, ১৩ জুন ২০২১; ৮:১৮ অপরাহ্ণ


‘অনেক সময়ই আমাদের ধারণাগুলোকে পাল্টাতে হয়। শুধু সাধারণ ধারণা কিংবা সামাজিক বা দার্শনিক ধারণাই নয়, মাঝে মাঝে আমাদের চিকিৎসা সম্পর্কিত ধারণাও পাল্টাতে হয়।’- চে গুয়েভারা

বর্তমান:
করোনাভাইরাসের সংক্রমণে ইতালিতে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পরও ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোনো দেশ এগিয়ে আসেনি তাদের সাহায্য করতে। পাশে দাঁড়ায়নি ‘বন্ধু’ আমেরিকাও। এ নিয়ে ক্ষোভ উগরে দিয়েছিল ইতালি। ‘ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটি দেশও সাহায্য করেনি’ বলে জানিয়েছিল ইতালি। এই পরিস্থিতিতে ইতালি সাহায্য চায় চীন, কিউবা ও ভেনেজুয়েলার কাছে।

ইতালি রওনা হওয়া কিউবান চিকিৎসক দলের সদস্য ৬৮ বছর বয়সী লিওনার্দো ফার্নান্দেজ সংবাদ সংস্থা রয়টার্সকে বলেছেন, ‘আমরা সবাই ভয়ে ভয়ে আছি। কিন্তু এটা বৈপ্লবিক কর্তব্য, যা করতেই হবে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ভয় সবাই পায় সুপারহিরোরা ছাড়া। আমরা সুপারহিরো নই, বিপ্লবী চিকিৎসক।’ ফার্নান্দেজ এই নিয়ে আটবার আন্তর্জাতিক মিশনে যাচ্ছেন। ইবোলার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের আগে তিনি লাইবেরিয়াতে গিয়েছিলেন। দলের আরেক সদস্য গ্রাসিলিয়ানো ডায়াজ জানান, ‘এটা একটা সম্মানজনক কাজ, যা সংহতির নীতির ওপর দাঁড়িয়ে আছে।’

কিউবা আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে বিশ্বে রোল মডেল। সুনামি এটাক, কাশ্মীর ভূমিকম্প ইত্যাদি প্রতিটি দূর্যোগে কিউবান চিকিৎসক টিম রাতদিন কাজ করেছেন। সারা বিশ্বব্যাপী প্রায় ২৫ হাজার কিউবান ডাক্তার বিভিন্ন দেশের স্বাস্থ্যখাত উন্নয়নে নিরলস শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন। আমেরিকায় হারিকেন ক্যাটরিনা আঘাতের পর তাৎক্ষণিক কিউবা সেখানে ১৫০০ জনের বিগ্রেড পাঠানোর প্রস্তাব দেয়, যদিও আমেরিকা তা প্রত্যাখ্যান করে। চেরোনবিল পাওয়ার প্ল্যান্ট ধ্বংসের পর প্রায় বিশ হাজারের বেশি ইউরোপিয়ান কিউবাতে বিভিন্ন সময় ‘রেডিয়েশন’ জনিত অসুস্থতার চিকিৎসা নিয়েছেন ফ্রিতে।

ফিদেল এবং কিউবার আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য খাতে সবচেয়ে বড় অবদান সম্ভবত ‘অপারেশন মিরাকল’। ২০০৫ সালে ফিদেল ক্যাস্ট্রো ও ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হুগো শাভেজের মধ্যে ‘অপারেশন মিরাকল’ নামক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর ফলে ভেনেজুয়েলা কিউবাতে স্বল্প মূল্যে তেল প্রদানে সম্মতি দেয়, বিনিময়ে কিউবা ভেনিজুয়েলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে কিউবান চিকিৎসকদের কাজ করতে পাঠাতে সম্মত হয়। কিউবান প্রায় পঁচিশ হাজার চিকিৎসক ভেনিজুয়েলায় সেবা প্রদান করা আরম্ভ করেন এবং তাদের উন্নত মান ও সেবা সেখানকার লোকাল চিকিৎসকদের এতদিনের স্বৈরতন্ত্রকে হুমকির মুখে ফেলে দেয়। এছাড়াও এ চুক্তি মোতাবেক ভেনিজুয়েলার যেকোনো নাগরিক কিউবাতে চক্ষু বিষয়ক যেকোন চিকিৎসা ও সার্জারি বিনামূল্যে পেয়ে থাকেন। এই সেবা অবশ্য এখন শুধু ভেনিজুয়েলা নয়, লাতিন আমেরিকার প্রতিটি দেশ ভোগ করে থাকে। বিভিন্ন দেশের প্রায় ৩৫ লাখ মানুষ এই পর্যন্ত কিউবার চিকিৎসায় অন্ধত্বের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছেন।

কিউবা’র স্বাস্থ্য ব্যবস্থা তার যোগ্যতাবলেই পৃথিবীব্যাপী বিখ্যাত। সুদীর্ঘ পঞ্চাশ বছর যাবৎ আমেরিকা কিউবা’তে কোনোরকম স্বাস্থ্যভিত্তিক পণ্য প্রবেশ ও রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে রাখলেও তা কিউবাকে খুব একটা টলাতে পারেনি। ফিদেল কাস্ত্রো ক্ষমতায় আসার পর ‘স্বাস্থ্যখাত’-কে জাতীয় উন্নতির এক নম্বর প্রায়োরিটি হিসেবে ঘোষণা দেন। অনেকের মতে, নাগরিকদের সর্বোচ্চ সুস্বাস্থ্য নিশ্চিতকরণই ফিদেলের এতযুগ ক্ষমতায় টিকে থাকার অন্যতম প্রধান কারণ।

কিউবাতে প্রতি এক হাজার মানুষের জন্য প্রায় ৭৪ জন ডাক্তার এবং ১০ জন ডেন্টিস্ট আছেন, অর্থাৎ প্রতি ১৭৫ জন নাগরিকের জন্য আছেন একজন করে ডাক্তার, যা উন্নত বিশ্বের যেকোনো দেশের কাছে বিস্ময়কর এবং আমাদের মত দেশের কাছে স্বপ্ন। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি এক হাজার মানুষের জন্য আড়াই জন ডাক্তার, যুক্তরাজ্যে রয়েছে ২.৭ জন।

স্বাস্থ্যখাতে মাথাপ্রতি মোটে ৪৩১ মার্কিন ডলার খরচ করে কিউবার শিশুমৃত্যুর হার এখন যুক্তরাষ্ট্রের চাইতে কম, গড় আয়ু যুক্তরাষ্ট্রের সমান। অথচ যুক্তরাষ্ট্র স্বাস্থ্যখাতে মাথাপ্রতি খরচ করে সাড়ে আট হাজার ডলারের বেশী। নবজাতক মৃত্যুর হার কিউবাতে প্রতি হাজারে মাত্র ৪.২, যা আমেরিকা, বৃটেনের চাইতেও অনেক কম। কিউবাতে একজন মানুষের স্বাভাবিক আয়ুষ্কাল ৮২ বছর, যা কিউবার দুর্দান্ত স্বাস্থ্যসেবাকেই নির্দেশ করে।

জনস্বাস্থ্যের বিপ্লবের শুরু যেখানেঃ কিছু পটভূমি
১৯৬০ সালের ১৬ই আগস্ট চে গুয়েভারা কিউবান মিলিশিয়াদের উদ্দেশ্যে একটা বক্তৃতা দিয়েছিলেন।এটাকেই চে’র ‘নোটস অন রেভোলিউশনারি মেডিসিন’ বলা হয়। অবাক হলেও সত্য ল্যাটিন অ্যামেরিকার স্বাস্থ্য ব্যবস্থা চে’র সেই অনবদ্য নোটসকেই যেন বাস্তবায়ন করে চলেছে। একজন গ্রেইট থিঙ্কার কতদুর পর্যন্ত দেখতে পারেন এটা তারই প্রমাণ। উনি বলেছিলেন, “Often we need to change our concepts, not only the general concepts, the social or philosophical ones, but also sometimes our medical concepts.”

কিউবা মেডিসিনকে দেখেছে তাঁদের বদলে দেয়া কনসেপ্ট থেকে। তাঁদের কাছে মেডিসিন শুধু বিজ্ঞান নয় বা শুধু টেকনোলজিও নয়। এটা স্যোশিও বায়োলজিক্যাল সাইন্স।

স্বাস্থ্যসেবা প্রদান এবং নতুন চিকিৎসাব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কিউবার অসাধারণ সফলতা আসতে কয়েক দশক সময় লেগেছে। এই কাজে কিউবা ভেনিজুয়েলাসহ বিভিন্ন দেশের সহযোগিতা পেয়েছে। কিন্তু কেমন করে কিউবার মতো তুলনামূলকভাবে দরিদ্র ও ছোট একটি দেশ এই অঙ্গীকার পূরণ করার সামর্থ্য অর্জন করল, তা অনুধাবন করতে হলে প্রথমে বুঝতে হবে কেমন করে কিউবা তার নিজের চিকিৎসাব্যবস্থা গড়ে তোলার পথে মানবসম্পদ, বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ও সামাজিক দক্ষতা তৈরি করেছে।

১৯৫৯ সালের বিপ্লবের পরপরই কিউবা তার চিকিৎসাসেবা প্রদানের ধরন-ধারণে পরিবর্তন নিয়ে আসে এবং প্রতিরোধমূলক চিকিৎসাসেবার ওপর জোর দিতে শুরু করে। ক্রমান্বয়ে সমাজ জীবনের সাথে পারিবারিক চিকিৎসাসেবার সার্বিক সমন্বয়কে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে চিকিৎসা পেশাজীবীদের প্রশিক্ষণেও পরিবর্তন আনা হয়।

বিপ্লবের আগে ১৯৫৮ সালে কিউবার চিকিৎসকের সংখ্যা ছিল ৬০০০, অর্থাৎ ১০৫১ জনের জন্য ১ জন চিকিৎসক। এই অনুপাত বেশির ভাগ ল্যাটিন আমেরিকার দেশের তুলনায় বেশি ছিল। পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়, যখন বহু চিকিৎসক কিউবার বিপ্লবী সমাজে চিকিৎসা পেশা চর্চা না করার সিদ্ধান্ত নেন এবং কিউবা ছেড়ে ভাগ্যান্বেষণে চলে যান অন্য দেশে। ষাটের দশকের মাঝামাঝি পর্যায়ে এসে দেখা গেল, আগের অর্ধেক অর্থাৎ মাত্র তিন হাজার চিকিৎসক আছেন কিউবায় এবং বিভিন্ন বাস্তব কারণে তাঁদের শূন্যস্থান পূরণের প্রক্রিয়াটিও বেশ ধীরগতির। ১৯৫৯ সালে ‘ইউনিভার্সিটি অব হাভানা মেডিক্যাল স্কুল’- যখন পুনরায় চালু হলো (স্বৈরশাসক বাতিস্তা ১৯৫৬ সালে এই বিশ্ববিদ্যালয়টি বন্ধ করে দিয়েছিলেন), ১৬১ জন অধ্যাপকের মধ্যে মাত্র ২৩ জনকে শিক্ষাদানের জন্য পাওয়া গিয়েছিল।

এই সব প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও বিপ্লবী সরকার যত দ্রুত সম্ভব কিউবার সকল নাগরিককে চিকিৎসাব্যবস্থার আওতায় নিয়ে আসার ব্যাপারে জোর দেয়। সকল বেসরকারি বিমা, চিকিৎসাসেবা ও হাসপাতালকে একটা জাতীয় জনস্বাস্থ্যব্যবস্থার আওতার মধ্যে আনা হয়। ওষুধের মূল্যহ্রাস এবং ওষুধ কোম্পানিগুলোকে দ্রুত রাষ্ট্রীয় করা হয়। চিকিৎসা ফি ক্রমশ হ্রাস করতে করতে একেবারে বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা চালু করা হয়।

সর্বজনের জন্য চিকিৎসার ব্যবস্থা করার এই চেষ্টা ১৯৫৯ সালে হাভানা মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশ অস্থিরতা তৈরি করে। মেডিকেল স্টুডেন্টদের মধ্যে এ বিষয়ে ঐক্যমত্য ছিল না। অতীতে চিকিৎসাবঞ্চিতদের মধ্যে ইন্টার্ন করতে তাঁরা বাধ্য কি না, সে বিষয়ে অনেক তর্ক হতে থাকে। অনেকে শহরেই থাকতে চাইলেন, আগের নিয়মে চিকিৎসা ব্যবসা করার প্রশিক্ষণ নিতে চাইলেন।

কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে সদ্য পাশ করা বেশির ভাগ চিকিৎসক স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কিউবার প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন, যেখানকার চাষিরা কখনোই চিকিৎসাসেবার আওতায় ছিল না। সে অনুযায়ী জনস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সদ্য পাস করা চিকিৎসকদের জন্য ‘পল্লী স্বাস্থ্যসেবা’ ব্যবস্থায় ৩১৮টি নতুন পদ সৃষ্টি করল, যার বেশির ভাগই ছিল সিয়েরা মায়েস্ত্রার মতো সুদূর পার্বত্য এলাকায়। এই উদ্যোগটি ছিল ভবিষ্যৎ চিকিৎসকদের জন্য একটি মডেল। ফলে ষাটের দশকের শেষের দিকে এসে সকল চিকিৎসককে এমন একটি সর্বজনের স্বাস্থ্যব্যবস্থার মধ্যে কাজ করতে হয়, যেখানে সবার জন্য চিকিৎসা একেবারে বিনা মূল্যে প্রদান করা হয়।

১৯৬০ সালে চে গুয়েভারা ‘নোটস অন রেভোলিউশনারি মেডিসিন’ বক্তৃতায় পল্লী এলাকায় চিকিৎসা দিতে অনিচ্ছুক চিকিৎসকদের সম্পর্কে তাঁর ভাবনা তুলে ধরেন। বিপ্লবে ও দরিদ্র জনগণের প্রতি সংহতির অভাবের জন্য চিকিৎসকদের সস্তা সমালোচনা করার বদলে চে বললেন, এঁদের অনিচ্ছার পেছনে শুধু লোভ নয়, ভিন্ন কিছু ব্যাপারও কাজ করছে। চিকিৎসাবিদ্যার ছাত্র হিসেবে স্রেফ নিজের ব্যক্তিগত মহিমা অর্জনের ভাববাদী স্বপ্ন এবং বিপ্লবী সংহতির জীবন গ্রহণের ব্যাপারে নিজের প্রস্তুতিহীনতার কথা স্বীকার করে তিনি বললেন :

‘কয়েক মাস আগে এই হাভানায় দেখা গেল, সদ্য পাস করা একদল চিকিৎসক দেশের গ্রাম এলাকায় যেতে চাইছেন না এবং যেতে রাজি হওয়ার আগেই পারিশ্রমিক চেয়ে বসেছেন। অতীতের বাস্তবতা মাথায় রাখলে এটাই দুনিয়ার সবচেয়ে যৌক্তিক বিষয়-অন্তত আমার তা-ই মনে হয়; কারণ আমার কাছে ব্যাপারটা একেবারে পরিষ্কার। এই পরিস্থিতি আমাকে অতীতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়- অতীতে কী ছিলাম এবং কয়েক বছর আগেও কী আকাঙ্খা পোষণ করতাম।
আমি যখন চিকিৎসাবিদ্যা শিখতে শুরু করি, তখন আমার মাথায় আদর্শ হিসেবে আজকের দিনের বেশির ভাগ বিপ্লবী ধারণাগুলো ছিল না। আর সবার মতো আমিও সফলতা চাইতাম। স্বপ্ন দেখতাম চিকিৎসাশাস্ত্রে বিখ্যাত গবেষক ও বৈজ্ঞানিক হব, স্বপ্ন দেখতাম অবিরাম পরিশ্রম করে যেন এমন একটা কিছু আবিষ্কার করতে পারি, যা মানবজাতির কল্যাণে কাজে লাগবে, কিন্তু তা আমার জন্য নিয়ে আসবে ব্যক্তিগত জয়। আমি ছিলাম আর সবার মতো আমার পরিবেশেরই সন্তান।’ [ বিল্পবী কিউবার স্বাস্থ্য ব্যবস্থা- স্টিভ ব্রাউয়ার]

চে সেদিন বলছিলেন, ব্যক্তিগত মহিমা অর্জনের ভাববাদী স্বপ্ন শিক্ষার্থীদেরকে সামাজিক সংহতির জন্য প্রস্তুত করে না। ফলে কিছু তরুণ চিকিৎসক যে বিপ্লবের মধ্যে বসবাস করেও বিপ্লবের প্রতি দায়বদ্ধ হতে পারেননি, এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই।
আর্জেন্টিনার নাগরিক আলবার্তো [যিনি মোটরসাইকেলে করে চের ল্যাটিন আমেরিকা ভ্রমণের সঙ্গী ছিলেন] ১৯৬০ সালে তিনি বিপ্লবী কাজে সহায়তা করতে কিউবায় চলে আসেন।তিনি ছিলেন জৈব রসায়নের ডিগ্রি ধারি। ১৯৬২ সাল নাগাদ তিনি কিউবার একদল চিকিৎসককে সাথে নিয়ে হাভানা থেকে ৫০০ মাইল দূরে সান্টিয়াগো ডি কিউবায় দ্বিতীয় চিকিৎসা বিশ্ববিদ্যালয়টি চালু করেন। মাত্র ৬৩ জন শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা করা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচটি মেডিক্যাল স্কুলে ৪৫ বছর পর ছাত্রসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৮৩৩৩ জন, যার মধ্যে দুটি স্কুলে চিকিৎসাবিদ্যা আর বাকি তিনটিতে নার্সিং, দন্ত চিকিৎসা এবং এসবের সাথে সম্পর্কিত স্বাস্থ্যবিজ্ঞান-বিষয়ক পাঠদান করা হয়। ২০০৮ সাল নাগাদ কিউবার মেডিক্যাল স্কুলের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৫, যেখানে পড়ছেন ২৯ হাজার শিক্ষার্থী। সব মিলিয়ে মেডিক্যাল স্কুল, দন্ত চিকিৎসা, নার্সিং, চিকিৎসা প্রযুক্তি, পুনর্বাসনসহ চিকিৎসাবিদ্যার সাথে সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়ে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ২ হাজার।

স্বপ্নের পথে যেতে যেতে …
‘ঐতিহ্যগতভাবে আমাদের চিকিৎসকেরা শুধু হাসপাতাল কেন্দ্র করে শিক্ষিত হন, তাঁদের ঝোঁক থাকে রোগের কারিগর হয়ে ওঠার দিকে। স্বাস্থ্যের সামাজিক, মানসিক কিংবা পরিচ্ছন্নতা-রোগতাত্ত্বিক দিক সম্পর্কে যথেষ্ট প্রশিক্ষণ থাকে না তাঁদের…প্রাথমিক চিকিৎসা বিষয়ে মনোযোগ থাকে অবহেলিত…বহু দশক ধরেই বিশেষায়িত চিকিৎসাব্যবস্থার দিকে অতিরিক্ত জোর দেওয়ার প্রবণতা চালু আছে…এই সব খোদ ‘মানুষ’ সম্পর্কিত ধারণাটিকেই বিকৃত করে ফেলেছে।’

নতুন জাতীয় স্বাস্থ্যসেবার আওতায় সব চিকিৎসাবঞ্চিত এলাকায় চিকিৎসক নিয়োগ করা হয়, জনস্বাস্থ্য কর্মসূচিতে বিভিন্ন প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার দিকে জোর দেওয়া হয় এবং সকল নাগরিককে এই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার আওতায় আনা হয়। প্রতিটি এলাকায় স্বেচ্ছাসেবকদের সাথে নিয়ে সরকারি প্রচারণার মাধ্যমে স্বাস্থ্য বিষয়ে সর্বসাধারণের মাঝে উঁচুমাত্রায় সচেতনতা তৈরি করা হয়।

কিন্তু কি ছিল যেই ম্যাজিক যা কিউবার স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে আমুলে বদলে ছিল দুনিয়ার আর সব চিকিৎসা ব্যবস্থা থেকে? কি করে গড়ে উঠল মাঠ পর্যায় থেকে প্রতিরোধ মূলক চিকিৎসা নীতির ভিত? ১৯৬০-এর দশকে যেসব চিকিৎসক পল্লী চিকিৎসাসেবার আওতায় একেবারে প্রথম দিকে কিউবার পার্বত্য অঞ্চলগুলোতে গিয়েছিলেন, তাঁরা বহু বছর পরে সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় পেছন দিককার কথা স্মরণ করে বলেছেন, সে সময়কার অভিজ্ঞতা নতুন চিকিৎসাব্যবস্থা চর্চায় তাঁদেরকে প্রস্তুত করতে একটা বড় ভূমিকা রেখেছে।

সাক্ষাৎকারদাতাদের কথায় তাঁদের অভিজ্ঞতার একটা সাধারণ গতিপথ ফুটে ওঠে : প্রথম দিকে ‘চিকিৎসকরা জনগণের কুঁড়েতে বসবাস করেন’ এবং ‘তাঁদের ভূমিকা শুধুমাত্র অসুস্থদের চিকিৎসাসেবা দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, যেহেতু প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগী তাঁদের কাছে চিকিৎসা নিতে আসত’। পরে, সময়ের সাথে সাথে, ‘চিকিৎসকরা যতই কমিউনিটির সাথে সম্পৃক্ত হতে থাকেন, ততই তাঁদেরকে সামাজিক ও শিক্ষাক্ষেত্রে নানা ভূমিকা রাখতে দেখা যায়।’ [ Ileana del Rosario Morales Suarez, MD, MS, Jose A. Fernandez Sacasas, MD, MS, and Francisco Duran Garcia, MD, “Cuban Medical Education: Aming for the Six-Star Doctor,” MEDICC Review, 10/4 (Fall 2008)]

পরবর্তী কয়েক দশকে এই চিকিৎসকদের অনেকেই কিউবার চিকিৎসাব্যবস্থায় নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠেন; দরিদ্রদের মধ্যে বসবাস করার প্রথম দিককার অভিজ্ঞতা এবং তাদের রোগের উৎসগুলো সম্পর্কে অর্জিত ধারণা পরবর্তীতে কিউবায় প্রতিরোধমূলক এবং প্রাথমিক চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর সর্বজনীন গুরুত্ব আরোপের নৈতিক ভিত্তিটা তৈরি করে দেয়।

সত্তরের দশকে স্থাপিত স্থানীয় পল্লী-ক্লিনিকগুলো ‘কম্প্রিহেনসিভ কমিউনিটি চিকিৎসাসেবা’র মূল প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে প্রাথমিক চিকিৎসার ওপর জোর দিয়ে কমিউনিটি চিকিৎসা কার্যকরভাবে গোটা দেশের জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া হয়। চিকিৎসক, নার্স ও অন্য চিকিৎসা পেশাজীবীরা যেন সুস্থ-সবল কমিউনিটি তৈরিতে তাঁদের দায়িত্ব সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করতে পারেন সে জন্য ১৯৭৬ সালে চিকিৎসা শিক্ষাব্যবস্থা দেখভালের দায়িত্ব শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে জনস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়। জনস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় খুব দ্রুত কিছু পরিবর্তনের সুপারিশ করে :

‘ঐতিহ্যগতভাবে আমাদের চিকিৎসকেরা শুধু হাসপাতাল কেন্দ্র করে শিক্ষিত হন, তাঁদের ঝোঁক থাকে রোগের কারিগর হয়ে ওঠার দিকে। স্বাস্থ্যের সামাজিক, মানসিক কিংবা পরিচ্ছন্নতা-রোগতাত্ত্বিক দিক সম্পর্কে যথেষ্ট প্রশিক্ষণ থাকে না তাঁদের…প্রাথমিক চিকিৎসা বিষয়ে মনোযোগ থাকে অবহেলিত…বহু দশক ধরেই বিশেষায়িত চিকিৎসাব্যবস্থার দিকে অতিরিক্ত জোর দেওয়ার প্রবণতা চালু আছে…এই সব খোদ মানুষ সম্পর্কিত ধারণাটিকেই বিকৃত করে ফেলেছে।’ [Ernesto de la Torre Montejo, Saludparatodos, sies possible. La Habana: Sociedadcubana de SaludPublicaSeccion de Medicinia Social, 2004, 50.]

আলমা-আতা ঘোষণা ও কিউবার এগিয়ে চলা
পল্লী-ক্লিনিকগুলোকে প্রাথমিক চিকিৎসার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার জন্য পরবর্তী কয়েক দশকে চিকিৎসা শিক্ষার প্যারাডাইম এবং স্বাস্থ্যসেবার দর্শনটিকেই পাল্টে ফেলতে হয়েছে। কিউবার চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা যখন তাঁদের এগিয়ে যাওয়ার ইতিহাসের কথা স্মরণ করেন, তখন প্রায় সব সময়ই ১৯৭৮ সালে আলমা আতায় গৃহীত গাইডলাইনের কথা তুলে ধরেন।

তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের (বর্তমানের কাজাখস্তান) আলমা আতায় প্রাথমিক চিকিৎসাসেবার ওপর একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা এবং জাতিসংঘের শিশু তহবিল কর্তৃক জারি করা রিপোর্টে ওই সম্মেলন কর্তৃক গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো প্রকাশিত হয়। সম্মেলনে সকল দেশে এবং বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ‘সর্বজনীন প্রাথমিক চিকিৎসাব্যবস্থা’ গড়ে তোলার লক্ষ্যে একটি আন্তর্জাতিক এজেন্ডা স্থির করা হয়। রিপোর্টে প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা নির্ভর একটি নতুন ধরনের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হয়। এ ব্যবস্থার আওতায় পারিবারিক চিকিৎসকদের জনস্বাস্থ্য কর্মসূচি এবং প্রতিরোধমূলক শিক্ষাকে চিকিৎসার সাথে সমন্বিত করার প্রশিক্ষণ প্রদান করা হবে। [ World Health Organization and the United Nations Children’s Fund, “Report of the International Conference on Primary Health Care, Alma-Ata, USSR, 6-12 September 1978,” WHO Health for All series, no. 1, Geneva, 1978.]

সম্মেলনের পরপর সারা দুনিয়ার চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ এবং মেডিক্যাল স্কুলগুলোর মধ্যে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য বিপুল উদ্দীপনার সঞ্চার হয়। এই কাতারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মতো উন্নত দেশেগুলোও রয়েছে, যেখানে বিশাল গ্রাম্য এলাকা এবং দরিদ্র নগর কেন্দ্রগুলোতে চিকিৎসাকর্মীর মারাত্মক সংকট রয়েছে।

কিন্তু পরবর্তী কয়েক দশকে প্রাথমিক চিকিৎসাসেবাকে অগ্রাধিকার দিয়ে চিকিৎসা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর এই তাগিদ আস্তে আস্তে সারা দুনিয়ায়ই দুর্বল হয়ে পড়ে। পুঁজিবাদী অর্থনীতির দেশগুলোতে উদ্যোগটি দুর্বল হয় ‘স্বাস্থ্যসেবা বাজার’-এর মুনাফার আকর্ষণে আর উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশগুলোতে উদ্যোগটি দুর্বল হয় সর্বজনের স্বাস্থ্যব্যবস্থা-বিরোধী নয়া উদারনৈতিক নীতিমালার চাপে।

১৯৭৩ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ড. হাফদান মাহলার ২০০৮ সালে আলমা আতা ঘোষণার তাৎপর্য সম্পর্কে বলেন, “বেশির ভাগের কাছে এটা ছিল সত্যিকার অর্থেই বিপ্লবী চিন্তা। ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’ এমন একটা মূল্যবোধভিত্তিক ব্যবস্থা (ভ্যালু সিস্টেম), যেখানে প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা হলো কৌশলগত উপাদান। এর একটা আরেকটার সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।” তিনি মনে করেন, ‘জনস্বাস্থ্য ও প্রাথমিক চিকিৎসা সম্পর্কে সেই সময় বৈশ্বিক ঐকমত্যে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছিল কারণ ‘১৯৭০-এর দশকের সময়টা ছিল সামাজিক ন্যায়ের জন্য একটা গুরুত্বপূর্ণ কাল। এ কারণেই ১৯৭৮ সালে আলমা আতার পরে সব কিছুই সম্ভব বলে মনে হতে থাকে।’

পরবর্তীতে যখন সামাজিক ন্যায়ের ভিত্তিতে সমন্বিত চিকিৎসার ধারণাটা খুব দ্রুত দুনিয়ার বেশির ভাগ অঞ্চলে পরিত্যক্ত হয়, সেটাও ঘটে ‘একটা পুরো উল্টো যাত্রার কারণে, যে সময় আইএমএফ ‘স্ট্রাকচারাল অ্যাডজাস্টমেন্ট প্রোগ্রাম’ বা কাঠামোগত পুনর্বিন্যাস কর্মসূচির মাধ্যমে সব ধরনের বেসরকারীকরণকে উৎসাহিত করে। আইএমএফ সে সময় আলমা আতায় গৃহীত ঐকমত্যের সমালোচনা করে এবং প্রাথমিক চিকিৎসাকেন্দ্রিক কৌশলের প্রতি অঙ্গীকারকে দুর্বল করে দেয়। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার আওতায় থাকা বিভিন্ন অঞ্চল চেষ্টা করলেও বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের কাছ থেকে কোনো সহায়তা পায়নি।’ [Primary Health care Comes Full Circle. An interview with Dr. Halfdan Mahler, Bulletin of the World Health Organization, October 2008.]

কিউবা কিন্তু আলমা আতা রূপকল্পের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ থাকে এবং সেই রূপকল্পকে বাস্তবে পরিণত করতে তার চিকিৎসা-ব্যবস্থায় প্রতি দশকেই বিভিন্ন উপাদান যুক্ত করতে থাকে। কিউবার প্রতিটি প্রদেশে মেডিক্যাল স্কুল স্থাপন করার কারণে ১৯৮০-র দশকে জনস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষে আরো বেশিসংখ্যক যোগ্য প্রাথমিক চিকিৎসা বিশেষজ্ঞের জোগান দেওয়া সম্ভব হয়।

১৯৮৪ সালে এসে ফিডেল ক্যাস্ট্রো ঘোষণা করেন, ২০০০ সাল নাগাদ কিউবায় ৭৫ হাজার চিকিৎসক তৈরি হবে, কিউবার প্রয়োজন মিটিয়েও যাঁদের মধ্য থেকে দশ হাজার জনকে যে কোনো সময় দেশের বাইরে চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত করা সম্ভব হবে। ১৯৮৬ সালে লক্ষ্যমাত্রা আরো নিখুঁত করার জন্য চিকিৎসকের সংখ্যা ৬৫ হাজারে নির্ধারণ করা হয়, যে লক্ষ্যমাত্রা শতাব্দীর শুরুতে অর্জিতও হয়। এ সময় কিউবায় চিকিৎসকের সংখ্যা দাঁড়ায় ৬৬ হাজারে। বিস্ময়কর এক পরিবর্তন- ১৯৭৬ সালে প্রতি হাজারে মাত্র ১ জন চিকিৎসক থেকে ২৪ বছর পর প্রতি ১৬৭ জনে ১ জন চিকিৎসক।

১৯৮৪ সালে কিউবার জনস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এই ভবিষ্যৎ চিকিৎসকদের প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা বিস্তারের জন্য উপযুক্ত করে গড়ে তুলতে আরো একটি পদক্ষেপ গ্রহণ করে। ‘মেডিসিনা জেনারেল ইন্টিগ্রাল’ নামে পারিবারিক চিকিৎসার একটি কর্মসূচি গৃহীত হয়, ইংরেজিতে যা ‘কম্প্রিহেনসিভ জেনারেল মেডিসিন’ নামে পরিচিত।
৮০-র দশকের শেষের দিকে এই কর্মসূচির মাধ্যমে কম্প্রিহেনসিভ জেনারেল মেডিসিনের বিশেষজ্ঞ এবং একজন করে চিকিৎসক ও নার্স সমন্বয়ে ‘বেসিক হেলথ টিম’ তৈরি হতে থাকে। ১৯৯০-এর দশকজুড়ে এই চিকিৎসক দলগুলোকে কিউবার প্রতিটি এলাকায় চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত করা হয়। এই দলগুলোকে সহায়তা করে ‘ব্রিগেডিস্টাস স্যানিটারিয়াস’ বা স্থানীয় জনগণের সমন্বয়ে গঠিত কতগুলো স্বাস্থ্য ব্রিগেড। এই স্বাস্থ্য ব্রিগেডগুলো চিকিৎসক ও নার্সদের সাথে প্রায়ই সাক্ষাৎ করে। বিশেষ করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার বিকাশে ও জনস্বাস্থ্যের প্রচারণায় স্বাস্থ্য ব্রিগেডগুলো মূল্যবান ভূমিকা পালন করে।

২০০৪ সাল নাগাদ এই চিকিৎসক দলগুলো কিউবার ৯৯ শতাংশ মানুষের কাছে চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়। একেকটি দলের কাজের আওতায় পড়ে গ্রাম বা শহরের ১২০ থেকে ১৫০ পরিবারের প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০ জন মানুষ। চিকিৎসক ও নার্সরা নিজ নিজ কাজের এলাকায়ই থাকে, যেন প্রয়োজনের সময় দ্রুত প্রতিটি পরিবারের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। এই আয়োজনটি প্রতিরোধমূলক চিকিৎসাব্যবস্থার মূল চাবিকাঠি; কেননা এই ব্যবস্থায় চিকিৎসক দলগুলোর পক্ষে স্থানীয় এলাকাটির সবচেয়ে জরুরি চিকিৎসাসংক্রান্ত বিষয়গুলো অনুধাবন করার সুযোগ তৈরি হয়। প্রত্যেক ব্যক্তি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান সংগ্রহ করে এবং তারপর প্রতিরোধমূলক সেবা ও স্বাস্থ্য শিক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করে চিকিৎসক ও নার্সদের দল কিউবার নাগরিকদের আরো বেশি স্বাস্থ্যসচেতন করে তোলে। ফলে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তির হার উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পায়। প্রয়োজনে চিকিৎসক বা নার্সদের দল রোগীদেরকে ল্যাবরেটরি টেস্টের জন্য পলিক্লিনিকের ডায়াগনস্টিক সেন্টারে এবং রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের কাছে প্রেরণ করে। এরপর প্রয়োজন অনুসারে রোগীদের হাসপাতালে ভর্তি কিংবা সার্জারির ব্যবস্থা করে। পল্লীক্লিনিকগুলোর অবস্থান এমন একেকটা জায়গায়, যেখান থেকে ২০ হাজার থেকে ৪০ হাজার মানুষ এবং প্রয়োজনীয় সংখ্যক চিকিৎসক বা নার্সদেরকে সাহায্য করতে পারে।

গণমুখী চিকিৎসা ব্যবস্থাঃ ‘রোগ আসার আগেই ঠেকিয়ে দেয়া’

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পারিবারিক চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের একটি দল ১৯৯০-এর দশকের শেষের দিক পর্যন্ত কিউবার প্রাথমিক চিকিৎসাসেবার একটি মূল্যায়ন তৈরি করে। তারা কিউবার চিকিৎসক ও নার্সদের দলের অভূতপূর্ব মনোযোগের বিষয়টি গুরুত্বসহকারে তুলে ধরে। তারা দেখে, চিকিৎসক ও নার্সরা নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রের সকলকে আক্ষরিক অর্থেই চেনে-জানে।

তারা এ বিষয়ে লিখেছে, ‘প্রত্যেক পারিবারিক চিকিৎসককে বছরে অন্তত দুবার নিজ নিজ কর্ম-এলাকার প্রত্যেক রোগীর সাথে সাক্ষাৎ করতে হয়। চিকিৎসকদের কাছে নিজ নিজ এলাকার সকল রোগীর অবস্থা এবং তাদেরকে দেওয়া প্রতিরোধমূলক চিকিৎসাসেবার রেকর্ড থাকে।’

তারা এমন কিছু বিষয়ের বর্ণনা দেয়, যেগুলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চিকিৎসাব্যবস্থার ভোক্তাদের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হবে :

‘রোগীকে যে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে, পারিবারিক চিকিৎসক নিজ উদ্যোগে সেখানে যান। রোগী যে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অধীনে ভর্তি হয়েছে, তার সাথে সাক্ষাৎ করেন, হাসপাতালের চিকিৎসার সাথে পরিচিত হন, যেন হাসপাতাল ছেড়ে যাওয়ার পর সে চিকিৎসার ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। তিনি রোগীর সাথে মাঝে মাঝে সাক্ষাৎ করেন, যেন রোগী-চিকিৎসক সম্পর্ক আরো জোরদার হয়।’ [ Howard Waitzkin, MD, PhD, Karen Wald, Romania Kee, MD, Ross Danielson, PhD, Lisa Robinson, RN, ARNP, “Primary Care in Cuba: Low and High-Tehnology Developments Pertinent to family Medicine,” Devision of Community Medicine, University of New Mexico, Family Practice Center, 1997.]

‘পারিবারিক চিকিৎসক-নার্স সংবলিত চিকিৎসা কর্মসূচি’ বাড়ানোর সাথে সাথে চিকিৎসার পাঠক্রমেও পারিবারিক চিকিৎসার মডেলের সাথে খাপ খাওয়ানোর উদ্দেশ্যে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন নিয়ে আসা হয়। ১৯৯০-এর দশকের দিকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, প্রায় সকল চিকিৎসা শিক্ষার্থীকে বিশেষজ্ঞ জ্ঞান অর্জনের আগে প্রথমে পারিবারিক চিকিৎসার প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে, যার মধ্যে অন্তত তিন বছরের আবাসিক চিকিৎসাও অন্তর্ভুক্ত।

প্রাথমিক পর্যায়ের চিকিৎসায় দক্ষতা অর্জনের ওপর এই গুরুত্বারোপের ফলে শুধু যে কিউবার ভেতরেই পারিবারিক বা সামাজিক চিকিৎসার প্রাধান্য নিশ্চিত করা সম্ভব হয় তা নয়, সেই সাথে কিউবার চিকিৎসা স্বেচ্ছাসেবীদেরকে কিউবার বাইরের বিভিন্ন চিকিৎসা ঘাটতির দেশে চিকিৎসাসেবা প্রদানে নানাভাবে যোগ্য করে তোলা হয়। প্রত্যেক চিকিৎসকই প্রয়োজনীয় পারিবারিক চিকিৎসাসেবা প্রদানে সক্ষম, সেই সাথে বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ জ্ঞান অর্জন করা প্রচুর চিকিৎসক রয়েছেন, যাঁরা প্রয়োজনানুসারে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসাসেবা দিতেও সক্ষম।

ড. ইলিয়েনা ডেল রোসারিও মোরালেস সুয়ারেস, ড. হোসে অ্যা. ফার্নান্দেজ সাকাসাস ও ড. ফ্রান্সিসকো ডুরান গারসিয়ার কাছ থেকে ওই সময় কিউবার চিকিৎসা শিক্ষাব্যবস্থায় যেসব ধারণাগত পরিবর্তন হয় তার একটা রূপরেখা জানা যায়। প্রত্যেক চিকিৎসককে প্রাথমিক চিকিৎসাসেবায় দক্ষ করে তোলার জন্য সে সময় নিম্নোক্ত বিষয়গুলোর ওপর জোর দেওয়া হয় :

  • ১. চিকিৎসাকে সামাজিক-জৈবিক বিজ্ঞানের সাথে সম্পর্কিত এক বাস্তব জীবন পদ্ধতি হিসেবে দেখা;
  • ২. সমস্যাভিত্তিক এবং পারস্পরিক আলোচনানির্ভর শিক্ষা পদ্ধতি অবলম্বন করা;
  • ৩. রোগতত্ত্ব ও জনস্বাস্থ্যবিজ্ঞানের ওপর বেশি করে জোর দেওয়া;
  • ৪. প্রশিক্ষণের শুরুর দিকেই বিভিন্ন মেডিক্যাল ও ক্লিনিক্যাল বিষয়ে দক্ষতা অর্জনের সূত্রপাত ঘটানো;
  • ৫. অধ্যাপকদের পাঠদান পদ্ধতির ক্রমাগত উন্নয়ন ঘটানো এবং শিক্ষার্থীদের চিকিৎসাসেবা শিক্ষায় অংশগ্রহণ করতে বলা;
  • ৬. প্রত্যেক মেডিক্যাল স্কুলে কম্প্রিহেনসিভ জেনারেল মেডিসিনের পৃথক বিভাগ খোলা বাধ্যতামূলক করা; ৭. তাত্ত্বিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণের আগে শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক পরীক্ষায় পাস বাধ্যতামূলক করা, যার মাধ্যমে পারিবারিক চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতার প্রমাণ মেলে।[Morales Suarez et al.,]

দেশটিতে এই প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা মডেলের চাবিকাঠি হচ্ছে বার্ষিক স্বাস্থ্য পর্যালোচনা।অর্থাৎ যে ডাক্তার বা যে ক্লিনিকটির আওতায় যতগুলো পরিবার এখানে চিকিৎসাধীন থাকবে তাদের প্রত্যেকের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে হবে বার্ষিক ভিত্তিতে।নাগরিকেরা যদি বার্ষিক পরীক্ষণের যদি ডাক্তারের কাছে বা ক্লিনিকে আসতে না চায় তাহলে তার বাড়িতে যাওয়া হবে, এবং যেখানেই থাকুক তাকে খুঁজে বের করা হবে। ড. কুইভ্যাস হিল রসিকতা করে বলছিলেন, ‘আমার নার্স জানে তারা কোথায় থাকে। তারা দৌড়াতে পারবে, কিন্তু পালাতে পারবে না’।বার্ষিক স্বাস্থ্য পরীক্ষণের এই তথ্য সন্নিবেশ করে চিকিৎসকেরা নির্ধারণ করেন কোন নাগরিক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে আছেন আর কোন নাগরিক ঝুঁকিমুক্ত। এখানে উদ্দেশ্য একটাই, ‘রোগ আসার আগেই ঠেকিয়ে দেবার চেষ্টা’।

১৯৭৬ সালে কিউবার সংবিধানের ৫০তম আর্টিকেলের মাধ্যমে ‘প্রত্যেক নাগরিকের জন্য বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা সুনিশ্চিত’ করার গ্যারান্টি দেয়া হয়। সেই থেকে প্রতিটি কিউবান ডাক্তারি পরামর্শ, পরীক্ষানিরীক্ষা, হাসপাতাল খরচ, ঔষধপত্র এবং সার্জিকাল সমস্ত সেবা একদম ফ্রিতে পেয়ে থাকেন। ২০০৭ সালে বিশ্বে প্রথমবারের মত কিউবা ব্লাড ব্যাংক, নেফ্রোলজি ও মেডিক্যাল ইমেজের একটি কম্পিউটারাইজড জাতীয় নেটওয়ার্ক তৈরির ঘোষণা দেয়, যা নি:সন্দেহে গবেষণা কার্যক্রমকে একলাফে দশ পা এগিয়ে দেবে।
১৯৭৬ সালে যখন এইডস সম্পর্কে খুব কম তথ্যই জানা গিয়েছিল, কিউবা তখন তাদের জনগণের মাঝে ম্যাসিভ স্ক্রিনিং চালায়। সকল এইচআইভি আক্রান্তকে তারা সম্পূর্ণ আলাদা জায়গায় নিয়ে রেখেছিল যাতে রোগ সংক্রামিত না হতে পারে। এইডস এর চিকিৎসায় ব্যবহৃত এন্টি রেট্রোভাইরাল ড্রাগ ‘৯৬ সালে কিউবান গবেষকগণ আবিষ্কার করেন এবং তা বিশ্বব্যাপী রপ্তানি করেন। লাটিন আমেরিকার দেশগুলোতে ক্রমবর্ধমান প্রস্টিটিউশান ও STD’র সংক্রমণের মাঝেও কিউবাতে এইচআইভি আক্রান্তের হার মাত্র ০.০০৫%।

কিউবার স্বাস্থ্যসেবা ‘রোগ নিরাময়’-এর চেয়ে ‘রোগ প্রতিরোধ’-এ অধিক গুরুত্ব প্রদান করে, তাই প্রিভেনটিভ মেডিসিনে তারা বিশ্বে রোল মডেল। পোলিও ও জলবসন্ত ইতিমধ্যে কিউবা হতে নির্মূল হয়েছে। পোলিও প্রতিরোধে ব্যবহৃত মুখে খাওয়ানোর টিকাটি মূলত ‘জীবন্ত বা লাইভ ভ্যাক্সিন’। কিউবান চিকিৎসকদের গবেষণায় বের হয়, যখন কোনো ভূখন্ড থেকে পোলিও প্রায় নির্মূলের পথে এগোয়, সেখানে ‘লাইভ ভ্যাক্সিন’ ব্যবহারের ফলে পোলিওর নতুন মারাত্মক এক প্রজাতির উদ্ভব ঘটার সম্ভাবনা থেকে যায়। সেক্ষেত্রে তাই ‘মৃত বা কিলড ভ্যাক্সিন’ ব্যবহার করা প্রয়োজন। কিউবাতে এই প্রচলন শুরু হওয়ার পর বিশ্বের প্রতিটি উন্নত দেশ এই পথে হাঁটা আরম্ভ করে। এছাড়াও কিউবান গবেষকগণ সম্প্রতি মেনিনজাইটিস বি-এর টিকা আবিষ্কার করে সাড়া ফেলেন।

কিউবা’র টুরিজমের প্রায় ৬% আসে চিকিৎসাকার্যে আগত পর্যটকদের থেকে। এছাড়া ভ্যাক্সিন রপ্তানিও তাদের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুবিশাল খাত। কিউবার মেডিকেল কলেজ ‘EML’ বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ হিসেবে স্বীকৃত।অতি প্রয়োজনীয় বিদেশি মুদ্রা অর্জন করবার জন্য কিউবা তাদের স্বাস্থ্যকর্মীদের বিদেশে পাঠায়, যেখানে তাঁরা স্থানীয় সরকারকে সাহায্য করেন। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের তথ্য অনুসারে কিউবা প্রতি বছর জন পরিষেবা রফতানির মাধ্যমে ৬ বিলিয়ন ডলার রোজগার করে থাকে।

তবে চিকিৎসকদের পারিশ্রমিক অন্যান্য দেশের তুলনায় কিউবাতে অত্যন্ত কম। গত শতাব্দীর শেষভাগে একজন কিউবান চিকিৎসকের মাসিক আয় ছিলো ২৬১ পেসো বা ২৫ ইউএস ডলারের মত, যদিও অন্যান্য পেশার সাধারণ নাগরিকের গড় আয়ের তুলনায় এই আয় প্রায় দ্বিগুণ। বান কি মুন কিউবার চিকিৎসকদের প্রশংসায় বলেছিলেন, ‘চিকিৎসকরা সেখানে ট্যাক্সি চালিয়ে বা ফল বেচে আরো বেশি আয় করতে পারেন, কিন্তু তারপরও তারা হাসিমুখে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন’।

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা ২০০০ সালে বলেছে, ” No other country has been as consistent in taking measures towards achieving the goal of “Health for All” as Cuba.”

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাঃ বিক্ষিপ্ত নীতির উজ্জ্বল স্মারক

২০১৪ সালে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক মারগারে ট চ্যান হাভানা এসে দেখেছেন সেই দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা রোগ প্রতিরোধ বিজ্ঞানের ভিত্তিতে গড়া, এর ফলাফল অসাধারন । মারগারে ট চ্যান তখন বলেন, ‘বিশ্বের কিউবার মডেল অনুসরণ করা উচিত আর রোগ চিকিৎসা মডেল বদলানো উচিৎ (curative ) । এই অকার্যকর আর ব্যয় বহুল চিকিৎসার বদলে প্রতিরোধক দৃষ্টি ভঙ্গী নেয়া উচিত। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা মনে করে স্বাস্থ্য সেবা মান আর সবার কাছে পৌঁছানো সম্পদের সীমা বদ্ধতার উপর নির্ভর করেনা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা আর দরিদ্র ভঙ্গুর জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা দেওয়া’।

আমাদের দেশ স্বাধীন হয়েছে ১৯৭১ সালে, কিন্তু তারপর এতো বছর পার হয়ে গেলেও স্বাধীন বাংলাদেশের কোন স্বাস্থ্য নীতি প্রণয়ন করা সম্ভব হয় নি। দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা স্বাধীন হবার আগে যা ছিল তারই ধারাবাহিকতায় স্বাস্থ্য সেবা নামক কর্মকান্ড হিশেবে চলে আসছে। ‘স্বাস্থ্য সেবা’র অর্থ দাঁড়িয়েছে চিকিৎসা সেবা এবং রোগ নিরাময়; রোগ প্রতিরোধ নয়। কিউবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নাম ‘ গণস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়’। আমাদের দেশের সরকারের নীতি নির্ধারকদের সম্ভবত ‘গণস্বাস্থ্য’ বা জনস্বাস্থ্য বিষয়ে কোন ধারণাই নেই।

ঔপনিবেশিক কাঠামো এবং চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবার অবাধ বাণিজ্যিকীকরণের ফলেই এমনটা হয়েছে। ১৭৬৪ সালে ইন্ডিয়ান মেডিকেল সার্ভিস (আইএমএস) চালু হয়, যা ছিল মূলত এ দেশে অবস্থানরত ইউরোপীয়দের জন্য। ফলে সাদা চামড়ার বিদায়ে তাদের জায়গায় এখানকার টাকাওয়ালারা প্রতিস্থাপিত হয়েছে। কাঠামো ছিল কঠোরভাবে কেন্দ্র-নিয়ন্ত্রিত। ব্রিটিশ গেছে কিন্তু কাঠামো চালু থেকেছে। শিক্ষাক্রমের যে ভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রবণতা ছিল, তা আচ্ছন্ন রেখেছে আজও। তা আমাদের চাকরিমুখী করেছে, কর্মমুখী করেনি। এই ধারার শিক্ষিতদের টার্গেট থাকে কম জবাবদিহির সরকারি চাকরি। গ্রামে স্বাস্থ্যসেবা কীভাবে যাবে কিংবা জনগণের ডাক্তার হওয়া যায় কীভাবে এই শিক্ষা কোনোভাবেই এখানে মেলে না।[‘স্বাস্থ্যব্যবস্থার অসুখ’ – ডা. মনিরুল ইসলাম]

১৯৭৮ সালে প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করার জন্য আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বিশ্বের সকল রাষ্ট্রের সস্মতিতে ‘আলমা আতা ঘোষণা’ গৃহিত হয়। বাংলাদেশ এর অন্যতম প্রধান স্বাক্ষরকারী দেশ এবং বাংলাদেশের কিছু ব্যক্তি সরাসরি এই ঘোষণা প্রণয়নের সাথে যুক্ত হবার গৌরব অর্জন করেছেন। তাঁদের মধ্যে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ডাঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরী অন্যতম।

মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী চিকিৎসকরা স্বাধীন বাংলাদেশের স্বাস্থ্য সেবার জন্য নতুন চিন্তাভাবনা করেছিলেন। সমাজতান্ত্রিক দেশ চীন ও কিউবার স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, বিশেষ করে স্বাস্থ্য কর্মী গঠন করে গ্রামে গঞ্জে স্বাস্থ্য পৌঁছে দিতে পারার সম্ভাবনা পরীক্ষা নিরীক্ষা বাংলাদেশে হয়েছে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) বাংলাদেশের অভিজ্ঞতাকেও ‘আলমা আতা ঘোষণা’ প্রস্তুত করার আগে নজির হিশেবে ব্যবহার করেছে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ছোট বড় অভিজ্ঞতার আলোকে ১৯৭৭ সালে ৩০তম বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনে ২০০০ সালের মধ্যে সবার জন্য স্বাস্থ্য অর্জনের ঘোষণা দেয়া হয়। এর পরের বছর সোভিয়েত রাশিয়ার কাজিকিস্তানের আলমা আতা শহরে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ৩১তম সম্মেলনে আলমা আতা ঘোষণা গৃহিত হয় যা এখনো প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা এবং রোগ প্রতিরোধ সংক্রান্ত সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ দলিল হিসেবে স্বীকৃত।

আলমা আতা ঘোষণার কয়েকটি তাৎপর্যপুর্ণ দিক ছিল যা, যে কোন স্বাস্থ্য নীতির জন্য দিকনির্দেশনা দিতে পারে। যেমন, ‘স্বাস্থ্য’ মানে কী? এর একটি ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, ‘স্বাস্থ্য হচ্ছে একটি পরিপুর্ণ শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক সুস্থ্য অবস্থা; শুধুমাত্র রোগের অনুপস্থিতি নয়। স্বাস্থ্য মানুষের মৌলিক অধিকার এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের গুরুত্বপুর্ণ সূচক হিশেবে স্বাস্থ্য সূচক সার্বজনীনভাবে স্বীকৃত। এই সংজ্ঞাটি বাংলাদেশের বিগত কয়েকটি স্বাস্থ্য নীতির খসড়ায় আলমা আতার উল্লেখ ছাড়াই স্থান পেয়েছে।

স্বাস্থ্যগত দিক থেকে ধনী ও গরিব দেশ এবং একই দেশে ধনী ও গরিব মানুষের মধ্যে অসম অবস্থান গ্রহণযোগ্য নয় বলে আলমা আতা ঘোষণায় বলা হয়েছে। আলমা আতা ঘোষণায় এই বৈষম্য বিচারের গুরুত্ব অনেক ব্যাপক ও রাজনৈতিক।জনগনের স্বাস্থ্য ভাল রাখার চেষ্টা করা দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন এবং শান্তির জন্য অপরিহার্য। তাই আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের মাধ্যমে ধনী ও গরিব দেশের মানুষের স্বাস্থ্য পরিস্থিতির মধ্যে পার্থক্য কমিয়ে আনা সম্ভব।

কিন্তু এই বিষয়টি মোটেও স্বাস্থ্য নীতির দিক থেকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয় নি। জনগনের স্বাস্থ্যের মান উন্নত হওয়া একটি দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনার জন্য কত জরুরী আমাদের দেশের স্বাস্থ্য নীতির প্রণেতারা সে বিষয়টি দেখতে ব্যর্থ হয়েছেন। তাই স্বাস্থ্য নীতির সাথে দারিদ্র বিমোচন পরিকল্পনা যুক্ত হয়নি। কিংবা দারিদ্র বিমোচন পরিকল্পনায় স্বাস্থ্য সূচক উন্নত করার মতো পরিকল্পনা রাখা হয়নি। মানুষের দরিদ্র হবার প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকলে স্বাস্থ্য সেবা যতোই উন্নত হোক, সে দেশ কখনোই উন্নত হতে পারে না।

‘আলমা আতা ঘোষণা’ অনুযায়ী জনগনের অধিকার এবং একই সাথে দায়িত্ব রয়েছে স্বাস্থ্য সেবা প্রদান সংক্রান্ত পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে অংশগ্রহণ করার। জনগণের এই অংশগ্রহণ রাজনৈতিক ক্ষমতার সাথেও যুক্ত। উপর থেকে চাপিয়ে দেয়া কোন নীতি নয়, জনগনের অধিকার স্বীকার করে তার অংশগ্রহণে তার প্রয়োজন অনুসারে নীতি প্রণীত হবে এবং বাস্তবায়ন করা হবে।

এই বিষয়টিকে প্রগতিশীল সংগঠনগুলো একভাবে দেখেন এবং তাঁরা এর রাজনৈতিক দিকটি অনুধাবন করে জনগন এবং স্থানীয় সরকারের সম্পৃক্তির প্রস্তাব করেন, কিন্তু সরকার এর পাশাপাশি শুধুই পেশাজীবি সংগঠন, বিশেষ করে চিকিৎসকদের সংগঠনের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেন। ফলে স্বাস্থ্য নীতি নিয়ে কথা বলেন চিকিৎসকরা এবং তাঁদের পছন্দ অপছন্দ এই ব্যাপারে প্রধান হয়ে দাঁড়ায়। তাছাড়া বর্তমানে রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্তিও জনগনের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে বাঁধা হয়ে যায়। এই আচরন স্বাস্থ্য সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে এবং জনগনের অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে ওঠে। স্বাস্থ্য নীতি শুধু চিকিৎসকদের নীতি নয়, স্বাস্থ্য জনগনের নীতি হিশেবে দেখা উচিত।

সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে জনগনের স্বাস্থ্য সেবার ব্যবস্থা করা এবং তা করা সম্ভব শুধুমাত্র পর্যাপ্ত স্বাস্থ্য ও সামাজিক পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে। এই কারণে আলমা আতা ঘোষণায় ২০০০ সালের মধ্যে সবার জন্য স্বাস্থ্য লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের কথা বলা হয়েছিল, যেন মানুষ সুস্থ্য থাকতে পারে এবং অর্থনৈতিকভাবে অবদান রাখতে পারে। প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবার ওপর গুরুত্ব দিয়ে স্বাস্থ্য সেবার ক্ষেত্রে সামাজিক ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছিল। সেদিক থেকে দেখলে স্বাস্থ্য নীতিতে প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবার উল্লেখ সর্বশেষ খসড়ার (২০১০) লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের মধ্যে পাওয়া গেলেও এর কর্মকৌশল ও বাস্তবায়ন বিক্ষিপ্তভাবে করা হয়েছে। যার কারণে প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা আলাদাভাবে একটি জোরালো কর্মসূচী আকারে ফুটে উঠছে না। [জাতীয় স্বাস্থ্য নীতির বিক্ষিপ্ত চেহারা- ফরিদা আখতার]

প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা জনগনের কাছে স্বাস্থ্য সেবা পৌঁছানোর প্রথম ধাপ, এবং ব্যক্তি, পরিবার ও কম্যুনিটির সাথে জাতীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্য সেবার সম্পর্ক স্থাপনের প্রথম স্তর। আলমা আতা ঘোষণা মতে প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা সবচেয়ে জরুরী এবং এই সেবা পৌঁছানোর জন্যে এমন পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে যাতে জনগণের অংশ গ্রহন থাকবে এবং যা জনগনের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে থাকবে।

জাতীয় স্বাস্থ্য নীতির খসড়া ২০১০-এ প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যের মধ্যে রাখা হয়েছে। বলা হয়েছে, ‘প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা এবং গ্রাম, ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে গ্রহণযোগ্য মানের চিকিৎসা ব্যবস্থার সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা’। আবার নীতিসমুহের মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে ‘প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যার অত্যাবশ্যকীয় সেবাগুলি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ভুখন্ডের যে কোন ভৌগলিক অবস্থানের প্রত্যেক নাগরিকের কাছে পৌঁছে দেয়া’। কিন্তু কৌশল সমুহের মধ্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবার কোন দিকনির্দেশনা নেই। অর্থাৎ লক্ষ্য ও মুলনীতিতে উল্লেখ থাকলেও কর্মকৌশলে কোন প্রতিফলন নেই।

প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা আলমা আতা ঘোষণা অনুযায়ী মোট সাতটি নিয়মের ওপর ভর করে আছে। এর মধ্যে রয়েছে,

  • ক। অর্থনৈতিক, সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অবস্থা এবং প্রাসঙ্গিক গবেষণা ও জনস্বাস্থ্য অভিজ্ঞতা।
  • খ। জনগনের প্রধান স্বাস্থ্য সমস্যা বিশেষ করে রোগ প্রতিরোধ ও নিরাময় এবং পুণর্বাসন সেবা ইত্যাদি।
  • গ। বিদ্যমান স্বাস্থ্য সমস্যা সংক্রান্ত স্বাস্থ্য শিক্ষা এবং প্রতিরোধ, খাদ্য সরবরাহ ও পুষ্টির নিশ্চয়তা; যথেষ্ট এবং নিরাপদ পানি সরবরাহ এবং পয়ঃনিষ্কাশন, মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য সেবা, পরিবার পরিকল্পনা; সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে টিকা কর্মসূচী, বিশেষ এলাকাভিত্তিক রোগ নিয়ন্ত্রণ, সাধারণ রোগ ও আঘাতের চিকিৎসা এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ।
  • ঘ। স্বাস্থ্যবিভাগ ছাড়াও সকল সংশ্লিষ্ট বিভাগ যেমন কৃষি, পশুসম্পদ, খাদ্য, শিল্প, শিক্ষা, বাসস্থান, যোগাযোগ, গণপূর্ত বিভাগের কাজের সম্বন্বয় সাধন করা।
  • ঙ। প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে জনগনের কার্যকর অংশগ্রহন এবং স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার।
  • চ। বিভিন্ন পর্যায়ের স্বাস্থ্য সেবার সাথে সম্বন্বিত ও সুষ্ঠু রেফারেল সেবার ব্যবস্থা করা।
  • ছ। সকল পর্যায়ের স্বাস্থ্য কর্মী, যেমন চিকিৎসক, নার্স, দাইমা, গ্রামীণ চিকিৎসক এবং কম্যুনিটি স্বাস্থ্য সেবা কর্মীদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ প্রদান করে সকলে মিলে যেন একটি টীমের মতো কাজ করতে পারে।

আলমা আতার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অবদান হচ্ছে প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবার বিস্তারিত ও সম্বনিত ধারণা তৈরি। স্বাস্থ্য নীতিতে প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবার উল্লেখ আছে ঠিকই কিন্তু এর কোন সম্বন্বিত রূপ ফুটিয়ে তোলা হয় নি। ফলে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবার বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়েছে।

আলমা আতা ঘোষণায় জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা প্রবর্তনের জন্য এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট বিভাগের সাথে সম্বন্বয়ের জন্য জাতীয় স্বাস্থ্য নীতি প্রণয়ন করার প্রস্তাব করা হয় এবং এর জন্যে প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় জাতীয় তহবিল এবং বিদেশী অর্থ সংস্থানের ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এতো বছর পার হবার পরও কোন সরকারের পক্ষেই একটি স্বাস্থ্য নীতি প্রণয়ন করা সম্ভব হয় নি। এর পক্ষে রাজনৈতিক অঙ্গীকারের যথেষ্ট অভাব ছিল। তবু ইতিহাস দেখলে কিছু ইতিবাচক উদ্যোগের কথা অবশ্যই বলা দরকার। যেমন ১৯৮২ সালের ওষুধ নীতি। এই ওষুধ নীতি বিশ্বের অনেক দেশেই প্রশংসিত হয়েছে, কারণ এর মধ্যে প্রয়োজনীয় ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ ইত্যাদি বিষয় এমনভাবে ছিল যা প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা প্রদানের জন্য জরুরী। এরপর ১৯৯০ সালের স্বাস্থ্য নীতি প্রণীত হয়েছিল কিন্তু গ্রহণযোগ্য হয় নি, একে একে ২০০০ সাল, ২০০৬, ২০০৮ ও ২০০৯ সালের স্বাস্থ্য নীতি আমরা দেখেছি, কিন্তু এখনও কোনটাই সুর্যের আলো দেখতে পারেনি।

আমরা আশা করবো এবার স্বাস্থ্য নীতি প্রণীত হবার আগে জনগনের মতামত নেয়ার চেষ্টা করা হবে বিশেষ করে যারা স্বাস্থ্য নীতি পর্যালোচনা করছেন এবং নির্দিষ্টভাবে মতামত দিচ্ছেন। শক্তিশালী প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবার ব্যবস্থা রেখে স্বাস্থ্য নীতি প্রণয়ন অত্যন্ত জরুরী। একবিংশ শতাব্দীতে একটি দেশের সরকারের কাছে এই নূন্যতম প্রত্যাশাটুকু আমরা করতেই পারি।

দোহাইঃ

  • কিউবার স্বাস্থ্য ব্যবস্থাঃ একজন ফিদেল কাস্ট্র- ডাঃ ইশতিয়াক ইসলাম খান
  • জাতীয় স্বাস্থ্য নীতির বিক্ষিপ্ত চেহারা- ফরিদা আখতার
  • Ileana del Rosario Morales Suarez, MD, MS, Jose A. Fernandez Sacasas, MD, MS, and Francisco Duran Garcia, MD, “Cuban Medical Education: Aming for the Six-Star Doctor,” MEDICC Review, 10/4 (Fall 2008)
  • বিপ্লবী কিউবার স্বাস্থ্য ব্যবস্থা- স্টিভ ব্রাউয়ার
  • Ernesto de la Torre Montejo, Saludparatodos, sies possible. La Habana: Sociedadcubana de SaludPublicaSeccion de Medicinia Social, 2004, 50.
  • Cuban Medical Education- Morales Suarez et al.,
  • Howard Waitzkin, MD, PhD, Karen Wald, Romania Kee, MD, Ross Danielson, PhD, Lisa Robinson, RN, ARNP, “Primary Care in Cuba: Low and High-Tehnology Developments Pertinent to family Medicine,” Devision of Community Medicine, University of New Mexico, Family Practice Center, 1997.
  • World Health Organization and the United Nations Children’s Fund, “Report of the International Conference on Primary Health Care, Alma-Ata, USSR, 6-12 September 1978,” WHO Health for All series, no. 1, Geneva, 1978
  • Primary Health care Comes Full Circle. An interview with Dr. Halfdan Mahler, Bulletin of the World Health Organization, October 2008.

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন