শুক্রবার, ২ জানুয়ারি ২০২১; ১১:৪২ অপরাহ্ণ


ইসরায়েলী লেখক, ইতিহাসবিদ ও অধ্যাপক ইউভাল নোয়াহ্‌ হারারি। ছবিঃ এএফপি

প্রশ্নঃ আপনি হোমো দিউসএ লিখেছেন “আমরা যদি প্রকৃতপক্ষে দুর্ভিক্ষ, মহামারী ও যুদ্ধকে নিয়ন্ত্রণে আনতে থাকি…।” করোনা ভাইরাস মহামারীর বিস্তার যদি অক্ষুণ্ণ থাকে, আপনি কি এখনো বিশ্বাস করেন মানব জাতি ব্যাপকভাবে সংক্রামক মহামারীসমূহকে  বশে আনতে পেরেছে?

আমরা নিশ্চিতভাবে নতুন সংক্রামক রোগের উপস্থিতিকে প্রতিরোধ করতে পারি না। জীবাণুগুলো প্রতিনিয়তই প্রাণী থেকে মানুষে চলে আসে অথবা পরিব্যক্তির মধ্য দিয়ে যায়, যেটা তাদেরকে আগের চেয়ে অধিকতর সংক্রামক ও বিপজ্জনক করে তোলে। তারপরও আমাদের সংক্রামক রোগগুলোকে বশে আনার ক্ষমতা আছে, এবং লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা করা থেকে ও অর্থনীতিকে ধ্বংস করা থেকে এগুলোকে বিরত করার ক্ষমতা আছে।

আমাদের আজকের পরিস্থিতির সাথে বিগত সময়ের পরিস্থিতির তুলনা করা উচিত। প্রাক-আধুনিক যুগে যখন মহামারী ছড়িয়ে পড়তো, সে সময় মানুষের সাধারণত কোনো ধারণা ছিলো না এসব কেন হতো এবং কী করলে এসব বন্ধ করা যাবে। তারা সাধারণত সংক্রামক মহামারীর জন্য রাগান্বিত ঈশ্বর কিংবা কালো জাদুকে দোষারোপ করতো, আর সবচেয়ে ভালো যেটা করার কথা চিন্তা করতে পারতো তা হচ্ছে ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে  গণ-প্রার্থনার আয়োজন করা — যা অনেক সময় গণ-সংক্রমণের দিকে মোড় নিতো। ১৪শ শতকে ব্ল্যাক ডেথে যখন এশিয়া ও ইউরোপের এক-চতুর্থাংশ মানুষের মৃত্যু হলো, মানুষ কখনোই এর কারণ আবিষ্কার করতে পারেনি। ষোড়শ শতকের গুটি বসন্তে ও অন্যান্য প্রাদুর্ভাবে যখন আমেরিকার নেটিভ জনগোষ্ঠীর ৯০ শতাংশ পর্যন্ত মানুষ মারা গেলো তখন আজটেক, মায়া ও ইন্‌কা-দের কোনো ধারণাই ছিলো না কেন তাদের লক্ষ লক্ষ লোক মৃত্যুবরণ করছিলো।

বিপরীতক্রমে, যখন করোনা ভাইরাস মহামারী সংঘটিত  হয়েছে তখন বিজ্ঞানীরা মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে নতুন ভাইরাসটি সনাক্ত করেছেন, জিনোম সিক্যুয়েন্স করেছেন এবং সংক্রমিত মানুষদের সনাক্ত করার জন্য একটি নির্ভরযোগ্য টেস্ট তৈরি করেছেন। রোগবাহী জীবাণুর সাথে তুমুল প্রতিযোগিতায় চিকিৎসকরা জিততে চলেছেন, কারণ রোগবাহী জীবাণুগুলো পরিব্যক্তির উপর নির্ভর করে আর চিকিৎসকরা নির্ভর করেন তথ্যের উপর। সংক্রামক মহামারীকে সীমিত রাখার জন্য দেশগুলো একে অপরের কাছে তথ্য, বিশেষজ্ঞ ও উপকরণ পাঠাতে পারে। অর্থনৈতিক ধ্বস ঠেকানোর জন্য সরকার ও ব্যাংকগুলো একটি সাধারণ পরিকল্পনা তৈরি করতে পারে।

তারপরও এখানে একটি বড় অশনি সংকেত আছে। মানব জাতির সংক্রামক রোগগুলোকে বশে আনার ক্ষমতা আছে, তার অর্থ এই নয় যে সবসময় এ ক্ষমতাকে ভালোভাবে ব্যবহার করার বিজ্ঞতা তাদের আছে। ২০১৫ সালে আমি হোমো দিউস-এ লিখেছিলাম, “কোনো নতুন ইবোলা প্রাদুর্ভাব অথবা একটি অজানা ফ্লু স্ট্রেইন সারা বিশ্বে বিস্তার লাভের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ মানুষকে মেরে ফেলবে এ বিষয়ে আমরা যেমন নিশ্চিত হতে পারি না, তেমনি আমরা একে কোনো অনিবার্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে বিবেচনা করতে পারবো না। বরং আমরা একে মানুষের একটি অমার্জনীয় ব্যর্থতা হিসেবে দেখবো এবং সেসব দায়ী ব্যক্তিদের  মুণ্ডুপাত করবো।… সংক্রামক মহামারীকে প্রতিরোধ করার মত জ্ঞান ও কৌশল মানুষের আছে, আর কোনো মহামারী যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় তখন সেটা ঐশ্বরিক ক্ষোভের বদলে মানুষের অক্ষমতার জন্যই হয়।”

আমি মনে করি এসব কথা এখনো সত্যকে ধারণ করে। আমরা এখন বিশ্বজুড়ে যা দেখছি তা কোনো অনিবার্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়। এটি মানুষের একটি ব্যর্থতা। দায়িত্বহীন সরকারগুলো তাদের স্বাস্থ্য সেবা ব্যবস্থাকে অগ্রাহ্য করেছে, সময়মত প্রতিক্রিয়া জানাতে ব্যর্থ হয়েছে এবং বর্তমানে এখনো বৈশ্বিক পর্যায়ে কার্যকরভাবে সহযোগিতা করতে ব্যর্থ হচ্ছে। আমাদের এটা বন্ধ করার ক্ষমতা আছে, তবে  এখন পর্যন্ত আমাদের প্রয়োজনীয় বিচক্ষণতার ঘাটতি রয়েছে।

প্রশ্নঃ চীন মহামারীর অভ্যন্তরীণ বিস্তার দূর করেছে এ কথা বলার মাধ্যমে দেশটি মহামারী নিয়ন্ত্রণে নিজের সাফল্যকে উপস্থাপন করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কর্তৃত্ববাদী সরকারগুলো, যারা লকডাউন জোরদার করতে পারে, তারা কি মহামারীর বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে পশ্চিমা গণতন্ত্রের চেয়ে বেশি প্রস্তুত?                

অবধারিতভাবে তা নয়। মহামারীর বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া সহজতর হয় যদি আপনি অজ্ঞ ও সন্দেহপ্রবণ জনসাধারণকে শাসানোর চাইতে আত্মপ্রত্যয়ী ও অবগত জনসাধারণের উপর নির্ভর করতে পারেন। আপনি কি লক্ষ লক্ষ মানুষের টয়লেটে ক্যামেরা ও পুলিশ বসিয়ে প্রতিদিন তাদেরকে দিয়ে হাত ধোয়াতে  পারবেন? সেটা খুবই কঠিন। তবে আপনি যদি মানুষকে শেখান এবং মানুষ যে তথ্য লাভ পায় তাতে যদি তারা আস্থা রাখে তাহলে তারা নিজ উদ্যোগেই সঠিক কাজটি করতে পারে।

আমি স্কুলে শিখেছি যে ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া রোগের কারণ। আমি শিখেছি যে সাবান দিয়ে হাত ধৌত করলে এসব  রোগবাহী জীবাণু দূর হয় অথবা মারা যায়। আমি এই তথ্যে আস্থা রাখি। তাই আমি নিজ ইচ্ছায় নিজের হাত ধুই এবং শত শত কোটি মানুষও তাই করে।

সমস্যা হচ্ছে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, গনতান্ত্রিক দেশসহ বহু দেশের লোকরঞ্জনবাদী রাজনীতিবিদরা ইচ্ছাকৃতভাবে বিজ্ঞানের প্রতি, প্রচার মাধ্যমের প্রতি ও সরকারি কর্তৃপক্ষের প্রতি মানুষের আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্থ করেছে। এমন আস্থা ব্যতীত মানুষ তার করণীয় সম্বন্ধে নিশ্চিত হতে পারে না। একটি কর্তৃত্ববাদী সরকার চাপিয়ে দেওয়ার মধ্যেই সমাধান নিহিত নয়। বিজ্ঞানের প্রতি, প্রচার মাধ্যমের প্রতি ও সরকারি কর্তৃপক্ষের প্রতি মানুষের আস্থাকে পুনর্নির্মাণ করার মাঝে সমাধান নিহিত আছে। যখনই আপনি এমন আস্থা ফিরে পাবেন তখন সার্বক্ষণিক নজরদারি ও শাস্তির ভয়-ভীতি ছাড়াই সঠিক কাজটি করার ব্যাপারে মানুষের উপর আপনি নির্ভর করতে পারবেন।

প্রশ্নঃ আমরা দেখেছি চীনের মত দেশগুলো মহামারী মোকাবিলা করার জন্য স্মার্টফোন ও অ্যাপ ব্যবহার করে নাগরিকদের অবস্থান ও স্বাস্থ্যের উপাত্ত সংগ্রহ করছে। বৈশ্বিক মহামারী কি একটি অধিকতর বায়োমেট্রিক রাষ্ট্রের বিকাশকে চালিত করতে পারে?

হ্যাঁ, এটি একটি প্রধান বিপত্তি। নজরদারির ইতিহাসে করোনা ভাইরাস মহামারী একটি যুগসন্ধিক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে। প্রথমত, যেসব দেশ এযাবতকালে গণ-নজরদারির যন্ত্রগুলো প্রত্যাখ্যান করেছে, এ মহামারী সেসব দেশেও এগুলোর বিস্তারকে হয়ত ন্যায্যতা দেবে ও স্বাভাবিক করে তুলবে। দ্বিতীয়ত ও এমনকি আরো গুরুত্বপূর্ণভাবে, এটি “চামড়ার উপর” থেকে “চামড়ার ভেতরে”র নজরদারির নাটকীয় স্থানান্তরকে তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে। অতীতে সরকারগুলো মূলত পৃথিবীতে আপনার চলাচলকে তদারকি করেছে — আপনি কোথায় যান, কার সাথে সাক্ষাত করেন। এখন আপনার দেহের ভেতরে কী ঘটছে সে ব্যাপারে তারা বেশি আগ্রহী। আপনার চিকিৎসার অবস্থা, শরীরের তাপমাত্রা, রক্তচাপ। এ ধরনের বায়োমেট্রিক তথ্য আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে আপনার সম্বন্ধে সরকারকে অনেক বেশি কিছু বলে দিতে পারে।

দশ বছরে এমন কোনো সর্বগ্রাসী রাষ্ট্রের কথা চিন্তা করুন যেখানে প্রত্যেক নাগরিককে একটি বায়োমেট্রিক ব্রেসলেট পরতে হবে যার মাধ্যমে দিনে ২৪ ঘণ্টা আপনাকে তদারকি করা যায়। মানব দেহ ও মস্তিষ্কের ব্যাপারে আমাদের ক্রমবর্ধমান বোঝাপড়াকে কাজে লাগিয়ে এবং মেশিন লার্নিং এর অগাধ ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে ইতিহাসে প্রথমবারের মত সরকার হয়ত জেনে নিতে পারবে প্রত্যেক নাগরিক প্রতি মুহূর্তে কী অনুভব করছে। আপনি যদি টেলিভিশনে গ্রেট লিডারের ভাষণ শোনেন এবং বায়োমেট্রিক সেন্সরগুলো রাগের লক্ষণীয় চিহ্ন প্রকাশ করে (উচ্চতর রক্তচাপ, শরীরের তাপমাত্রার সামান্য বৃদ্ধি, এমিগডালার* বর্ধিত কার্যক্রম) তাহলে আপনি বড় ধরনের ঝামেলায় পড়বেন। আপনি যান্ত্রিকভাবে হাসতে পারেন ও হাত তালি দিতে পারেন, কিন্তু আপনি যদি আদতেই রেগে যান তাহলে সরকার তা জেনে যাবে।

সরকারগুলো হয়ত যুক্তি দেখাতে পারে কোভিড-১৯ মোকাবিলায় বর্তমানে যেসব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে তার সাথে এই দুঃস্বপ্নময় পটভূমির কোনো সম্পর্ক নেই। এসব ব্যবস্থা শুধুই জরুরী অবস্থায় গ্রহণ করা হয়েছে। তবে অস্থায়ী ব্যবস্থাগুলোর একটি বাজে অভ্যাস হচ্ছে এগুলো জরুরী অবস্থাকে ছাপিয়ে যায়, বিশেষ করে যখন দিগন্তে সবসময়ই একটি নতুন জরুরী অবস্থা উঁকি দিচ্ছে। করোনা ভাইরাস থেকে সংক্রমণ যখন শূন্যে নেমে আসবে, তখনও কিছু সরকার হয়ত যুক্তি দেখাতে পারে যে তাদের বায়োমেট্রিক নজরদারি ব্যবস্থাগুলো জারি রাখা দরকার কারণ তারা করোনা ভাইরাসের পুনরাগমনের ভয়ে ভীত, নয়ত মধ্য আফ্রিকাতে ইবোলার একটি নতুন স্ট্রেইন বিবর্তিত হচ্ছে, কিংবা তারা সিজনাল ফ্লু থেকে মানুষকে রক্ষা করতে চায়। করোনা ভাইরাস থামিয়েই শেষ হবে কেন?

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমাদের গোপনীয়তার উপর একটি বড় যুদ্ধ চালানো হচ্ছে। করোনা ভাইরাস সংকট হতে পারে যুদ্ধের শীর্ষ স্থান। মানুষকে যদি স্বাস্থ্য ও গোপনীয়তার মধ্যে একটিকে বেছে নিতে বলা হয় তাহলে তারা সাধারণত স্বাস্থ্যকে বেছে নেবে। আদতে সমস্যার গোঁড়া হচ্ছে গোপনীয়তা ও স্বাস্থ্যের মধ্যে একটিকে বেছে নিতে বলা। এটি একটি মেকি তফাত। আমরা গোপনীয়তা ও স্বাস্থ্য দুটোই পেতে পারি এবং পাওয়া উচিত। সর্বগ্রাসী নজরদারির সরকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নয়, বরং নাগরিকদের শিক্ষিত ও ক্ষমতায়িত করার মাধ্যমে আমরা আমাদের স্বাস্থ্য রক্ষা করতে পারি ও করোনা ভাইরাস মহামারী রুখে দিতে পারি। মনে রাখবেন মানুষ যখন ভালো বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা লাভ করে এবং তাদেরকে সত্য জানানোর কারণে যখন সরকারি কর্তৃপক্ষের প্রতি ভরসা রাখে তখন মানুষ নিজ উদ্যোগে সঠিক কাজটি করতে পারে।

প্রশ্নঃ মহামারী বিস্তার লাভ করার আগে যখন চীনে এর প্রকোপ চলছিলো তখন কয়েকটি দেশ, যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলো, পদক্ষেপ নিতে দেরি করেছে যদিও তারা প্রস্তুত হওয়ার জন্য কয়েক মাস সময় পেয়েছে। এ থেকে আমাদের কী শিক্ষা নেওয়া উচিত?

আমি আশা করি এ মহামারী থেকে আমাদের মূল শিক্ষাটি হচ্ছে যে, লোকে বুঝতে পারে যে আমরা সকলেই এর মধ্যে আছি। এটি চীনের সংকট নয় কিংবা ইতালির সংকট নয়, এটি একটি বৈশ্বিক সংকট। সারা বিশ্বের মানুষ একই অভিজ্ঞতা, ভয় ও স্বার্থ ভাগ করে নিচ্ছে। ভাইরাসের প্রেক্ষাপট থেকে আমরা সবাই একই রকম, আমরা সবাই মনুষ্য শিকার। আর মানুষের প্রেক্ষাপট থেকে, মহামারী যতক্ষণ কোনো এক দেশে ছড়াতে থাকে ততক্ষণ এটি আমাদের সকলকে বিপদাপন্ন করে, কারণ এটি আমাদের সবার নাগালে চলে যেতে পারে। তাই এ মহামারী মোকাবিলায় আমাদের একটি বৈশ্বিক পরিকল্পনা থাকা দরকার।

প্রশ্নঃ এই মহামারী কি দেশগুলোকে সীমান্ত, বাণিজ্য ও সংস্কৃতির ভিত্তিতে বিশ্বায়নকে পুনরায় মূল্যায়নের দিকে এবং আরো বেশি প্রতিবন্ধকতা স্থাপনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে?

কিছু মানুষ সত্যিই করোনা ভাইরাস প্রাদুভার্বের জন্য বিশ্বায়নকে দুষছেন এবং বলছেন এরকম আরো প্রাদুর্ভাবকে প্রতিরোধ করার জন্য আমাদের উচিত বিশ্বকে বিশ্বায়নের পূর্বের অবস্থায় নিয়ে যাওয়া। কিন্তু এটি সম্পূর্ণ ভুল। বিশ্বায়নের যুগের বহু আগে মহামারীগুলো ছড়িয়েছিলো। মধ্যযুগে ভাইরাস মালবাহী ঘোড়ার গতিতে ভ্রমণ করেছিলো এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে কেবল ছোট শহর ও গ্রামগুলোকে সংক্রমিত করতে পারতো। তবুও ব্ল্যাক ডেথের মত সংক্রামক মহামারীগুলো আজকের চেয়ে অনেক বেশি ভয়ানক। আপনি যদি বিচ্ছিন্নতা অবলম্বন করে মহামারী থেকে নিজেকে রক্ষা করতে চান, তাহলে আপনাকে একেবারে প্রস্তর যুগে ফিরে যেতে হবে। ওটা ছিলো সর্বশেষ সময় যখন মানুষ মহামারী থেকে মুক্ত ছিলো, কারণ সে সময় মানুষ ছিলো খুবই কম, তাদের মধ্যে সংযোগও ছিলো খুব কম।

মহামারীর আসল প্রতিষেধক বিচ্ছিন্নতা ও পৃথকীকরণ নয়, তা হচ্ছে তথ্য ও সহযোগিতা। ভাইরাসের তুলনায় মানুষের বড় সুবিধাটি হচ্ছে কার্যকরীভাবে সহযোগিতা করার সক্ষমতা। মানুষকে কীভাবে সংক্রমিত করবে সে ব্যাপারে চীনের করোনা ভাইরাস ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের করোনা ভাইরাস কৌশল অদল-বদল করতে পারে না। তবে করোনা ভাইরাসের ব্যাপারে চীন যুক্তরাষ্ট্রকে অনেক মূল্যবান জিনিস ও কীভাবে একে মোকাবিলা করতে হয় সে ব্যাপারে শেখাতে পারে। সর্বোপরি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি সহায়তা করার জন্য চীন আদতেই বিশেষজ্ঞ ও উপকরণ পাঠাতে পারে। ভাইরাস সেরকম কিছুই করতে পারে না।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, নেতৃত্বের ঘাটতি থাকার কারণে আমরা আমাদের সহযোগিতা করার সক্ষমতাকে সর্বাধিক ব্যবহার করতে পারছি না। বিগত কয়েক বছরে দায়িত্বহীন নেতৃবৃন্দ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ইচ্ছাকৃতভাবে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রতি আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। আমরা এখন তার মূল্য দিচ্ছি। মনে হচ্ছে রুমের ভেতর প্রাপ্তবয়স্ক কেউ নেই।  

আশা করছি, আমরা শীঘ্রই অন্তত এই পাঁচটি ক্ষেত্রে আরো বেশি ও আরো ভালো সহযোগিতা দেখতে পাবোঃ

১. নির্ভরযোগ্য তথ্য আদান-প্রদান করা। যেসব দেশ ইতোমধ্যে মহামারীর অভিজ্ঞতা লাভ করেছে তাদের উচিত অন্য দেশগুলোকে এ ব্যাপারে শেখানো। মহামারীকে সীমিত রাখা এবং ওষুধ ও প্রতিষেধক তৈরি করার উদ্দেশ্যে সারা বিশ্বের উপাত্ত মুক্তভাবে ও দ্রুততার সাথে আদান-প্রদান করা উচিত।

২. প্রয়োজনীয় মেডিকেল উপকরণ যেমন টেস্টিং কিট, সুরক্ষামূলক সরঞ্জামাদি ও শ্বাস-প্রশ্বাসের যন্ত্রগুলোর বৈশ্বিক উৎপাদন ও সুষ্ঠু বিতরণের মধ্যে সমন্বয় সাধন করা। বৈশ্বিক সমন্বয়ই উৎপাদন-জট অতিক্রম কাটিয়ে উঠতে পারে এবং নিশ্চিত করতে পারে সবচেয়ে ধনী দেশগুলোর পরিবর্তে যেসব দেশে সরঞ্জামাদি সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সেসব দেশেই তা যাচ্ছে।

৩. কম ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর উচিত সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোতে ডাক্তার, নার্স ও বিশেষজ্ঞ পাঠানো, যাতে করে সেসব দেশকে সাহায্য করা যায় ও মূল্যবান অভিজ্ঞতা অর্জন করা যায়। মহামারীর কেন্দ্র স্থানান্তরিত হতে থাকে। আগে ছিলো চীনে, এখন সেটা ইউরোপে, হয়ত পরের মাসে হবে যুক্তরাষ্ট্র এবং তারপর ব্রাজিল। আজ ব্রাজিল যদি ইতালিতে সাহায্য পাঠায়, হয়ত দুই মাসে যখন ইতালি আরোগ্য লাভ করবে এবং ব্রাজিল সংকটাপন্ন হবে, ইতালি তখন সহায়তা পরিশোধ করবে।

৪. সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশ ও খাতগুলোকে রক্ষা করার জন্য একটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সুরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করা। ধনী দেশগুলো যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও জার্মানি ভালোই থাকবে। তবে মহামারী যখনই আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোতে ছড়িয়ে যাবে তখন যদি আমাদের কোনো বৈশ্বিক কর্মপন্থা না থাকে, সেখানে সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক ধ্বস নেমে আসতে পারে।

৫.  ভ্রমণকারীদের প্রি-স্ক্রিনিং-এর ব্যাপারে একটি বৈশ্বিক ঐকমত্যের পরিকল্পনা করা যাতে করে কম সংখ্যক অপরিহার্য ভ্রমণকারী সীমান্ত পার হতে পারে। ভ্রমণকারীরা যদি প্লেনে চড়ার আগে তাদের দেশ থেকে সাবধানতার সহিত বাছাই হয়ে আসে তবে গন্তব্যের দেশটির তাদেরকে ঢুকতে দেওয়ার ব্যাপারে নিরাপদ বোধ করা উচিত।

____________________

*এমিগডালাঃ মস্তিষ্কের প্রতিটি সেরিব্রাল হেমিস্ফিয়ারের অভ্যন্তরে অনেকটা বাদাম আকৃতির গ্রে ম্যাটারের পিণ্ড, যার প্রাথমিক কাজ হচ্ছে স্মৃতি, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও আবেগময় প্রতিক্রিয়া (ভয়,উদ্বেগ, ক্ষোভ) প্রক্রিয়াকরণ করা৷ 

(সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট থেকে অনূদিত)

ইউভাল নোয়াহ্‌ হারারি একজন ইসরায়েলী ইতিহাসবিদ। তিনি “স্যাপিয়েন্স”, “হোমো দিউস” “টুয়েন্টি ওয়ান লেসনস্‌ ফর দ্য টুয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি” গ্রন্থসমূহের রচয়িতা।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন