, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১; ১০:১২ অপরাহ্ণ


‘ইতিহাস’ জ্ঞানের এক উজ্জ্বলতম শাখা। এখানে যতোই মনোনিবেশ করা যায়—প্রজ্ঞা ততোই উৎকর্ষ লাভ করতে থাকে। বিভিন্ন সভ্যতার ইতিহাস আমাদের চিন্তা শক্তিকে আরো শাণিত করে। কারণ, সভ্যতার ক্রমবিকাশ অনেক প্রাচীন একটি বিষয়। এর মাঝে কালিক বিবরণ অনুযায়ী বিশদ আকারে অনেক ধরণের জ্ঞান সন্নিবেশিত হয়েছে। যদিও সুনির্দিষ্টভাবে দিন-ক্ষণ ধরে বিজ্ঞানীরা আমাদের সেই সময়কালের বিবরণ তুলে ধরতে সমর্থ হননি। বিভিন্ন ধরণের ‘আর্টিফেকট’ এর সূত্র ধরে প্রাচীন সভ্যতাগুলোর যে বিবরণ আমরা পাই, তাতে সত্যের পাশাপাশি অনেক কিছুতেই অনুমান ও ধারণার আশ্রয় গ্রহন করা হয়েছে। ভারতীয় উপমহাদেশে যে সভ্যতাগুলো গড়ে উঠেছিল, সেসবের জন্যও একই পদ্ধতি অবলম্বন করতে দেখা যায় গবেষকদের। প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ এইচ.ডি. সাংখলিয়ার মতে,

‘‘ প্রাক-ঐতিহাসিক মানুষের ব্যবহৃত হাত পাথরের যন্ত্রপাতি পরীক্ষা করে ভূতত্ত্ববিদরা মনে করেন যে, অন্তত পাঁচ লক্ষ বছর আগে ভারতের মাটিতে মানুষ বসবাস করত।”

অবশ্য কিছু ইতিহাসবিদ মনে করেন— ‘দ্বিতীয় হিমবাহের যুগ থেকে ভারতে মানুষের বসবাস আরম্ভ হয়।’ সেসব কিছু আমলে নিয়ে মনে করা হয় যে, ৪-২ লক্ষ বছর আগে ভারতে মানুষের বসতি ছিল। যাই হোক, এবার আমরা প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতা সমূহের মধ্যে অন্যতম প্রধান ও চিত্তাকর্ষক সভ্যতা তথা ‘ ‘প্রাচীন বৈদিক সভ্যতা’ নিয়ে আলোচনা করব।

আর্যদের বিবরণ : প্রাচীন বৈদিক সভ্যতার আলোচনায় আর্য জাতির অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের আগমনই বৈদিক সভ্যতার সূত্রপাত ঘটায়। সেক্ষেত্রে সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন উঠতে পারে যে, আর্যজাতি বলতে কাদের বোঝানো হয় ? প্রকৃত পক্ষে ‘আর্য’ একটি ভাষার নাম। স্যার উইলিয়াম জোনস ১৭৮৬ খ্রিস্টাব্দে তাঁর এশিয়াটিক সোসাইটির বক্তৃতামালায় প্রথমবারের মত সংস্কৃত ভাষার সাথে প্রাচীন গ্রীক, ল্যাটিন, জার্মান, পারসিক, কেলটিক প্রভৃতি ভাষার অন্তর্নিহিত সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেন। উইলিয়াম জোনস এই সমস্ত ভাষার সাদৃশ্য লক্ষ্য করে, এদের একই মূল ভাষা হতে উৎপন্ন বলে মন্তব্য করেন। কারণ, সংস্কৃত মূল ভাষা —আর্য ভাষা থেকে উৎপন্ন। সুতরাং, সংস্কৃতভাষী ভারতীয় আর্যদের সাথে ইউরোপীয় ও মধ্য এশিয়ার আর্য ভাষাভাষীদের যে সাদৃশ্য ছিল—তা এক প্রকার নিশ্চিত। আর আর্য ভাষায় যারা কথা বলত—তাদেরকেই আর্য জাতি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এরা দুই ভাগে বিভক্ত। একটি ইউরোপে বসবাস করত। আরেকটি ভারতীয় উপমহাদেশ ও এশিয়া মাইনরে বসবাস করা শুরু করে।

আর্য জাতির আদি বাসস্থান নিয়ে ইতিহাসবিদদের মাঝে মতভেদ রয়েছে। ম্যাক্স মুলারের ভাষায়—‘পশ্চিম এশিয়া থেকে আর্যদের একটি দল এশিয়া মাইনরের ভেতর দিয়ে ইউরোপে অনুপ্রবেশ করে। আর অন্য দলটি উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে আসে।’ ম্যাক্স মুলারের এই চিন্তা প্রাথমিকভাবে গৃহীত হলেও পরে পরিত্যাজ্য হয়।

অধ্যাপক ম্যাকডোনাল ও গিল এর মতে,‘বর্তমান হাঙ্গেরি, অস্ট্রিয়া ও চেকোশ্লোভাকিয়া নিয়ে ইউরোপের যে অঞ্চল গঠিত—সেটাই ছিল আর্যদের আদি বাসস্থান।’ এ বিষয়ে প্রখ্যাত ঐতিহাসকি রমেশ চন্দ্র মজুমদার বলেন—‘দক্ষিণ রাশিয়া ছিল আর্যদের আদি ভূমি।’

এ নিয়ে ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের আরো অনেক মতামত রয়েছে। তবে সেসবের আলোকে এটা পরিষ্কার যে, আনুমানিক খ্রীস্টপূর্ব ২০০০ অব্দে পূর্ব ইউরোপের পোল্যান্ড থেকে মধ্য এশিয়া পর্যন্ত যে বিস্তীর্ণ তৃণভূমি অঞ্চলে আর্যরা বসবাস করত। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অভ্যন্তরীন কলহ, খাদ্যের অভাব প্রভৃতি সমস্যা দেখা দিলে, তারা নিজেদের আদিভূমি ত্যাগ করে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ে। তাদের একটি শাখা প্রাচীন পারস্যে চলে যায়। সেদিক থেকে বর্তমান ইরানীরাও এই আর্যজাতির বংশধর। অপর একটি শাখা একটি শাখা উত্তর-পশ্চিম গিরিপথ দিয়ে ভারতে প্রবেশ করে। ক্যাপাডশিয়ায় প্রাপ্ত ‘বোখাজ কোষ’ শিলালিপি থেকে জানা যায়— ‘খ্রীস্টপূর্ব ১৪০০ অব্দে ভারতের উত্তরাঞ্চলের ‘মিঠালী’ নামক অধিবাসীদের উপর প্রভাব বিস্তার করে।’ তা থেকে এটা অনুমান করা যায় যে, খ্রীস্টপূর্ব ১৪০০-১৫০০ অব্দে আর্যরা ভারতে অনুপ্রবেশ করে।

প্রাচীন বৈদিক যুগের ভারত

ভারতে আর্যদের বিচরণস্থল : উত্তর ভারতেই আর্যদের প্রভাব-প্রতিপত্তি বেশি ছিল। সেই তুলনায় দাক্ষিণাত্যে আর্য সভ্যতা সেই অনুপাতে আধিপত্য বিস্তার করতে পারেনি। সিন্ধু নদী বিধৌত ভূমিতে তারা নিজেদের সভ্যতা গড়ে তোলে। বৈদিক সাহিত্যে এই অঞ্চলকে ‘সপ্ত সিন্ধু’ নামে অভিহিত করা হয়েছে। সিন্ধু, ইরাবতী, শতদ্রু, চন্দ্রভাগা, স্বরস্বতী, বিপাশা, বিতস্তা—এই মোট সাতটি নদীর অববাহিকা ঘিরে আর্যদের সভ্যতা গড়ে ওঠে। তবে এই অঞ্চলের আদি অধিবাসীরা আর্যদের অনুপ্রবেশকে মেনে নিতে পারেনি। ফলে দীর্ঘকাল ধরে উভয় জাতির মাঝে যুদ্ধ চলতে থাকে। আর্যরা এক সময় শোচনীয়ভাবে আদি অধিবাসীদের পরাস্ত করে। পরাজিতরা পাহাড় ও বন-জঙ্গলে গিয়ে বসবাস করা শুরু করে। অন্যরা আর্য সমাজের নিম্ন শ্রেণীর অন্তর্ভূক্ত হয়ে জীবন ধারণ করতে থাকে। আর্যরা এদের দস্যু, দাস, অসুর, রাক্ষস প্রভৃতি নামে অভিহিত করত। আর্য সাহিত্য অনুযায়ী আদি অধিবাসীরা ছিল অনার্য জাতি।

সপ্ত সিন্ধুর অববাহিকায় নিজেদের প্রাথমিক সভ্যতাকে শক্তিশালী করার পর, আর্যরা মধ্যদেশ অধিকার করে। এরপর উত্তর ও দক্ষিণ বিহার, বারাণসী, বঙ্গদেশসহ আরো অনেক অঞ্চল নিজেদের দখলে আনে। খ্রীস্ট্রপূর্ব ২০০ অব্দের মধ্যে হিমাচল থেকে শুরু করে বিন্ধ্যা পর্বত পর্যন্ত সুবিশাল অঞ্চল তাদের অধিকারে আসে। এই বিস্তীর্ণ ভূভাগকে তারা ‘আর্যাবর্ত’ হিসেবে অভিহিত করে।

ঐতিহাসিক সিন্ধু নদী

পরবর্তীকালে আর্যরা বিন্ধ্যা পর্বত অতিক্রম করে বেরার প্রদেশে বিদর্ভ রাজ্য, নাসিক অঞ্চলে দণ্ডক রাজ্য এবং বুন্দেল খণ্ডে চেদী রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। তবে অনেক যুদ্ধবিগ্রহ ও সংগ্রাম করেও আর্যরা সমগ্র দাক্ষিণাত্য অধিকার করতে পারেনি। উত্তর ভারতের মত করে তাদের প্রভাব-প্রতিপত্তিও দাক্ষিণাত্যে সেভাবে অনুপ্রবেশ করতে পারেনি।

বৈদিক যুগ ও তার শ্রেণী বিভাগ : আর্যদের আগমনের ফলে ভারতে আর্য সভ্যতার যে টাইমলাইন শুরু হয়, তাকেই ইতিহাসে ‘বৈদিক যুগ’ নামে আখ্যায়িত করা হয়। ইতিহাসবিদরা মোটা দাগে এই সময়কে দুইভাগে বিভক্ত করেছেন, যথা—ঋগ বৈদিক যুগ বা প্রাচীন বৈদিক যুগ ও পরবর্তী বৈদিক যুগ। এই দুই যুগের মাঝে অনেকগুলো পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। সময়ের প্রবাহে সভ্যতাটি নানা রকম বৈশিষ্ট্য ধারণ করতে থাকে। এই রচনায় আমরা প্রাচীন বৈদিক যুগ নিয়েই আলোচনা সীমিত রাখব।

প্রাচীন বৈদিক যুগের রাজনৈতিক অবস্থা : প্রাচীন বৈদিক যুগে কৃষিভূমি, পশুচারণের ক্ষেত্র নিয়ে অনার্যদের সাথে আর্যদের যুদ্ধ অব্যাহত ছিল। দ্রাবিড় ও অন্যান্য অনার্য জাতিসমূহ আর্যদের বিরুদ্ধে অবিরাম প্রতিরোধ চালিয়ে যায়। ঋগবেদে দশ রাজার যে উপাখ্যান বর্ণিত হয়েছে তা থেকে এটা বোঝা যায় যে, আর্যরা খুব একটা শান্তিপ্রিয় জাতি ছিলনা। আধিপত্য বিস্তারের নীতির জন্য অন্যান্য জাতি ও গোষ্ঠীগুলোর সাথে তাদের দ্বন্দ্ব ও সংঘাত লেগেই থাকত। ঐতিহাসিক রোমিলা থাপারের মতে, ‘প্রাচীন বৈদিক যুগের রাজারা ছিল প্রধানত যোদ্ধাদের নেতা।

ঋগবেদে রাজতন্ত্রের উৎপত্তি সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া যায়। একটি উপাখ্যান আছে সেখানে এরকমভাবে বর্ণিত আছে যে, দেবতারা অসুরদের কাছে পরাস্ত হয়ে সিদ্ধান্তে আসে যে, তাদের মাঝে কোনো রাজা না থাকার ফলেই তাদের এই পরাজয়। এরপর তারা সর্ব সম্মতিক্রমে নিজেদের রাজা নির্বাচন করে। এই উপাখ্যান থেকে প্রাচীন বৈদিক সভ্যতায় রাজতন্ত্র উদ্ভবের একটি সূত্র পাওয়া যায়।

এই যুগে রাজার প্রধান কাজ ছিল অনেকটাই সামরিক। শত্রু জাতিগুলো থেকে আর্যদের নিরাপত্তা দেয়াই ছিল তার প্রধান কাজ। এর পাশাপাশি আইন-শৃংখলা রক্ষা করা ও প্রজাদের জান-মাল সংরক্ষণে তৎপর থাকাও ছিল তাদের অন্যতম প্রধান কাজ। রাজা ধর্মীয় বিধি-আচার পালনে সক্রিয় ভূমিকা রাখতেন। জমির উপর রাজার কোনো স্বত্ত্ব ছিলনা। প্রজারা অনেকটা স্বেচ্ছায় রাজাকে কর প্রদান করত। রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে কয়েক স্তরে ভাগ করা হয়েছিল। প্রশাসনের কেন্দ্রভূমিতে থাকতেন রাজা স্বয়ং। পরিবারগেুলো ছিল পিতৃকেন্দ্রীক। কয়েকটি পরিবার নিয়ে গোষ্ঠী ও কয়েকটি গোষ্ঠী নিয়ে একটি গ্রাম পরিগঠিত হত। রাজা তার শাসনের সুবিধার্থে বিভিন্ন গ্রাম ও অঞ্চলে প্রশাসনিক কর্মচারী নিয়োগ দিতেন।
রোমান সিনেটের মত কোনো ব্যবস্থা না থাকলেও রাজা সভা ও সমিতি নামক দুটি সংস্থাকে মেনে চলতেন। অর্থাৎ, এই দুইটি সংস্থা রাজশক্তি নিয়ন্ত্রণে কিছুটা হলেও ভূমিকা রাখত।

সামাজিক জীবন : প্রাথমিক পর্যায়ে প্রাচীন বৈদিক সমাজে জাতিভেদ প্রথা ছিলনা। পরবর্তীতে অনার্যদের সাথে সংমিশ্রিত হয়ে একটি নতুন ভাবধারার উদ্ভব হয়। সমাজে অর্থনৈতিক শ্রেণী থাকলেও বংশীয় শ্রেণীভেদ ছিলনা। কালক্রমে তাদের মাঝে জাতিভেদ প্রথা মাথাচাড়া দেয়। সমাজ চার ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে, যথা—ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র। এটা প্রাচীন বৈদিক যুগের শেষদিকের কথা। তখন জাতিভেদ প্রথা মারাত্মক আকার ধারণ করতে থাকে। সমাজে কৌলিণ্য থাকায় মানুষে-মানুষে ভেদাভেদ বাড়তে থাকে। সেই সমাজে ‘চতুরাশ্রম’ একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। এর মাধ্যমে মানবজীবনের চারটি অবস্থাকে বোঝানো হয়ে থাকে। প্রথম জীবন ছিল ব্রাহ্মকর্ম। এই সময় প্রত্যেক আর্য বালক গুরুর গৃহে থেকে বিদ্যা শিক্ষা করত এবং গুরুর সেবাকার্যে আত্মনিয়োগ করত। ব্রাহ্মকর্ম শেষ হলে, নিজের গৃহে প্রবেশ করে গার্হাস্থ্য আশ্রম শুরু করতে হত। অর্থাৎ, বিয়ে করে সংসার জীবন শুরু করাই ছিল এই প্রক্রিয়া। এই দ্বিতীয় প্রস্থ শেষ হলে শুরু হত—‘বাণপ্রস্থাশ্রম’; মধ্য বয়স পার করে বনে কুটির বেঁধে নির্লিপ্ত জীবন-যাপনই ছিল এর প্রধান উদ্দেশ্য। আর শেষ পর্যায়টিকে বলা হয়—‘সন্ন্যাস’ বা ‘যতি-আশ্রম’। এ পর্যায়ে এসে সবাইকে সন্ন্যাসীর মত জীবন যাপন করতে হত।

গুরুকূলে বিদ্যা অর্জনের দৃশ্য

সমাজে নারীর অবস্থান ছিল অত্যন্ত উঁচু। শিক্ষা-দীক্ষায় নারীরা পুরুষের সমান মর্যাদা লাভ করতেন। গৃহস্থালীর বিষয়ে নারীর সর্বময় কর্তৃত্ব ছিল। সমাজে পুত্র সন্তানের প্রতি ঝোঁক থাকলেও, কন্যা সন্তাকে অবহেলা করা হতনা। বৈদিক যুগে লোপামুদ্রা, মমতা, ঘোষা, বিশ্ববারা, অপালা প্রমুখ নারীরা বেদমন্ত্র রচনার অধিকার লাভ করেন। সাহিত্য রচনা ছাড়াও নারীদের যুদ্ধবিদ্যা, অস্ত্রচালনা বিষয়েও শিক্ষাদান করা হত।

অর্থনৈতিক জীবন : সিন্ধু সভ্যতা ছিল নগর কেন্দ্রীক। অন্যদিকে প্রাচীন বৈদিক সভ্যতা ছিল গ্রামকেন্দ্রীক। গ্রামকে ঘিরেই তাদের প্রশাসন, অর্থনীতি, সামাজজীবন ও ধর্মীয় জীবন পরিচালিত হত। এই যুগের অর্থনীতির মূল ভিত্তি ছিল—কৃষিকাজ ও পশুপালন। প্রতিটি পরিবারেই নিজস্ব কৃষি জমি ছিল। সেখানে চাষাবাদের কাজ চলত। এর পাশপাশি প্রতিটি গ্রামেই পশুচারণ ভূমি ছিল। আর্যরা গম, যব, ধান, প্রভৃতি খাদ্যশস্য উৎপাদন করত। জমি উর্বর থাকায় তাদের কৃষিকাজ নির্বিঘ্নেই সম্পাদিত হত। মাঝেমাঝে অনাবৃষ্টি ও প্রাকৃতিক অন্যান্য দুযোর্গ তাদের ভোগান্তি সৃষ্টি করত। তারপরও উর্বর ভূমি তাদের জন্য ছিল এক প্রকার আশীর্বাদ। গরু, ঘোড়া, ছাগল, কুকুর, ভেড়া—এসব গৃহপালিত পশু ছিল তাদের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। বৈদিক যুগে শিল্পজাত দ্রব্যের কথাও জানা যায়। বস্ত্রশিল্প, মৃৎশিল্প, চারুশিল্প, ধাতু শিল্প এবং অন্যান্য কারুকার্যের মাধ্যমে সমাজের অনেক মানুষ জীবিকা নির্বাহ করত। সেসময় মুদ্রার প্রচলন ছিলনা। দ্রব্য বিনিময় প্রথার মাধ্যমে মানুষ অর্থনৈতিক কাজ ও ব্যবসায়িক কাজ সম্পাদন করত। সীমিত আকারে হলেও পণ্য পরিবহনের জন্য যানবাহনের ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল।

বৈদিক যুগের শিল্পজাত দ্রব্য

ধর্মীয় জীবন : ‘বেদ’ ছিল সেই সমাজের ধর্মীয় জীবনের মূল ভিত্তি। ঋগবেদের বিভিন্ন স্তোত্র থেকে আর্যদের ধর্মীয় জীবনের ধারণা পাওয়া যায়। ‘বেদ’ শব্দটি ‘বিদ’ তথা জ্ঞান থেকে উৎপন্ন। এটি প্রাচীন সংস্কৃত ভাষায় রচিত। বেদ ও অপরাপর বৈদিক সাহিত্যগুলি আনুমানিকভাবে খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০-১০০০ অব্দের মধ্যে রচিত বলে মনে করা হয়। বেদ সমগ্র বিশ্ব সাহিত্যে একটি বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছে। বেদ চারভাগে বিভক্ত, যথা—ঋক, সাম, যজুঃ ও অথর্ব। আবার প্রত্যেকটি বেদ সংহিতা, ব্রাহ্মণ, আরণ্যক ও উপনিষদ—এই চারভাগে বিভক্ত। কোনো একজন সাহিত্যিক বেদ রচনা করেননি। ভিন্ন ভিন্ন সময়ে, ভিন্ন ভিন্ন ঋষি ও মহাপুরুষগণ বেদ রচনা করেছেন। কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ব্যাসদেবকে বেদের অন্যতম রচয়িতা বলে মনে করা হয়।

উনবিংশ শতাব্দীতে প্রাপ্ত ঋগবেদের স্তোত্র

ঋগবেদ (ঋকবেদ) সেই সময়ের সর্বাপেক্ষা প্রাচীন ও সাহিত্যের মাঝে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত। প্রকৃতির অধিষ্ঠাতা দেবতাদের উদ্দেশ্যে এই বেদে ১০২৮টি ঋক বা স্তোত্রের বিবরণ রয়েছে। ঊষা, উন্দ্র, আকাশ, সূর্য, অগ্নি প্রমুখ দেবতার স্তুতি করা হয়েছে। অন্যদিকে সামবেদ— ঋগবেদ হতেই সংকলিত; তবে তাতে ছন্দ, মাত্রা, সুর ও সঙ্গীত সংমিশ্রিত হয়েছে। যজুর্বেদ গদ্য ও পদ্যের সংমিশ্রণ। এতে যাজ্ঞকর্মের পরিপূর্ণ বিবরণ ও বিভিন্ন মন্ত্র তুলে ধরা হয়েছে। বেদের শেষ স্তর হল—অথর্ব বেদ। উপরোক্ত তিন বেদে যে বিষয়গুলো স্থান পায়নি এই বেদে সেগুলো সংযুক্ত করা হয়েছে। এই বেদে অনেক উপদেবতার উপাসনার ইঙ্গিত, ঔষধপত্রের আলোচনা ও বশীকরণের বিভিন্ন মন্ত্র উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রাচীন বৈদিক যুগে বর্তমান সনাতন বা হিন্দু ধর্মের মত মূর্তিপূজা প্রচলিত ছিলনা। আর্যরা প্রকৃতির বিভিন্ন শক্তির প্রতি বিস্মিত হয়ে ভক্তি সহকারে দেব-দেবীরূপে তাদের উপাসনা করতে থাকে। জলের দেবতা বরুণ, বজ্রের দেবতা ইন্দ্র, ঝড়ের দেবতা মরুৎ, আলোর দেবতা সূর্যের উপাসনা—সমাজে ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল। এছাড়া অগ্নি, বায়ু, উষা প্রমুখের উপাসনা করা হত। বিভিন্ন দেব-দেবীর উপাসনা করা সত্ত্বেও আর্যরা এটা ঠিকই উপলব্ধি করে যে, সমস্ত দেব-দেবী মূলত একই ঈশ্বরের বিভিন্ন রূপ। একেশ্বরবাদ সম্পর্কে বৈদিক সাহিত্যে অনেক স্তোত্র পাওয়া যায়। সেসময় আর্যরা দেবতাদের সন্তুষ্ট করার জন্য অগ্নিতে ঘৃতাহুতি দিত। এছাড়া বড় আকারে যজ্ঞের আয়োজন করা হত।

উপসংহার : প্রাচীন বৈদিক সভ্যতা কালের প্রভাবে বর্ণাশ্রম প্রথা, যাগ-যজ্ঞের অতিরিক্ত আড়ম্বর ও সামাজিক বৈষম্য দ্বারা ক্ষতিগ্রস্থ হতে থাকে। পরবর্তী বৈদিক যুগে এই সমস্ত সমস্যা আরো প্রকট আকার ধারণ করে। এসবের অ্যান্টি থিসিস হিসেবে তখন বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের উৎপত্তি ঘটে। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে ভারতীয় উপমহাদেশে এরই প্রেক্ষিতে ধর্মীয় বিপ্লব সাধিত হয়। মহামতি গৌতম বুদ্ধ, পার্শ্বনাথ, মহাবীর প্রমুখ ধর্ম প্রচারকের আবির্ভাব ও কর্ম তৎপরতা এক নতুন পরিস্থিতির সূচনা করে। এসব সত্ত্বেও ভারতীয় সভ্যতার ইতিহাসে প্রাচীন বৈদিক সভ্যতা অনেকগুলো কারণে একটি অনন্য স্থান অধিকার করে আছে। ইতিহাস ও সভ্যতায় অনুসন্ধিৎসু পাঠকরা এ থেকে অনেক অজানা বিষয় সম্পর্কে প্রয়োজনীয় জ্ঞান আহরণ করতে পারবেন।

সহায়ক গ্রন্থাবলী :

১) Pre-Historic and Proro-Historic Ages, H.D Sankhalia

২) The Vedic Age, Max Muller

৩) A History of India, Burton Stein

৪) The Quest for origins of Vedic culture, Edwin Bryant


সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন