, ১ জানুয়ারি ২০২১; ১২:১৫ অপরাহ্ণ


সুমিত রয়…

মহাবীর তৃতীয় আলেকজান্ডার, ছবি সুত্র: উইকিপিডিয়া।

কালচারে এরকম পুরুষালী অভিনেতা হিরো কাল্ট, সাগা এর সাথে সম্পর্কিত, যা নির্ভর করে কোন সমাজে বীর পূজা, বীরত্ব সূচক কাহিনী নিয়ে ডিমান্ডের উপর, তার ভিত্তিতেই সমাজে বীর ভিত্তিক পুরাণেরও জন্ম হয়। বাঙ্গালীর সেরকম হিরো টাইপ কাল্ট অফ পারসোনালিটির অভাব গোড়া থেকেই। এর সাথে এই অঞ্চলের মানুষের মাতৃশক্তিভিত্তিক ধর্মবিশ্বাস ও তন্ত্র প্রাধান্য ধর্ম চিন্তাধারার সম্পর্ক থাকতে পারে, যার কারণে এই অঞ্চলে কোন বীরত্বসূচক পুরাণ বা ফকলোরেরও জন্ম হয়নি। পরবর্তীতে আসা তন্ত্রনির্ভর সহজিয়া, বৈষ্ণববাদী, সুফি ধর্মগুলোতেও এই হিরোইক কাল্টের ব্যাপার স্যাপার ছিল না। এখানে কৃষ্ণ কোন বীর নয়, বরং প্রেমিক, এখানে রামের বীরত্বসূচক চরিত্রও কেমন ম্রিয়মান মনে হয়, এখানকার শিবও মাস্কুলার নয় বরং ভুড়িওয়ালা। এদের চেয়ে বরং মাতৃশক্তির চরিত্রগুলো যেমন ছিন্নমস্তা, রক্ষাকালীদেরকেই বেশি বীরত্বসূচক বলে মনে হয়।

মাতৃশক্তির আরাধনা সব জাতিতেই আছে, কিন্তু কালের বিবর্তনে সেখানে পুরুষ প্রধান প্যান্থিয়নও তৈরি হয়ে গেছে। ইউরোপের প্রতিটা জায়গাই ভীষণভাবে সংঘাতময় ছিল। মাতৃপূজা কখনই বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় না, আমি ভৌগলিক কারণটাই আনছি।

বাংলায় হিংস্র পশু মূলত সুন্দরবন আর পাহাড়ী বনগুলোতে। পাহাড়ী বনাঞ্চলে বাঙ্গালী ছিল না, আর সুন্দরবন রেজিয়ন খুব পেরিফেরিতে, সেখানে হিরোয়িক কাল্ট ফিগারও তৈরি হয়েছে। কিন্তু মূল ভূখণ্ডের বন, যেমন ঢাকা অঞ্চলের শাল ও গজার বনের দিকটা দেখুন। সেখানে হিংস্র পশুও খুব একটা নেই, আর গাছগুলোও সহজে কেটে পরিষ্কার করে চারণভূমি ও কৃষিভূমি তৈরি করা যায়। এই দুটো সুবিধার জন্যই কিছু অঞ্চল ব্যাতীত বাংলার মূল ভূখণ্ডে আর বনাঞ্চল নেই, জীব জন্তুও নেই। মানুষ খুব সহজেই এই অঞ্চলগুলো পরিষ্কার করে ফেলত। এই পরিবেশটা হিরো ফিগার বা পিতৃতান্ত্রিক প্যান্থিয়ন সৃষ্টির উপযোগী নয়, ইউরোপ বা অন্যান্য অঞ্চলের মত।

যাই হোক, এইসব কারণে বাংলার অতীতের মিথোলজি ও ফকলোরগুলো থেকে বোঝ যায় বাংলার মানুষের মধ্যে অতীতেও বীরপূজা বা বীরত্বসূচক কাহিনীর তেমন চাহিদা ছিল না, যার প্রভাব এখনও সুস্পষ্ট। কেন এরকমটা ছিল?

এর উত্তর বাংলার ভৌগলিক অবস্থায় নিহিত থাকবে। এই সমাজ কৃষিভিত্তিক আর সেই সাথে ঘোড়ার প্রচলনের পূর্বে এই সমাজ ছিল বহিরাক্রমণের জন্য অনুপযোগী। এখানে এত বনাঞ্চল ও এত নদী ও উত্তর থেকে পূর্বে এতটাই পর্বতে ঘেরা যে সেভাবে কেউ এই অঞ্চল আক্রমণ করতে চাইত না, আর খুব একটা হিংস্র বন্য পশুও ছিল না যাদের হত্যা করার জন্য কোন হিরো ফিগার লাগবে। এরকম পরিবেশে নিজেদের রক্ষা করার জন্য হিরো ফিগারের খুব একটা প্রয়োজন হয়না, বরং কৃষিপ্রাধান্যের জন্য শক্তিশালী নারী চরিত্রই বেশি তৈরি হয়। পরবর্তীতে বাংলায় বিকশিত পপুলার কালচারে এই অবস্থারই প্রতিফলন ঘটেছে মাত্র।

লক্ষ্মী মূর্তি, ছবি: সংগৃহীত।

ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় বাংলায় অনেক বীরেরই জন্ম হয়েছে। বহিঃশত্রুর সাথে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, যুদ্ধ ইত্যাদি ইতিহাসে তার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। কিন্তু এরা বিস্মৃত, কোন বার্ড বা কাব্যগীতিকার এদের কাহিনী নিয়ে লোকগাঁথা তৈরি করেনি, কোন স্তুতিকার তাদের নিয়ে স্তুতি তৈরি করে বাংলার আনাচে কানাচে ছড়িয়ে দেয়নি, তাই তারা বিস্মৃত। কেন বাংলার গীতিকার, স্তুতিকার এদের নিয়ে কিছু লিখল না?

লেখেনি কারণ এইসব শিল্পের ডিমান্ড ছিল না। বীরের জন্ম হয়, কিন্তু মানুষ তাদের গল্প খুব একটা ভালোবাসেনি বলে তাদের কথাও কেউ মনে রাখেনি। আর পপুলার কালচারেও তাদের বীরত্বের কোন প্রভাব পড়েনি।

বন জঙ্গলে হিংস্র পশু তেমন না থাকলে আর গাছ খুব একটা শক্ত না হলে বনাঞ্চলকে সহজেই সাফ করে কৃষিজমি ও বসতি তৈরি করা যায়। আর নদীমাতৃক বাংলায় সেচের জন্য কুপ খননেরও দরকার হত না। বসতি নির্মাণের জন্য মাটি কাটলে এমনিতেই পুকুর তৈরি হয়ে যায় এখানে। আর বহিরাক্রমণ প্রতিহত করার জন্য এই অঞ্চলে কোন রকম দেয়াল তৈরিরও দরকার হয়নি যা ভারতের অন্যত্র অঞ্চলের ক্ষেত্রে দেখা যায়, এই অঞ্চল এতই নদীমাত্রিক যে ঘোড়ার প্রচলনের আগে সেভাবে কেউ আক্রমণ করত না। এরকম সব কিছু সহজলভ্য হবার কারণে আমার মতে বাংলায় মানুষের স্বভাবে বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য দেখা যাবার কথা যা ভারতবর্ষের অন্যান্য অঞ্চলে অনুপস্থিত –

(১) এখানে যেটি আলোচিত হয়েছে, বীরগাঁথা, হিরো ফিগারের চাহিদার অভাব, এর ফলে বীর জন্মালেও মিথোলজি ও ফকলোরে বীরস্তুতি ও বীরপূজার অভাব। এদিকে উর্বর ভূমির প্রাচুর্য ও বহিরাক্রমণের অভাবের কারণে শক্তি আরাধনার বৃদ্ধি, এবং পুরুষ দেবতার কম প্রভাব।

(২) ইন্ডিভিজুয়ালিজম, কেননা সহজলভ্যতার কারণে খুব একটা সমবায়ের প্রয়োজন হত না, সমবায় না থাকায় সংহতি থাকত না, ব্যক্তির নিজেকে একাই একশ ভাবার প্রবণতা থাকার কথা এখানে। এর কারণে প্রচলিত রীতিনীতি না মানায় বা বিরুদ্ধে যাওয়ায় যদি কাউকে একঘরে করে দেয়া হয় তখন সে সহজেই অন্য কোন অঞ্চলে গিয়ে বন সাফ করে বসতি নির্মাণ করতে পারবে।

(৩) ইন্ডিভিজুয়ালিজম বেশি হওয়ায় সংঘবদ্ধতার অভাব। এর কারণে বাঙ্গালীর মধ্যে দলীয় মনোভাব বা সংঘবদ্ধ চেতনা কম হতে পারে।

(৪) প্রগতিশীল আচরণ। ইন্ডিভিজুয়ালিজম বেশি থাকার ফলে বাঙ্গালীর মননে কালেক্টিভিজম ও ট্রেডিশনালিজম এর প্রভাব কম হবার কথা, এটি সমগ্র উপমহাদেশে বাংলাতেই প্রথম নবজাগরণের উদ্ভবের ক্ষেত্রে প্রভাবক হয়ে থাকতে পারে।

(৫) সহজেই ধর্মান্তরন এর একটি ফল হতে পারে। বাংলায় খুব সহজেই মানুষ সহজিয়া ধর্মমত, গৌড়ীয় বৈষ্ণবমত, সুফিমত গ্রহণ করেছিল। বাংলায় যে পরিমাণ মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে তা উত্তর পশ্চিম ভারত ছাড়া অন্য কোন অঞ্চলে দেখা যায়নি। এর কারণ এখানকার মানুষের মধ্যে গ্রামীন সংঘবদ্ধতার অভাব ছিল। প্রচলিত প্রথার বিরুদ্ধে গেলে একঘরে হবার ভয় এখানে ছিল না।

(৬) বৌদ্ধ ভান্তে বা সুফি দরবেশদের মত মিশনারির পক্ষে এই অঞ্চলে ধর্মপ্রচার করা অনেক সহজ। যেহেতু এই অঞ্চলে বনাঞ্চল পরিষ্কার করা ও বসতি নির্মাণ দুরূহ নয়, কাজেই মিশনারীদের পক্ষে খুব সহজেই ছোট দল গঠন করে নতুন নতুখ আখড়া নির্মানও সহজতর, তারা আধ্যাত্মিক কর্মকাণ্ড ছাড়া বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ড সম্পাদনের মাধ্যমে সহজেই মানুষের মনে প্রভাব সৃষ্টি করতে সক্ষম হবার কথা।

(৭) বাংলায় জমি উর্বর হওয়ায়, খাদ্যের ক্ষেত্রে শস্যের প্রাধান্য বেশি ছিল, ফলে এই অঞ্চলের খাদ্যাভাসে শর্করার পরিমাণ ছিল বেশি, যার ফলে আদর্শ পুরুষের কল্পনায় এই অঞ্চলের মানুষ খুব একটা সুঠামদেহী পুরুষকে কল্পনা করতে পারেনি, তার প্রতিফলন বাংলার আইকনোগ্রাফিতেও দেখা যায়। বুদ্ধের কিছু বোধিসত্ত্বের মূর্তি তো মেয়েলীই লাগে।

(৮) অধিক নদীমাত্রিক হওয়ায় এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা খারাপ থাকায় এই অঞ্চলের রাজ্যের আকারও খুব একটা বড় ছিল না, বিশেষ করে পূর্ব ও দক্ষিণ বঙ্গের রাজ্যগুলো স্বাধীন ছিল এবং সম্পদের প্রাচুর্য থাকায় সনির্ভরও ছিল। এর ফলে প্রচুর ঘোড়ার অধিকারী তুর্কীরা তাদের ঘোড়ার মহিমায় সমগ্র বাংলা অধিকার করার পর স্থানীয়দের মধ্যে জাতীয়তাবোধও ও জাতীয় চেতনাও খুব একটা কাজ করার কথা নয়।

(১) আর (৭) নং এর প্রভাব বাংলার পপুলার কালচার আর শিল্প-সাহিত্যে পড়বে – এটাই স্বাভাবিক।

কিছু বিতর্ক (আপডেটেডবল):

বাংলায় হিংস্র পশু ছিল দাবি প্রসঙ্গে-

বাংলায় হিংস্র পশু মূলত সুন্দরবন আর পাহাড়ী বনগুলোতে। পাহাড়ী বনাঞ্চলে বাঙ্গালী ছিল না, আর সুন্দরবন রেজিয়ন খুব পেরিফেরিতে, সেখানে হিরোয়িক কাল্ট ফিগারও তৈরি হয়েছে। কিন্তু মূল ভূখণ্ডের বন, যেমন ঢাকা অঞ্চলের শাল ও গজার বনের দিকটা দেখুন। সেখানে হিংস্র পশুও খুব একটা নেই, আর গাছগুলোও সহজে কেটে পরিষ্কার করে চারণভূমি ও কৃষিভূমি তৈরি করা যায়। এই দুটো সুবিধার জন্যই কিছু অঞ্চল ব্যাতীত বাংলার মূল ভূখণ্ডে আর বনাঞ্চল নেই, জীব জন্তুও নেই। মানুষ খুব সহজেই এই অঞ্চলগুলো পরিষ্কার করে ফেলত। এই পরিবেশটা হিরো ফিগার বা পিতৃতান্ত্রিক প্যান্থিয়ন সৃষ্টির উপযোগী নয়, ইউরোপ বা অন্যান্য অঞ্চলের মত। সুন্দরবন অঞ্চলের আরও একটা সমস্যা হল লোনা জলের অঞ্চল বলে কৃষিকাজে সমস্যা, তাই সেই অঞ্চলে মানব বসতিও কম থাকার কথা। বরিশাল অঞ্চল পরিষ্কার করে বসতি অনেক পরের দিকে তৈরি হয়েছে পড়েছি। কলকাতার যে মাটি তাতে মূলভূমির বনাঞ্চল থাকাই সম্ভব। সুন্দরবনের বাস্তুসংস্থান কেবল উপকূলের জন্য।

“যে জাতি মস্তিষ্কের চর্চা করে, তার অধঃপতনের কি প্রয়োজন? হাতাহাতি তারাই করবে, যাদের মাথায় কিছু নেই।” উক্তি প্রসঙ্গে –

এখানে একটা ডিলেমাও আছে। প্রাচীন গ্রিসের সমৃদ্ধশালী মাইসিনীয় সভ্যতা ধ্বংস হয়েছিল বলকান অঞ্চল থেকে আসা বর্বর ও তুলনামূলকভাবে অনুন্নত ডোরিয়ানদের হাতে (পূরাণে সেই কাহিনী হারকিউলিস ও তার পুত্রদের বীরত্ব দিয়ে বর্ণিত, গ্রিস ধ্বংসকারী হল গ্রিক বীর হিসেবে পূজিত)। হিট্টাইটদের সমৃদ্ধ সভ্যতা ধ্বংস করলে সি পিপল, তারা মিশর, সুমেরীয়দের সমৃদ্ধশালী সভ্যতাকেও করেছিল ধরাশায়ী। সমৃদ্ধশালী পশ্চিম রোমান সভ্যতা ধ্বংস হয় বর্বর জার্মানিক ট্রাইবদের হাতে। সমৃদ্ধশালী কনস্টান্টিনোপল ধ্বংস হয় তুর্কীদের হাতে।

যারা মস্তিষ্কের চর্চা করে সমৃদ্ধ হয় তাদের নিজেদের সমৃদ্ধতা টিকিয়ে রাখার জন্য বহিঃশত্রুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের শক্তির প্রয়োজন হয়। নাহলে মস্তিষ্কের চর্চা, সমৃদ্ধি কিছুই আর টেকে না। কিন্তু সেটা করাও কঠিন। সভ্যতা তৈরি মানে কৃষির উপর নির্ভরশীলতা বৃদ্ধি, আর কৃষিনির্ভর মানুষেরা শক্তিতে প্যাস্টরালিস্ট আর নমাডদের চেয়ে দুর্বল হবেই। কারণ মানুষের শরীর এখনও কৃষিনির্ভর কার্ব সমৃদ্ধ খাদ্যাভাসের সাথে তাল মিলিয়ে বিবর্তিত হয়নি।

বাংলার আইকনোগ্রাফি, আর্টস ও পপ কালচারে ম্যাসকুলিনিটি, “সুঠাম শরীরের দরকার খুব একটা পড়ে না। মারার জন্য শরীরের থেকেও মানসিক শক্তি বেশি লাগে”, “ব্রিটিশরা বাঙালীদের এফিমিনেট বলত কিন্তু তারপর বোমা খেয়েছিল। জাপানীদের শারিরীক শক্তি কিছুই নয় কিন্তু ভয়ংকর যোদ্ধা প্রকৃতির সাহস বীরত্বে ইউরোপীয়দেরও হার মানায়” প্রসঙ্গে

মানসিক শক্তির অনেক কিছুই সুঠাম দেহের উপর নির্ভরশীল। চর্বি বেশি মানে টেস্টোস্টেরন কম, টেস্টোস্টেরন কম মানে এগ্রেসিভনেস কম, ক্ষিপ্রতা কম, লড়াই করার মানসিকতাও কম। আধুনিক ওয়ারফেয়ারে স্ট্রেংথ এর প্রয়োজনীয়তা অনেক কম, কিন্তু সেইসময়ের ওয়ারফেয়ারে স্ট্রেংথ খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল, সুঠাম দেহ না থাকলে মাসল মাস কম, স্ট্রেংথও কম। বাঙ্গালির বোমাবাজি, এম্পেরর মেজির টাইম সময় থেকে জাপানের আধুনিক সমরাস্ত্রে বলিয়ান হওয়া এসব আধুনিক ওয়ারফেয়ারের অংশ, যেখানে স্ট্রেংথ এর চেয়ে স্ট্র্যাটেজি গুরুত্বপূর্ণ।

বাঙ্গলির বোমাবাজিতে যে সাহস বা বেপড়োয়া ভাব ছিল তা ইতিমধ্যে ব্যাখ্যা করা ইন্ডিভিজুয়ালিজমের প্রভাবে আর নবজাগরণ পরবর্তী রোমান্টিসিজমের বিকাশ হেতু জাতীয়তাবাদের কারণে হয়ে থাকতে পারে, সেটাও সম্ভবত বাংলায় অনেকটা ইউনিক ছিল। কিন্তু বাঙ্গালীর মননে পুরুষত্বের আইডিয়াল চিত্রে সুঠাম দেহের অভাব থাকার ফলটা আধুনিক যুগের পপ কালচারে সরাসরি পড়বে। কারণ পপ কালচারে স্ট্র্যাটেজির চেয়ে স্ট্রেংথের ডিমান্ড বেশি। হয়তো বাঙ্গালীরা স্ট্র্যাটেজিতে বেশি এগিয়ে বলে এই অঞ্চলে ডিটেক্টিভ বা থ্রিলার টাইপের পপ কালচার বেশি জনপ্রিয় হয়। হিরো টাইপের পপ কালচারের মর্যাদা তেমন নেই।

বাংলার গ্রামের দিকে যেতে থাকলে চর্বিহীন লিকলিকে মানুষ পাওয়া যাবে, কিন্তু তাতে পুষ্টিহীনতা কম থাকে। গ্রামের লোকেদের প্রোটিন চাহিদা খুব একটা পুরণ হয় না বলে মাসল মাস ভাল হয়না, আর তাতে টেস্টোস্টেরন ভাল তৈরি হয়না।

জাপানে ১৫ শতক থেকে মাছ দিয়ে বানানো সুশি খুব জনপ্রিয় হয়, বাংলার শুটকির মত ফারমেন্টেড ছিল। পরে ফারমেন্টেশন ছাড়াও শুটকি খেত ওরা। এটাই বলতে গেলে ওদের প্রোটিন সোর্স ছিল। কিন্তু ১৮৫৪ এর পর মেজি সংস্কার এদের খাদ্যাভাস অনেক কিছুই বদলে দেয়। একদিকে জাপানে পুনরায় মাংস খাওয়া শুরু হয় (জাপানে বৌদ্ধধর্মের (জেন) আবির্ভাবের পর মাংস খাওয়া রাষ্ট্রীয়ভাবে নিষিদ্ধ ছিল), আর অন্যদিকে অর্থনীতি থেকে সব কিছু থেকে জাপানের উন্নতি। এই দিকটা জাপানের মানুষের খাদ্যাভাসে পরিবর্তন আনে, তাদের পুষ্টিহীনতার সমস্যা ঘুচে যায়, পুষ্টির দিক দিয়ে তারা তদকালীন পশ্চিম ইউরোপের পর্যায়ে পৌঁছে যায়। এটা বাংলার ক্ষেত্রে হয়নি। কলোনিয়াল পিরিয়ডে উল্টে বাঙ্গালীর পুষ্টিহীনতার সমস্যা বাড়তে থাকে। এই দিকটা পরবর্তীতে জাপানিদের সুপারপাওয়ার হওয়া, আর জাপানি সৈনিকদের সাহসিকতার ব্যাখ্যা দেয়।

ছবি: সংগৃহীত

ভারতেও এক সাহসী গোষ্ঠী আছে যা গোরখা নামে পরিচিত। স্যাম মানেকশ তো বলেইছিলেন, “If anyone tells you he is never afraid, he is a liar or he is a Gurkha.” ব্যাখ্যাটা কী? এদের খাদ্যাভাস অনেকটাই ব্যাখ্যা দেয়। গোরখাদের খাদ্যাভাসে প্রোটিন কনটেন্ট অনেক বেশি। কেন? কারণ এরা পাহাড়ী, কৃষির উপর নির্ভরশীল না, তাই খুব একটা কার্বোহাইড্রেট পায়নি, মাংসের উপরেই নির্ভর করে চলতে হয়েছে।

বাংলায় বীরগাঁথা না থাকার পেছনে মুসলিম শাসকদের হাত থাকা প্রসঙ্গে-

অন্যান্য হেরেটিক ফকলোর তো টিকে গেছে। এছাড়া ইসলামী শাসনের প্রচলিত বীরগাঁথাকে রদ করার কথা না, বরং তাকে ইসলামী চরিত্র দিয়ে প্রতিস্থাপন করার কথা, বিহারে এর একটা এক্সাম্পল দেখেছি। বাংলায় সেরকম কিছুও তেমন পাওয়া যায়না। সত্যপীর, মনাইপীর টাইপের কিছু কাহিনী আছে তবুও সেটা বীরত্বের চেয়ে আধ্যাত্মিকতার সাথেই বেশি যায়। এছাড়া রাজনৈতিকভাবে শিল্পসাহিত্য নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও ফকলোর নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।

“আগডুম-বাগডুম আছে তো। মল্ল রাজাদের সৈন্য সজ্জা নিয়ে ছড়া” প্রসঙ্গে-

আগডুম বাগডুমে কৈবর্ত বীরদের ডিটেইলস নেই, তাই হিরোর ধারণা নির্মাণে এর প্রভাবও নেই। বেশিরভাগ একে বাচ্চাদের ছড়া বলেই জানে। “আগডুম বাগডুম” একটা বাগধারাও হয়ে গেছে যা অর্থহীনতাকে ইঙ্গিত করে। এটা নির্দেধ করে যে আগডুম বাগডুমের কোন ঐতিহাসিক বা বীরগাঁথা সূচক সিগনিফিকেন্স নেই।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন