, ১৩ জুন ২০২১; ৯:২০ অপরাহ্ণ


মুক্তির চেতনার আকাংখ্যা মানুষের জন্মগত, শ্বাশত এবং জীবনের সাথে সম্পৃক্ত। মুক্তির চেতনার কথা বলতে প্রথমেই এ কথা বুঝে নিতে হবে যে মুক্তি কি এবং সেই সাথে বন্ধনকেও।

কারন মুক্তি শব্দের মাঝেই অনুক্ত ভাবে থেকে যায় বন্ধন বা শৃঙ্খলের এই ধারণা। কি থেকে মুক্তি চায় মানুষ, কোন শৃংখলে আবদ্ধ সে, সেই মুক্তি কি আর সব মানুষকে পাশে ফেলে আপন মুক্তি নাকি সামগ্রিক কোন মুক্তির সাথে যুক্ত আছে ব্যক্তি মানুষের মুক্তি? আবার একই সঙ্গে বুঝে নিতে হবে চেতনা শব্দটি। আর চেতনা বলতে চলে আসবে মানুষ নামক ধারণার কথা। মানুষ কোন অর্থে অন্য সব প্রানীর চেয়ে আলাদা আর প্রাণি জগতের মধ্যে মানুসকেই কেন বার বার অস্তিত্বের সংকট অতিক্রম করতে হয় প্রতিক্ষণে, এই ইশতেহারে এসব বয়ানের মাধ্যমেই আমরা মানুষ নামক ধারণার পিছু ধরে পৌছে যেতে চাই মানবতার চিরকালীন মুক্তির চেতনার সৈকতে।   

প্রাণী জগতে অন্যসব প্রাণীর সঙ্গে মানুষের যত পার্থক্য বিদ্যমান তার মধ্যে সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মানুষের কল্পনাশক্তি। এটাকে অন্য ভাবে আমরা মানুষের বিশ্লেষণ ক্ষমতাও বলতে পারি। অর্থাৎ এই জগতকে দেখা এবং নিজের অনুভুতি দিয়ে উপলব্ধির যেই সংযোগ রয়েছে অন্যান্য প্রাণীর ক্ষেত্রে, সেটা একমাত্রিক, প্রবৃত্তি গত এবং এক স্বাভাবিক সত্ত্বাগত বৈশিষ্ট্য। কিন্তু মানুষের মাঝে কাজ করে আরেক প্রতিক্রিয়া (সেকেন্ড রিফ্লেক্সশন)। আর এটা যেমন মানুষের অনন্য গুণ, তেমনি মানুষের জীবনের জটিলতারও কারণ। মানব সভ্যতা বিকাশের একবারে প্রাথমিক পর্যায়ে মানুষ তার এই সেকেন্ড রিফলেক্সশনের মাধ্যমে নির্ধারিত করেছিল তার চলার পথ। সেই বন্য সংকট ময় যুদ্ধে সে আবিস্কার করেছিল তার শক্তিশালী গুণ আর তার দূর্বলতা।

মানুষের এই দ্বিতীয় প্রতিক্রিয়া বা সেকেন্ড রিফ্লেকশন, যা দিয়ে মানুষ অন্য প্রানী হতে আলাদা, এটা বুঝতে হলে আমাদের বুঝে নিতে হবে মানুষের আকাংখ্যা বা চেতনার গোঁড়ার কথা। কি আমাদের চেতনাকে গড়ে তোলে, কি আমাদের ভাবতে শেখায় শেখায়, কেন সব মানুষের ভাবনা একই রকম না?   

মানুষের ভাবনা বা চেতনা যাই বলি গড়ে ওঠে তার পরিপার্শ দিয়ে। এই পরিপার্শই অনেকটা প্রায় সবটাই আমাদের রুচিকে তৈরি করে। যেসব ভাবনা বা চেতনা বা বিশ্বাসকে আমরা খুব স্বাভাবিক ভাবেই শ্বাশত ধরেই নেই তার অনেকটাই যে আমাদের চারপাশের পরিবেশের প্রভাব দ্বারা নির্মিত-এই সত্যও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আমাদের ভাবনার আড়ালে থেকে যায়। চেতনার মুক্তি বলতে আমাদের ভাবনার আড়ালে ঢেকে যাওয়া সেই সত্যের মুক্তিকেও বুঝায়। আরও বুঝায় আমাদের চিন্তার পরিকাঠামো নির্মাণ করা পারিপার্শ্বিক সেই সব প্রভাবের থেকে মুক্তি যেগুলো আমাদের নিতান্তই অনিচ্ছায় মানতে হয়।

দুই

পুঁজিবাদের এই সর্বগ্রাসী সময়ে মানুষের চেতনার পথে সবচেয়ে বড় দেবতা হয়ে পথ আগলে বসে আছে এমন এক ধারণা যার নিজস্ব কোন গুণ নেই, কিন্তু জিনিসটা জগতের সকল বস্তুর গুণকে ধারণ করে। সেই ধারণার নাম অর্থ বা টাকা। জগতের আর সব প্রাণীর মতই জন্মাবার সাথে সাথে মানুষের যে খাদ্য পাওয়া প্রাকৃতিক অধিকার সেই প্রশ্ন আজ এক হাস্যকর রূপ নিয়েছে এবং মানুষের ক্ষুধাকে শুধু জিম্মি করে মানুষের সকল শ্রমের মধ্যে বিনিময়ের সাধারণ তারল্যপূর্ন মাধ্যম যেই অর্থ , তার দাপটে আটকে যায় যেমন বাস্তব মুক্তির পথ তেমনি তা করে তুলতে পারে চেতনার মুক্তি নামক ধারনাকে অবান্তর। যদিও এই প্রক্রিয়া আবহমান কালের তবু শিল্প বিপ্লবের পর থেকে মানুষের ক্ষুধাকে জিম্মি করে শ্রমের তারল্যভিত্তিক আর্থিক ধারণা্র এমন এক প্রলংকারী বৈষম্য গড়ে তুলেছে জগতময় যেখানে মানুষের মুক্তির সকল দুয়ার রুদ্ধ।

আগেই বলা হয়েছে সৃষ্টি জগতের মধ্যে মানুষ অন্যান্য প্রাণী হতে আলাদা করেছে  তার চিন্তা বা কল্পনা শক্তি দিয়ে, আর এই কল্পনা শক্তিই মানুষের শ্রমকে জগতের আর সব প্রাণীর শ্রম থেকে আলাদা করেছে। একমাত্র মানুষের শ্রমই সৃজনশীল কারণ তার শ্রমের সাথে যুক্ত থাকে চেতনা বা চিন্তা আর সেকারণেই সেটার পুনঃরাবৃত্তি অসম্ভব। এখন প্রশ্ন উঠবে যে চেতনা বা চিন্তা মানুষের শ্রমকে জগতের অন্য প্রাণী থেকে আলাদা করলো, সেই চেতনাকে আমরা দেখবো কি করে, চিন্তা চেতনা তো এক বিমূর্ত জিনিস। কিন্তু চেতনার মুক্তির জন্য তো সেই চিন্তা চেতনাকে আমাদের দেখতেই হবে নাহলে কি করে আমরা খুঁজে পাবো চেতনার বন্ধন। 

চেতনার আকাংখ্যা বা চেতনার উন্মেস মানুষের অভ্যন্তরীন বিষয় কিন্তু চেতনার বন্ধন বা শৃঙ্খল সমূহ বাহ্যিক। বস্তুত মানুষের চিন্তাকে বা চেতনাকে বুঝতে পারা যায় তার চিন্তা বা চেতনা প্রকাশের মাধ্যম দ্বারা, তার সৃষ্টি দিয়ে। চেতনার মুক্তির প্রশ্নই উঠত না যদি মানুষের এই সকল সৃষ্টির সকল উপাদান তার আপনার মালিকানায় থাকত, আর এখানেই যত বিপত্তি। বেশিরভাগ সৃষ্টি উপকরণ অর্থ নামক এক ধারণা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। সেই অর্থ শক্তি যে বা যারা নিয়ন্ত্রণ করে, সেই পক্ষই শেষ মেশ সেই সৃষ্টির মালিক হয়ে বসে। জগতে বৈষম্যের মূলে আছে এটাই। 

মানুষের চেতনার বন্দিত্বের কারণ এটাই যে মানুষ নিজের চেতনা বা চিন্তার ফসল আপনার ঘরে নিতে পারে না। আমাদের চেতনা চিন্তা কল্পনা সব বন্দি হয়ে আছে সেই সমাজে যেই সমাজ মানুষ নিজেই নির্মান করেছে, যেই সমাজের সম্পদ গুলো সৃষ্টি করেছে সব মানুষ মিলে যুগে যুগে, কিন্তু সম্পদের মালিক সব মানুষ না। অল্প কিছু মানুষ সেই সম্পদের মালিক। অর্থাৎ আমাদের চেতনার মুক্তি, চিন্তার মুক্তি, ইতিহাসের মুক্তি, ভবিষ্যতের মুক্তি একমাত্র সম্ভব যদি সমাজের সৃষ্টির উপকরণে সকল মানুষের সম অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। আর এজন্য সর্ব প্রথম দরকার আমাদের শৃঙ্খলকে শৃঙ্খল হিসেবে চেনা। লেলিন বলেছিলেন, ‘যদি কোন দাস নিজের শেকলকে অলংকার ভাবে তবে তার মুক্তি কোন কালেই সম্ভব নয়, আর যদি কেউ নিজের শেকলকে শেকল হিসেবে চিনে ফেলতে পারে, সেখানেই তার অর্ধেক মুক্তি ঘটে যায়’।

তিন

মানুষের অনন্যতা বুঝতে মীর তকি মীরের একটা খুব প্রাসঙ্গিক কথা এই ক্ষেত্রে আমরা বলতে পারি। ‘এই মাটির মানুষ দিয়েই জগতের যত উজ্জলতা। তা নাহলে আয়না তো আগেও ছিল কিন্তু সেই আয়নায় মুখ দেখার মতো চোখ তো ছিল না’। মানুষই এই জগতের চোখ। পৃথিবীর ইতিহাস তাই মানব সভ্যতার ই ইতিহাস। পৃথিবীতে হাজার হাজার বছর ধরে ঘটে যাওয়া যে কোন দৃশ্য ই ব্যক্তি মানুষের নতুন দৃষ্টির সম্মুখে নতুন আবেগ নিয়ে উপস্থিত হয়, ঠিক তেমন মানুষের মুক্তির চেতনার ব্যাখ্যায় আজ আমরা যেসব প্রসঙ্গ নিয়ে আসছি সেই মুক্তির চেতনার কথা পাঁচ হাজার বছর আগে মিশরে নবী মুছা (আঃ) বলে গিয়েছেন, সেই কথা প্রায় আড়াই হাজার বছর আগের গৌতম বুদ্ধ বলেছেন বা ঈছায়ী সনের ৭১ বছর পূর্বে রোমান সম্রাটদের সাথে যুদ্ধ করা ক্রীতদাস স্পার্টাকাস বলেছিলেন। আর আজ এই ইশতেহারের মাধ্যমে অতীতের সকল মুক্তির চেতনার পুনঃজন্ম লাভ ঘটলো।

বিংশ শতাব্দীর অন্যতম চিন্তানায়ক জ্যা পল সাত্রে যদিও বলেছেন, ‘মানুষ আর মুক্ত মানুষ শব্দ দুটো সমার্থক। অর্থাৎ তিনি ধরেই নিয়েছেন যে যাকে মানুষ বলা হয়, সেই মানুষ স্বাধীন থাকবে। সেই মানুষ হবে মুক্ত। কিন্তু ইউরোপীয় রেনেসাঁর এক সোনালী কারিগর জ্যা জ্যাক রুশো আমাদের জানাচ্ছেন, ‘চেতনাগত ভাবে অর্থাৎ প্রাকৃতিক ভাবে মানুষ মুক্ত অবস্থায় জন্ম নেয় বটে, কিন্তু জন্মেই সে জড়িয়ে পরে নানারকম শৃঙ্খলে’। এই যে এক এক সমাজ তাঁর আপন কাঠমো বিস্তারে মানুষকে বেঁধে নির্বোধ কতগুলো প্রাণীতে পরিণত করে,  বেশিরভাগ সময় মানুষ এই শৃঙ্খলকে মুক্তি ভেবে আমৃত্যু বয়ে চলে এঁর দায়। জীবনের মাঝে বেঁচে থাকার সচেতন বোধ যদি হয় জীবন, তাহলে আমাদের মানতেই হবে যে মানুষের মুক্তি আসলে মানুষের চেতনার মুক্তি, আর সেটা দেশ কাল উত্তীর্ণ এক বোধ। অশিক্ষা আর মিথ্যে কতগুলো নিয়মের বেড়ায় আটকে আছে আজ মানব মুক্তির চেতনা।   

আমাদের চারপাশের এই এই প্রবাহমান কলরোরিত জীবনে এমন অনেক বিষয়ই আছে যেগুলো সম্পর্কে আমরা কখনো ভাবি না, স্বভাবিক ধরে নেই, সেই সব কিছুই সমাজ ও কালের নিরিখে ভিন্ন ভিন্ন অর্থ ধারণ করে। উদাহরণ স্বরুপ আমরা বলতে পারি কৃতদাস প্রথার কথা। আজকে যাদের আমরা তথাকথিত সভ্য বলি ও যাদের পদাংক অনুসরণ করতে চাই মন প্রাণ দিয়ে, সেসব দেশেও মাত্র দেড় দুশ বছর আগে মানুষকে পশুর চেয়ে হীন ভাবে দাস হিসেবে ব্যবহার করতো, আর সেটাকেই স্বভাবিক ধরে নেয়া হতো। অর্থাৎ মানুষের মুক্তির ন্যায্যতাও সময়ে সময়ে বদলায়। এটা সেই পৃথিবী যেখানে এক অংশের মানুষ কি করে অতিরিক্ত ওজন কমানো যায় সেই নিয়ে উদ্ববেগে আছে, অপরদিকে কমপক্ষে একশত কোটি মানুষ রাতে না খেয়ে ঘুমাতে যায়। সেই একই পৃথিবিতে নিঃশ্বাস ফেলি আমরা সবাই। অর্থাৎ সমাজ মানুষের মধ্যে প্রবেশ করিয়ে দেয় এমন প্রোগ্রাম যা মানুষের মুক্তির চেতনাকে ঢেকে ফেলে কালো চাদরে। যেন ডাস্টবিনে কুকুরের পাশে খাবার খুজতে থাকা মানুষ দেখেও আমাদের সব স্বভাবিক মনে হয়। এই সমাজ এমন ভাবে আমাদের বাচতে শেখায় যেন আমাদের মধ্যে কোন প্রশ্ন না আসে।

বেশিরভাগ মানুষের বেঁচে থাকার সামান্য অংশই থাকে তাঁর জীবন। মানুষের চিন্তার কাঠামো, ভাল-মন্দ, ন্যায় অন্যায়, নীতি -নৈতিকতা এই সব কিছুর সমাজ নির্ধারিত এক সাজানো ছক রয়েছে। কাকে আপনি ভালো মনে করবেন, কাকে আপনি খারাপ মনে করবেন, কোন বিষয়ে কি ভাবা উচিত এবং করে ভাবা উচিত- সেটাও ঠিক করে দেয় আমাদের জন্ম নেয়া সমাজ। গুস্তাব ফ্লবেরের ‘আহাম্মকের’ অভিধানে কি নির্মন ভাবে লেখা আছে চেতনহীন এই সব জম্বি মানুষদের লোকাচারের কথা।

 যুগে যুগে মানুষকে বাধ্য করা হয়েছে সেভাবেই বাঁচতে। সামাজিকীকরণ বলতে আমরা যা বুঝি সেটার আদল গড়ে দেয় চারপাশ, এই মুক্ত বাজার অর্থ নীতি কালে আরও বিশেষ করে বললে পুজিবাদ ও সাম্রাজ্য বাদের চরম বিজয়ের কালে মানুষের চেতনাকে যে আফিম দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখা আছে সেটা হল ‘পুঁজি’। আর স্পষ্ট করলে বললে সেটার নাম টাকা, যা সব কিছুর চালিকা শক্তি হিসেবে আজ কাজ করছে। পৃথিবীর বেশিরভাগ সম্পদ কুক্ষিগত করে রেখেছে খুব অল্প সংখ্যক মানুষ, আর বাকি মানুষগুলো বন্দী হয়ে আছে দিন যাপনের অচিচ্ছার প্রহরে। মূলে গেলে আমরা দেখতে পাবো, সম্পদ উৎপাদনে সকলের অংশিদারিত্ব যোগ্যতা অনুযায়ী সমান হলেও সেই উৎপাদিত সম্পদের সুফল ভোগ করছে একটা শ্রেণী। আমাদের প্রথমেই খুঁজে বের করতে কি সেই মায়াবী যাদু যা দিয়ে সমাজ আর রাষ্ট্র ভুলিয়ে রাখে আমাদের মুক্তির চেতনা। সেই সাথে আমাদের আজ এই রহস্যও ভেদ করতে হবে সাম্য মানবিক মর্যাদা আর সামাজিক ন্যায় বিচার- অর্থাৎ মানব মুক্তির অন্তরায় সে অকল্পনীয় গল্প গুলোর।

কার্ল মার্ক্সের ক্যাপিটাল বইয়ের প্রথম খন্ডে তিনি জানাচ্ছেন এক অসাধারণ পর্যবেক্ষণ, যা দিয়ে আমরা বুঝতে পারবো কেন মানুষ প্রাণী জগতের মাঝে অনন্য। মার্ক্স জানাচ্ছেন, একটি বাবুই পাখির বাসা এতই নিখুঁত যে দুনিয়ার সেরা তাতিও সেটার সামনে এলে স্তম্ভিত হয়। বা একটি মৌমাছির চাক, যার নিপুনতা দেখলে দুনিয়ার সেরা স্থপতিও লজ্জা পাবে। কিন্তু এরপরের দুনিয়ার সবচেয়ে বাজে তাতি বা স্থপতির কাজ সেই বাবুই পাখি বা মৌমাছির চেয়ে আলাদা ও অনন্য। কারণ জগতের আর সব প্রানী চালিত হত তার প্রবৃত্তি দিয়ে। সেখানে স্বপ্ন বা কল্পনার অবকাশ থাকে। মানুষের প্রতিটি কাজের পেছনে কাজ করে তার কল্পনা ও স্বপ্ন। এই যে সচেনতা এটাই একই সঙ্গে মানুষের সুখ ও দুঃখের কারণ।

চার  

বাংলাদেশের জনগণ ’৭১-এর আগে স্বতন্ত্র ভূমি বা সার্বভৌমত্ব নিয়ে কখনই স্বাধীন ছিল না। বাঙালি জাতির সামনে যখন অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার প্রশ্ন এসে দাঁড়ায়, তখন চেতনাই আমাদের এক অভিন্ন বিন্দুতে মিলিত করে। এ জন্য বাঙালির প্রতিটি চেনা সংগ্রামেরই মন্ত্রবীজ ছিল ‘মুক্তির চেতনা’। আর এই চেতনা সবচেয়ে বেশি সক্রিয় ছিল ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে। প্রায় দু’শ বছরের পরাধীনতার গ্লানি মুক্তির চেতনায় রূপ নিতে নিতে সমগ্র বাংলার জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে যায়। আর এই চেতনা  সালে একটি প্রবল আগ্নেয়গিরির মতোই উদগিরণ ঘটে। এই উদগিরণ ঐতিহাসিক। চিরায়ত মানুষের শ্বাশত মুক্তির চেতনাই এই উদগিরণকে পথ দেখায় এবং  সময়ে স্বাধীনতা সংগ্রামে রূপ নেয়। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রাম হচ্ছে বাঙালির জাতীয় চেতনার ধারাবাহিক উত্তরণের একটি স্বতঃস্ফূর্ত এবং সক্রিয় রূপ।

 নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্য দিয়ে আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা বাঙালির করতলগত হয়। দীর্ঘ সময়ের ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণ ও নিপীড়নের ফলে জাতির চেতনায় ক্ষোভ, প্রতিবাদ, রক্তক্ষরণ, সংগ্রামশীল জীবনদৃষ্টি এবং ভবিষ্যৎস্পর্শী কল্পনার জন্ম হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত অভিজ্ঞতা ও সাফল্যের মধ্য দিয়ে বাঙালির গঠনমূলক রূপান্তরের পথ প্রশস্ত হয়। আসলে চেতনার পরিমাপে মুক্তিযুদ্ধ একটি ব্যাপক এবং বহুমাত্রিক রূপ নিয়ে আমাদের জাতীয় জীবনকে সমৃদ্ধ করে।

১৯৭১-এর ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার এক পক্ষকাল সময়ের ভেতর ’৭১-এর ১০ এপ্রিল প্রণীত হয়েছে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র, যা ছিল নয় মাসব্যাপী রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক, সামাজিক ও আইনগত ভিত্তি। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নিছক একটি ভূ-খণ্ড লাভ কিংবা পতাকা বদলের জন্য হয়নি। নয় মাসব্যাপী এই যুদ্ধ ছিল প্রকৃত অর্থেই মুক্তির যুদ্ধ। দেশের কৃষক, শ্রমিক, মেহনতি মানুষ এই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন সার্বিক মুক্তির আশায়। জনগণের এই আকাঙ্ক্ষা মূর্ত হয়েছিল ’৭২-এর সংবিধানে।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান রচনায় এ চেতনার বহিঃপ্রকাশ লক্ষ করা যায়। প্রস্তাবনার: তৃতীয় প্যারায় বলা আছে,

‘আমরা আরও অঙ্গীকার করিতেছি যে আমাদের রাষ্ট্রের অন্যতম মূল লক্ষ্য হইবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠা, যেখানে সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হইবে;’

প্রথম ভাগ: প্রজাতন্ত্র

১) বাংলাদেশ একটি একক, স্বাধীন ও সার্বভৌম প্রজাতন্ত্র, যাহা ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’ নামে পরিচিত হইবে।

৭। (১) প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ; এবং জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল এই সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্ব কার্যকর হইবে।’

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও তার ভিত্তিতে সৃষ্ট বাংলাদেশের দুটি প্রধান বৈশিষ্ট্য নিম্নরূপ:

প্রথমত, বাংলাদেশ হবে জনগণের দেশ এবং জনগণের দ্বারা পরিচালিত দেশ; অর্থাৎ গণতান্ত্রিকভাবে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা পরিচালিত দেশ।

দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ হবে সব ধরনের বৈষম্যমুক্ত, অন্যায়, অবিচার ও শোষণমুক্ত; অর্থাৎ অসাম্প্রদায়িক সামাজিক ন্যায়বিচারভিত্তিক দেশ।

পাঁচ  

কোনো সমাজ ব্যবস্থা যখন জরাজীর্ণ এবং গতিহীন হয়ে পড়ে, তখন সমাজের মধ্য থেকে এমন শক্তি জেগে ওঠে যে তার আঘাতে পুরাতনতন্ত্র তাসের ঘরের ন্যায় ভেঙে পড়ে। ক্ষয়ধরা সমাজকে ভেঙে পুরাতন ব্যবস্থার স্থলে নতুন ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। সমাজের এই তৎক্ষণাৎ মৌলিক পরিবর্তনই হল বিপ্লব। ঐতিহাসিকেরা বিপ্লবের একটি বিশেষ অংশ দেখেন। তাদের মতে, সমাজে দুটি শ্রেণি থাকে। এক শ্রেণি সকল সুযোগ সুবিধা ভোগ করে এবং অপর শ্রেণি শোষিত হয়। শোষিত শ্রেণি শেষ পর্যন্ত অধিকারভোগী শ্রেণীর প্রথাগত রাজনৈতিক এবং আর্থিক সকল অধিকার বিপ্লবের মাধ্যমে ধ্বংস করে।

এক্ষেত্রে আমরা স্মরণ করতে পৃথিবীর সাম্প্রতিক ইতিহাসের রাজনৈতিক পালাবদলের ঘটনা বলীকে, যা মানুষের সার্বিক মুক্তির চেতনাকেই প্রতিফলিত করে। ফরাসি বিপ্লবকে পশ্চিমা গণতন্ত্রের ইতিহাসে একটি জটিল সন্ধিক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয় যার মাধ্যমে পশ্চিমা সভ্যতা নিরঙ্কুশ রাজনীতি এবং অভিজাততন্ত্র থেকে নাগরিকত্বের যুগে পদার্পণ করে।

১৭৮৯ সালের ১৪ জুলাই ফ্রান্স রাজ্যের প্যারিস কুখ্যাত বাস্তিলে বিক্ষোভ (ফরাসি: Prise de la Bastille [pʁiz də la bastij]) হয়। ফ্রান্সের রাজা ষোড়শ লুই এ খবর পেয়ে এক সহচরের কাছে এমন অভিমত প্রকাশ করেন, দ্যাট ইজ এ রিভোল্ট।’ সহচরটি প্রত্যুত্তরে বলেন, স্যার, ‘ইট ইজ নট এ রিভোল্ট, ইট ইজ এ রেভল্যুশন’।এই ফরাসি বিপ্লবের মূলনীতি ছিল “Liberté, égalité, fraternité, ou la mort!” অর্থাৎ “স্বাধীনতা, সমতা, ভ্রাতৃত্ব, অথবা মৃত্যু”।

গৌতম বুদ্ধ বলেছিলেন, ‘বাহ্যিক কাঠামো, বাহ্যিক অবয়ব বা বাহ্যিক সৌন্দর্য কখনোই সত্যের মানদণ্ড হতে পারে না। আবার বাহ্যিক কোন কাঠামো বা মানুষের কোন আচরণ যা তোমার কাছে সত্য বলে মনে হচ্ছে, মনে রেখো সেটাই সত্য’। অর্থাৎ সত্যকেও ব্যক্তি পর্যায়ে নির্মান করতে হয় আলাদা আলাদা করে। আর সেই সত্যের বয়ান ততক্ষণ পর্যন্ত করতে হয় যতক্ষণ পর্যন্ত মানুষ ওই সত্যের মুখোখুখি না হয়।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন