সামাজিক পরিবর্তনের প্রয়োজনে বা সমাজের মানুষের অধিকারের আকাঙ্খায় যারা প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারেন না’- তাঁদের সত্যিকার বুদ্ধিজীবী বলা সঙ্গত হবে না। এঁদের তিনি বলছেন সনাতন (কনভেনশনাল)বুদ্ধিজীবী।
গ্রামসী তাঁর লেখায় আরেক শ্রেনীর বুদ্ধিজীবীকে এনেছেন যারা নিজের শ্রেণীর বাইরেও সমাজের বৃহত্তর মানুষের আশা আকাঙ্ক্ষা কে ধারণ করেন ও তাঁদের সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্নের আকাঙ্খাকে বাস্তব করার জন্য কাজ করে যান। এঁদের তিনি বলেছিলেন সতিক্যার বুদ্ধিজীবী(অর্গানিক বা জৈবিক ও বলা যায়)। জৈবিক বুদ্ধিজীবীরা প্রধানত পূঁজিবাদী সমাজের ভাবাদর্শিক আধিপত্যবাদীতার বিপরীত ভাবাদর্শ (counter hegemo) তৈরি করতে পারেন।


আধুনিক বিশ্বের অন্যতম বুদ্ধিজীবী এডওয়ার্ড সাইদ বুদ্ধিজীবিতার নৈতিক অবস্থানে অনেকটাই চমেস্কির মতোই বা তাঁর চেয়েও আক্রমনাত্মক। তিনি সে সব লোকদের বুদ্ধিজীবী বলতেই রাজি নন ‘যারা সমাজের স্থিতি অবস্থার বিপরীতে কোন প্রশ্ন উত্থাপন করেন না’। তিনি মনে করতেন একজন বুদ্ধিজীবীর অবশ্যই প্রশ্ন করতে হবে সমাজের নানান অবস্থার বিষয়ে শোষক ও শাসক শ্রেণীকে এবং এসব প্রশ্ন উদ্দেশ্যহীন নয়’। এসব প্রশ্নের ভিতর দিয়ে সমাজের ন্যায় অন্যায় ও শোষণের কাঠামো সম্পর্কে তিনি স্পষ্ট ধারণা তৈরি করবেন। এবং সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে নীতি নির্ধারনী সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে তিনি উদাসীন বা নিরপেক্ষ থাকতে পারেন না।


কিন্তু কোন প্রক্রিয়ায় বুদ্ধিজীবী কাজ করে সেটা নিয়ে সাঈদের অবস্থান অনেকটাই গ্রামশির থেকে ভিন্ন। এডওয়ার্ড সাঈদ ‘Representations of the Intellectuals’ বইয়ে বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন। তিনি গ্রামসি ও জুলিয়ান বেন্দার বইয়ের বুদ্ধিজীবী বিষয়ের আলোচনাকে উদ্বৃত করে বুদ্ধিজীবীদের সম্পর্কে বিশদ ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেন: “প্রকৃত বুদ্ধিজীবীদের কর্মকাণ্ড ব্যবহারিক উদ্দেশ্যে সাধনের লক্ষ্যে নয়। তাঁরা আনন্দ খোঁজে শিল্প, বিজ্ঞান কিংবা দর্শনের মধ্যে… প্রকৃত বুদ্ধিজীবীরা সমাজ-বিচ্ছিন্নতা ও নিষ্ঠুরতার মধ্যেও ঝুঁকি নেবেন।…তাদের আপসহীন ব্যক্তি হতে হবে। বুদ্ধিজীবীদের ব্যক্তিত্ব হবে উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন।” আধুনিক ইতিহাসে প্রত্যেকটা বিপ্লব ও সমাজ পরিবর্তনের আন্দোলনে বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকাকে চিহ্নিত করে তিনি বুদ্ধিজীবীদের ‘বিপ্লবের প্রাণ’ বলে উল্লেখ করেছেন।
গ্রামসি এবং এডওয়ার্ড সাঈদের মতো তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে না হলেও ভারতীয় সামাজিক ইতিহাসবিদ বিনয় ঘোষ ‘বাংলার নবজাগৃতি’ এবং ‘বাংলার বিদ্বৎসমাজ’ বইগুলোতে ভারতবর্ষের শিক্ষিত জনগোষ্ঠী তথা বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার সঙ্গে যুক্ত বুদ্ধিজীবী শ্রেণি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।

তিন

বুদ্ধিজীবী সমাজেই বাস করেন।কিন্তু তিনি আর যাই হোন না কেন নিরপেক্ষ নন, নিরপেক্ষ হতে পারেন না। রাষ্ট্র ও সমাজের ভেতরে সর্বদা দ্বন্দ চলছে প্রবলের সাথে দূর্বলের। সেখানে নিরপেক্ষা থাকা আত্ম প্রতারনা বটেই, হয়তবা আত্মহননও। কেননা দূর্বলের পক্ষে না থাকার অর্থই হচ্ছে প্রবল যে অত্যাচার চলছে সেটাকে মেনে নেওয়া। এই মেনে নেওয়া আর সমর্থন করার মাঝে দুরত্ব আর কতই বা। ( বুদ্ধিজীবীদের কাজ কর্ম ও দায় দায়িত্ব / অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চোধুরী)।

জ্যা পল সাত্রে ১৯৮০ সালে মৃত্যুবরণ করেন! সময় ছিল মধ্যরাতের কিছু পরে! আনুমানিক রাত দেড়টার দিকে! তাঁর মৃত্যু সংবাদ যখন সংবাদপত্র অফিস এ আসে তখন পত্রিকার গুলো ছাপানোর কাজ চলছিল! সংবাদ আসা মাত্র সব পত্রিকার প্রথম ও শেষ পাতার মেকআপ নতুন করে করতে হয়েছিল! কালো বর্ডার দেয়া প্রথম ও শেষ পাতা জুড়ে ছিল সাত্রের মৃত্যুর সংবাদ! পরদিন সকালে প্যারিসের সব পত্রিকা দেরি করে বের হয়েছিল।


দেরি হওয়ার প্রধান কারণ ছিল এলিসি প্রাসাদ থেকে প্রেসিডেন্ট এর শোকবার্তা আসতে বিলম্ব হচ্ছিল! প্রেসিডেন্ট ছিলেন ভালেরি জিস্কারড দ্যা’স্তা। কাঁচা ঘুম থেকে উঠে বিহবল প্রেসিডেন্ট তাঁর ব্যক্তিগত সহকারীকে ডিকটেশন দিতে শুরু করলেন। এর পরে লেখা হয় সেই বিখ্যাত শোকবার্তা। “সারাজীবন প্রতিষ্ঠান ও প্রথাবিরোধী ছিলেন এই মহান দার্শনিক। প্রেসিডেন্ট হিসেবে আমি তাঁর মৃত্যুতে শোকবাণী দিলে তাঁর নীতি আদর্শের প্রতি অসম্মান জানানো হবে। এসব আনুষ্ঠানিক সম্মান তিনি কখনো পছন্দ করেননি। তাঁর মৃত্যুতে আমি শোক প্রকাশ করতে পারি শুধু তাঁর একজন ছাত্র ও পাঠক হিসেবে। রাষ্ট্র প্রধান হিসেবে শোক প্রকাশ হবে ঔদ্ধতের সামিল!”

দীর্ঘ শোকবার্তার শেষে তিনি লেখেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটা , ‘সাত্রে নিরপেক্ষ ছিলেন না, সব সময় একটা সাইড নিতেন’।

সাত্রের মতো মানুষেরা কেন পক্ষ নিতেন এবং কার পক্ষ নিতেন?সাত্রে সারাজীবন জাতীয় বা আন্তর্জাতিক এবং আন্ত রাষ্ট্রীয় প্রশ্নে তিনি সর্বদা একটা পক্ষ নিতেন সাবলীল ভাবে!এমনকি যখন দেখতেন তাঁর রাষ্ট্র অন্যায় করছে তিনি একটা পক্ষ নিতেন। অন্যায়কারী নিজের রাষ্ট্রের বিরুদ্ধেও দাঁড়াতে দ্বিধা করেননি। প্রবলকে দুর্বলের ওপর অবিচার করতে দেখলে প্রবলের বিরোধিতা করেছেন সর্বশক্তি দিয়ে!সাত্রে তাই তার অনেক পরিচয়ের বাইরেও বুদ্ধিজীবী হিসেবে আলাদা সম্মানের জায়গায় আছেন।


যে কোন ঘটনায় বুদ্ধিজীবীকে একটা পক্ষ নিতেই হবে! তার বিবেক বুদ্ধি দিয়ে যেটা ন্যায় মনে হয় , সেই পক্ষ!সেই পক্ষ ঠিক না ভুল সেটা সময় নির্ধারন করে, কিন্তু পক্ষ নিতে হবে। কারণ নিরপেক্ষতা মানে সুবিধাবাদিতা, অপেক্ষা করা কে জেতে, যে জিতবে সুবিধাবাদী তার সাথে! এই সুবিধাবাদী অবস্থান এর সাথে বুদ্ধিজীবীর সার্বিক সংজ্ঞা ও কার্যক্রম সাংঘর্ষিক।

এটি বলার অপেক্ষা রাখে না যে বুদ্ধিজীবীর কাজ মোটেই রাজনীতি বা সমাজ বিচ্ছিন্ন নয়। চরিত্রগত ভাবেই বুদ্ধিজীবী একজন সামাজিক মানুষ, কিন্তু সমাজে বুদ্ধিজীবীর কাজ অন্যান্য সামাজিক থেকে কিছুটা আলাদা রকমের। তিনি সামাজিক ক্ষমতার আজ্ঞাবাহী বা ভারবাহী নন। সমাজের অন্ধকার, অন্যায় ও অসুন্দরকে তিনি মেনে নিতে চান না। বদলাতে চান একে অনেক ভাবে।এবং সেই লক্ষ্যে কাজ করেন বা করতে চান।হয়ত সেই কাজ অনেক সময় সামাজিক প্রভাব বলয়ের জন্য হুমকি স্বরূপ।

ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা থাকে সকল রাজনীতির কেন্দ্রে। সামাজিক সংস্কারবাদীরাও চান ক্ষমতা ও সম্মান। বুদ্ধিজীবীর কাজ ক্ষমতা নিয়ে নয়, ক্ষমতার প্রয়োগে সাধারণের হক নিশ্চিত করার জন্য কাজ করা। তার লক্ষ্য হচ্ছে মানুষের মুক্তিকে ত্বরান্বিত করা এবং লক্ষ্য অর্জনের জন্য কাজ করা। এক কথায় বলতে গেলে মুক্তির যে আন্দোলন সমাজে চলে তিনি তার সাথে যুক্ত। যদিও শেষ পর্যন্ত মুক্তি ব্যাক্তিরই, কিন্তু সেই মুক্তি কিছুতেই সম্ভব নয় সমষ্টির মুক্তিকে বাদ দিয়ে। অসচেতন, নিপীড়িত সাধারণ মানুষের মুক্তির স্বপক্ষ্যে যেই পরিবর্তন অনুভূত হয় সমাজ ও রাষ্ট্র কাঠামোর ভিতর থেকে, বুদ্ধিজীবী সেই পরিবর্তনকে জনগণের কন্ঠস্বরে রূপ দেন এবং মুক্তির সামাজিক আন্দলনের অংশ হয়ে থাকেন আমৃত্যু, যেহেতু সমাজ মুক্তির এই আন্দোলন এক বহমান প্রক্রিয়া।

চার

নোয়াম চমস্কি একবার সুইডেনে গিয়ে দেখেন ট্যাক্সি ড্রাইভেরা একটু বেশি আন্তরিক। তার ব্যাপারটা একটু অন্যরকম লাগল। তিনি একজনকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী ব্যাপার? আপনারা সবাই এতো আন্তরিক আচরণ করছেন কেন?’ তখন ড্রাইভারটি তার শার্ট খুললেন। নিচে ছিল একটি টি-শার্ট এবং সেখানে চমস্কির ছবি ও একটি কথা যেটি ‘কুওট শিক্ষা আন্দোলন’ নিয়ে করা চমেস্কির উক্তি। ড্রাইভার জানালেন এখানকার সব ড্রাইভার এই টি শার্ট পরে আছেন। এরপরে কুওটে শিক্ষাব্যবস্থার সমালোচনা ( effective education, effective indoctrination.) করতে থাকা চমস্কিকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, ‘তাহলে সমাজের স্বাধীন চিন্তার লোকেরা সব কোথায়?’ চমস্কি উত্তর দিয়েছিলেন, ‘তারা সবাই ট্যাক্সি চালান’।

উপরে আলোচিত প্রায় সর্বজন স্বীকৃত বুদ্ধিজীবীর আদল ও গড়ন এর ব্যতিক্রম সারা বিশ্বের মতই আমাদের দেশেও প্রায় লক্ষ্য করা যায়। চমেস্কির সংজ্ঞানুসারে বুদ্ধিজীবী আমাদের দেশে বিরল। কেবল আমাদের দেশ নয় বা উন্নয়নশীল দেশ নয়, তথাকথিত উন্নত বিশ্বেও অধিকাংশ বুদ্ধিজীবী ক্ষমতার সাথে আম-দুধের মতো মিশে আছেন!

ক্ষমতা তার চরিত্রগত ও অন্তর্গত ভাবেই ভীষণ একগুঁয়ে ও উদ্ধত। সে তার দাপটে ভঙ্গিতে অভ্যস্ত। এই অভ্যস্ততায় যে কোন ভিন্ন মতকে লোভ দেখিয়ে বা ভয় দেখিয়ে বোবা করে রাখতে চায়। বুদ্ধিজীবী মাত্রই রাজনীতি ও সমাজ সচেতন। এই রাজনীতি সচেতনতা ও সমাজ মনস্কতার দরুন বুদ্ধিজীবীর দ্বন্দ বাঁধে রাষ্ট্রের ও ক্ষমতার সাথে। বুদ্ধিজীবী ক্ষমতার লোভ ও ভয়ের বাইরে এসে আপন বিবেকের দায়ে সর্বদা মজলুম ও দেশের জনস্বার্থ মুখী অবস্থান গ্রহণ করেন।

জনস্বার্থ পরায়ণ সক্রিয় বুদ্ধিজীবীতার বাইরেও ‘জনস্বার্থ বিরোধী’ সক্রিয় বুদ্ধিজীবীতার প্রবণতা আজ সারা বিশ্বেই লক্ষ্যনীয়। একটা নির্দিষ্ট ক্ষমতা, অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামো কেবল বল প্রয়োগের মাধ্যমেই টিকিয়ে রাখা যায় না, এর জন্য জনমত তৈরি, এমনকি যদি তা ‘গোয়েবলসীয়’ হয় তবুও, সেটার জন্য ক্ষমতার দরকার কিছু ‘পোষা বুদ্ধিজীবী’। এঁরা রাষ্ট্রের যাবতীয় শোষন ও জনবিরোধী কাজের নায্যতা তৈরির চেষ্টা করে রাস্ত্রীয় সুবিধা ব্যবহার করেই।

এমনকি নিষ্ক্রিয় বুদ্ধিজীবীও সমাজে থাকা অবাস্তব কিছু নয়। এসব বুদ্ধিজীবী আপন দলের স্বার্থের পক্ষে সরব হলেও দলের কোন ভুল বা সাধারণ মানুষের এমন কোন অধিকার যা নিজ দলকে বেকায়দায় ফেলে সে সম্পর্কে আপন স্বার্থে চুপ করে থাকে।

পাঁচ

সমাজে মানুষের কাছে মানুষের পৌছানোর অন্যতম উপাদান ভাষা। এই ভাষা যেমন শ্রেনী নিরপেক্ষ না, যেমনি নিরপেক্ষ নয় বুদ্ধিজীবীর দায় ও দায়িত্ব। এই ভাষা নির্মান এবং এর ব্যবহারের যে রাজনীতি সেখান থেকেই আমরা পাই সমাজ পরিবর্তনে সক্রিয়, জনস্বার্থ বিরোধী এবং নিষ্ক্রিয় বুদ্ধিজীবীর ভূমিকা। সমাজের বেশিরভাগ বুদ্ধিজীবী যারা প্রকাশ্যে সত্য বলতে চান বা বলতে বাধ্য হন, তাঁদের ভাষা জটিলতার কারণে সমাজে বিভ্রান্তি আরও বাড়ে। এমনকি অনেক সত্যও কেবল ভাষার কারণে অর্ধ সত্যে পরিণত হয়। আর কে না জানে অর্ধ সত্য মিথ্যার চেয়েও জঘন্য।


এই ভাষা জটিলতাকে লুকানোর জন্য বুদ্ধিজীবীগণ ব্যবহার করেন ‘উত্তরাধুনিক’ ভাষার ছদ্মবেশ। আমাদের দেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশে উত্তর আধুনিকতার ধারণা যেখানে শিক্ষিত সমাজে প্রায় ‘ফ্যাশন’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়, সেখানে বুদ্ধিজীবীরাও সত্যের ধারণার ‘এক বিমূর্ত সংজ্ঞা’ তৈরি করেন এবং সেটাও ফ্যাশন হিসেবে। যা জনগণের পক্ষে যে কোন সচেতন লড়াইয়ের প্রয়াসকে ব্যপক ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করে।

বুদ্ধিজীবীর কাজ কালের রাজনীতি ও সমাজতত্ত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে ভাষা বিচার করার যে পদ্ধতি পশ্চিমে (সেইসূত্রে আমাদের এখানেও) শক্তিশালী তা প্রত্যাখ্যান করা এবং সাংস্কৃতিক বিন্যাস ও বাস্তবতার ঐতিহাসিক পরম্পরার ভিত্তিতে বিচার বিশ্লেষণ করা।


বুদ্ধিজীবীকে শ্রেণীবিভক্ত সমাজে আপন শ্রেণীর বাইরেও তাঁর নৈতিক অবস্থান গ্রহণ করতে হবে। এ জন্য এটা জরুরী না যে বুদ্ধিজীবী মানেই শ্রেনীচ্যুত হবেন। বরং এর চেয়ে বেশি জরুরী সামাজ পরিবর্তনের জন্য কার্যকর সংকেত গুলোকে গণ মানুষের ভাষায় সমাজে ব্যাখ্যা প্রদান।

এক্ষেত্রে অনেক বুদ্ধিজীবী এসব সামাজিক প্রবণতা বুঝেও, এমনকি এসব প্রকাশের ভাষা জানা স্বত্তেও ক্ষমতার পক্ষ অবলম্বন করেন। উনিশ ও বিশ শতকের কলোনিয়াল দুনিয়ায় এর অগণন উদাহারণ রয়েছে।এর জন্য দূর প্রাচ্য বা আফ্রিকা বা ল্যাতিন আমেরিকায় যাবার দরকার নেই, তথাকথিত ‘বাংলার রেনেসাঁর ইতিহাসে’ এমন অনেক উজ্জ্বল উদাহরণ বিদ্যমান।

ছয়

প্রাচ্যে পশ্চিমের উপনিবেশী অবস্থান এবং উপনিবেশিত’র সামগ্রিক পরিস্থিতি পাঠ করার প্রক্রিয়ায় আমরা দেখি উপনিবেশী আগ্রাসনের সাথে পশ্চিমের সাংস্কৃতিক মনোভঙ্গি ও জ্ঞানচর্চার নিবিড় সম্পর্ক। বিশেষ ধরণের সাংস্কৃতিক প্রণোদণা ও জ্ঞানচর্চা পশ্চিমাদের মনে প্রাচ্যকে নিকৃষ্টরূপে দেখায়, প্রাচ্যকে কব্জা করতে ও বশ করতে প্ররোচণা যোগায়। এবং শাসিত দেশের কিছু গৃহপালিত বুদ্ধিজীবী তাদের কলোনিয়াল প্রভুদের প্ররচনা ও প্রচারনায় হাওয়া জুগিয়ে চলেন। পশ্চিমের এই জ্ঞান-কলুষ, নৈতিকতা বিবর্জিত সাংস্কৃতিক আধিপত্যকে এডওয়ার্ড সাঈদ বলেছেন ‘জ্ঞান ও ক্ষমতার শয়তানী জোটের সবচেয়ে বড়ো নমুনা, পৃথিবীর বেশিরভাগ মানুষের করুণতম এক কালপর্বের পেছনের অন্যতম কারণ’।

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তাঁর বইয়ে( বুদ্ধিজীবীদের কাজ কর্ম ও দায় দায়িত্ব / অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চোধুরী) আলোচনা করেছিলেন মার্টিন লুথার কিং ও রাজা রামমোহন রায় এর তুলনা। তিনি দেখিয়েছিলেন এই দুই শতকের দুই দেশের উল্লেখযোগ্য সমাজ সংস্কারক কিভাবে দুই বিপরীত ভূমিকা পালন করেছিলেন। অর্থাৎ বুদ্ধিজীবীর সামাজিক কাজ ও দায়িত্ব দুই আলাদা বিষয়। লুথার মার্টিন নিজে বাইবেলের অনুবাদ করেছিলেন। কিন্তু সেই অনুবাদের ভাষা ছিল আমেরিকার কৃষক সমাজের ভাষা, যাদের অধিকাংশই কালো চামড়ার। এটা শ্বেত ক্রিষ্ট সমাজ বা ভ্যাটিকানের অধিপত্যের বিরুদ্ধে এক বিদ্রোহই বলা যায়।

অন্যদিকে রামমোহন এর বেদের অনুবাদের ভাষা ছিল তৎসম বহুল বা ফোর্ট উইওলিয়াম এ হিন্দু শ্রেনীর জন্য নির্মিত নির্ধারিত ভাষায়। যা প্রকারন্তরে এই দেশে ইংরেজ কোম্পানির শাসনকে স্বীকৃতি প্রদান করে। শুধু তাই নয় রামমোহন ও লালন প্রায় সমসাময়িক হবার পরেও সেই সময় লালন এর ভাষা সাহিত্যের ভাষা হতে পারেনি কারণ লালন ক্ষমতার সীমা থেকে অনেক দূরে ছিলেন। অন্যদিকে রামমোহন কাজ করেছেন উপনেবেশিক কাঠামোর সীমার মাঝেই, যদিও সমাজ পরিবর্তনে তিনি কাজ করেছেন কিন্তু তাঁর সেই কাজ ক্ষমতার জন্য কোন হুমকি হয়ে আসেনি, বরং ক্ষমতাকে এক প্রকার বৈধতা তৈরি করতেই সহায়ক হয়েছে। এটা তাঁর চেতনাগত ব্যর্থতাও বলা যায়।

উনিশ শতকে বঙ্কিমচন্দ্র যে গদ্য লিখলেন তাঁর ভাষা ও প্রকরণ সাধারণ মানুষদের নিয়ে ছিল কিন্তু উদ্দেশ্য ছিল না সাধারণ মানুষ। বঙ্কিম নিজে বলেছিলেন, ‘তিনি সাম্য বা এ জাতীয় প্রবন্ধ ও তাঁর রচনা ও উপন্যাসে সমাজের যে চিত্র দেখিয়েছেন সেটার উদ্দেশ্য সমাজের পরিবর্তন নয়’। বরং তিনি লিখেছিলেন জমিদারদের উদ্দেশ্যে, যেন চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত কার্যকরের সুবিদার্থে জমিদারগণ কিছুটা সংশোধিত হন। নতুবা সমাজিক বিপ্লব অবশ্যম্ভ্যাবী। সরাসরি কৃষক স্বার্থের বাইরে গিয়ে জমিদার শ্রেণীর হিতাকাঙ্খী হিসেবে তার লেখা কাজ করেছে।

অর্থাৎ বঙ্কিমের সমাজ সচেতনতা বুদ্ধিজীবী সুলভ হলেও এর উদ্দেশ্য সামাজিক বিপ্লবের প্রতিকুলেই ছিল, যেন তাঁর আস্থাভাজন ইংরেজদের অনুমিত সামাজিক কানুন মিথ্যে হয়ে না যায়। এবং নতুন করে তৈরি হতে যাওয়া ‘আধুনিক বঙ্গীয় কাঠামো’ ভেঙ্গে না পড়ে। তিনি স্পষ্ট করে লিখেছিলেন ‘আমরা সামাজিক বিপ্লবের অনুমোদক নই’। একসময় বঙ্কিম তাঁর ‘সাম্য’ প্রবন্ধটি নোটিশ দিয়ে বাজার থেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন। সেখানে তিনি স্পষ্ট করে লিখেছিলেন , ‘এটি বেশি বিক্রি হয় বেশি মানুষ বোঝে বলে এটি ছাপানো বন্ধ করে দিয়েছি’।

এমনকি আমরা দেখবো মীর মোশারফ হোসেন ‘জমিদার দর্পন’ নাটক লিখলে বঙ্কিম সেটি্র ভাষার প্রশংসা করলেও প্রচার করতে বারণ করছেন।[এ ক্ষেত্রে বলে রাখা দরকার যে ভাষার প্রশংসা ছিল কেবল এ জন্য যে এটা মুসলমানি গদ্য নয়!] কারণ বঙ্কিমের ভাষায় এই বই কৃষক সমাজের যেই ক্ষোভ , বিশেষ করে তৎকালীন পাবনা ফরিদপুর অঞ্চলে যে কৃষক আন্দলন যেখানে ইন্ধন যোগাতে পারে।

সাত

তত্ব ও সেই সাথে বাস্তবিক জ্ঞান এই দুটি এক না হলে কোন কোন শিক্ষাই পূর্ণ হয় না। বুদ্ধিজীবী সেই সামাজিক মানুষ যিনি তাঁর সময়, সমাজ ও ক্ষমতাকে প্রশ্ন করবেন জন মানুষের অধিকার সাপেক্ষে, যিনি সমাজ ও ক্ষমতার অন্ধকার দিক সমূহকে উন্মুক্ত করবেন সর্ব সমুক্ষে , যিনি সময় ও সমাজের নৈতিক বিবেকের দুয়ার পাহারা দিবেন জীবন ও সম্মানের ঝুঁকি নিয়ে এবং যিনি ইতিহাস ও আপন অভিজ্ঞতার আলোকে সামাজিক মুক্তির নিজস্ব ব্যাখ্যা দিবেন।

বলাই বাহুল্য এসবে ঝুঁকি মারাত্মক বিশেষ করে আমাদের মতো দেশে যেখানে জাতীয় রাজনীতির বৃহত্তর ঐক্য প্রশ্নে সমাজ দ্বিধা বিভক্ত। এখানে যেই আদর্শিক দলই ক্ষমতায় থাক, তাঁদের দিকে প্রশ্ন তোলা মানেই ক্ষমতার বিরুদ্ধে কথা বলা অর্থাৎ ক্ষমতার শত্রুতে পরিণত হওয়া। এমন পরিবেশে কেবল বই লিখে বা একাডেমিকলি বুদ্ধিজীবীতায় দায় শোধ হয় না। এমনকি সেই একাডেমিক কাজ যদি জনস্বার্থ মুখীও হয় এবং কোন বুদ্ধিজীবী যদি সেটা বাস্তবায়নের চেষ্টা না করেন, তাহলে তিনি আসলে নিজের চৈতন্য বোধ বা ইতিহাস বোধকে ক্ষুন্ন করার সাথে সাথে আত্মমর্যাদা বোধকে ক্ষুন্ন করে নিজেরই বিরোধিতা করেন। তাই একাডেমিক কাজ বা বই লেখা বা অন্য কোন কাজ যাই থাক সেটা বুদ্ধিজীবীর সামাজিক দায়িত্ব পালনের অপারগতার অজুহাত কখনোই না। ইতিহাসে আমরা বড় বড় বুদ্ধিজীবীদের বড় সামাজিক দায়িত্ব পালন করতে দেখেছি, আর সেই উদাহরণ অবিরল।


এই দক্ষিণ এশিয়ায় একমাত্র সশস্ত্র সংগ্রাম করে স্বাধীন হওয়া দেশ বাংলাদেশ। স্বাধীনতার পরে আজ পর্যন্ত যে পথ এটি অতিক্রম করেছে সেটি আর যাই হোক মুক্ত স্বাধীন মত প্রকাশের অনুকুল বা প্রগতিশীল চর্চার নিরাপদ ক্ষেত্র যেমন হতে পারেনি, তেমনি এর শিক্ষা ব্যবস্থা কোন ক্রমেই ‘স্বতন্ত্র মত’ গড়ে তোলা বা শাসক দলের আধিপত্যের বিপরীতে অবস্থান গ্রহণের অনুকূলে নয়। যার ফলে সমাজে সার্বিক রাজনীতি বিমুখতার এক পরিবেশ বিরাজ করছে আজ পর্যন্ত।

এর প্রধান কারণ রাজনৈতিক দলসমূওহের বিরাজনীতি করণ। এখন রাজনৈতিক দল গুলোর একমাত্র লক্ষণই যেন ক্ষমতায় যে কোন প্রক্রিয়ায় ক্ষমতায় গিয়ে ব্যক্তিগত বিত্ত ও বৈভবের পাহাড় গড়ে তোলা, রাস্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে। আমরা লক্ষ্য করলে দেখবো যারা ক্ষমতায় যাবার মতো সাংঠনিক ক্ষমতা রাখে এমন দল সমূহের মধ্যে রাজনৈতিক কর্মসূচী , অর্থনৈতিক কর্মসূচী, দৃষ্টি ভঙ্গি এমনকি নৈতিকতার জায়গায় বড় মাপের গুণগত কোন পার্থক্য নেই। ভোগবাদী অর্থনীতির এই চরম ও পরম যুগে সব রাজনৈতিক দলগুলো যখন লুটতন্ত্রের নামান্তর হয়ে ওঠে, তখন জন অধিকার বা গণ আকাঙ্খার শেষ মশাল হিসেবে প্রতিরোধের স্বরকে কন্ঠ দেয়া বুদ্ধিজীবীর কর্তব্য।

কিন্তু এখন প্রশ্ন জাগে এই বহু শিক্ষায় বিভক্ত সমাজে কোন ভাষায় কথা বলবেন বুদ্ধিজীবী? তাঁর আপন মাতৃভাষায় নাকি শোষক শ্রেণীর প্রতীকী ভাষায়।ভাষা নিজেই এক প্রকার ক্ষমতা যেমন, ঠিক তেমনি ভাষা ক্ষমতা প্রকাশের এক প্রতীক । তথাকথিত উপনিবেশিক শাসনের অবসান হলেও এই নব্য উপনিবেশবাদের কালে ইংরেজীর মতো বিদেশি ভাষা এখনও ক্ষমতার ভাষা, পুজির ভাষা ও নব্য সাম্রাজ্যবাদের ভাষা। তাই সাধারণ পরিমাপেই যদি বুদ্ধিজীবীদের বুদ্ধিজীবীতার প্রকাশ আপন মাতৃভাষা ব্যাতীত অন্য কোন ভাষায় হয়, সেটা যেমন এক জন বিচ্ছিন্ন স্বার্থপর পরিমন্ডলেই ঘটে , তেমনি এই বুদ্ধিজীবীতার চর্চা সমাজের ক্ষমতার কাছের একদল মানুষের সংস্কৃতি চর্চার বিলাস ছাড়া কিছুই হয়ে উঠবে না।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন