শনিবার, ২ জানুয়ারি ২০২১; ১২:০৭ পূর্বাহ্ণ


জাপানের জনগণ কতটুকু ক্ষমতার অধিকারী?

জাপানে করোনা রোগী বাড়ছে। লক ডাউন দিচ্ছেনা কেন? এক জাপানি কলিগ কে জিজ্ঞাস করলাম।
বললেন, সরকারের সেই ক্ষমতা নেই।
সরকার এক্ষেত্রে নাগরিকদের কেবল মাত্র অনুরোধ করতে পারেন। অর্ডার করতে পারেন না।
তাই পুলিশ লাঠি চালাতে পারেনা। কোন অফিসার কান ধরাতে পারেন না। জরিমানা ধরতে পারেন না।

আসলেই জাপানের জনগণ কতটুকু ক্ষমতার অধিকারী?

(১)
আমাদের কিয়ুশু বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ক্যাম্পাস তৈরি হলো বছর দশেক আগে। ক্যাম্পাস তৈরি হয়েছে বললে ভুল হবে। বলেন সরিয়ে নেয়া হয়েছে। আমাদের ঐতিহ্যবাহী ক্যাম্পাসটি ছিল মূল শহরের কাছাকাছি। ১০০ বছরের পুরনো। কত স্মৃতি, কত কাহিনি। এই ক্যাম্পাসে আইনস্টাইন এসেছিলেন ১৯১৩ সালে। ১৯১৩ সালে আর কি ঘটেছিল জানেন? রবীন্দ্রনাথ নোবেল পেয়েছিলেন।

প্রথম মহাযুদ্ধ গেল, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে আমেরিকা শত শত বোমা ফেলে লাল ক্যাম্পাস খানার রং কালো করে দিল। আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলের মতো শুধু কয়েকটা লাল বিল্ডিং দাঁড়িয়ে ছিল, এখনো আছে। তারপর গত ৬০ বছরে ক্যাম্পাস অনেক উন্নত হলো।

আমাদের ফুকুওকা তে যে এয়ারপোর্ট টা আছে, তা আমাদের এই পুরনো ক্যাম্পাস থেকে খুব বেশি দুরে নয়। দ্বিতীয় মহযুদ্ধের পর জাপানের অর্থনীতি যত ভালো হতে লাগলো, ফুকুওকা এয়ারপোর্টে উড়োজাহাজ আরও জুড়ে এসে সমানুপাতিক হারে বাড়তে লাগলো। আশির দশকে ছাত্র-শিক্ষক-গবেষক মিলে সরকারের কাছে নালিশ দিল। কোমল স্বরে বললো,

“এয়ারপোর্ট খানা আমাদের প্রচণ্ড বেদনা দিচ্ছে। প্রতি ৩ মিনিটে একটা করে প্লেন উঠে নামে। শব্দ দূষণ আমরা সাউন্ড প্রুফ গ্লাস দিয়ে রক্ষা করেছি। কিন্তু আওয়াজে যে কম্পন তৈরি হয়, তাতে আমরা এক্সপেরিমেন্ট গুলোতে সঠিক ডাটা নিতে পারছি না। এয়ারপোর্ট খানা সরিয়ে নিতে হুজুরের মর্জি হয়।“
সরকার শুনলেন। এবার ডাকলেন ব্যবসায়ীদের। বিজনেস কমিউনিটির সোজা উত্তর – “এয়ারপোর্টটা শহরের কাছে আছে বলেই ফুকুওকার বিজনেস কমিউনিটি দুই-পয়সা রোজগার করতে পারছে। এয়ারপোর্ট সরিয়ে নিলে বিজনেসে লাল বাতি জ্বলবে। ফুকুওকা থেকে কোরিয়ার বুসান এর এয়ার দূরত্ব মাত্র ৪০ মিনিট, চীনের সাংহাই দুইঘন্টা। এয়ারপোর্ট থেকে নেমে মুল শহর মাত্র ৫ মিনিটের সাবওয়ে পথ। বরং টোকিও আমাদের চেয়ে অনেক দুরে”।

এয়ারপোর্ট সরবে নাকি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস সরবে? গবেষণা করে দুই প্রস্তাবের উপকারিতা অপকারিতার লিস্ট বানালেন। দীর্ঘ দশ বছর সময় নিলেন। দুই পক্ষের সাথে কন্টিনিউয়াস কথা বলেছেন। বুঝতেই পারছেন, সরতে হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস। ক্যাম্পাস সরাতে যা টাকা লাগবে তার বিরাট অংশ বিজনেস কমিউনিটি ম্যানেজ করে দেবেন- এই হলো চুক্তি। কোন মিছিল হলো না, কোন রক্ত ঝরল না। ২০০৬ সাল থেকে আমরা পাহাড়ের পাদদেশে সমুদ্রের সন্নিকটে নতুন ক্যাম্পাস পেলাম। নতুন ট্রেইন স্টেশন তৈরি হল ৫ কিমি দুরে।

জনগণের ক্ষমতা নিয়ে লিখতে বসেছি, সে কথায় আসছি।
ক্যাম্পাস থেকে ট্রেন স্টেশন পর্যন্ত এল -শেইপের একটা রাস্তা তৈরি হবে। এই এলাকায় জমি ছাড়া কিছুই ছিলনা। রাস্তা বানানোর জন্য সরকার জমি কেনা শুরু করলেন। এল-শেইপের রাস্তা তৈরি তে একটু বাঁধা পড়লো। সবাই জমি দিল কিন্তু এক জমির মালিক তার অংশের এক কাঠার মতো জমি দেবেন না। সরকার নেগোসিয়সনে নামলেন। এক যুগ পার হলো – মালিক রাজি হলেন না। রাস্তা আর এল-সেইপ রইলো না। ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে স্টিয়ারিং ধরে নিশ্চিন্তে বসে থাকতে পারিনা। ঐ জমিটুকুর জায়গায় এসে একবার বেঁকে গিয়ে আবার মুল রাস্তায় প্রবেশ করি। আর ভাবি, একজন নাগরিকের ক্ষমতা কতদূর হতে পারে।

(২)
টোকিওর আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে ল্যান্ড করার সময় খেয়াল করবেন রান ওয়ের মাঝখানে খানিকটা জমি। একটা বাড়ি ও আছে। বেড়া দিয়ে ঢাকা। সেখানে ও একই কাহিনি। জমির মালিক জমি দেবেন না। ৫০ বছর কেটে গেল। সেই ১৯৬৬ সাল থেকে নেগোশিয়েশনের শুরু। মালিক জমি দিলেন না, তার ছেলে দিলেন না এখন তার নাতি ও দিতে চাচ্ছেন না। রান ওয়ের মাঝখানে দাদা জানের একটুকুরো জমি এখনো শোভা পাচ্ছে। এত বিরোধের পর ও সরকার তাকে পানি, বিদ্যুৎ, টেলিফোনের ব্যবস্থা দিতে বাধ্য। ঐ বাড়িটিতে তেমন কেউ থাকে না, কিন্তু এই লাইফ লাইন সার্ভিস সবই আছে।
নারিতা এয়ার পোর্টে এখন দিনে ৭০০ টি প্লেন ওঠানামা করে। ডিমান্ড আছে তার দ্বিগুণ। মাঝখানে জমিটুকু থাকায় প্যারালেল ল্যান্ডিং করতে পারছে না।
এয়ারপোর্টের এই অসুবিধা টুকুর জন্য আরেকটা এয়ারপোর্ট তৈরি করতে হলো। শহরের মাঝখানের ডোমেস্টিক এয়ারপোর্টটিকে ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে পরিণত করা হল। কয়েক লক্ষ কোটি টাকার ব্যাপার।

দাদাজান কেন জমি দিতে রাজি হলেন না, জানেন? খুব সিম্পল। সরকার তার পারমিশন না নিয়েই এয়ারপোর্ট এর জায়গা সিলেক্ট করে ফেলেছেন। তিনি টেলিভিশনের খবর দেখে জানতে পেরেছেন তার জমি দখল হয়ে গেছে। এতেই তার গোস্বা হল। সেই গোস্বা ভাঙতে ৫০ বছর ধরে সরকার মাথা নুইয়ে গেছেন, আজো তার পরিবারের মন গলাতে পারেন নি।
নাগরিক অধিকার বলে কথা।

(৩)
২০১৬ সালের কথা। টোকিওর মেয়র সাহেবকে তলব করছেন পুলিশ। ৪ বছর পর টোকিও অলিম্পিক। তার হাতে এখন অনেক কাজ। গত বছর কোন এক বিজনেস ট্রিপে গিয়ে নাতির জন্য ৪ ডলার দিয়ে একটা কমিক বই কিনেছিলেন। ভুলক্রমে তার অফিসের ক্রেডিট কার্ড দিয়ে বিল দিয়েছিলেন। এই ভুল বের হবার পর, অনুসন্ধান টিম ক্ষান্ত দিলেন না। আরো হদিস পেলেন। একটা ডিনারের খরচ আর হোটেলের খরচ ও ভুল ক্রমে সরকারি খাতায় জমা চলে গেছে।

জনগনের ট্যাক্সের টাকা ব্যাক্তিগত কাজে ব্যয় করা অপরাধ। টাকার অঙ্ক নিয়ে মানুষ প্রশ্ন তুলছেন না – তুলছেন জনগণের ট্যাক্সের টাকার প্রতি তার অশ্রদ্ধা আর অবহেলা দেখে।

টিভির লোকরা সাধারণ জনগণের কাছ থেকে ইন্টার্ভিউ নিচ্ছেন। জনগণের কথা জনগণকে জানিয়ে দিচ্ছেন। লোকজন ফুঁসে উঠছে।

সবাই জানে এটা জাস্ট একটা ভুল। সরকারি এই কয়েকটা টাকা মেরে খাবার ইচ্ছা তার হবার কথা না। কিন্তু মানুষ তাকে ছেড়ে দিচ্ছে না, কথা বলছে অন্য লেভেল থেকে- সরকারি টাকা যে খরচ করতে অবহেলা করে তার ওপর টোকিও মেট্রোপলিটনের দায়িত্ব দেয়া যাবে কিনা সবাই সেই সন্দেহে ভুগছে।

সাংবাদিকরা প্রেস কনফারেন্সে তীর্যক প্রশ্ন করে বসলেন,
(১) “স্যার, জনগণের টাকায় কেনা কমিক বই টা কী এখন আছে? একটু ছুঁয়ে দেখতে চাই”
(২) “স্যার, জনগণের টাকা ব্যাক্তিগত প্রয়োজনে খরচ করার পরিকল্পনা কী আরো আছে? ”
মেয়র সাহেব এসব প্রশ্নের উত্তর কীভাবে দেবেন? এগুলো কি উত্তর দেয়ার প্রশ্ন?

ভুল উপলব্ধি করা, স্বীকার করা তারপর ক্ষমা চাওয়া-এগুলো সবই বড় গুন।
মেয়র সাহেব ক্ষমা চেয়েছেন এবং প্রাইমারি স্কুলের ছাত্রদের মতো করে বলেছেন, এই ভুল আর তার কক্ষনো হবে না, জনগণ যেন তাকে ক্ষমা করে। ক্ষমা করার দায়িত্ব জনগণের।
সামান্য এক ভুল মেয়রের পদটুকু নড়বড়ে করে দিল। শেষতক জুন মাসের ১৫ তারিখে মেয়র পদত্যাগ করতে বাধ্য হলেন। জনগণের ক্ষমতা বলে কথা।

ছবি – টোকিও নারিতা বিমান বন্দর এবং সেই বিখ্যাত বাড়ি।
Credit- https://weburbanist.com/2015/06/04/relentless-residents-10-more-households-that-refuse-to-move/2/

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন