শনিবার, ২ জানুয়ারি ২০২১; ১২:০৮ পূর্বাহ্ণ


চেঙ্গিস খান : নামটিই যথেষ্ট তাঁর পরিচয়ের জন্য। পৃথিবীর ইতিহাসে একমাত্র মানুষ : যিনি নিজেকে সারা পৃথিবীর সম্রাট হিসেবে ঘোষণা দিয়েছিলন। এতো বড় দুঃসাহস—আজ অবধি আর কেউ দেখাতে পারেনি। তো এই খানই হলেন— বিখ্যাত মোঙ্গল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা। সঙ্গত কারণেই মোঙ্গলরা তাঁকে জাতির জনক হিসেবে মান্য করে। চেঙ্গিস সম্পর্কে সবথেকে প্রামাণ্য তথ্য পাওয়া যায় “ মোঙ্গল জাতির গোপন ইতিহাস” বইতে। এই গ্রন্থের রচনাকাল ১২৩০ সাল বলেই ঐতিহাসিকরা মনে করেন।


চেঙ্গিস খানের আদিনাম তিমুজিন। ‘Secret History of Mongols’ অনুসারে তিনি ছিলেন বর্তে চিনোর উত্তরপুরুষ। তার পিতার নাম ইয়েসুকাই ও মাতার নাম হয়লুন। তার পিতার গোত্র ছিল বরজিগিন ও মাতার গোত্র ছিল অলখুনুত। বরজিগিন গোত্রই পরবর্তীতে মঙ্গোলদের রাজকীয় গোত্রে পরিণত হয়। তার জীবন শুরু থেকেই ছিল ঘটনা বহুল। এর বিবরন মোঙ্গল জাতির গোপন ইতিহাস বইতে বিস্তারিত রয়েছে।

বলা হয়ে থাকে, ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সাম্রাজ্যের মালিক ছিল মোঙ্গলরা। চেঙ্গিসখানের সময় থেকে শুরু হওয়া মোঙ্গলদের জয়যাত্রা অব্যাহত ছিল পরবর্তী গ্রেট খানদের সময়ও। ১২০৬ সাল থেকে ১২৬০ সাল পর্যন্ত—তারা একটি যুদ্ধেও পরাজয়ের মুখ দেখেনি। বাগদাদ, সমরকন্দ, বেইজিং, বুখারা, আলেপ্পোর মত বড় বড় শহর— তাতার হামলায় মাটির সাথে মিশে গিয়েছিল।পূর্ব-পশ্চিমের কোনো রাজ্যই ছিলনা যা—মোঙ্গলদের গতি পথে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। বিশ্বজয়ের যে স্বপ্ন অপূর্ণ রেখে মারা গিয়েছিলেন চেঙ্গিস খান, তার পুত্র ও পৌত্ররা সেই মিশন ইম্পসিবলকে ফিনিশ করার কাজে নেমে যায় অসীম সাহসে। তাঁদের বর্বরতায় ইউরোপ ও এশিয়ার কোটি কোটি নিরীহ মানুষ প্রাণ দিয়েছ অনেকটা বিনা প্রতিরোধে। তাই সারা দুনিয়ার মানুষ ভাবতে শুরু করেছিল মোঙ্গলদের থামানো বোধ হয় অসম্ভব। কিন্তু ১২৬০ সালে হঠাৎই থেমে গেল অপ্রতিরোধ্য মোঙ্গলদের জয়রথ। এক অসাধ্য সাধন হল ফিলিস্তিনের গাজার অদূরে আইন জালুত প্রান্তরে।


উত্থানপর্ব :

মোঙ্গলদের উত্থানের যুগে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলো বেশ কয়েকটি ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন রাজ্যে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল, যেটা ইসলামের উত্থানপর্বের শুরু থেকে ৬০০ বছরের ইতিহাসে কখনও ঘটেনি। ইসলামী খিলাফত তখন আব্বাসীয়দের হাতে। নাম মাত্র আব্বাসীয় খলিফাদের রাজধানী ছিল বাগদাদে। খলিফা হারুন উর রশিদ, খলিফা মুহতাসিম বিল্লাহ কিংবা খলিফা মামুন, মনসুর ও মুন্তাসিরদের পরাক্রম ততোদিনে কেবলই কিংবদন্তী। বাস্তবের আব্বাসীয় শাসকরা আধ্যাত্নিক কিংবা সামরিক কোনো ক্ষেত্রেই পূর্বসুরীদের মত ছিলেন না। বস্তুত আব্বাসীয় খিলাফত তখন অভ্যন্তরীন কোন্দল ও ভোগবিলাসে মত্ত। এ অবস্থায় মোঙ্গলদের গ্রেট খান ছিলেন মঙ্গ খান। তখন মধ্যপ্রাচ্যে মোঙ্গল বাহিনীর দায়িত্বে ছিলেন তাঁরই ভাই ইতিহাস খ্যাত হালাকু খান। হালাকু খান এমনিতেই সুনজরে দেখতেন না বাগদাদের আব্বাসীয় খিলাফতকে। তার উপর আব্বাসীয়দের সঞ্চিত রাশি রাশি ধন-সম্পদও হালাকু খানকে প্ররোচিত করেছিল বাগদাদ আক্রমণে। ফলশ্রুতিতে হালাকু খানের বর্বোরোচিত আক্রমণে, মাটির সাথে মিশে যায় বাগদাদ। ইতিহাসের নজিরবিহীন পাশবিকতায় বাগদাদে প্রাণ হারায় প্রায় ১০ লক্ষ মানুষ !

শুধু বাগদাদ ধ্বংস করেই হালাকু খানের বাহিনী থেমে থাকেনি। ইরাক থেকে সিরিয়া হয়ে তারা এগিয়ে চলছিল— মিশরের দিকে। পথে সিরিয়ার দামেস্ক ও আলেপ্পোর পতন হয় তাদের হাতে। সেই শহরের মানুষগুলোকেও বরণ করতে হয়েছিল বাগদাদবাসীর মত ভয়াবহ পরিণতি। মোঙ্গলদের ভয়ে সিরিয়া থেকে পালিয়ে তখন দলে দলে মানুষ আশ্রয় নিচ্ছিল মিশরে। এদিকে হালাকুর পরবর্তী পরিকল্পনাই ছিল মিশরকে পদানত করা। কারণ, তখনকার সময়ে মিশর জয় করার অর্থ—সমগ্র উত্তর আফ্রিকাই জয় করো। আর উত্তর আফ্রিকা থেকে জিব্রাল্টার হয়ে একবার স্পেনে ঢোকার মানে হল— পশ্চিম ইউরোপকে পদানত করা। সেটি করতে পারলেই পূর্ণ হবে পিতামহ চেঙ্গিসের বিশ্ব জয়ের স্বপ্ন। আর মোঙ্গলদের বিশ্ব জয়ের স্বপ্নে তখন একমাত্র বাধাই ছিলেন—মিশরের মামলুক সুলতান সাইফউদ্দিন কুতুজ।


মিশরের উদ্দেশ্যে মোঙ্গলদের হুমকীপূর্ণ চিঠি:


সিরিয়া থেকে মিশর আক্রমণের পূর্বে হালাকু খান মোঙ্গলদের স্বভাব সুলভ “হয় আত্মসমর্পণ, নয় ভয়াবহ মৃত্যু” এই হুমকি দিয়ে চিঠি পাঠালেন মিশরের সুলতানের কাছে। সেই চিঠির ভাষেই অত্যন্ত আগ্রাসী ও ভয়াবহ। চলুন এবার চিঠিতে একবার চোখ বুলিয়ে নেয়া যাক—

আমাদের তরবারির ভয়ে পালিয়ে যাওয়া মিশরের মামলুক সুলতান কুতুজের প্রতি পূর্ব ও পশ্চিমের সকল রাজার রাজাধিরাজ বিশ্ব অধিপতি খানের ফরমান–
“তুমি কোথায় লুকাবে? কোন রাস্তায় দিয়ে পালিয়ে যাবে? আমাদের ঘোড়াগুলো যেমন তেজী, আমাদের শরগুলোও তেমন তীক্ষ্ণ। আমাদের তরবারিগুলো বজ্রের মত আর আমাদের হৃদয় পর্বতের মত শক্ত। মরু বালুকার মত আমাদের সৈন্যসংখ্যাও গুণে শেষ করা যাবে না। না কোনো দুর্গ আমাদের আটকাতে পারবে, না কোন সৈন্যদল পারবে আমাদের রুখতে। আল্লাহ’র কাছে তোমাদের ফরিয়াদ আমাদের বিরুদ্ধে কোনো কাজেই আসবে না। কোনো শোকের মাতম আমাদের হৃদয়কে স্পর্শ করতে পারবেনা, না চোখের অশ্রু গলাতে পারবে আমাদের মন। শুধু যারা প্রাণ ভিক্ষা চাইবে তারাই আমাদের হাত থেকে বাঁচতে পারবে। যুদ্ধের দাবানল ছড়িয়ে পড়ার আগেই তোমার উত্তর পাঠিয়ে দিও। কোনো প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করলে, তার ফল হবে ভয়ংকরতম। আমরা তোমাদের মসজিদগুলো ভেঙ্গে চুরমার করে ফেলব আর তোমাদের সৃষ্টিকর্তার দুর্বলতা সবার সমানে প্রকাশ করব। তারপর তোমাদের শিশু-বৃদ্ধ নির্বিশেষে সবাইকে হত্যা করব। মনে রেখ এই মুহুর্তে, কেবল তোমরাই আমদের একমাত্র শত্রু।”

সাইফউদ্দিন কুতুজ ভালোভাবেই জানতেন— ইতিপূর্বে যারা বিনা যুদ্ধে মোঙ্গলদের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল তাঁদের করুণ পরিণতি। তাই বিনা যুদ্ধে অপমানের মৃত্যুর চেয়ে, তিনি চাইলেন—এই বর্বর বাহিনীর মুখোমুখি হতে। উপরে উল্লেখ করা চিঠির উত্তরটা সুলতান কুতুজ দিয়েছিলেন—মোঙ্গল দূতের শিরোচ্ছেদ করে। এর ফলাফলটা সকলের কাছেই অনুমেয়। যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে উঠল দু’পক্ষের জন্য।

মোঙ্গল বনাম মামলুক সৈন্য:


মামলুক সুলতান কুতুজ প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন মোঙ্গলদের মোকাবেলা করার। ঠিক সেই সময়ে মিশরে মস্ত বড় ইসলামিক স্কলার ছিলেন শেখ ইজ্জউদ্দিন আব্দুস সালাম । তিনি তার বক্তব্যে সুপষ্টভাবে সুলতান কুতুজের এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানালেন এবং জনগণকে দলে দলে কুতুজের বাহিনীতে যোগ দেওয়ার আহবান করলেন। সেই আমন্ত্রণে সিরিয়া থেকে কিংবদন্তী কমান্ডার রুকনউদ্দিন বাইবার্স কুতুজের সাথে যোগ দিলেন। এদিকে যাত্রা পথে হালাকু খবর পেলেন তাঁর ভাই গ্রেট মঙ্গ খান মারা গেছেন। তাই ৬ লক্ষ সৈন্যের প্রায় সাড়ে ৫ লক্ষ নিজের সাথে নিয়ে তিনি মঙ্গোলিয়া ফিরে গেলেন খানের শেষকৃত্যে যোগ দিতে। অবশিষ্ট ৫০ হাজার সৈন্য তিনি রেখে গেলেন তাঁর বিশ্বস্ত ও দক্ষ সেনাপতি কিতবুকার অধীনে।

যুদ্ধের কৌশল:


দুর্ধর্ষ মোঙ্গল বাহিনীর মূল শক্তি ছিল—তাদের ক্ষিপ্রতা ও প্রচন্ড কার্যকর অশ্বারোহী বাহিনী। এছাড়া ঘোড়ার উপরে থেকেই তীর নিক্ষেপের অপূর্ব দক্ষতা ছিল তাদের, যা ইউরোপ ও এশিয়ার অন্য সেনাবাহিনীগুলোর ছিলনা। এদের বলা হত—‘হর্স আর্চার’ মানে অশ্বারোহী তীরন্দাজ। আর মোঙ্গল ধনুকগুলো ছিল হালকা কিন্তু অসম্ভব শক্তিশালী।পাল্লা বেশী হওয়ায় ঘোড়ায় চড়েও সহজেই তীর চালানো যেত।

মোঙ্গলরাদের আরেকটি স্ট্র্যাটেজি ছিল পর পর অনেকগুলো সারিতে বিন্যস্ত না হয়েই, যতোটা সম্ভব পাশাপাশি থেকে হামলা চালানো; যাতে সুযোগ বুঝে শত্রু বাহিনীকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলা যায়। সুলতান কুতুজ বুঝতে পারলেন— চওড়া প্রান্তরে মোঙ্গলদের মুখোমুখি হওয়া মানে পরাজয় অনিবার্য। তিনি মোঙ্গলদের আগে যুদ্ধ ক্ষেত্র পছন্দ করার সুযোগই দিতে চাইলেন না বরং নিজেই সৈন্য নিয়ে এগিয়ে গেলেন তাঁদের মোকাবেলা করার জন্য এবং বেছে নিলেন প্যালেস্টাইনের আইনে জালুত প্রান্তর।

যুদ্ধের বর্ণনা :


১২৬০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে যুদ্ধ শুরু হয়। প্রথম দিকে মোঙ্গলদের প্রবল আক্রমণের মুখে কুতুজের সৈন্যদের অবস্থা ছিল টালমাটাল। তখন সুলতান নিজে শিরস্ত্রাণ খুলে উঁচু জায়গা থেকে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে সৈন্যদের সাহস যোগাতে লাগলেন।পাশপাশি নিজেই ঝাঁপিয়ে পড়লেন সাধারণ সৈন্যদের মাঝে দৃষ্টান্ত স্থাপনের জন্য। আরেক জনের কথা না বললেই নয়; তিনি—রুকনুদ্দিন বাইবার্স। তিনি ছিলেন মামলুকদের প্রধান সমরনায়ক। বাইবার্সের ট্যাকটিকস সাহস ও বীরত্ব ছিল কুতুজ বাহিনীর ভাইটাল দিক। এদিকে যুদ্ধের প্রান্তরটি সরু হওয়ায় মোঙ্গলরা তাঁদের পুরনো ট্যাকটিকস ব্যবহার করতে পারছিলনা।

উপরন্তু, মামলুক সৈন্যদের ভেদ করে কুতুজের ব্যূহের ভেতরে প্রবেশ করার পর, তারা মুখোমুখি হয় এলিট বাহিনীর। সামনের সারির সিরীয় সৈন্যদের জন্য তাঁরা পিছিয়েও আসতে পারছিলনা। সাথে সাথে দুই পাশ থেকে মোঙ্গলদের উপর নেমে আসল তীর বৃষ্টি। অসাধারণ সামরিক প্রতিভার পরিচয় দিয়ে চললেন মামলুক সমরনায়ক বাইবার্স। তাঁর কীর্তিতে এক পর্যায়ে মোঙ্গল সেনাপতি কিতবুকা মারা যান। এরপরই ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে তার মূল সেনাবাহিনী। পালিয়ে যেতে থাকে বিক্ষিপ্ত মোঙ্গলরা। কুতুজের সৈন্যরা প্রায় ৬০০ কিলোমিটার অবধি তাদের ধাওয়া করে শেষ সৈন্যটিকেও হত্যা করে। আর এভাবেই মামলুক সৈন্যদের কাছে পরাজয় ঘটে অহংকারী, বর্বর ও মোঙ্গল বাহিনীর। চূর্ণ হয়ে যায় তাঁদের আকাশছোঁয়া দম্ভ। আর এই যুদ্ধের মাধ্যমে বাইবার্সের বীরত্ব ও কৌশল ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়।

কেন আইন জালুতের যুদ্ধ গুরুত্বপূর্ণ :


আইন জালুতের ঐতিহাসিক প্রান্তরে অবসান হয় মোঙ্গলদের অপরাজেয় মিথের। তাঁদের ভয়ে স্বদেশ থেকে পালিয়ে যেতে থাকা হাজার হাজার মানুষ একে একে আবার ফিরে আসতে শুরু করল। এই পরাজয়ের পরও মোঙ্গলরা যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল; কিন্তু আর কখনই তারা আগের মত ফিউরিয়াস ফোর্স হিসেবে দুনিয়ায় ত্রাস ছড়াতে পারেনি। শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নয়, পৃথিবীর ইতিহাসেও গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধগুলোর মধ্যে একটি হল আইন জালুতের যুদ্ধ। কারণ, এই যুদ্ধে সুলতান কুতুজ পরাস্ত হলে—উত্তর আফ্রিকা, স্পেন ও ইউরোপ পরিণত হত বাগদাদ, সমরখন্দ ও বেইজিং এর মত বধ্যভুমিতে। মানব সভ্যতার ঐ ক্ষত সেরে উঠত কিনা, সেই প্রশ্নের উত্তর কারও জানা নেই। তবে বর্বর মোঙ্গল বাহিনীকে রুখে দেওয়ার অনন্য কীর্তির প্রতিদান হিসাবে বিশ্ববাসী যে, চিরকাল সুলতান সাইফউদ্দিন কুতুজ ও রুকনুদ্দিন বাইবার্সকে মনে রাখবে সেটা বলা যায় নিঃসন্দেহে। তবে এই যুদ্ধের কিছু কাল পরই বাইবার্স মামলুক সুলতান হিসেবে মিশরের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন। অনেকেই বলেন বাইবার্সের ষড়যন্ত্রেই কুতুজকে হত্যা করা হয়।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন