, ১৩ জুন ২০২১; ৮:০৯ অপরাহ্ণ


প্রতিকী ছবি, বাংলা নাট্যমঞ্চ

প্রিয়ব্রত পাত্র

ভারতবর্ষে নাটকের সূচনা বহুকালপূর্বে। এমনকি ঋগ্বেদের কোনও কোনও সূত্রেও নাট্যক্রিয়ার বীজ চিহ্নিত রয়েছে। পরবর্তীতে উপনিষদ বা মহাকাব্যগুলি সম্বন্ধেও এ কথা খাটবে। আর কালিদাস, ভাস, শূদ্রক প্রমুখ জগৎপ্রসিদ্ধ নাট্যকারের নাট্যকৃতি আজও সংস্কৃত নাটকের সুমহান নাট্য-ঐতিহ্যের সাক্ষ্যবহনকারী। পরবর্তী সময়ে বাংলাভাষা ও সংস্কৃতি গঠনের যুগেও লোক জীবনে নাটকের যোগ ছিল অঙ্গাঙ্গী। চর্যাপদে পাবো ‘নাচন্তি বাজিল গান্তি দেবী।/বুদ্ধনাটক বিসমা হোই।।’ অর্থাৎ, ‘বজ্রাচার্য নাচছেন আর দেবী গান গাইছেন, এর ফলে বুদ্ধনাটক বিপরীতভাবে অনুষ্ঠিত হল। তৎকালীন বঙ্গ সমাজে নাটগীতির পালা অভিনয়ের সপক্ষে এই পদটি একটি জোরালো প্রমাণ। ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ -এর গঠনরীতি বিশ্লেষণ করলে একেও নাটগীতিই বলতে হয়। পরবর্তী সময়েও এই ধারা অব্যাহত থেকেছে।

পালাগান, কীর্তন কিংবা পাঁচালির মধ্যেও বিবিধ চরিত্র এবং উত্তর-প্রত্যুত্তরের ঢঙে সংলাপ ও গান পরিবেশনে নাটগীতির বহমানতার পরিচয় পাওয়া যায়। অন্যদিকে পুতুল নাচ, ছৌ, কালীকাচ, আলকাপ বা গম্ভীরার মতো লোকশিল্পেও নাট্য সম্ভাবনা রয়েছে প্রচুর পরিমাণে, আর বাংলার নিজস্ব নাট্যমাধ্যম যাত্রার কথাও এপ্রসঙ্গে ভুললে চলবে না। এই নাট্যকলার মূলে বৈদিক কালের নাট্যাঙ্গিকের অবশেষ আবিষ্কার করেছেন কেউ কেউ; অনুমান করা হয় প্রথম পর্যায়ে সূর্য-ই ছিলেন যাত্রা-কাহিনির অধিদেবতা, পরে কৃষ্ণযাত্রা এবং আরও পরে বিদ্যাসুন্দর যাত্রা বাংলাদেশে জনপ্রিয় হয়। এই বিদ্যাসুন্দর নিয়েই কলকাতায় প্রথম সখের যাত্রাদল বাঁধেন বহুবাজারের রাধামোহন সরকার। গোপাল উড়ে এই যাত্রাদলে গান করে সুবিখ্যাত হন। এরও পূর্বে শিশুরাম অধিকারী অথবা শ্রীদাম, সুবল, পরমানন্দ প্রমখের কীর্তি স্মরণীয়। কিন্তু আধুনিক অর্থে আমরা যাকে থিয়েটার বলি, দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের স্বদেশি নাট্যমাধ্যম থেকে তা সহজ ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিকশিত হয়নি। সাহিত্য ও সংস্কৃতির আরও অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো নাটকের বিষয়ও ইংরেজি শিক্ষিত নবীন বাঙালির রসদৃষ্টি ইংরাজি নাট্যাঙ্গিকের প্রতি ঝুঁকে পড়েছিল।

১৭৯৫ খ্রিস্টাব্দে রুশদেশবাসী গেরাসিম স্তেফানোভিচ লেবেদেফ কলকাতায় প্রথম ‘দ্য ডিসগাইজ’ -নামক একটি ইংরেজি নাটকের বঙ্গানুবাদ করিয়ে বাঙালি নটনটীদের দিয়ে অভিনয় করান, গোলোকনাথ দাসের অনুবাদে এর নাম হয়েছিল ‘কাল্পনিক সংবদল’, ১৭১৬-এ আর একবার অভিনয়ের পর বিভিন্ন কারণে লেবেদেফের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়।

কেবল একদিক খোলা মঞ্চ বা ‘প্রসেনিয়াম’-রীতিতে বাঙালির চেষ্টায় প্রথম নাট্যাভিনয় ১৮৩১ খ্রিস্টাব্দে, প্রসন্নকুমার ঠাকুর প্রতিষ্ঠিত হিন্দু থিয়েটারে। ১৮৩৫-এ শ্যামবাজারে নবীন বসুর বাড়িতে অভিনীত হয় দেশীয় নাটক ‘বিদ্যাসুন্দর’, সংস্কৃত নাটকের অনুবাদ যেমন এই সময়েই শুরু হয় তেমনই ইংরাজি আদর্শে নাটক রচনার চেষ্টাও প্রবলতর ছিল। এমন কি পরে অনেক অসাধারণ বাংলা উপন্যাসকে নাটকে রূপান্তরিত করা হয়েছিল।

১৮৫২-র লিখিত যোগেন্দ্র গুপ্তের ‘কীর্তি বিলাস’ যেমন ট্রাজেডি ও বিশেষত শেকসপিয়রের ‘হ্যামলেট’ নাটকের ছায়ায় রচিত, ঐ সালেই দেখা তারাচরণ শিকদারের ‘ভদ্রার্জুন’ তেমনই প্রথম কমেডি লেখার প্রয়াস। হরচন্দ্র ঘোষ লিখেছেন চারটি নাটক। শেকসপিয়রের ‘মার্চেন্ট অফ্ ভেনিস’ -অবলম্বনে ‘ভানুমতী চিত্তবিলাস'(১৮৫৩), মহাভারতের গল্প নিয়ে ‘কৌরববিয়োগ'(১৮৫৮), শেকসপিয়রের ‘রোমিও জুলিয়েট’ অবলম্বনে ‘চারুমুখ চিত্তহরা'(১৮৬৪) এবং ব্রহ্মদেশের কাহিনি নিয়ে ‘রজতগিরি নন্দিনী'(১৮৭৪)।

এরপর নাম করতে হয় রামনারায়ণ তর্করত্ন বা নাটুকে রামনারায়ণের। তাঁর প্রথম নাটক ‘কুলীনকুলসর্ব্বস্ব'(১৮৫৪) শিক্ষিত বাঙালি সমাজে কৌলীন্য প্রথার নিরসনে অপূর্ব উদ্দীপনা সঞ্চার করে। তাঁর সংস্কৃত নাট্যানুবাদের মধ্যে পড়ে ‘বেণীসংহার'(১৮৫৬), ‘রত্নাবলী'(১৮৫৮), ‘অভিজ্ঞান শকুন্তল'(১৮৬০) ও ‘মালতীমাধব'(১৮৬৭)। পুরাণাশ্রিত বিষয়ে তাঁর মৌলিক নাটক তিনটি —‘রুক্মিনীহরণ'(১৮৭১), ‘কংসবধ'(১৮৭৫) ও ‘ধর্মবিজয়'(১৮৭৫)। তবে জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির নাট্যশালায় অভিনীত ‘নবনাটক’ বা ‘বহুবিবাহ’ প্রভৃতি কুপ্রথা বিষয়ক নাটক এবং ‘যেমন কর্ম তেমনি ফল’, ‘উভয় সংকট’ ও ‘চক্ষুদান’ প্রহসনগুলি তিনি রচনা করেন।

রামনারায়ণের অনুকারীদের মধ্যে তারকচন্দ্র চূড়ামণির ‘সপত্নী নাটক'(১৮৫৮), শ্রীপতি মুখোপাধ্যায়ের ‘বাল্যবিবাহ নাটক'(১৮৫৯), শ্যামাচরণ শ্রীমানির ‘বাল্যোদ্বাহ'(১৮৬০) এবং নফরচন্দ্র পালের ‘কন্যাবিক্রয় নাটক’ উল্লেখ্য। ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দে বিদ্যাসাগরের চেষ্টায় বিধবাবিবাহ আইন-সিদ্ধ হলে ঐ বছরেই উমেশচন্দ্র মিত্রের লেখা ‘বিধবাবিবাহ’ নাটকটিও এ প্রসঙ্গে স্মর্তব্য।

১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে বেলগাছিয়া নাট্যশালায় রামনারায়ণের ‘রত্নাবলী’ -নাটকের অভিনয় দেখে অতৃপ্ত মাইকেল মধুসূদন দত্ত বাংলা ভাষায় রসোত্তীর্ণ নাটক রচনায় অভিনিবেশ করেন। তাঁর এই চেষ্টার সার্থক ফল প্রথম নাটক ‘শর্মিষ্ঠা'(১৮৫৯)। মহাভারতের কাহিনি ও পাশ্চাত্য আঙ্গিকের মেলবন্ধনে এটিই আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রথম পূর্ণাঙ্গ নাটক। ১৮৬০ -এ লেখা ‘পদ্মাবতী’ গ্রিক পুরাণের ‘apple of discord’ -এর কাহিনি নিয়ে রচিত। অন্যান্য কারণ ছাড়াও এই নাটক স্মরণীয় হয়ে থাকবে প্রথম অমিত্রাক্ষর ছন্দের ব্যবহারে। তবে মধুসূদনের সিদ্ধিলাভ ঘটেছে তাঁর রচিত দু’টি প্রহসনে। ‘শর্মিষ্ঠা’ ও ‘পদ্মাবতী’ লেখার সমসময়েই রচিত ‘একেই কি বলে সভ্যতা’ এবং ‘বুড়ো শালিখের ঘাড়ে রোঁ’ এই দুটি প্রহসনে সেকালের ইঙ্গ-বঙ্গ সমাজের নৈতিক ব্যাভিচার ও আধুনিকতার নামে উৎকট উন্মার্গগামী কদর্য উচ্ছৃঙ্খলতা যেমন প্রকাশ পেয়েছে, তেমনই কপট ধার্মিক ধনাঢ্য বৃদ্ধের দুরাচরণও তার সমস্ত ন্যক্কারজনক হাস্যকরতা নিয়ে উঠে এসেছে। উনিশ শতকের ‘বাবু’ সংস্কৃতির এর চেয়ে ভালো প্রতিফলন বাংলা সাহিত্যে আর হয়েছে কি না সন্দেহ। মধুসূদনের শেষ উল্লেখ্য নাটক ‘কৃষ্ণকুমারী'(১৮৬১) টড্ -এর লেখা রাজস্থানের ইতিহাস কথা অনুসরণে রচিত। রাজা জয়সিংহ এবং মানসিংহের প্রতিদ্বন্দ্বিতার বলি উদয়পুরের রাজকন্যা কৃষ্ণকুমারীর ট্রাজিক মৃত্যুই এই নাটকের উপজীব্য। এছাড়া মৃত্যুর আগে ‘মায়াকানন’ নামে একটি নাটক তিনি লিখে শেষ করলেও ‘রিজিয়া’ নাটকটি অসম্পূর্ণই ছিল।

মধুসূদন পরবর্তী সময়ে বাংলা নাটকের ধারায় সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ আসন দীনবন্ধু মিত্রের। ১৮৬০ সালে ‘কেনচিৎ পথিকেনাভি প্রণীতম্’ ছদ্মনামে লেখা নীলকর সাহেবদের অত্যাচারের সার্থক প্রতিফলন ‘নীলদর্পণ’ নাটকটি প্রকাশ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সমকালীন বঙ্গসমাজ এই নতুন নাট্যকারকে চিনে নিতে দেরি করেনি। বস্তুত, নাটক যে সমসময়ের প্রত্যক্ষ ফসল, এমনকি তা যে সমসময়কে প্রভাবিত করতেও সক্ষম এ বিশ্বাস ‘নীলদর্পণ’ নাটকের সূত্রে তৈরি হওয়া সমাজ আন্দোলনের ঐতিহাসিক বাস্তবয়তায় প্রত্যয়িত হয়েছে। এই নাটকটি অনুবাদ করে মধুসূদন দত্তের জেল ও জরিমানা হয়। ইংলণ্ডে ‘Indigo Commission’ বসে এবং ক্রমে নীলচাষ রদ হয়। দীনবন্ধুর নাটকগুলিতে মূলত তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায় —
             (১) সামাজিক নাটক —-‘নীলদর্পণ’
             (২) রোমান্টিক নাটক —- ‘নবীন তপস্বিনী’ (১৮৬৩), ‘লীলাবতী’ (১৮৬৭), ‘কমলে কামিনী’ (১৮৭৩)
             (৩) কমেডি নাটক —- ‘বিয়ে পাগলা বুড়ো’ (১৮৬৬), ‘সধবার একাদশী’ (১৮৬৬), ‘জামাই বারিক’ (১৮৭২)

এই নাটকগুলির মধ্যে বিশেষত ‘সধবার একাদশী’ পৃথক উল্লেখের দাবি রাখে। সমসাময়িক বাংলার ক্ষয়িষ্ণু ও উন্মার্গগামী মূল্যবোধহীন সমাজের চিত্রায়ন এবং নিমচাঁদের মতো যুগসন্ধির বলিপ্রদত্ত সিরিও -কমিক চরিত্রচিত্রণে দীনবন্ধু অত্যন্ত সাফল্য অর্জন করেছেন।

মনোমোহন বসুর নাটকগুলিতে বাঙালির জাতীয় প্রবণতার সন্ধানের একটি চেষ্টা দেখা যায়। যাত্রার মতো তাঁর নাটকগুলিও ঘটনা শ্লথতায় আক্রান্ত, আবেগসর্বস্ব এবং সংগীতপ্রবণ। তাঁর লেখা পৌরাণিক ও ভক্তিমূলক নাটকের মধ্যে ‘রামাভিষেক'(১৮৬৭), ‘সতী'(১৮৭৩), ‘হরিশচন্দ্র'(১৮৭৫), ‘পার্থ পরাজয়'(১৮৮১), ‘রামলীলা'(১৮৮৯), ‘আনন্দময়'(১৮৯০) —এর নাম করা যায়। এই নাটকগুলির মধ্যে স্বদেশপ্রীতির উদ্দীপনাও পরোক্ষভাবে ক্রিয়াশীল থাকতে দেখা যায়। রাজকৃষ্ণ রায়ের ‘হরধনুভঙ্গ'(১৮৭৮) নাটকে ভাঙ্গা অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রথম সফল প্রয়োগ লক্ষ করা যায় যা পরবর্তীকালে গিরিশচন্দ্রের হাতে গৈরিশ ছন্দের রূপ নেয়। তাঁর ‘প্রহ্লাদচরিত্র’, ‘নরমেধ যজ্ঞ’, ‘অনলে বিজলী’ প্রভৃতি পৌরাণিক নাটক, ঐতিহাসিক নাটক ‘বিক্রমাদিত্য’ এবং ‘কলির প্রহ্লাদ’, ‘জাগো পাগলা’ ইত্যাদি প্রহসন যথেষ্ট প্রসাদগুণের অধিকারী।

আধুনিক বাংলা নাট্যমঞ্চ

এই সময়ের মধ্যে কামিনী সুন্দরী দেবীর তিনটি নাটকের নাম জানা যায়, যথা-‘ঊর্বশী’, ‘ঊষা’ ও ‘রামের বনবাস’। সম্ভবত, তিনিই বাংলা সাহিত্যের প্রথম মহিলা নাট্যকার।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন