শুক্রবার, ২ জানুয়ারি ২০২১; ১০:৫৪ অপরাহ্ণ


রেজাউল করিম
লেখকঃ রেজাউল ইসলাম

কভিড- ১৯ বা নভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে গোটা দুনিয়া আজ একটি আস্ত হাসপাতালে পরিণত হয়েছে। শয়ে শয়ে মানুষ মরছে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে। রাতারাতি সারা দুনিয়ায় কফিন আর কাফনের কাপড়ের চাহিদা বেড়ে গেছে বহু গুণে। বিশ্বের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত- সবখানেই বড় বড় চিকিৎসাবিজ্ঞানী অহর্নিশ গবেষণাগারে খেটে যাচ্ছেন। কিন্তু আলোড়ন সৃষ্টিকারী এ ক্ষুদ্র ভাইরাসের কোনো প্রতিষেধক বের করতে পারছেন না! তাই এখন মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় সামাজিক দুরত্ব তৈরি করে মরণঘাতী এ রোগের মোকাবেলা করা, বলছেন তারা। কিন্তু আমাদের দেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে কয়জনের পক্ষে এবং কতদিন পর্যন্ত এই সামাজিক দুরত্বের নির্দেশনা মেনে চলা সম্ভব?

সরকারি নির্দেশনা মতে অনেক দিন ধরে দেশ কার্যত  অচল। যে সকল শ্রমজীবী মানুষ শপিং মল, হোটেল-রেস্টুরেন্ট, কলকারখানা, রাস্তাঘাট, হাঁটে ও মাঠে কাজ করতেন তারা বেকার হয়ে পড়েছেন। এটা বলে রাখা দরকার যে, বাংলাদেশের সিংহভাগ মানুষই শ্রমজীবী। তাঁরা প্রধানত তাদের শ্রম বিক্রি করে টাকা আয় করে । সেই টাকায় অন্নবস্ত্রের যোগান দেয়, চিকিৎসার খরচ মেটায়, ছেলে- মেয়ের লেখাপড়া শেখায় ইত্যাদি। এই শ্রেণীর মানুষ দিন আনে দিন খায়। তাদের দৈনন্দিন আয় এতো সামান্য যে তা দিয়ে ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করা কোনোমতেই সম্ভব হয়ে ওঠে না। তাই যখনই তাদের কাজ বন্ধ হয়ে যায়, তখনই তাদের পরিবার খাবার পায় না, পোষাক পায় না, চিকিৎসা পায় না, পড়ালেখা চালিয়ে যেতে পারে না ইত্যাদি।

এমতাবস্থায় কাজকর্ম ফেলে দীর্ঘদিন ধরে ঘরে বসে সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখার ধারণাটি তাদের জীবনে অলীক কল্পনা ছাড়া আর কিছুই নয়। সামাজিক দুরত্ব নামক ধারণার সাফাই গেয়ে অনেকে বলছেন, আপনারা ঘরে বসে কাজ করুন। কিন্তু গবেষণা বলছে, প্রতি পাঁচজন কৃষক শ্রমিকের একজনেরও কম ঘরে বসে কাজ করতে সক্ষম । বস্তুত, কৃষক শ্রমিক মেহনতি মানুষের পক্ষে ঘরে বসে কাজ করার সুযোগ একদমই নেই। কাজ করতে তাদের হয় বাইরে বের হতে হবে নয়তো ঘরের মধ্যে কর্মহীন জীবন কাটাতে হবে। তাই তাদের অনেকেই হয়তো সামাজিক দুরত্বের নির্দেশনা মানতে পারছেন না। বেরিয়ে পড়ছেন ঘর থেকে অন্য কোনো কর্মের খোঁজে। ঢাকা থেকে বেকার হয়ে ফিরে আসা অনেক মানুষ এখন পেটের দায়ে গ্রামে দিনমজুরের কাজ করছেন। তাঁদের কেউ কেউ হয়তো অন্যের খেতে কাজ করছেন, আবার কেউ কেউ অন্যের বাড়িতে শ্রম দিচ্ছেন।

পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, সমাজের এ শ্রেণীর মানুষই সব থেকে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। অনেকে হয়তো বলছেন, করোনাভাইরাস দেশ, জাতি, শ্রেণী , গোষ্ঠী বা ব্যক্তি বিশেষে কাউকেই ছাড়ছে না। রাজা-প্রজা, ধনী-গরীব, ইতর- ভদ্র সবাই এর শিকার। হ্যাঁ, তাদের দাবি ভিত্তিহীন নয়, কারণ
এটি যে কাউকে আক্রমণ করতে পারে। এটির যেমন শিকার হয়েছেন ব্রিটেনের রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ, ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন, ব্রিটেনের রাজপুত্র প্রিন্স চার্লস, কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর স্ত্রী সফি ট্রুডো, লিবিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী জিবরিলসহ আরো অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তি। তবে তত্ত্বগতভাবে তাদের দাবিটা সঠিক হলেও বাস্তবে তা অন্যরকম। কভিড-১৯ বা করোনা ভাইরাস আর দশটি রোগের মতোই সমাজের সবচেয়ে নিচে অবস্থান করা মানুষদেরই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করছে । কারণ, তাদের জীবন সমাজের বিত্তবানদের থেকে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ, ভঙ্গুর এবং দুর্বল । জীবিকার জন্য তাদেরকেই বেশি বাইরে বের হতে হচ্ছে এবং এজন্য তারাই বেশি এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।

গত কয়েক দিন ধরে খবরের কাগজ সয়লাব হয়ে গেছে দেশের পোশাক শ্রমিকদের ঘর থেকে বের হওয়ার সংবাদে। চাকরি বাঁচানোর জন্য বিশ্বব্যাপী এই ক্রান্তিকালিন সময়েও নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাঁরা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঢাকা ও ঢাকার পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতে ফিরে এসেছেন কাজে যোগ দিতে। গাড়ি না পেয়ে অনেকে দীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটে পাড়ি দিয়েছেন। এতে সারা রাস্তাজুড়ে মানুষের দীর্ঘ জটলা তৈরি হয়েছে। সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখার জন্য যে মানুষগুলোকে বাড়ি পাঠানো হয়েছিল তাদের দ্বারাই  সে ব্যবস্থাটি আবার ভেঙে পড়েছে। এর জন্য কোনোমতেই তাঁরা দায়ী নন। কর্তৃপক্ষ তাদের ছুটি দিয়েছিল, আবার সেই কর্তৃপক্ষই তাদের কাজে ফেরার আদেশ দিয়েছে। চাকরি বাঁচাতে তাই তাঁরা জীবনের মায়া ত্যাগ করে ঘর থেকে বের হয়েছেন। সামাজিক দুরত্বের সুযোগটি তাই তাঁরা পাননি।

প্রকৃত বিষয় হলো, খেটে খাওয়া মেহনতি মানুষের পক্ষে সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখার সুযোগ লাভ করা সম্ভব নয়। কারণ, অর্থনৈতিক কারণেই তাদেরকে গণপরিবহনে যাতায়াত করতে হয়- যেখান থেকে এ ভাইরাস ছড়ানোর ঝুঁকি অনেক বেশি। জীবিকার তাগিদে তাদের পক্ষে পুরোপুরি চাকরি বা কাজ ছেড়ে ঘরে থাকা সম্ভব নয়। এই বিষয়গুলো তাদের খারাপ ভাগ্য বরণ করতে সবিশেষ ভূমিকা রাখে। অপরপক্ষে, সমাজের বিত্তবান মানুষদের অন্নবস্ত্রের চিন্তা করতে হয় না। অঢেল সম্পদের জন্য তাদের জীবন অনেক সহজ ও সুন্দরভাবে চলে। তাই তাঁরা চাইলেই সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখার জন্য যতদিন খুশি ঘরের মধ্যে থাকতে পারেন। বিশেষ কারণে বাইরে বের হতে চাইলে তারা ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করতে পারেন। কোনো কাজ মানুষ দিয়ে সহজেই করিয়ে নিতে পারেন টাকার বিনিময়ে। তাই তাঁরা অনেক সুরক্ষিত, অনেক নিরাপদ থাকতে পারেন। সামাজিক দুরত্বের বিষয়টি তাদের জন্য একটি বিরাট সুযোগ – যে সুযোগ থেকে শ্রমজীবী মানুষ একদম বঞ্চিত।

ইউরোপের দেশ ইটালি , স্পেন, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্যের মতো যুক্তরাষ্ট্রেও ব্যাপকভাবে হানা দিয়েছে করোনা ভাইরাস। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি করোনা আক্রান্ত রোগীর দেশ এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সেখানে এখন পর্যন্ত করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা প্রায় চার লাখ এবং করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে তের হাজারেরও বেশি। গবেষণায় দেখা গেছে, সেখানে দরিদ্র এবং সমাজের পিছিয়ে পড়া লোকেরাই করোনার শিকার হয়েছেন বেশি। সেদেশের কৃষ্ণাঙ্গ নাগরিকগণ, হিস্পানিক -আমেরিকান সমাজসহ অন্যান্য অভিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে এ রোগের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি। বাস্তবতা হচ্ছে, এ চিত্র শুধু আমেরিকাতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা এশিয়া, ইউরোপ এবং আফ্রিকায়ও একইরকম।  রোম থেকে ঢাকা- সবজায়গাতেই সমাজের গরীব এবং পিছিয়েপড়া জনগোষ্ঠীই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মরণঘাতী এই ভাইরাসে।

করোনাভাইরাস থেকে বাঁচতে হলে রাষ্ট্রের সবাইকে সুরক্ষিত রাখার কথা ভাবতে হবে। সমাজের উচ্চবিত্ত মানুষগুলোই শুধু করোনা থেকে বেঁচে থাকার নির্দেশনা মেনে চলবে, আর খেটে খাওয়া মানুষগুলো জীবিকার জন্য পথে প্রান্তরে ঘুরে বেড়াবে- তাতে কারো লাভ হবে না। এর কারণ হলো, করোনা ভাইরাস একটি ছোঁয়াচে রোগ। দামী টাইলস আর দুর্লভ পাথরখচিত অট্টালিকায় সংঙ্গনিরোধ সময় কাটানো ব্যক্তিটি হয়তো তার বৈষয়িক সামর্থ্যের কারণে নিজেকে কিছুকাল রোগমুক্ত রাখতে পারবেন। কিন্তু মনে রাখা দরকার যে, সমাজের একজন আক্রান্ত হলেই কিন্তু তা আস্তে আস্তে সবার ঘরে পৌঁছে যাবে। তাই শুধু সামর্থ্যবান মানুষ নয়,সবার জন্য সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখার সুযোগ করে দিতে হবে। তাহলেই হয়তো আমরা একসাথে করোনা ভাইরাসকে মোকাবেলা করতে পারবো এবং লক্ষ কোটি বছরের মানবসভ্যতাকে টিকিয়ে রাখতে পারবো।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন