, ১ জানুয়ারি ২০২১; ১:০৮ অপরাহ্ণ


একটা সিস্টেম যখন সামগ্রিকভাবে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়, তখন তার কঙ্কালসার অবয়বকে সামান্য আঘাতও বিধ্বস্ত করতে সক্ষম। কোভিড-১৯ তথা ‘করোনা’ আবির্ভূত হয়েছে প্রায় মাস তিনেক হল; কিন্তু আমাদের ব্যর্থতাগুলো প্রকাশিত হওয়া শুরু করেছে আরো আগে থেকে।


এবার মূল আলোনা শুরু করা যাক। যারা নব্বইয়ের দশক বা তারও আগের দশকগুলো দেখেছেন, তারা জানেন—ভেতরে-বাইরে আমাদের নৈতিক স্খলন আজ কোথায় এসে উপনীত হয়েছে। একটা সময় ছিল, যখন আজকের মত এতো বেশি নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি ছিলনা। যৌথ পরিবারগুলো সুখ-দুঃখ—সবই ভাগাভাগি করে নিত। মাথার উপরে থাকতেন—বাবা-মা, চাচা, বড় ভাই, বড় বোন—প্রমুখ। শাসনের কড়াকড়ি হয়তো ছিল; কিন্তু জীবনের ভুলগুলো ধরিয়ে দেবার মত মানুষ থাকাটিই ছিল আশীর্বাদ।

এখনকার মত বল্গাহীন হয়ে যাওয়া—তখন সহজ ছিলনা। মদপান করা মানুষটিকে পুরো সমাজ খারাপ চোখে দেখত। সিনেমা হল চলত। প্রচুর দর্শক হই-হুল্লোড় করে টিকেট কিনে, তারপর সিনেমা দেখত। সেই সিনেমা দেখাকেও সমাজের অনেকে নেতিবাচকভাবে নিতেন। একটামাত্র টিভি চ্যানেল ছিল।সেটাতে নাটক কিংবা বিদেশী সিরিয়াল দেখার জন্য মানুষ উন্মুখ হয়ে থাকত। বিনোদন তথনো ছিল—তবে তার মাঝে অশালীনতার প্রকোপ দেখা দেয়নি। যৌনতা ছিল—আন্ডারগ্রাউন্ড ইস্যু। আর প্রেম ছিল—বহুল সাধনার বিষয়। মানুষ চিঠি লিখত। অপেক্ষা করত।কেউ কেউ একটা স্মৃতিকে ধারণ করে, জীবনও পার করে দিত।


স্কুল-কলেজের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কিংবা মেয়েদের উত্যক্ত করার মত ঘটনা— অবশ্যই ঘটত; তবে সেটারও একটা সীমারেখা ছিল। সমাজে শিক্ষকরা সক্রিয় ছিলেন। বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিরা সামষ্টিকভাবে সামাজিক সমস্যা নিরসনে এগিয়ে আসতেন। টাকা দিয়ে বই কেনার মত প্রচুর পাঠক ছিল। পুরনো সেই রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, শরৎ, মাণিক, তারাশঙ্কর, বিভূতি, জীবনানন্দ, মুজতবা আলী প্রমুখের পাশাপাশি সমসাময়িক হুমায়ূন, সুনীল, সমরেশ, শীর্ষেন্দু, বুদ্ধদেব ইত্যাদি লেখকদের বই প্রচুর পঠিত হত। কমিকস বা ডিটেকটিভ এসব তো ছিলই—পেপারব্যাক সংস্করণে সেবা প্রকাশনীর জনপ্রিয়তাও ছিল তুঙ্গে। মানুষের আয় কম ছিল। টানাটানির মধ্য দিয়েই জীবন এগিয়ে যেত। পরিবার-সমাজ হয়ে শিক্ষাজীবন শেষ করতে করতে—মানুষ অটোম্যাটিক্যালি অনেক মূল্যবোধ ও নৈতিকতার সাথে পরিচিত হয়ে যেত। পুরো সমাজে একটা ভালবাসার নির্মল প্রবাহ ছিল। এই অ্যানরয়েড, আইফোন, পিসি, ল্যাপটপের সময়ে, সেই নিরবিচ্ছিন্ন সুখটুকু কিভাবে যেন উধাও হয়ে গেছে !

সেসময়গুলোতে আমরা রাজনীতিতে পারস্পরিক সম্মান দেখেছি। সমঝোতা দেখেছি। বড় সংকটে পারস্পরিক বোঝাপড়ার দৃষ্টান্ত দেখেছি। আজ সেগুলো বিবর্ণ ইতিহাস বলে মনে হয়।চাপা আতঙ্কের মাঝে আটকে থাকা হৃদয়—চায়ের দোকানে বসেও রাজনৈতিক তর্ক-বিতর্ক চালাতে ইতস্তত বোধ করে। একটা সক্রিয় সংসদ, অংশগ্রহনমূলক ডেমোক্রেসি কী করে এতোটা দুর্লভ হয়ে উঠল—তা নিয়ে ভবিষ্যতের ইতিহাসে অবশ্যই আলোচনা হবে।

রাষ্ট্র বা সরকার সেকালেও সব কাজ একা সামাল দিতে পারেনি। প্রাথমিক শিক্ষা, স্যানিটেশন, নারীশিক্ষা, প্রসূতী সেবাদান, শিশুদের টিকাদান কর্মসূচী, কৃষকদের আধুনিক কৃষির পাঠদান, বয়স্কদের নিরক্ষরতা দূরীকরণসহ অনেক প্রকল্পে এনজিওগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহন ছিল। বিশেষ করে যুবসমাজের বেকারত্ব দূরীকরণ এবং নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়গুলো মাইলস্টোন হয়ে আছে। বলছিনা—সবকিছু বিতর্কমুক্ত ছিল। নিরপেক্ষ শুভ বা কল্যাণকর বলে কোনো কিছু পাওয়া—জগতে খুবই দুর্লভ ঘটনা। সেদিক থেকে এনজিওগুলোও সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। তবে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের পার্সপেক্টিভে সরকারকে এনজিওর সহায়তা করার বিষয়টি বহুমুখী তাৎপর্য বহন করে।

বাংলার মানুষ পশ্চিমা ‘ওয়েলফেয়ার স্টেট’ তথা কল্যাণ রাষ্ট্রের সুবিধা কোনো কালেই ভোগ করেনি। তারা বড়জোর একটা মালয়েশিয়া কিংবা সিঙ্গাপুর হওয়ার স্বপ্ন দেখেছে। প্রাকৃতিক ঝড়- বন্যা-জলোচ্ছাসের সাথে অভ্যস্ত হয়ে ওঠা আমজনতা এক সময় ঠিকই উপলব্ধি করেছে যে, নিজের উন্নয়ন নিজেকেই করতে হবে। সেখান থেকেই প্রবাসী শ্রমিক হওয়া কিংবা খুবই কম মজুরীতে গার্মেন্টসে নারী শ্রমিক হয়ে যোগ দান করা। অচিরেই এই সিদ্ধান্তগুলো ইতিবাচক দিকে মোড় নেয়। রেমিট্যান্স, গার্মেন্টস শিল্প আর কৃষকের খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার হাত ধরে, তৃতীয় বিশ্বের দেশ থেকে একটু করে উঠে দাঁড়ানোর গল্প লিখতে থাকে বাংলাদেশ।


সামগ্রিক দুর্নীতি, ক্রমাগত রাজনৈতিক সংঘর্ষ আর আমলাতান্ত্রিক প্রশাসনের দীর্ঘসূত্রীতা না থাকলে, সেই গল্পটা মালয়েশিয়ার উচ্চতায় অবশ্যই পৌঁছাত। কিন্তু ওসবের উপস্থিতির জন্য জন্ম নিল—সন্ত্রাস, কালো অর্থ, লুটপাট আর রাজনৈতিক শক্তি হাসিলের কদর্য ট্রেডিশান। ফল স্বরূপ সমাজে ধনী-দরিদ্রের ব্যবধানটা আজো আকাশচুম্বীই হয়ে থাকল। সম্পদের পাহাড় স্তূপীকৃত হল—সামান্য কিছু মানুষের হাতে।


এই বিষয়গুলো নিয়ে যারা এক সময় সোচ্চার ছিলেন—তারা ধীরে ধীরে স্তাবকে পরিণত হলেন। ইন্টেলেকচুয়ালদের যে সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্ব থাকে, তারা সেটা থেকে সরে এসে আশ্রয় নিলেন দলীয় ছায়াতলে। ফলে এককালের আহমদ ছফা, বদরুদ্দীন উমর, সরদার ফজলুল করীম—প্রমুখ বরেণ্য চিন্তাশীলদের যোগ্য রিপ্লেসমেন্ট বাংলাদেশ পেলনা। এমনিতেই আমাদের শিক্ষার যে মান, সেটা উন্নত বিশ্বের কোনো কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে কোনোভাবেই তুলনীয় নয়।

তার উপর অধিকাংশ মেধাবীরা কেবল ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার-সরকারী চাকরীজীবি কিংবা ব্যাংকার হতে চায়। আরেকটা অংশ সম্পূর্ণ বিদেশমুখী। ফলে বিজ্ঞানী, দার্শনিক, চিন্তক, বুদ্ধিজীবি, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, চলচ্চিত্র নির্মাতা প্রভৃতির ঘাটতি আমরা কখনোই পূরণ করতে পারিনি।


ইতিহাস থেকে আমরা জানি, চাণক্য তথা কৌটিল্য ছিলেন মৌর্য সাম্রাজ্যের জ্ঞানগত ভিত্তি। আলেকজান্ডার সাম্রাজ্য বিস্তার করেছিলেন গুরু এরিস্টটলের দীক্ষায়।একদা সুলতান মাহমুদের রাজসভা অলংকৃত করতেন—আল বেরুনীর মত বিদগ্ধ পণ্ডিত। বাংলাদেশ কেন মৌলিক চিন্তাবিদ ও সৎ বুদ্ধিজীবিদের সহায়তায় অগ্রসর হলনা—সেই প্রশ্নের উত্তর আমাদেরই খুঁজতে হবে।

আর গণমাধ্যম : যা এক সময় মানুষের বিশ্বাস অর্জন করেছিল, তা ধীরে ধীরে বিচ্যুত ও পদস্খলিত হল। বস্তুনিষ্ঠতার অভাব নাকি অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ—তার উত্তর সময়ই নিষ্পন্ন করে দেবে। কিন্তু যে সমাজে মানুষকে সোশ্যাল মিডিয়ার উপর ভর করে অনেক সত্য আবিষ্কার করতে হয়, গুজব-রটনায় প্রভাবিত হতে হয়; সেই সমাজকে গণমাধ্যমের জন্য অনুকূল বলা যায় কি?

সবচেয়ে হতাশাজনক সত্য হচ্ছে—একটা প্রজন্ম! পরিণত হবার আগেই যাদের হাতে আজ স্মার্ট ফোন। ঘরে ল্যাপটপ-পিসি আর পর্নোগ্রাফিক দুনিয়ার অবাধ সুযোগ। এরা না কোনো নৈতিকতা বোঝে, না কোনো মূল্যবোধ। নিজের প্রবৃত্তি আর স্বার্থের কাছে বন্দী এই প্রজন্ম : তার জ্ঞানগত এবং চরিত্রগত দেউলিয়াত্বের জন্য ব্যাপকভাবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎকে ক্ষতিগ্রস্থ করবে—এটা সহজেই অনুমেয়।


এদিকে আর্ট-কালচার পরিণত হয়েছে অযোগ্যদের সাম্রাজ্যে। চলচ্চিত্র শিল্প প্রায় ধ্বংসের মুখে। অডিও শিল্প টিকে আছে ইউটিউব তথা ভিজুয়ালাইজেশনের জোরে। মানে সঙ্গীত এখন শোনার বা উপলব্ধির বিষয় নয়; বরং দেখার জিনিস মাত্র। সাহিত্যচর্চায় নেই নির্মোহ কোনো সাধনা। টাকা থাকলেই প্রকাশ করা যায়; কিংবা বইমেলাতে নতুন বই প্রকাশিত হলেই নিজস্ব বলয়ে জনপ্রিয়তা পাওয়া যায়—এরকম ট্রেন্ডই এস্টাবলিশ হয়ে গেছে। ফলে পাঠকের চেয়ে সংখ্যায় লেখক বেশি হলেও আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই ! আর সব জায়গায় ওঁৎ পেতে আছে সিন্ডিকেট। সিন্ডিকেটগুলোর দৌরাত্ম্যে মেধাবী ও সম্ভাবনাময়দের উত্থান আজ বিঘ্নিত হচ্ছে পদে-পদে।

ফলে এই যে সমাজের একটা সামগ্রিক ভগ্ন চালচিত্র ও কঙ্কালসার অবয়ব—তা কি দু’দিনেই সৃষ্টি হয়েছে? নাকি এর প্রেক্ষাপট আরো গভীর আবর্তে বিদ্যমান? করোনা আঘাত হানার আগে থেকেই কি আমরা ভঙ্গুর হয়ে যাইনি? এরকম মাহমারীজনিত সমস্যা না থাকলেও, ভেতরে-বাইরে বাংলাদেশ অজস্র ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে পড়েছিল। রাষ্ট্রের সেই সাংঘাতিকরকম দুর্বল অবয়বে যখন উত্তরাধুনিক ট্যাকটিক্যাল ওয়ারফেয়ারের অংশ হিসেবে কোভিড-১৯ হানা দিল, তখন তার প্রকৃত চেহারা আরো নগ্ন ও কদর্য আকারে বেরিয়ে এল।


হয়তো তুলনা করা যায় যে, ইউরোপ-আমেরিকাও তো এর অনেক বড় ভিকটিম,—তাইনা? অথচ বাস্তবতা এই যে, তাদের আর্থ-সামজিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের চেয়ে বহুগুণ শক্তিশালী। ফলে, এর ক্ষতিপূরণ তারা যেভাবে করতে পারবে, আমাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থা তার দুর্বল ইনফ্রাস্ট্রাকচার নিয়ে কিভাবে ও কতো দিনে তা করতে সক্ষম হবে—তা আপাতত চিন্তারও বাইরে। আমাদের দিন এনে, দিন পার করা অধিকাংশ মানুষ—এর আর্থ-সামাজিক ধাক্কা থেকে সহসাই বেরোতে পারবেনা।মন্বন্তর কিংবা দুর্ভিক্ষ হলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই। নৈতিকভাবে পরাস্ত একটা সমাজ ব্যবস্থার সামগ্রিক ধ্বংসাবশেষ তুলে ধরবার জন্যই হয়তো এই ভাইরাস অনিবার্য ছিল।


আশার কথা হল—পৃথিবীতে দুর্যোগের পরই প্রাকৃতিকভাবে একটা পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া দেখা যায়। আমাদের সব ক্ষত ধুয়ে, করোনার পর যদি সেই প্রক্রিয়াতেই নতুন সম্ভাবনাগুলো বিস্তৃত হতে থাকে, তবে সেটাই হবে বাংলাদেশের একটা নতুন সূচনার ঐতিহাসিক পর্যায়। সবচেয়ে বড় কথা—আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক বিপর্যয় থেকে কি আমরা বেরোতে পারব; নাকি পুরনো বৃত্তেই আবর্তন করতে থাকব? আমাদের জাতিগত হুজুগে আবেগ ও বস্তনিষ্ঠ চিন্তার মাঝে কি ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে? ক্ষয়িষ্ণু মূল্যবোধ আর নৈতিক স্খলন থেকে বেরিয়ে আসার একটা দুর্মর সাহস কি এই প্রজন্ম দেখাতে পারবে? এরকম বড় আকারের প্রশ্নগুলো—আজ পেণ্ডলামের মত দুলছে বাংলাদেশের বর্তমান ও ভবিষ্যতের উপর।


সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন