শুক্রবার, ২ জানুয়ারি ২০২১; ১১:০০ অপরাহ্ণ


সোমবার বিমানবাহী রণতরী থিওডোর রুজভেল্টের কমান্ডার ক্যাপ্টেন ব্রেট ক্রোজিয়ার নৌবাহিনীকে একটি চিঠি পাঠিয়েছিলেন, যাতে তিনি  রণতরীটিকে গুয়ামে নোঙর করে  কোভিড -১৯-এ আক্রান্ত বেশ কয়েকজন নাবিককে সেখান থেকে নামিয়ে আনার অনুমতি চেয়ে আবেদন করেছিলেন।  পেন্টাগন রণতরীটিকে চালিয়ে নিচ্ছিল এবং সেখানে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করছিল।

“আমরা যুদ্ধরত নই,” তিনি লিখেছিলেন।  “নাবিকদের এখন জীবন দেয়ার দরকার নেই।  আমরা যদি এখনই কাজ না করি, তাহলে আমরা আমাদের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সম্পদ – আমাদের নাবিকদের সঠিকভাবে যত্ন নিতে ব্যর্থ হবো।  “

দ্য সান ফ্রান্সিসকো ক্রনিকলের কাছে এই চিঠি ফাঁসের পরে নৌবাহিনী নরম হয়।  তবে বৃহস্পতিবার নৌবাহিনী ক্যাপ্টেন ক্রোজিয়ারকে তার নেতৃত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়।

ক্যাপ্টেন ক্রোজিয়ার এমন বীর পুরুষ ও মহিলাদের বর্ধমান তালিকায় যোগ দিলেন যারা এই ভয়ঙ্কর মহামারীতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রাণঘাতী ব্যর্থতা সম্পর্কে  মুখ খুলে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে তাদের পেশাকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছেন।  তাদের  অনেকেই হচ্ছেন ডাক্তার এবং পরিষেবিকা এবং তাদের অনেককে ক্যাপ্টেন ক্রোজিয়ারের মতো শাস্তি দেওয়া হয়েছে।  তাঁরা সকলেই আমাদের গভীর কৃতজ্ঞতা লাভের যোগ্য।

ক্যাপ্টেন ক্রোজিয়ারকে অপসারণের যুক্তি হিসেবে নৌবাহিনী বলেছিল যে, তাঁর চিঠিটি ছিল একটি মারাত্মক ভুল  যা তার নাবিকদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করতে পারতো।  কিন্তু এটা জানা কঠিন যে, সেসময়  তিনি আর কী করতে পারতেন  – কারণ থিয়োডোর রুজভেল্টে পরিস্থিতি সেসময় ভয়াবহ ছিল।

সমুদ্রের জাহাজ,  সে রণতরী হোক কিংবা প্রমদতরী, এই রোগের দূর্গ।  সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা এখানে অসম্ভব:  জনাকীর্ণ মেসে,  ঘুমানোর বদ্ধ শিবিরে এবং প্রহরিদলে নাবিকরা একে অপরের সাথে গলাগলি ধরে থাকে।

ধারণা করা হয় ভিয়েতনামের তীর হতে  ফেরার সময় একজন নাবিক এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়।  জাহাজে একবার প্রবেশ করা মাত্র ভাইরাসটি তার অনুমেয় রুপ ধারণ  করে: প্রথমে একজন বা দুজন নাবিক আক্রান্ত হয়, তারপরে কয়েক ডজন, এবং হঠাৎ করে ১০০ জনেরও বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ে।

ক্যাপ্টেন ক্রোজিয়ার গুয়াম থেকে জাহাজ ছাড়ার আদেশ পেয়েছিলেন, তবে বেশিরভাগ নাবিককে জাহাজ থেকে নামানোর অনুমতি তাঁকে দেওয়া হয়নি।  ভাইরাসটি জাহাজের ছোট্ট চিকিৎসা দলকে বিহ্বল করার ভয় দেখাচ্ছিল ।  নাবিকদের মৃত্যুবরণ করার খুব বেশি সময় হাতে ছিল না।

জাহাজটির অধিনায়ক বুঝতে পেরেছিলেন যে তার নাবিকদের বাঁচাতে হলে তাকে তাৎক্ষণিকভাবে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।জাহাজটি থেকে যত সংখ্যক নাবিককে সরিয়ে ফেলা সম্ভব তত সংখ্যক নাবিককে তাৎক্ষণিকভাবে সরিয়ে ফেলার দাবি করে  তিনি একটি কড়া চিঠি লেখার সিদ্ধান্ত  নিয়েছিলেন, যা তিনি নৌবাহিনীর  বেশ কয়েকজন ব্যক্তির মধ্যে বিতরণ করেছিলেন।  সম্ভবত এটি তাঁর পেশার জন্য ভালো পদক্ষেপ ছিল না, এবং তিনি তার ফলও পেয়েছিলেন।

যখনি ক্রোনিকলের কাছে চিঠিটি ফাঁস হয়ে গেল, তখনি সেটি দ্রুত দেশব্যাপী অন্যান্য কাগজপত্রে প্রকাশিত হয়ে পড়লো।  জনসাধারণের তাৎক্ষণিক চাপ নৌবাহিনীকে নিরস্ত করতে বাধ্য করেছিল এবং যতটা সম্ভব তাঁরা নাবিকদেরকে জাহাজ থেকে নামিয়ে  হোটেলে উঠানোর ব্যবস্থা শুরু করে।

এজন্য ক্যাপ্টেন ক্রোজিয়ারকে অবশ্য  বড় দাম দিতে হয়েছে ।  নৌবাহিনীর ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি টমাস মোডলি তাৎক্ষণিকভাবে তাকে বরখাস্ত করেছিলেন, চিঠি ফাঁস করার জন্য নয় (যার জন্য তিনি বলেছিলেন যে তার কাছে এর কোনও প্রমাণ নেই), বরং “অত্যন্ত দুর্বল সিদ্ধান্ত” গ্রহণ করার জন্য।  অনেকে এর সাথে দ্বিমত পোষণ করে বলেন,ক্যাপ্টেন ক্রোজিয়ার বরং খুবই ভালো একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন।  বৃহস্পতিবার রাতে তিনি জাহাজ ছেড়ে চলে গেলেন একজন সাহসী নায়কের বিদায় সংবর্ধনা পাঠানোর জন্য।

আমি মনে করি এটা আশা করা বেশি যে, নৌবাহিনী  তার নিজের  স্বার্থে হলেও এই দুর্ভাগ্যজনক সিদ্ধান্তটিকে প্রত্যাহার করবে।  তবে  সম্ভবত ক্যাপ্টেন ক্রোজিয়ারের চাকরি বাঁচানোর সময় পার হয়ে গেছে।

ক্যাপ্টেন ক্রোজিয়ারের প্রাক্তন কমান্ডারের বংশধর হিসাবে আমি প্রায়ই আশ্চর্য হই যে, থিওডোর রুজভেল্ট এইরকম পরিস্থিতিতে কি করতেন।  যদিও এই ধরনের পরিস্থিতিতে  তিনি ঠিক কী করে থাকতে পারতেন তা আমি জানি।  ১৮৯৮ সালে তিনি  ঠিক একই পরিস্থিতিতে পড়েছিলেন।

জাতীয় রাজনীতিতে তাঁর উত্থানের আগে রুজভেল্ট স্পেন-আমেরিকান যুদ্ধে কিউবার আগ্রাসনের মুখে রুফ রাইডার্স নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী অশ্বারোহী রেজিমেন্টে যোগ দিয়েছিলেন।  সান জুয়ান হিলের যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল ও সেই লড়াইয়ে তাঁরা জিতেছিল এবং যুদ্ধটি মূলত সেখানেই শেষ হয়েছিল।  তবে কিউবাতে তখনো  সৈন্য মোতায়েন করে রাখা হয়েছিল এবং তাঁরা আরও কঠিন শত্রুর মুখোমুখি হয়েছিল আর তা হলো: হলুদ জ্বর এবং ম্যালেরিয়া।

এটা স্বাভাবিক ছিল যে,  আধুনিক ওষুধ আবিষ্কারের আগের দিনগুলিতে শত্রুর আক্রমণের চেয়ে রোগে অনেক বেশি সৈন্য মারা যেত। এই ভেবে রুজভেল্টসহ যুদ্ধক্ষেত্রের অন্য কমান্ডাররা সৈন্যদের দেশে ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিলেন।  কিন্তু ওয়াশিংটনের নেতৃবৃন্দ – বিশেষ করে সামরিক সচিব রাসেল অ্যালজার সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন নেতিবাচক রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার ভয়ে। তখন একটা অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়।

যে সকল পেশাদার আর্মি অফিসার স্পষ্টবাদী হয়ে তাদের চাকরি হারাতে চাননি, তারা কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলেন।  স্বল্পকালীন স্বেচ্ছাসেবক হিসাবে রুজভেল্টের হারানোর বেশি কিছু ছিল না।  সুতরাং, সহকর্মীদের সম্মতি নিয়ে তিনি একটি জ্বালাময়ী খোলা চিঠি লিখলেন এবং তা সংবাদপত্রে প্রকাশের ব্যবস্থা করেছিলেন।

“রাউন্ড রবিন” নামে পরিচিত সেই চিঠিটি  কার্যত দেশের প্রতিটি পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল, যা সৈন্যদের তাৎক্ষণিকভাবে দেশে ফিরিয়ে আনার দাবিতে  হৈচৈ ফেলে দিয়েছিল।  অ্যালজার হার মানলেন  এবং সৈন্যদের মন্টাক পয়েন্টের লং আইল্যান্ডে কোয়ারেন্টিনে  পাঠানো হলো। কিউবায় কয়েক শত মানুষ এই রোগে মারা গেলেও রুজভেল্টের এই পদক্ষেপগুলো সম্ভবত আরও অনেককে
বাঁচিয়ে দিয়েছিল।

তিনি অবশ্য তার মূল্য দিয়েছিলেন।   অ্যালজার তার প্রতি ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। সম্মাননা পদকের মনোনয়নে যখন রুজভেল্টের নাম  এসেছিল, সামরিক সচিব তখন তা ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলেন (শেষ পর্যন্ত রুজভেল্ট ২০০১ সালে মরণোত্তর পদকটি পেয়েছিলেন)। সে যুদ্ধে অবশ্যই রুজভেল্ট জয়ী হয়েছিলেন ।  আজ কে রাসেল অ্যালজারের কথা স্মরণ করে?

এই যুগে যখন অনেক লোক জায়গাটির সাধ্যমতো সম্মান দেখায়, তখন এটি আনন্দদায়ক বিষয় যে, আরও অনেক লোক বিরাট সাহস দেখিয়ে চলেছেন, কেউ কেউ এমনকি নিজের জীবনকেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছেন।  থিওডোর রুজভেল্ট তাঁর সময়ে সম্মানজনক পথটিই বেছে নিয়েছিলেন।  ক্যাপ্টেন ক্রোজিয়ারও সেটাই করলেন।

টয়েড রুজভেল্ট হলেন থিওডর রুজভেল্টের প্রপৌত্র। তিনি একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর এবং লং আইল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের থিওডোর রুজভেল্ট ইনস্টিটিউটের  চেয়ারম্যান।

ইংরেজি থেকে অনূদিত: রেজাউল ইসলাম( লেখাটি নিউ ইয়র্ক টাইমস থেকে নেওয়া)

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন