, ১ জানুয়ারি ২০২১; ১:৩৯ অপরাহ্ণ


Photo: Evolution of the Logo of Dhaka University


“… তাকে (খান মোহাম্মদ শামসুর রহমান ওরফে ডক্টর জনসন, সিএসপি। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামী) জিজ্ঞেস করেছিলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘স্বর্ণযুগ’ বা সেরকম কোন গৌরবদীপ্ত সময় হিসেবে কোনো মেয়াদকে চিহ্নিত করা যায় কিনা। তখন শামসুর রহমান এক কথায় কোন জবাব দেননি। তবে একটু পূর্বকথার মত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকালীন ঝগড়া-ফ্যাসাদ সম্বন্ধে আলোকপাত করেছিলেন।

ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের দাবির পেছনে অনেক রকমের যুক্তি তুলে ধরা হয়েছিল। তবে ইংরেজ শাসকদের কাছে অন্য সব যুক্তি ছাপিয়ে রাজনীতির যুক্তিটাই ছিল প্রবলতম। আর কলকাতাকেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবীদের প্রধান দৃষ্টিভঙ্গিটাও ছিল রাজনৈতিক। আন্তর্জাতিক ব্যাপ্তির খ্যাতি অর্জনকারী একমাত্র বাঙ্গালী মনীষী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও ঢাকায় প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিপক্ষে জোরেসোরে অভিমত দিয়েছিলেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য উপযুক্ত শিক্ষক পাওয়া যাবে কিভাবে তা নিয়ে তিনি ঘোর সন্দিহান ছিলেন।কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় মহল হ’তে ছিল সবচেয়ে বেশি প্রতিবন্ধকতা।

ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর স্যার আশুতোষ মুখার্জীর বিরোধিতা ছিল একেবারে সর্বজনবিদিত ও অতি প্রকাশ্য। এক্ষেত্রে তার পরম সুহৃদ ও বন্ধু পন্ডিত মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ছিলেন একাট্টা। কিন্তু অবশেষে ঢাকায় যখন বিশ্ববিদ্যালয় হয়েই গেল তখন এর ভাইস-চ্যান্সেলর হার্টগের মেধা-শিকারযজ্ঞের প্রথম দিকের পাত্রই হয়ে গেলেন এই বিখ্যাত পন্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী। অনেকে অবাক হ’লেন। আশুতোষ মুখার্জী তো ক্ষেপে অস্থির হ’য়ে গেলেন। ক’দিন আগেই না দু’বন্ধু মিলে প্রস্তাবিত ঢাকা ইউনিভার্সিটিকে ব্যঙ্গ ক’রে ‘মক্কা ইউনিভার্সিটি’ নামে অভিহিত করেছেন।

কত যুক্তি দিয়ে বুঝিয়ে দিতে সচেষ্ট হয়েছেন যে, ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করার কোন প্রশ্নই ওঠে না। আর ক’দিনের ব্যবধানে হরপ্রসাদ সেই প্রতিষ্ঠানে চাকরি নিলেন। হরপ্রসাদের ছুটি বা রিলিজ নেয়া ও তার পাওনাদি আদায়ের আবেদনের ওপরও বাগড়া বাঁধানো হয়েছিল তখন। আশুতোষ ও হরপ্রসাদের বন্ধুত্ব তো আশৈশবের। একেবারে হরিহর-আত্মা ছিলেন দু’জনে। বন্ধুতার গভীরতা এতখানি ছিল যে, বয়স হলে তাদের যখন ছেলে হ’তে থাকে তখন উভয়েই তাদের অভিন্নহৃদয় বন্ধুর নামের সাথে মিলিয়ে ছেলেদের নাম রাখতেন। যেমন, হরপ্রসাদের ছেলেদের নাম মহীতোষ, ভবতোষ ইত্যাদি। আবার আশুতোষের ছেলেরা হ’লেন শ্যামাপ্রসাদ, উমাপ্রসাদ ইত্যাদি। মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেয়ার পর ছুটিতে একবার কলকাতায় গিয়ে বন্ধুর সাক্ষাতের চেষ্টা ক’রেও ব্যর্থ হন। যে ক’বছর বেঁচে ছিলেন স্যার আশুতোষ মুখার্জী আর হরপ্রসাদের মুখদর্শন করেননি। বাক্যালাপ তো দূরের কথা, পত্রালাপও হয়নি কখনো॥”—

ড. শেখ আব্দুর রশীদ / সেই সিভিল সার্ভিস সেইসব সিভিলিয়ান ॥ [ মুক্তচিন্তা প্রকাশনা – ২০১১ । পৃ: ২২৬-২২৭ ]


“… আর. সি. মজুমদার এক সময়ে বলেছেন যে, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হলে মুসলমানরা খুবই খুশি হলেন বটে কিন্তু হিন্দুদের মনে তীব্র অসন্তোষ দেখা দেয়।” তারা এর বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করলেন। সাধারণত যারা রাজনৈতিক আন্দোলন থেকে দূরে থাকতেন, তারাও এবার এর প্রতিবাদী আন্দোলনে যোগ দেন। এরা হলেন রাসবিহারী ঘোষ, আশুতোষ মুখোপাধ্যায় ও গুরুদাস বন্দোপাধ্যায়। তাদের প্রধান যুক্তি হল যে, প্রশাসনিক ক্ষেত্রে বঙ্গভঙ্গ রহিত হয়েছে সত্য কিন্তু তার বদলে এখন একটা সাংস্কৃতিক বিভাগ করা হচ্ছে। ফলে এতে গুরুতর বিপদের সম্ভাবনা রয়েছে। ক্রমে এই আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে। হিন্দু নেতাগণ একে ‘মক্কা’ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে তাচ্ছিল্য করেছেন। অনেকে ‘ফাক্কা’ বিশ্ববিদ্যালয়ও বলেছেন। অনেকে মন্তব্য করেছেন যে, কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও নাকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেন। বহু বছর পর ১৯৫৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে এ. কে. ফজলুল হক চ্যান্সেলরের ভাষণ দিতে গিয়ে বলেন যে, লর্ড হার্ডিঞ্জের সাথে সাক্ষাৎ করার সময় তিনিও উপস্থিত ছিলেন। প্রতিপক্ষের তরফ থেকে প্রবল বাধা আসে এবং তাদের সেটাকে অতিক্রম করতে হয়॥”

—ড. মো: মকসুদুর রহমান (অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ – রা.বি) / বঙ্গভঙ্গ ও বাঙালির ঐক্য ॥ [ প্রতীক – ফেব্রুয়ারি, ২০০৬ । পৃ: ১৪৬ ]০৩.


“… বস্তুত ১৯০৪ সালেই বঙ্গভঙ্গের পরিকল্পনার মধ্যেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের কার্যক্রম ছিল। পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশের রাজধানীতে একটি করে বিশ্ববিদ্যালয় থাকার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করা গিয়েছিল। বঙ্গভঙ্গ রদের ব্যাপক আন্দোলনের কারণে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের উদ্যোগ ধামাচাপা পড়েছিল। যখন ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হলো – কলিকাতা ঢাকা এক হলো এবং পূর্ববঙ্গের নেতৃস্থানীয় মুসলমান যখন ক্ষুব্ধ তখন ১৯১২ সালে বড় লাট হার্ডিঞ্জ ঘোষণা করলেন যে, বিভিন্ন দিকে বিভিন্ন পর্যায়ে ঢাকার উন্নয়ন সাধন করা হবে, তারই একটি অংশ ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন। সাথে সাথেই প্রতিবাদ-প্রতিরোধ শুরু হয়। বাংলার বাঘ আশুতোষ মুখার্জি, রাসবিহারী ঘোষ প্রমুখ নেতারা এর তীব্র সমালোচনা ও বিরোধিতা শুরু করেন। এ কথাও বলা হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হলে বাঙালি জাতি শিক্ষা-সংস্কৃতির দিক থেকে বিভক্ত হয়ে যাবে। (বাংলায় হিন্দু মুসলমান সম্পর্ক : ড: নজরুল ইসলাম ২২০ পৃ:)। প্রতিরোধের মুখে শেষ পর্যন্ত সরকার নেতৃবৃন্দ বুদ্ধিজীবীদের সাথে আপোস করতে বাধ্য হন। পরিকল্পনাটি পাল্টে ঘোষণা করা হলো : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হবে, তবে তা হবে আবাসিক বিশ্বব্দ্যালয় মাত্র। মাত্র দশ মাইল থাকবে চারদিকের সীমানা। কোনো কলেজ তার অধীনে থাকবে না।উপরন্তু কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে আরো নতুন চারটি অধ্যাপকের পদ সৃষ্টি করতে হলো। বড়লাট তার ঘোষণায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বছরে মাত্র ৫ লাখ টাকা অর্থ মঞ্জুরি করেছিলেন। কিন্তু পরে খতিয়ে দেখা গেল ১৯১৯ সালের আইন মোতাবেক শিক্ষা কার্যক্রম প্রদেশের এখতিয়ারভুক্ত হওয়ার ফলে বাংলার তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী কী অবলীলাক্রমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বড়লাটের বরাদ্দকৃত মঞ্জুরি কেটে ফেলেন। এসব প্রতিবন্ধকতা থেকেই বোঝা যায় তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যারা উঠে এসেছিলেন তাদের কত বিঘ্ন-বাধা মাড়িয়ে উঠে আসতে হয়েছিল। বস্তুত ত্রিশের দশকে প্রবেশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রমাণ করতে সক্ষম হলো পূর্ববঙ্গের জন্য সত্যিই একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজন ছিল। বস্তুত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্ম-ইতিহাসও সাম্প্রদায়িকতার কলংকে রঞ্জিত॥”

— আবু আল সাঈদ / ফজলুর রহমান : অনুদানের ইতিহাসের একদশক (১৯৩৭-৪৭) ॥ [ আগামী প্রকাশনী – ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৭ । পৃ: ১৫ ]

“… ১৯১১ খ্রীষ্টাব্দে বঙ্গভঙ্গ বাতিল হওয়ায় ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করার জন্য ইংরেজ সরকার প্রতিশ্রুতি দেয়। মুসলমানেরা হতভম্ব হয়ে দেখল, তাতেও হিন্দুরা আপত্তি করছে। আশুতোষ মুখোপাধ্যায় ও রাসবিহারী ঘোষের মত বুদ্ধিজীবীরাও বলতে থাকেন যে, তার ফলে, বাঙ্গালী জাতি ও সংস্কৃতির ক্ষতি হবে। ঢাকার হিন্দুরাও ঐ মত সমর্থন করে। ১৯২১ খ্রীষ্টাব্দে ঐ বিশ্ববিদ্যালয স্থাপিত হলেও তার পঠন-পাঠন ক্ষেত্র হয় বেশ সীমাবদ্ধ। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও ব্যাপারটি ঠিকভাবে নিতে পারেননি। তিনি তাই লিখেছিলেন : ‘আমার নিশ্চয় বিশ্বাস, নিজেদের স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন প্রভৃতি উদযোগ লইয়া মুসলমানরা যে উৎসাহিত হইয়া উঠিয়াছে তাহার মধ্যে প্রতিযোগিতার ভাব যদি কিছু থাকে তবে সেটা স্থায়ী ও সত্য পদার্থ নহে। ইহার মধ্যে সত্য পদার্থ নিজেদের স্বাতন্ত্র্য উপলব্ধি। মুসলমান নিজের প্রকৃতিতেই মহৎ হইয়া উঠিবে ইহাই মুসলমানের সত্য ইচ্ছা। অতএব যাহারা স্বতন্ত্রভাবে হিন্দু বা মুসলমান বিশ্বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকে ভয় করেন তাহাদের ভয়ের কোন কারণ নাই এমন কথা বলিতে পারি না।’ ( পরিচয় – “হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়” প্রবন্ধ দ্রষ্টব্য)॥”

— সৈয়্দ আব্দুল হালিম / বাঙ্গালী মুসলমানের উৎপত্তি ও বাঙ্গালী বিকাশের ধারা (তৃতীয় খন্ড / পরাধীনতা ও প্রতিকার) ॥ [ নবযুগ প্রকাশনী – ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ । পৃ: ২১১ ]


“… সংখ্যাগুরু হিন্দুদের হিংসা এবং মুসলমানদের সর্বনাশ দেখার জেদ বঙ্গভঙ্গ রদ করেই শেষ হয়ে গেলনা এবং মর্লি-মিণ্টো সংস্কারের পৃথক নির্বাচন ও মুসলমানদের স্বতন্ত্র প্রতিনিধিত্ব-সুযোগের বিরোধিতা অব্যাহত রাখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলোনা, মুসলিম বিরোধী তাদের সহিংস মন ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্তও মেনে নিতে পারলো না। উল্লেখ্য, বঙ্গভঙ্গ রদের পর মুসলমানদের স্বান্তনা দেবার জন্যে ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত ভারত সরকার ১৯১২ সালের ২রা ফেব্রুয়ারী ঘোষণা করেন।এই সিদ্ধান্ত ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমে পড়ল হিন্দুরা। ১৯১২ সালের ২৮শে মার্চ কলকাতায় গড়ের মাঠে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করে তারা সভা করল। এই সভায় সভাপতিত্ব করলেন স্বয়ং কবি রবীন্দ্রনাথ। [ দ্রষ্টব্য : অধ্যাপক আব্দুন নুর (চ.বি) / ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সিলেবাস বিতর্ক এবং অতীত ষড়যন্ত্রের কাহিনী – দৈনিক সংগ্রাম, ২৬ এপ্রিল, ১৯৯৩ইং ] বিস্ময়ের ব্যাপার, পূর্ববঙ্গে যে রবীন্দ্রনাথের বিশাল জমিদারি ছিল, সে রবীন্দ্রনাথও তার মুসলিম প্রজারা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করে শিক্ষিত হোক তা চাননি।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সেদিন একাট্টা হয়ে প্রচারে নেমেছিল হিন্দু সংবাদপত্রগুলো। হিন্দু বুদ্ধিজীবী ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ বিভিন্ন শহরে মিটিং করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে প্রস্তাব পাশ করে পাঠাতে লাগলেন বৃটিশ সরকারের কাছে। [ দ্রষ্টব্যঃ Calcutta University Commission report. Vol. IV পৃষ্ঠা ১১২, ১৫১। ] ‘এভাবে বাবু গিরীশচন্দ্র ব্যানার্জী, ডঃ স্যার রাসবিহারী ঘোষ এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর স্যার আশুতোষ মুখার্জীর নেতৃত্বে বাংলার এলিটগণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে ১৮ বার স্মারক লিপি সহকারে তদানীন্তন ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ-এর উপর চাপ সৃষ্টি করলেন। ডঃ স্যার রাসবিহারী ঘোষের নেতৃত্বে হিন্দু প্রতিনিধিগণ বড় লাটের কাছে এই বলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে যুক্তি প্রদর্শন করলেন যে, পূর্ব বাংলার মুসলমানগণ অধিকাংশই কৃষক। অতএব বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করলে তাদের কোন উপকার হবে না। [ দ্রষ্টব্যঃ Calcutta University Commission report. Vol. IV পৃষ্ঠা ১১৩। ]বঙ্গভঙ্গ রদ আন্দোলনের সময় মুসলিম স্বার্থের বিরুদ্ধে সব হিন্দু যেমন এক হয়েছিল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতার ক্ষেত্রেও তাই হলো। পূর্ববঙ্গের, এমনকি ঢাকার হিন্দুরাও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকে বাধা দেবার জন্যে এগিয়ে এল। ‘A History of Freedom Movement’ গ্রন্থে বলা হয়েছে, The Controversy that started on the Proposal for founding a university at Dacca, throws interesting on the attitude of the Hindis and Muslims. About two hundred prominent Hindis of East Bengal, headed by Babu Ananda Chandra Ray, the leading pleder of Dacca, submitted a memorial to the Viceroy vehemently against the establishment of a University at Dacca For a long time afterwards. They tauntingly termed this University as ‘Mecca University’. [ দ্রষ্টব্য : ‘A History of the Freedom Movement’, গ্রন্থের চতুর্থ খণ্ডের Dacca University; Its role in Freedom Movement’ শীর্ষক অধ্যায়, পৃষ্ঠা ১০ (Published in 1970). ] অর্থাৎ ‘ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রস্তাব যে বিতর্কের সৃষ্টি করল তাতে হিন্দু ও মুসলমানদের ভূমিকা সম্পর্কে মজার তথ্য প্রকাশ পেল। পূর্ব বাংলার প্রায় দুই’শ গণ্যমান্য হিন্দু ঢাকার প্রখ্যাত উকিল বাবু আনন্দ চন্দ্র রায়ের নেতৃত্বে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের তীব্র বিরোধিতা করে ভাইসরয়কে একটি স্মারক লিপি দিয়েছিল। পরে দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘মক্কা বিশ্ববিদ্যালয়’ বলে বিদ্রুপ করা হতো’।হিন্দুদের এই সর্বাত্মক বিরোধিতা সত্বেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি তাদের বিরোধিতা ও ঘৃণা তারা অব্যাহতই রাখল। এর একটা সুন্দর প্রমাণ পাই আমরা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাস ও সংস্কৃতি অধ্যাপক শ্রী দেবদত্ত রামকৃষ্ণ ভাণ্ডারকর’ এর বক্তব্যে। শ্রীভাণ্ডারকর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে দেওয়া তার এক বক্তৃতায় বলেন “কলিযুগে বৃদ্ধগঙ্গা নদীর তীরে হরতগ নামক একজন অসুর জন্ম গ্রহণ করবে। মূল গঙ্গার তীরে একটি পবিত্র আশ্রম আছে। সেখানে অনেক মুনি-ঋষি এবং তাদের শিষ্যগণ বাস করে। এই অসুর সেই আশ্রমটি নষ্ট করার জন্যে নানা রকম প্রলোভন দেখিয়ে একে একে অনেক শিষ্যকে নিজ আশ্রমে নিয়ে যাবে। যারা অর্থ লোভে পূর্বের আশ্রম ত্যাগ করে এই অসুরের আকর্ষণে বৃদ্ধ গঙ্গার তীরে যাবে, তারাও ক্রমে অসুরত্ব প্রাপ্ত হবে এবং তারা অশেষ দুর্দশাগ্রস্ত হবে।” [ দ্রষ্টব্য : শ্রী ভাণ্ডারকরের এই উক্তিটি ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার তার স্মৃতিকথা ‘জীবনের স্মৃতিদ্বীপে’ উল্লেখ করেছেন। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে সভায় শ্রী ভাণ্ডারকরের এ উক্তি করেন, সে সভায় ডক্টর রমেশচন্দ্র মজুমদার উপস্থিত ছিলেন।]পরিস্কার যে, শ্রী ভাণ্ডারকর এই বক্তব্যে ‘হরতগ’ বলতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ভাইস চ্যান্সেলর মিঃ ফিলিপ ‘হরতগ’ কে বুঝিয়েছেন। মিঃ হরতগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে দীর্ঘ ২৫ বছর ভাইস চ্যান্সেলর ছিলেন। শ্রী ভাণ্ডারকরের বক্তব্যে হরতগ-এর ‘আশ্রম’ বলতে বুঝানো হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে। আমাদের ‘বুড়িগঙ্গা’ হয়েছে শ্রী ভাণ্ডারকরের বক্তব্যে ‘বৃদ্ধাগঙ্গা’। আর মূল গঙ্গা-তীরের ‘পবিত্র আশ্রম’ বলতে শ্রী ভাণ্ডারকর বুঝিয়েছেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে। শ্রী ভাণ্ডারকরের কথায় ঢাকা অর্থাৎ পূর্ববাংলা অসুরদের স্থান। পবিত্র স্থান কলকাতা থেকে যেসব ঋষি শিষ্য ঢাকায় চাকুরী করতে আসবেন তারাও অসুর হয়ে যাবে। এ থেকেই বুঝা যায়, মুসলমানদর প্রতি শ্রী ভাণ্ডারকরদের বৈরিতা কত তীব্র, ঘৃণা কত গভীর।তাদের এ বৈরিতার কারণে উপযুক্ত বরাদ্দের অভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ভীষণ অর্থকষ্ট ভোগ করতে হয় এবং অঙ্গহানিও হয়েছিল। ডক্টর রমেশচন্দ্র মজুমদার-এর ভাষায় “(ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায়) মুসলমানরা খুবই খুশী হলেন বটে, কিন্তু হিন্দুদের মনে তীব্র অসন্তোষ দেখা দেয়। তারা এর বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করলেন। সাধারণত যারা রাজনৈতিক আন্দোলন থেকে দূরে থাকতেন, তারাও এবার এই প্রতিবাদ আন্দোলনে যোগ দিলেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন রাস বিহারী ঘোষ ও গুরুদাস বন্দোপাধ্যয়। তাদের প্রধান যুক্তি হলো এই যে, প্রশাসন ক্ষেত্রে বঙ্গভঙ্গ রহিত হয়েছে বটে, কিন্তু তার বদলে এখন একটি সাংস্কৃতিক বিভাগ করা হচ্ছে। ফলে, এতে গুরুতর বিপদের সম্ভাবনা রয়েছে। ক্রমে এই আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করলে বড় লাট লর্ড হার্ডিঞ্জ হিন্দুদের এই বলে আশ্বাস দিলেন যে, তাদের এমন আশংকার কোন কারণ নেই। ঢাকায় যে বিশ্ববিদ্যালয় হবে তার ক্ষমতা ও অধিকার ঢাকা শহরের দশ মাইল পরিধির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।” [ দ্রষ্টব্য : ‘জীবনের স্মৃতিদ্বীপে’, ডক্টর রমেশচন্দ্র মজুমদার। ]ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলেও এই ভাবে হিন্দুরা একে ‘ঠুটো জগন্নাথে’ পরিণত করে রাখার ব্যবস্থা করেছিল। সবচেয়ে বিস্ময়ের ব্যাপার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সিন্ডিকেটে হিন্দু যারা নির্বাচিত হয়ে আসতেন তারাও বিশ্ব-বিদ্যালয়ের বৈরিতা ত্যাগ করতেন না, তাদের ভোট বিশ্ববিদ্যালয়কে ক্ষতিগ্রস্ত করারই চেষ্টা করত। ডক্টর রমেশচন্দ্র লিখছেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কোর্টের (সিনেটর) সদস্যদের মধ্যে অর্ধেক ছিলো মুসলমান এবং অর্ধেক ছিলেন হিন্দু। প্রফেসররা কোর্টের সদস্য ছিলেন। বার লাইব্রেরীর অনেক উকিল রেজিষ্টার্ড গ্রাজুয়েটদের দ্বারা নির্বাচিত হয়ে এর সভ্য হতেন। ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনকে হিন্দুরা ভাল চোখে দেখেনি, একথা পূর্বেই বলেছি। কারণ হিন্দুদের বিশ্বাস ছিল বঙ্গভঙ্গ রহিত করায় মুসলমানদের যে ক্ষতি হয়েছে, অনেকটা তা পূরণ করার জন্যই এই নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছে। যদিও বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রীতির চোখে দেখেননি। বাইরে এ বিষয়ে যে আলোচনা হত কোর্টের সভায় হিন্দু সভ্যদের বক্তৃতায় তা প্রতিফলিত হত। অবশ্য ভোটের সময় জয়লাভের ব্যাপারে আমরা অনেকটা নিশ্চিত ছিলাম। মুসলমান সদস্য এবং হিন্দু শিক্ষক সদস্যরা একত্রে হিন্দু সদস্যদের চেয়ে অনেক বেশী ছিলেন”। [ দ্রষ্টব্য : ‘জীবনের স্মৃতিদ্বীপে’, ডক্টর রমেশচন্দ্র মজুমদার।]সংখ্যাগুরু হিন্দুরা মুসলমানদের কোন ভালই সহ্য করতে পারেনি। মুসলিম লীগ গঠন তাদের চক্ষুশূলে পরিণত হয়েছিল, মর্লি-মিণ্টোর শাসন-সংস্কারে মুসলমানদের স্বতন্ত্র প্রতিনিধিত্বের সুযোগ তারা বরদাশত করেনি, বঙ্গভঙ্গের ফলে মুসলমানদের যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল, তাকে তারা সহ্য করতে পারেনি এবং ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ও তাদের সহ্য হলোনা। ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতার মধ্য দিয়ে মুসলমানদের প্রতি হিন্দু মনোভাব সবচেয়ে নগ্নভাবে ফুটে উঠেছে। তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মধ্যে ‘গুরুতর বিপদ’ অবলোকন করেছে। এই ‘গুরুতর বিপদ’টা কি? সেটা মুসলমানদের উন্নতি ও উত্থান। অর্থাৎ হিন্দুরা হয়ে উঠেছিল মুসলমানদের অস্তিত্বের বিরোধী, যা মাথা তুলেছিল শিবাজী, স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী, শ্রী অরবিন্দের আন্দোলনে। সংখ্যাগুরু হিন্দুদের উত্থিত এই সংহার মূর্তিই সেদিন মুসলমানদের রাজনৈতিক আন্দোলনে তাদের আত্মরক্ষার সংগ্রামকেই অপরিহার্য করে তুলেছিল॥”

— আবুল আসাদ / একশ’ বছরের রাজনীতি ॥ [ বাংলাদেশ কো-অপারেটিভ বুক সোসাইটি – মে, ২০১৪ । পৃ: ৭১-৭৪ ]


“… যারা কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা বলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় বাধা প্রদান করেন তারা কোন সময়ে এ অঞ্চলের মানুষের কল্যাণের কথা মাথায় আনেননি। বহুকাল থেকে বাংলার পূর্বাঞ্চল শিক্ষা-দীক্ষায় অবহেলিত হতে থাকে। কলিকাতাকেন্দ্রিক ভদ্রলোক শ্রেণী কেবল কলিকাতার উন্নতিকেই দেশের উন্নয়ন হিসেবে গণ্য করেছেন। সে কারণে শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য, সংস্কৃতি সকল কিছুর কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কলিকাতা প্রতিষ্ঠা লাভ করে। তারা কোন সময়ে চাচ্ছিলেন না যে, কলিকাতার অনুরূপ আর একটি প্রতিষ্ঠান মুসলমান অধ্যুষিত ঢাকায় গড়ে উঠুক।কলিকাতা তখন শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র। পিছিয়ে পড়া মুসলমান ছাত্ররা সুদূর কলিকাতায় গিয়ে লেখাপড়া করতে পারতেন না। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে মুসলমানদের যেমন পড়ার সুযোগ কম ছিল তেমন পরিচালনা সংস্থাগুলোতেও তাদের তেমন প্রাধান্য লক্ষ কর্স যায় না। ১৯০৪ সালের পূর্বে কোন মুসলমান সিন্ডিকেট সদস্য ছিলেন না। এ সময় পর্যন্ত কোন মুসলমান ফেলোও প্রবেশ করতে পারেননি। ১৯১৭ সালে দেখা যায় ১১০ জন ফেলোর মধ্যে মুসলমান ছিলেন মাত্র ৭ জন। আবাসিক বা প্রশাসনিক কমিটিতে কোন মুসলমান ছিলেন না। পাঠ্যসূচিতে হিন্দু প্রভাব লক্ষ করা যায়। মুসলমানদের যে সব ইতিহাস ছিল তাও বিকৃত করা হয়। পাঠ্যতালিকা সম্পর্কে শিক্ষামন্ত্রী আজিজুল হক বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় পাঠ্যপুস্তকসমূহ প্রায়ই সংস্কৃত উদ্ধৃতিযুক্ত পুরাণ কাহিনী এবং কিংবদন্তীতে পরিপূর্ণ। এমন কয়েকটি ক্ষেত্রেই দেখা গেছে যে, মুসলমান ছাত্ররা আর সকল বিষয়ে খুব কৃতিত্বপূর্ণ নম্বর পেয়েছে, অথচ তাদের দূর্ভাগ্য কেবল মাতৃভাষার পরিক্ষাতেই অকৃতকার্য হয়েছে। মুসলমান ছাত্রদের সমস্যা সৃষ্টি করে পাঠ্যপুস্তক। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পরিষদ প্রায় সম্পূর্ণরূপেই মুসলমান বর্জিত হওয়ায় মুসলমান বিষয় সম্পর্কিত পুস্তকের কিংবা মুসলমান লেখক রচিত পুস্তকের প্রতি সহানুভূতিমূলক বিবেচনা প্রদর্শিত হয়নি।” এ কারণেই ১৯০৩ সালে সৈয়দ আমীর আলী আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের লন্ডনস্থ ছাত্রদের সমাবেশে বলেন যে, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় আসলে হিন্দুদের বিশ্ববিদ্যালয়।১৯১৫ সালে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির শিক্ষা সম্মিলনে নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী বলেন, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা নিয়ন্ত্রনের ভারও কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর অথচ সেখানে কোন মুসলমান সিন্ডিকেট সদস্য নেই। একশত জন সাধারণ সিনেট সদস্যের মধ্যে কেবল মাত্র ৬ জন হলেন মুসলমান। কোন অফিসে মুসলমান কর্মকর্তা দেখা যায় না। ১৯১৫-১৬ সালে বাজেট বক্তৃতায় তিনি বলেন যে, আজ পর্যন্ত সেখানে মুসলমান ছাত্র্দের কোন হল নির্মিত হয়নি। এজন্য তাদের অবর্ণনীয় কষ্ট করে থাকতে হয়। শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ে নয়, কলিকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ, ল কলেজ – কোথাও কোন ছাত্রাবাস ছিল না। ভারতীয় আইনসভায় ১৯২০ সালে বলেন, ২৩টী কলেজের গভর্ণিং বডিতে কোন মুসলমান প্রতিনিধি নেই, ১০৬৫ জন কলেজিয়েট শিক্ষকদের মধ্যে মাত্র ৩৭ জন মুসলমান। ল কলেজের ৭০ জনের মধ্যে কোন মুসলমান নেই। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাত্র ২ জন প্রভাষক হলেন মুসলমান। সে কারণে তিনি কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে সাম্প্রদায়িক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।… পূর্বে কলিকাতাকেন্দ্রিক ভদ্রলোক শ্রেণীর ধারণা ছিল যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হবে মুসলমানদের বিশ্ববিদ্যালয়। কে কেউ একে ‘মক্কা বিশ্ববিদ্যালয়’ বলে তাচ্ছিল্য করেছেন। কিন্তু আমরা যদি গঠণ প্রণালী, ছাত্র সংখ্যা, পাসের হার সব কিছু বিবেচনা করি, তাহলে দেখতে পাব যে, সেখানে হিন্দুদের প্রাধান্য কম ছিল না। প্রথম একাডেমিক কমিটির ১৯ জন সদস্যের মধ্যে ৬ জন হিন্দু, ৮ জন ইংরেজ ও ৫ জন মুসলমান। এর মধ্যে আর. সি. মজুমদার একজন সদস্য। মুসলমান সদস্যের মধ্যে ছিলেন স্যার এফ. রহমান ও মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্।… আসলে কমিটি গঠন, ছাত্র সংখ্যা, পাসের হার সবক্ষেত্রে দেখা যায় যে, হিন্দুদের সংখ্যা ছিল অনেক বেশি। তাহলে তারা আগাম কি করে বলেন যে, ঢাকা হবে মুসলমানদের বিশ্ববিদ্যালয়? ছাত্র হবে না, কেননা কৃষক সন্তান আর কয়জনইবা পড়তে আসবে। আসলে সুযোগ পেলে পরিস্থিতি যে আলাদা হতে পারে তা তারা বুঝতেই চাননি। অনেকে বলেছেন যে, এটা হবে ‘ফাক্কা বিশ্ববিদ্যালয়’ অর্থাৎ এখানে তেমন মেধাবী ছাত্র পড়তে আসবেন না। যারা সম্ভ্রান্ত ঘরের সন্তান তারা কলিকাতায় গিয়েই পড়াশোনা করেন। এটা আসলে তেমন ফলদানকারী প্রতিষ্ঠান হবে না। কিন্তু ফলাফল বিশ্লেষণ করলে তা প্রমাণ হয় না। ১৯২২ সালে বি.এ. প্রথম শ্রেণীতে যারা পাস করেন এর মধ্যে ৫ জন ছিলেন হিন্দু, এম.এ. – তিনজন প্রথম শ্রেণীতে পাস করেন এবং তারা সবাই ছিলেন হিন্দু। তুলনামুলক আলোচনা করলে দেখা যায়, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে ঢাকার ফলাফল ভাল ছিল। প্রমাণসহ বলা যায়, ১৮৫৮ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম শিক্ষাবর্ষে ১০ জন বি.এ. পরীক্ষা দেন। দশজনের মধ্যে ঢাকা কলেজ থেকে ১ জন অংশ নেন। সকলেই অকৃতকার্য হন। পরে দুজনকে প্রমার্জন নম্বর দিয়ে পাস করান হয়। এর মধ্যে সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় একজন এবং অন্যজন হলেন যদুনাথ বসু। সেই থেকে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রমার্জন নম্বরের বিধান চালু হয়। এতকিছু জানা ও বুঝার পরও অন্নদাশঙ্কর রায়ের মত ব্যক্তিও বলেছেন যে, আসলে মুসলমানদের সুবিধার জন্য নাকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সৃষ্টি হযেছিল।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিশন মুসলমানদের জন্য একটি ছাত্রাবাস নির্মাণের সুপারিশ করে। প্রথমে তিনটি হল ছিল। যথা: ঢাকা হল, জগন্নাথ হল ও মুসলিম হল। মুসলিম হলে ১৯২১-২২ শিক্ষাবর্ষের ছাত্র ছিলেন ৭৫, ১৯২৩-২৪ ১২৭, ১৯২৫-২৫ ১৬০, ১৯২৬-২৭ ২০৪, ১৯২৭-২৮ ২২৯ জন। ছাত্র সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পায়। প্রথম প্রভোস্ট ছিলেন স্যার এফ. রহমান এবং হাউজ টিউটর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। এসব ছাত্রের বিভিন্ন স্থানে আবাসন দেয়া হত। সেজন্য একটি স্বতন্ত্র বিল্ডিং নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয় এবং ১৯২৭ সালে একটি হল নির্মিত হয়। ১৯২৯ সালে এর নাম হয় এস. এম. হল বা সলিমুল্লাহ মুসলিম হল। ১৯২৩ সালে এ হল নির্মাণের সংবাদ শোনার পর পরই নানা কথা বলতে থাকেন। কেউ কেউ বলেন যে, মুসলমান ছাত্র সংখ্যা কোন সময়ে এত বেশি হতে পারে না, তাই প্রকান্ড হল নির্মাণের কোনোই প্রয়োজন নেই। তারা মন্তব্য করেন যে, এ হলে ছাত্রের অভাবে এক সময়ে গরু-ছাগল থাকবে। এস. এম. হলের পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষে যে স্মারকগ্রন্থ প্রকাশিত হয় সেটি আমি সম্পূর্ণ পাঠ করেছি এবম স্বাভাবিকভাবেই স্তম্ভিত হয়েছি যে, ঐ হল কত পৃথিবীখ্যাত ও দেশবরেণ্য ব্যক্তিকে বুকে ধারণ করেছে।… এসব আলোচনা থেকে একটি ভাব বেরিয়ে আসে, তাহল এ অঞ্চলের মানুষের উন্নয়নকে কোন সময়ে মনেপ্রাণে গ্র্হণ করা হয়নি। সে কারণেই একটি মহান শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনকে কেন্দ্র করেও তাদের মনোভাবের প্রতিফলন ঘটতে দেখা যায়। বঙ্গভঙ্গের ফলে যে উন্নতি হয় তা রদ হয়ে স্তব্ধ হয়ে যায়। এর কিছু ক্ষতি পুষিয়ে দেবার জন্যই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা। ১৯২৩ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কনভোকেশনে ভাষণদানকালে লর্ড লিটন বলেছিলেন যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হল বঙ্গভঙ্গ রদের কিছুটা ক্ষতি পূরণ। এ অঞ্চলের মানুষ একে মনে প্রাণে আশীর্বাদ হিসেবে গ্র্হণ করে কিন্তু প্রতিক্রিয়াশীল চক্র নানাভাবে ক্ষতি করতে তৎপর হয়। ১৯৫৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে ভাষণ দিতে গিয়ে শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নের জন্য সরকার সে সময়ে ৬৫ লক্ষ টাকা বরাদ্দ দেয় অথচ শিক্ষামন্ত্রী প্রভাস সিং তা সমগ্র বাংলাদেশের কাছে এনে সেটা সমগ্র বাংলা প্রদেশের শিক্ষা বিস্তারের জন্য বরাদ্দ দেন।এমনিভাবে বিস্তারিত আলোচনা করলে এটা সহজে প্রমাণিত হয় যে, এ অঞ্চলের মানুষের প্রতি তাদের মনোভাব কেমন ছিল। পিছিয়ে পড়া অঞ্চলের কল্যাণের জন্য কোন প্রকার দরদ প্রদর্শন করা হয়নি আর এভাবেই সহানুভূতি দেখান হয় বাঙালীকে মানুষ করার জন্য॥”

— ড. মো: মকসুদুর রহমান (অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ – রা.বি) / বঙ্গভঙ্গ ও বাঙালির ঐক্য ॥ [ প্রতীক – ফেব্রুয়ারি, ২০০৬ । পৃ: ১৪৭-১৫১ ]


“… অত:পর সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধির বাতাবরণ তৈরীর মাধ্যমে হিন্দু ব্রাহ্মণ্যবাদীদের তুমুল আন্দোলনের মুখে ১৯১১ সালে পূর্ববাঙলা আসাম প্রদেশ তথা ‘বঙ্গভঙ্গ’ রদ হ’ল। বৃটিশ ভারতের ‘যবন’ ও ‘ম্লেচ্ছ’ অধ্যুষিত পান্ডববর্জিত অঞ্চল পূর্ববাঙলা ও বৃহত্তর আসামের নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ আবারও ঘোর অন্ধকারে নিমজ্জিত হ’ল।১৯০৫ সালে পূর্ববাঙলা ও বৃহত্তর আসাম (আজকের সেভেন সিস্টার্স) নিয়ে বৃটিশ ভারতে যে নতুন প্রদেশ গঠিত হয়েছিল তা উগ্র বর্ণহিন্দু-জাতীয়তাবাদীদের আন্দোলনের মুখে বাতিল না হয়ে যদি স্থায়িত্ব লাভ করতো, তাহলে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক অঞ্চল পূর্ববাঙলা ও বৃহত্তর আসামে, এমনকি গোটা দক্ষিণ এশিয়ায় ৫টি বড় মাইলফলক তৈরি হতো। সেগুলো হ’ল :১. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকাল ১৯২১ সালের পনেরো বছর আগেই ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হতো এবং সেই পনেরো বছরের মধ্যেই অর্থাৎ ১৯২১ সালের মধ্যেই পূর্ববাঙলা ও আসাম অঞ্চলের ভয়াবহভাবে পিছিয়ে পড়া মুছলমান ও নিম্নবর্ণীয় হিন্দু-বৌদ্ধ সমাজে আধুনিক মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উত্থান ঘটে যেতো।২. ঢাকা তখন কলকাতার হিন্টারল্যান্ড (উপনিবেশ) থেকে মুক্ত হয়ে নতুন প্রদেশের রাজধানী হিসেবে কলকাতা ও ভারতের অন্যান্য নগরীর প্রতিযোগী নগর হিসেবে বিকাশ লাভ করতো।৩. চট্টগ্রাম বন্দরের সমৃদ্ধি তৎকালীন বোম্বাই, মাদ্রাজ, বিশাখাপত্তনম, কলকাতাসহ ভারতবর্ষের সকল সামুদ্রিক বন্দরের সমৃদ্ধিকে ছাড়িয়ে যেতো। বাংলাদেশের একশ্রেণীর বুদ্ধিজীবী-সুশীলরা যে, চট্টগ্রাম বন্দরকে মার্কিন ও ভারতের হাতে তুলে দিয়ে চট্টগ্রামকে ‘সিঙ্গাপুর’ বানানোর অলীক স্বপ্ন দেখেন, সেই স্বপ্ন আজ থেকে অন্তত: সত্তর বছর আগেই বাস্তবে পূরণ হতো।৪. পূর্ববাঙলা-আসাম প্রদেশ বৃটিশ শাসনকালের মধ্যেই অর্থাৎ ১৯৪৭ সালের মধ্যেই পশ্চিমবঙ্গকে ছাড়িয়ে কৃষি, শিল্প, অর্থনীতিতে এবং ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতিতে ভারতবর্ষের সবচেয়ে উন্নত ও সমৃদ্ধশালী প্রদেশে রূপান্তরিত হতো।৫. এর ফলে ১৯৪৭ সালে ভারত-বিভাগ ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের উদ্ভবই হতো না, কারণ পাকিস্তান আন্দোলনে প্রধান ভূমিকা পালন করেছিল তৎকালীন কলকাতার ‘উপনিবেশ’ পূর্ববাঙলার জনগণ। ১৯০৫ সালের পূর্ববাঙলা-আসাম প্রদেশ স্থায়ী হলে ১৯৪৭-এর মধ্যেই এ অঞ্চলের জনগণের মধ্যে ভারত-ভাগ ও পাকিস্তান আন্দোলনে অংশগ্রহণের শর্তই তৈরী হতো না। বরং সমগ্র ভারতবর্ষে নিজের পণ্যের বাজার সম্প্রসারনের স্বার্থেই তারা ভারত-ভাগের বিরোধিতা করতো। আর, কোন কারণে সাতচল্লিশ বা তার আগে-পরে ভারত যদি বিভক্তও হতো এবং পাকিস্তানও যদি প্রতিষ্ঠিত হতো, তাহলে সে ক্ষেত্রে পূর্ববাঙলা-আসাম প্রদেশের পাকিস্তানে যোগ দেওয়ার কোনই প্রয়োজন হতো না, বরং পূর্ববাঙলা-আসাম প্রদেশ নিজেই একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হতো। সেটি হ’লে স্বাধীন পূর্ববাঙলা-আসাম রাষ্ট্র পঞ্চাশ-ষাট বছরের মধ্যে ভারত ও পাকিস্তানের তুলনায় বেশী উন্নত ও সমৃদ্ধশালী রাষ্ট্রে পরিণত হতো। আজ যারা দক্ষিন এশিয়ায় বাংলাদেশ, সেভেন সিস্টার্স ও দার্জিলিং নিয়ে ‘কমনওয়েলথ অব ইন্ডিপেন্ডেন্ট স্টেটস (সি.আই.এস)’ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেন, সেই স্বপ্ন ষাট-সত্তর বছর আগেই পূরণ হতো।দু:খজনক ব্যাপার হ’ল – তৎকালীন পূর্ববাঙলা ও বৃহত্তর আসামের যে-সব রাজনীতিক-বুদ্ধিজীবীরা ব্রাহ্মণ্যবাদীদের লেজুড়বৃত্তি করেছিলেন এবং ১৯০৫-এ এই সম্ভাবনাময় প্রদেশ প্রতিষ্ঠিত হলে তার বিরুদ্ধে ‘বঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদ’ বলে চিৎকার করে পূর্ববাঙলা-আসাম প্রদেশ প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন এবং আজও তাদের উত্তরসূরী বাংলাদেশের একশ্রেণীর ‘মুছলমান ব্রাহ্মণরাও’ যে কথিত বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে বিষোদগার করে করে মুখের ফ্যানা তোলেন – তারা কি বুঝেন, এ অঞ্চলের জনগণের কত বড় ক্ষতি তারা করেছিলেন? তারা কি কখনও এ-ও ভেবে দেখার অবকাশ পান যে, তাদের চিৎকার পরবর্তীতে ৪৭-এর বঙ্গভঙ্গ ঠেকাতে পারেনি, ভারত ভাগও ঠেকাতে পারেনি?১৯০৫-এর বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলন যে ঘোরতর মুছলিম-বিদ্বেষী উগ্র হিন্দু-জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ছিল সে বিষয়ে ভারতীয় লেখক বিমলানন্দ শাসমল তার ‘ভারত কী করে ভাগ হ’ল’ গ্রন্থে লিখেছেন -এই বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলন ছিল সন্দেহাতীতভাবে মুছলমানবিরোধী এবং গভীরভাবে মুছলিম স্বার্থের পরিপন্থী। এই আন্দোলনের তাগিদে যে-সকল সন্ত্রাসী বা বিপ্লববাদী নেতা কর্মক্ষেত্রে আবির্ভুত হলেন তারা সকলেই ছিলেন গভীরভাবে মুছলমান বিরোধী॥”

— রইসউদ্দিন আরিফ (সাবেক সম্পাদক, পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি) / অসমাপ্ত মুক্তিযুদ্ধ : বাঙালী ও বাংলাদেশ ॥ [ পাঠক সমাবেশ – ফেব্রুয়ারি, ২০১৫ । পৃ: ৮০-৮২ ]

“… ১৯০৬ সালের ১ অক্টোবর আগা খানের নেতৃত্বে ভারতের ৩৫ জন মুসলিম নেতা সিমলায় ভাইসরয় মিন্টোর সাথে দেখা করে মুসলমানদের পক্ষ থেকে কতিপয় সুনির্দিষ্ট দাবী পেশ করেন। অন্যতম দাবীটি ছিল ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা। হিন্দুদের চক্রান্তে বঙ্গভঙ্গ রদের পর ১৯১২ সালের ৩১ জানুয়ারী ভারতের বড়লাট নবাবকে সান্তনা দেয়ার জন্য ঢাকায় আসেন এবং বঙ্গভঙ্গ রদের ক্ষতিপূরণ স্বরূপ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আশ্বাস দেন। কিন্তু অন্যান্য উগ্রবাদী হিন্দু নেতাদের সাথে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এ আশ্বাসেরও চরম বিরোধিতা করেন।১৯১২ সালের ২৮ মার্চ কলকাতার গড়ের মাঠে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে হিন্দুরা প্রতিবাদ সভা ডাকে। প্রতিবাদ সভায় সভাপতিত্ব করেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কারণ তিনি ছিলেন জমিদার। তিনি মুসলমান প্রজাদের মনে করতেন লাইভ স্টক বা গৃহপালিত পশু। [ নীরদচন্দ্র চৌধুরী, দি অটোবায়োগ্রাফি অব এন আননোন ইন্ডিয়ান দ্রষ্টব্য ]কাজেই বাংলার মাটি, বাংলার জলের জন্য একবছর আগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রেমে গদ গদ হয়ে গান লিখলেও এক বছর পর বাংলার কৃষকদের ছেলে শিক্ষিত হবে তা তিনি সহ্য করেননি। কারণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হলে নবশিক্ষিত মুসলমান সমাজকে আর দাবিয়ে রাখা যাবে না। কৃষিজীবী সম্প্রদায়ের সন্তানদের শিক্ষিত হয়ে বুদ্ধিজীবী হলে চিরকাল সেবাদাস করে রাখা যাবে না। একথা চিন্তা করেই বোধ হয় হিন্দু বুদ্ধিজীবী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরেরা সেদিন আতঙ্কিত ও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে উগ্রবাদী হিন্দুরা কতটা ক্ষিপ্ত হয়েছিল এর প্রমাণ পাওয়া যাবে সেকালের নেতৃবৃন্দের বক্তব্য, বিবৃতি ও পত্রিকার ভাষ্য থেকে।১৯১২ সালে ১৬ই ফেব্রুয়ারী বড় লাটের সাথে বর্ধমানের স্যার রাসবিহারী ঘোষের নেতৃত্বে এক প্রতিনিধিমন্ডলী সাক্ষাৎ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা না করার পক্ষে নিম্নোক্ত যুক্তির জাল বিস্তার করেন।’ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হলে আভ্যন্তরীণ বঙ্গ বিভাগ-এর সমার্থক, তাছাড়া পূর্ববঙ্গের মুসলমানরা প্রধানত কৃষক; তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় তারা কোন মতেই উপকৃত হবে না।’ [ Report of the Calcutta University Commission Vol. IV, Prt. II, P. 133 ]’সিলেটের বিপিনচন্দ্র পাল বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে অশিক্ষিত ও কৃষক বহুল পূর্ববঙ্গের শিক্ষাদান কার্যে ব্যাপৃত থাকতে হবে; পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গের জনসাধারণের শিক্ষানীতি ও মেধার মধ্যে সামঞ্জস্য থাকবে না।’ [ ঢাকা প্রকাশ, ১১ ও ১৮ই ফেব্রুয়ারী – ১৯১২ ]এছাড়া হিন্দু সংবাদপত্র, বুদ্ধিজীবী ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে অসংখ্য প্রতিবাদ সভার আয়োজন করেন এবং সভার সিদ্ধান্তগুলো বৃটিশ সরকারের কাছে প্রেরণ করতে থাকেন। বাবু গিরিশ চন্দ্র ব্যানার্জী, ড: স্যার রাসবিহারী ঘোষ এবং কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর স্যার আশুতোষ মুখার্জীর নেতৃত্বে হিন্দু বুদ্ধিজীবীরা বড় লাট হার্ডিঞ্জের কাছে ১৮ বার স্মারকলিপি পেশ করেন [ Report of the Calcutta University Commission ]আশ্চর্যের বিষয়, এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতার মিছিলে শরীক হয়েছিলেন মানবতার কবি দাবীদার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও।… ১৯১৫ সালের ১৬ই জানুয়ারী নবাব সলিমুল্লাহর মৃত্যুর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। নবাব সলিমুল্লাহর স্বপ্ন বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে শক্ত হাতে হাল ধরেন সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী। সেই ১৯১১ সালের ৩১ জানুয়ারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণার দিন থেকে ১৯২০ সালের ২৩শে মার্চ-এ বড় লাটের আইন সভায় ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এ্যাক্ট’ পাস হওয়ার দিনটি পর্যন্ত তিনি বিরামহীন প্রচেষ্টা চালান। কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহও বিশ্ববিদ্যালয় আইন পাসের ক্ষেত্রে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। অবশেষে কট্টর হিন্দু নেতাদের প্রবল বিরোধিতা সত্ত্বেও ১৯২১ সালের জুলাই মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু কাঙ্খিত বিশ্ববিদ্যালয়টি নবাব দেখে যেতে পারেননি। এছাড়া জমিদার ওয়াজেদ আলী খান পন্নীও (চাঁদ মিয়া) পূর্ব বাংলার মুসলমানদের শিক্ষার জন্য উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছেন। অথচ আজ নবাব সলিমুল্লাহর নামে একটি হল আছে বটে; কিন্তু কায়েদ আযম জিন্নাহ, নওয়াব আলী চৌধুরী ও জমিদার চাঁদ মিয়ার কোন স্মৃতি চিহ্ন ক্যাম্পাসে নেই।… আর যাদের আন্দোলনের ফসল এই এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, অনেকে তাদের নামই জানে না। তাদেরকে নিয়ে কোন আলোচনা বা স্মৃতি সভা হয় না। আলোচনা বা স্মৃতি সভা হয় বঙ্কিম, সূর্যসেন ও রবীন্দ্রনাথদের নিয়ে। যাদের কল্যাণে চাষার ছেলে থেকে আজকে যারা ভাইস-চান্সেলর, অধ্যাপক, বুদ্ধিজীবী, আমলা, রাজনীতিবিদ, আইনজ্ঞ, বিচারপতি, শিল্পপতি, শিল্পী, অভিনেতা-অভিনেত্রী, প্রযোজক-পরিচালক হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছেন, সে-সব কৃতি সন্তানেরা আজ উপেক্ষিত, নিন্দিত। হায়রে দূর্ভাগা দেশ। হায়রে দূর্ভাগা জাতি।বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার লগ্ন থেকেই এর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলছে। বর্তমানেও তা অব্যাহত রয়েছে। পূর্বে এই এই প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে চক্রান্ত করেছে রবীন্দ্র বাবুরা। বর্তমানে করছে মুসলমান নামধারী রবীন্দ্র ভক্তরা।বাংলাদেশের এক বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রবন্ধে নিম্নোক্ত মন্তব্য করেছিলেন :’রবীন্দ্রনাথের মাটিতে দাঁড়িয়ে রবীন্দ্রনাথকে অতিক্রম করার সাধনা, রবীন্দ্রনাথকে বাদ দিয়ে বেঁচে থাকার, বিকশিত হওয়ার কিংবা রবীন্দ্রনাথকে অতিক্রম করার বর্বর অহংকার হচ্ছে পায়ের তলায় জমি শুন্য, শেকড় শুন্য, নির্বোধের অহংকার।’ [ সরদার ফজলুল করিম : রবীন্দ্রনাথের অস্তিত্বে আমাদের অস্তিত্ব /দৈনিক সংবাদ – ২৪ ফাল্গুন, ১৩৯৬ ]সচেতন মহলের মতে, দেশের শিক্ষা ও সংস্কৃতির সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ফজলুল করিমের এই মন্তব্যে নতুন প্রজন্মের মন-মানসিকতা আচ্ছন্ন করারই কথা। তারা স্বভাবতই বিশ্বাস করবে ‘রবীন্দ্রনাথের অস্তিত্ব আমাদের অস্তিত্ব’। এই বিশ্বাসের পরিণাম কি হবে তাও ভেবে দেখা সময়ের দাবী॥”

— সরকার শাহাবুদ্দীন আহমেদ / ইতিহাসের নিরিখে নজরুল-রবীন্দ্র চরিত ॥ [ বাংলাদেশ কো অপারেটিভ বুক সোসাইটি – জুলাই, ১৯৯৮ । পৃ: ২৩০-২৩৩ ]

“… রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আহবান অনুযায়ী ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর (বঙ্গভঙ্গ কার্যকরী করার জন্য ইংরেজ সরকার কর্তৃক ঘোষিত দিবস)-কে ‘রাখীবন্ধন দিবস’ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কর্তৃক ১৯০৩ সালে লিখিত “আমার সোনার বাংলা” গানটি ‘বঙ্গভঙ্গ রদ’ আন্দোলনে যথেষ্ট গতি সঞ্চার করে।বঙ্গভঙ্গ রদ হওয়ার পর পূর্ববাংলার বিক্ষুব্ধ ও বিমর্ষ মুসলমানদের মধ্যে সৃষ্ট অসন্তোষ প্রশমনের জন্য তৎকালীন বড়লাট লর্ড হার্ডিঞ্জ পুর্ববঙ্গ সফরের কর্মসূচী গ্রহণ করেন এবং তদানুযায়ী তিনি ১৯১২ সালের ৩১ জানুয়ারী ঢাকা সফরে আসেন। ঐদিনই নবাব স্যার সলিমুল্লাহ, নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী, এ কে ফজলুল হক প্রমুখ মুসলিম নেতৃবৃন্দের একটি প্রতিনিধিদল তার সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং তাদের বিশেষ অনুরোধক্রমে তৎকালীন বড়লাট ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা প্রদান করেন। উক্ত ঘোষণার পর একই বছর মে মাসে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে বিস্তারিত সুপারিশ পেশ করার জন্য ‘নাথান কমিশন’ নামে একটি কমিশন গঠন করা হয়। দীর্ঘ আলাপ আলোচনার পর অত্র কমিশন একটি আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করে। পূর্ববাংলার মানুষ এবং মুসলিম নেতৃবৃন্দ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সরকারী সরকারী সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানায়।কিন্তু ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা প্রদানের সাথে সাথেই এবারো শুরু হয়ে যায় কলকাতাকেন্দ্রিক হিন্দু নেতৃবৃন্দ ও বুদ্ধিজীবিদের চরম গাত্রদাহ। সেই একই হিন্দু নেতৃবৃন্দ ও বুদ্ধিজীবি যারা বঙ্গভঙ্গ রদ করার জন্য আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সরকারী সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে এবারো তারা গর্জে ওঠে, গড়ে তুলে ব্যাপক আন্দোলন। হিন্দু নেতারা সারা বাংলায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিবাদে ব্যাপক সভা-সমাবেশের আয়োজন করে। ১৯১২ সালের ২৮ মার্চ কলিকাতার গড়ের মাঠে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সভাপতিত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিবাদে এক বিশাল জনসভার আয়োজন করা হয়। ১৯১২ ইং সালের ১২ ফেব্রুয়ারী হিন্দু নেতৃবৃন্দের একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদল লর্ড হার্ডিঞ্জের সাথে সাক্ষাৎ করেন। সাক্ষাৎকালীন উক্ত প্রতিনিধিদলের পক্ষ থেকে তাকে বলা হয় যে, ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা আভ্যন্তরীণভাবে বঙ্গভঙ্গেরই সমতুল্য। কেননা এর ফলে বাঙালি জাতি বিভক্ত হয়ে পড়বে এবং হিন্দু মুসলমানের মধ্যে বিরাজমান বিরোধ আরো বাড়বে। তাছাড়া পূর্ববঙ্গের মানুষ প্রধানত কৃষক। তাই ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন কোন উপকারেই আসবে না।১৯১৭ ইং সালের ২০ মার্চ সৈয়দ নওয়াব অলী চৌধুরী ভারতীয় আইনসভায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি পুনরায় উত্থাপন করেন এবং অবিলম্বে ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা বিল’ পাসের দাবি জানান। আইনসভার পক্ষ থেকে জানানো হয় যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিলের ‘খসড়া’ প্রস্তুত রয়েছে তবে যুদ্ধ সঙ্কটের মধ্যে সরকার এ বিলে হাত দিতে চান না। যুদ্ধশেষে য্থাসময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে।অত:পর একই বছর ‘কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কমিশন’ নামে একটি কমিশন গঠন করা হয়। উক্ত কমিশন পূর্বেকার ‘নাথান কমিশন’ রিপোর্ট অনুমোদন করে। এ রিপোর্টের ভিত্তিতে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এক্ট’ পাস হয়। অবশেষে সকল প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে দীর্ঘ নয় বছর পর হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রবল বাঁধার মুখে রমনার বিশাল সবুজ চত্বরে প্রায় ৬০০ একর জায়গা জুড়ে প্রতিষ্ঠিত হয় বহুল প্রত্যাশিত ও অনেক সংগ্রামের ফসল ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’। ১৯২১ সালের ১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার যাত্রা শুরু করে এবং এক বছর পর ১৯২২ সালে প্রথম সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়।মুসলমানদের দাবির প্রেক্ষিতে এ দেশের মুসলমানদের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলেও, প্রতিষ্ঠার পর বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার দায়িত্বে মুসলমানরা নিয়োজিত ছিল না, হিন্দুদেরই প্রাধান্য ছিল সর্বক্ষেত্রে। যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন “মক্কা বিশ্ববিদ্যালয়” বলে ব্যঙ্গ করতে কুন্ঠাবোধ করেনি, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর এ বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেয়ার জন্য কিন্তু তাদের মাঝে কোন সংকোচ বা কার্পণ্য মোটেই দেখা যায়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর জনৈক ইংরেজ এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি পদে অধিষ্ঠিত হন এবং বিভিন্ন বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে হিন্দু পন্ডিতগণ পরিচালকের আসনে সমাসীন হন। তারা তাদের রুচি ও মন-মানসিকতা অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল প্রশাসন কার্য পরিচালনা করতে থাকেন।ফলে দেখা যায়, যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধীতা করেছিলেন, ঢাকার বুকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার মাত্র পাঁচ বছর পর সে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণেই তিনি বিপুলভাবে সংবর্ধিত হন এবং তারো দশ বছর পর তিনি সেখান থেকেই সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রীপ্রাপ্ত হন। শুধু তাই নয়, একই কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোগ্রামে ‘অশোক চক্র’ স্থান লাভ করে। পরবর্তীতে পাকিস্তান আমলে সে মনোগ্রাম পরিবর্তিত হয়ে তাতে পবিত্র কোরআনের আয়াত সংযোজিত হলেও বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার তাদের চিরাচরিত স্বভাব অনুযায়ী নিজেকে মাত্রাতিরিক্ত ‘স্যাকুলার’ বা ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ প্রমাণের হীন উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে পাকিস্তান আমলে পরিবর্তিত সে মনোগ্রাম থেকে পবিত্র কোরআনের আয়াতকে নির্বাসিত করে। একই সাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সলিমুল্লাহ্ মুসলিম হল’ এবং ‘ফজলুল হক মুসলিম হল’ দুটির নাম থেকে মুসলিম শব্দ তুলে দেয়া হয়॥”

— মেজর জেনারেল (অব:) এম. এ. মতিন, বীর প্রতীক, পিএসসি / আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের ধারাবাহিকতা এবং প্রাসঙ্গিক কিছু কথা ॥ [ আহমদ পাবলিশিং হাউস – ফেব্রুয়ারি, ২০০০ । পৃ: ১৮-২২ ]


“… As compensation for the annulment of the partition as well as protest against the general antipathy of the Calcutta University towards the Muslims, the deputation pressed a vigorous demand for a University at Dacca. In his reply, Lord Hardinge said that the Government of India realised that education was the true salvation of the Muslims and that the Government of India, as an earnest of their intentions, would recommend to the Secretary of State the constitution of a University at Dacca. On 2 February, 1912, a communique was published stating the decision of the Government of India to recommend the constitution of a University at Dacca. [ C. U. Commission Report, Vol. IV, Pt. II, P. 133 ]The Hindu leaders were opposed to the plan of setting up a University at Dacca. They voiced their disapprobation in press and platform. On February 16, 1912 a delegation headed by Dr. Rash Behary Ghose waited upon the Viceroy and expressed apprehension that the creation of a separate University at Dacca would be in the nature of ‘an internal partition of Bengal’. They also contended that the the Muslims of Eastern Bengal were in large majority cultivators and they would benefit in no way by the foundation of a University. [Ibid., P. 122 ]In his reply, Lord Hardinge referred to the progress made by the people of Eastern Bengal and Assam during the few years of the partition and said, “when I visited Dacca I found a wide-spread apprehension, particularly among the Muhammadans, who form a majority of the population, lest the attention which the partition of Bengal secured for the eastern provinces should be relaxed, and that there might be a setback in educational progress. It was to allay this not very unreasonable apprehension that I stated to a deputation of Muhammadan gentlemen that the Government of India were so much impressed with the necessity of promoting education in a province which had made such good progress during the past few years that we have decided to recommend to the secretary of state the constitution of a University at Dacca and the appointment of a special officer for education in Eastern Bengal.”The viceroy assured the delegation that no proposals which could lead to the internal partition or division of Bengal would meet the support of the Government of India; and he added that from the fact that he announced the intention of the Government in regard to Dacca to a deputation of Muhammadans it did not follow in any way that the new University would be a Muhammadan University; it would be a University open to all – a teaching and a residential University. [ Ibid., Vol. I , Pt. I, P. 151 ]… Dr. R. C. Majumdar, in his article “Dhakar Smriti” has referred to the opposition by Sir Ashutosh Mukharjee, Gurudas Banerjee and others. Dr. Majumder writes that Lord Hardinge told Sir Ashutosh that he was determined to establish Dacca University in spite of all opposition and the Viceroy wanted to know at what price he was prepared to withdraw his opposition to it. Sir Ashutosh thought of using this occasion for a bargain in favor of Calcutta University, of which he was the Vice-Chancellor. He asked for four Proffesorships for his University. The Viceroy accepted his demand and Sir Ashutosh agreed to stop his opposition. This agreement between the Viceroy and Sir Ashutosh was named the ‘Dacca University Pact’. (Sir Ashutosh Bhattacharya, Amader Shei Dhaka Visva Vidyalaya , pp. 24-29)The educated Hindus criticised the Dacca University as ‘Mecca University’, ‘Fucca (Hollow) University’ and expressed that ‘a good College (Dacca College) was killed to create a bad University. [ Sir Ashutosh Bhattacharya, Amader Shei Dhaka Visva Vidyalaya , pp. 6 & 56 ]… Educated Hindus said that three Jews, Vice-Chancellor Hartog, Viceroy Lord Reading and Secretary of State E. Montage, had contaminated the University and it would not function. [ Syed Mostafa Ali, Atmakatha, p. 115 ]… In the annual Court meeting of 1922-23 the Vice-Chancellor in his Presidential speech replied to these critics of the Dacca University. He said that he felt proud of the achievement of the Dacca University in a year and spoke of its progressive type of syllabuses, effective tutorial system, better laboratory and library facilities and personal contacts between the teachers and students. There were increasing demands for books both by students and teachers and such demand for books hardly existed before the University was created. He also recalled that the Dacca University, though open to all, was created in response to the demand of the Muslim community and it was intended as an organ to raise them form their backward position in regard to education. [ Minutes of the Court, 13 February, 1922 ].”

— Muhammad Abdur Rahim / The History of the University of Dacca ॥ [ University of Dacca – September, 1981 । P. 5-6 / 39 ]


“… লর্ড হার্ডিঞ্জ ঢাকা সফর শেষে কলকাতায় প্রত্যাবর্তন করলে ১৯১২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ড. রাসবিহারী ঘোষের নেতৃত্বে কলকাতার বিশিষ্ট অমুসলমান নেতাদের এক প্রতিনিধি দল তার সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের তীব্র বিরোধিতা করে একটি স্মারকলিপি পেশ করেন। উত্তরে লর্ড হার্ডিঞ্জ ওই প্রতিনিধি দলকে জানান, ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হলেও তা মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় হবে না, তা হবে একটি সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়। বঙ্গভঙ্গ এবং পূর্ববাংলা ও আসাম প্রদেশ রদের প্রেক্ষাপটে এ অঞ্চলের মুসলমান জনসাধারণের মধ্যে যে হতাশা ও ক্ষোভের সঞ্চার হয়, তা খানিকটা হলেও প্রশমনের জন্য ক্ষতিপূরণস্বরূপ ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল। বলা চলে, বঙ্গভঙ্গ রদ না হলে যেমন পরিণতিতে ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন অনিবার্য ছিল, তেমনি আবার বঙ্গভঙ্গ রদের পরেও সে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন অপরিহার্য হয়ে পড়ে। সুতরাং বলা যায়, প্রথম বঙ্গভঙ্গ এবং তা রদের ফলেই ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছিল, এ কথাও বলা যায় যে বঙ্গভঙ্গ না হলে হয়তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হতো না। কিন্তু লর্ড হার্ডিঞ্জের ওই আশ্বাস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে শুধু কলকাতা নয়, এমনকি ঢাকায় অমুসলমান সম্প্রদায়ের বিরোধিতা বা প্রতিকুলতা দূর করতে পারেনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রস্তাবনা থেকেই এর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু হয়।ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য ১৯১২ সালের মে মাসে গঠিত হয়েছিল নাথান কমিটি। যে কমিটি মোট ২৫টি সাব-কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে রিপোর্ট পেশ করে। এই রিপোর্টে বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণের জন্য ৫৩ লাখ টাকা এবং বাৎসরিক খরচের জন্য ১২ লাখ টাকা ধরা হয়েছিল। নাথান কমিটি রমনা অঞ্চলে অধুনালুপ্ত পূর্ববাংলা ও আসাম প্রদেশের রাজধানীর পরিত্যক্ত ৪৫০ একর জমির ওপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস স্থাপনের সুপারিশ করে। এই রিপোর্ট ১৯১৩ সালে ভারত সচিব কর্তৃক অনুমোদিত হয়। কিন্তু সৃষ্টির লগ্ন থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বৈরিতার শিকার। প্রথম মহাযুদ্ধের কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য সংকোচিত বাজেট পেশ করতে বলা হয় ১১ লাখ ২৫ হাজার টাকার মধ্যে। ফলে ঢাকা ও জগন্নাথ হল এবং মোহামেডান ও নতুন আর্টস কলেজ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শুরুর সংশোধিত পরিকল্পনা পেশ করা হয়; কিন্তু তা-ও কার্যকর হয়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন দেরি হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই পূর্ববাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ক্ষুব্ধ হয়। ১৯১৭ সালের মার্চ মাসে ‘ইমপেরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলে’ সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী অবিলম্বে সরকারের প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিল পেশের আহ্বান জানিয়ে বলেন,”পূর্ববাংলাকে বঙ্গভঙ্গ রদের ক্ষতিপূরণস্বরূপ একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল; কিন্তু যুদ্ধের কারণে সেই প্রতিশ্রুতি পালনের বিলম্ব হেতু বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রস্তাব অনির্দিষ্টকালের জন্য মুলতবি বা স্থগিত রাখার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।”শেষ পর্যন্ত ১৯১৭ সালে বাংলার গভর্নর ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর লর্ড চেমসফোর্ড কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্যা তদন্তের জন্য নিয়োজিত স্যাডলার কমিশনের ওপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের পরিকল্পনা সম্পর্কে পরামর্শ দানের দায়িত্ব প্রদান করেন। কমিশনের সদস্যদের মধ্যে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা স্বীকৃত হলেও তা আবাসিক না এফিলিয়েটিং হবে, তা নিয়ে মতভেদ দেখা দেয়। ভারত সরকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে মূলত আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় করার পক্ষপাতি ছিল। পক্ষান্তরে পূর্ববাংলার মুসলমান নেতারা পূর্ববাংলার কলেজগুলোকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত করার পক্ষে ছিলেন, যাতে পূর্ববাংলার উচ্চশিক্ষার্থী মুসলমান ছাত্ররা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রদায়িক বৈষম্যের হাত থেকে রেহাই পায়।বাংলার অমুসলমান জনমত ঢাকায় এফিলিয়েটিং বা মঞ্জুরি প্রদানের ক্ষমতাযুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের ঘোরতর বিরোধী ছিল। স্যাডলার কমিশন মধ্যপথ অবলম্বন করে, পূর্ববাংলার বিভিন্ন কলেজের পরিবর্তে ঢাকার বিভিন্ন আবাসিক হলকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউনিটরূপে গণ্য করার সুপারিশ করে আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কাউন্সিল হাউসের পাঁচ মাইল ব্যাসার্ধ এলাকাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আওতাভুক্ত এলাকারূপে গণ্য করার পরামর্শ দেয়। ওই কমিশনে প্রদত্ত ১৩টি সুপারিশ কিছু রদবদলসহ ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইন ১৯২০’ ভারতীয় আইনসভায় গৃহীত হয় এবং গভর্নর জেনারেল ১৯২০ সালের ২৩ মার্চ তাতে সম্মতি দেন।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দেরির কারণ শুধু প্রথম মহাযুদ্ধ বা ভারত সরকারের লালফিতার দৌরাত্ম্য নয়, অবিভক্ত বাংলার দ্বিতীয় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বিরোধিতা ও প্রতিকুলতা তার জন্য বিশেষভাবে দায়ী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় সবচেয়ে বড় বাধা ছিলেন স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় এবং সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার ‘ঢাকার স্মৃতি’ প্রবন্ধে লিখেছেন, বড়লাট লর্ড হার্ডিঞ্জ আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের কাছে জানতে চেয়েছিলেন কী মূল্যে অর্থাৎ কিসের বিনিময়ে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের বিরোধিতা থেকে বিরত থাকবেন। ‘বাংলার বাঘ’ নামে খ্যাত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য চারটি নতুন প্রফেসর পদের বিনিময়ে তার বিরোধিতার অবসান ঘটিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত ১৯২১ সালের জুলাই মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রস্তাব বাস্তবায়িত হয়েছিল এবং লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক রেজিস্ট্রার ফিলিপ হার্টগ প্রথম ভাইস চ্যান্সেলর নিযুক্ত হন।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয় ১৯২১ সালের ১ জুলাই। ১৯১১ সালের ডিসেম্বর মাসে বঙ্গভঙ্গ রদ, ঢাকাকে রাজধানীরূপে পূর্ববাংলা ও আসাম প্রদেশ বাতিল হওয়ার প্রায় দশ বছর পর বিলোপকৃত রাজধানীর জন্য নির্মিত নতুন বাগিচা শহর রমনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক যাত্রা শুরু হয় মুসলিম হল, ঢাকা হল ও জগন্নাথ হলের যথাক্রমে ১৭৮, ৩৮৬ ও ৩১৩ মোট ৮৭৭ জন ছাত্র নিয়ে।ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হওয়ার পরেও তা অবিভক্ত বাংলা সরকার এবং ঢাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রভাবশালী মহলের নিরন্তর বাধার সম্মুখীন ছিল। এ প্রসঙ্গে ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার লিখেছেন,”১৯১৯ সালের নতুন আইন অনুসারে বাংলার প্রথম শিক্ষামন্ত্রী হন পশ্চিমবঙ্গের সন্তান প্রভাসচন্দ্র মিত্র। তিনি মন্ত্রী হয়েই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন কমানোর নির্দেশ দেন। প্রতিষ্ঠালগ্নে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রিজার্ভ ফান্ডে ৫০ লাখ টাকা গচ্ছিত ছিল, বাংলা সরকার বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রদত্ত ভবনগুলোর জন্য সে টাকা কেটে নেয়। বাংলা সরকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য প্রতি বছর মাত্র ৫ লাখ টাকা বরাদ্দ করে। ফলে শিক্ষকদের বেতন কমিয়ে দিতে হয়।”ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার ১৯৭৪ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রদের পুনর্মিলনী উপলক্ষে প্রকাশিত ‘আমাদের সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’ স্মরণিকায় ‘ঢাকার স্মৃতি’ প্রসঙ্গে আরো লিখেছেন,”এই সমুদয় গোলমালের মূল কারণ ছিল হিন্দুরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরোধী এবং শিক্ষামন্ত্রী পশ্চিমবঙ্গের লোক হওয়ায় তার পূর্ববঙ্গের প্রতি সহানুভূতির যথেষ্ট অভাব ছিল। ঢাকাবাসী হিন্দু শিক্ষিত সম্প্রদায় কোনদিনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে সুনজরে দেখেননি। যেসব হিন্দু প্রফেসর ও রিডার ছিলেন, সকলেই ঢাকার বাইরে থেকে এসেছিলেন – তারা এতো মোটা মাইনে পাবে, এতো বড় বড় বাড়িতে থাকবে এটা কোনদিনই তারা সহ্য করতে পারেননি। একজন অধ্যাপক একবার ঢাকার এক বিশিষ্ট হিন্দু নেতাকে বলেছিলেন যে, আমরা এসব বাড়ি দখল না করলে কি গভর্নমেন্ট আপনাদের এসব বাড়িতে থাকতে দিত? তবে আপনারা আমাদের হিংসা করেন কেনো? মুসলমানরা হিন্দু শিক্ষকদের বিরোধিতা করেননি। তবে তারা চাইতেন লেকচারারের পদে যথাসম্ভব বেশি মুসলমান নিযুক্ত করতে – অধিকতর যোগ্য হিন্দু থাকলেও; কিন্তু প্রফেসর ও রিডারের বেলায় মোটামুটি যোগ্যতা অনুসারে নির্বাচন করারই পক্ষপাতি ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা অনেকে পদানুসারে কোর্টের সভ্য ছিলেন, অন্য অনেক হিন্দুও এর সভ্য ছিলেন, তাদের বিরোধী দল বললে বিশেষ অতিরঞ্জন করা হবে না। শিক্ষক সদস্যদের মুখপাত্র ছিলেন ড. নরেশচন্দ্র সেনগুপ্ত – তারপর আমাকেই বিরোধী হিন্দুদের সঙ্গে কোর্টের সভায় লড়াই করতে হয়। এ জন্য ঢাকার হিন্দু জননায়কেরা আমার ওপর খুশি ছিলেন না। তবে কোর্টসভায় মুসলমানেরা হিন্দু শিক্ষকদের পক্ষে থাকায় শিক্ষকদের বা শিক্ষা সম্বন্ধে অনিষ্টকর কোনো প্রস্তাব পাস করা সম্ভব হতো না।”ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হওয়াতে পূর্ববাংলার কৃষিনির্ভর দরিদ্র মুসলমান সমাজের ছাত্রদের উচ্চশিক্ষার দ্বার প্রসারিত হয়েছিল। কৃষক পরিবারের সন্তানদের পক্ষে কলকাতায় গিয়ে উচ্চশিক্ষা গ্র্হণের সঙ্গতি ছিল না, তবে অভিজাত শ্রেণীর মুষ্টিমেয় মুসলমান ছাত্র কলকাতা, আলিগড় বা লন্ডন গিয়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ গ্রহণ করতেন। ঢাকা শহরের আদিবাসী ঢাকাইয়া মুসলমান সমাজে শিক্ষার আগ্রহ ছিল কম, তবে তারা ঢাকার বাইরে থেকে আগত ছাত্রদের নিজেদের বাড়িতে জায়গীর রাখতেন। ফলে অনেক দরিদ্র ছাত্র জায়গীর থেকে কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনার খরচও ছিল কম। যদিও দেশ বিভাগের আগে পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অমুসলমান ছাত্ররাই ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। তবু ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হওয়ায় উচ্চশিক্ষা গ্র্হণের সুযোগ সম্প্রসারণের কারণে মুসলমান মধ্যবিত্ত সমাজের বিকাশ ত্বরান্বিত হয়েছিল॥”

— রফিকুল ইসলাম / স্বাধীনতা সংগ্রামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ॥ [ ঐতিহ্য – ফেব্রুয়ারি, ২০০৪ । পৃ: ১২-১৬ ]


“… ঢাকা নগরীতে সংঘটিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার হাত হতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অব্যাহতি পায়নি। কোন কোন ক্ষেত্রে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের হিন্দু ছাত্রবৃন্দও এই পৈশাচিক কাজে লিপ্ত হয়েছিলো। ১৯২৬ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের শ্রেণী কক্ষে বাদলকৃষ্ণ গাঙ্গুলী নামে জনৈক ছাত্র সাম্প্রদায়িক সম্পর্কের ক্ষেত্রে উস্কানীমূলক বক্তব্য রাখে, যার ফলে এই শ্রেণী কক্ষে মুসলমান ছাত্রদ্বয় মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়। একই দিন সে দু’টি শ্রেণী কক্ষে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়ানোর চেষ্টা করে। রসায়ন বিভাগের শিক্ষক এ. এন. কাপ্পানা ও গণিত বিভাগের শিক্ষক ড. এন. এম. বসুর ক্লাসে এই ঘটনা ঘটে। ক্লাসে ছাত্রদের মধ্যে মাত্র দু’জন ছিলেন মুসলমান সম্প্রদায়ের, যারা এই ঘটনায় মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়। ছাত্রদ্বয় ছিলো ওয়ালিউল্লাহ পাটোয়ারী ও মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন। তারা এই ঘটনা মুসলিম হলের প্রাধ্যক্ষ ও ইতিহাস বিভাগের রীডার স্যার আহমেদ ফজলুর রহমানকে (১৮৮৯-১৯৪৫) জানান, যিনি বিষয়টি উপাচার্য ল্যাংলীর নজরে আনেন। ঢাকা নগরীতে বিদ্যমান সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে এই অবস্থা উপাচার্য ল্যাংলী খুব দ্রুত সামলানোর চেষ্টা করেন। তিনি প্রথমেই প্রাধ্যক্ষের মাধ্যমে বাদলকৃষ্ণ গাঙ্গুলীকে তার সাথে ১৫ সেপ্টেম্বর দেখা করার নির্দেশ দেন। [ Letter from Dr. J, C. Ghosh, Provost, Dhaka Hall to Badal Krishna Ganguli, a student of Dhaka Hall, 15 September, 1926. File-BM, Serial No. 523, Dhaka University Record Room. ]ইতোমধ্যে উপাচার্য এই ঘটনার সময় উপস্থিত শিক্ষকদ্বয় এ. এন. কাপ্পানা ও ড. এন. এম. বসুর নিকট হতে ঘটনা সম্পর্কে তাদের লিখিত বক্তব্য আদায়ের চেষ্টা করেন। উল্লেখ্য যে স্যার আহমেদ ফজলুর রহমানের নিকট হতে এই ঘটনার তথ্য অবগত হয়েই অত্যন্ত দ্রুত উপাচার্য এক বিজ্ঞপ্তি জারী করেন। এই বিজ্ঞপ্তিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অনুরোধ জানান যে হিন্দু মুসলমান সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে এমন মন্তব্যকারী যে কোন ছাত্রের নাম অতি দ্রুত যেন উপাচার্যকে জানানো হয়। শিক্ষকদের আরো অনুরোধ জানানো হয় তারা যেন ছাত্রদের বুঝাতে সক্ষম হন যে এরূপ আচরণ বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা ভঙ্গের সামিল এবং মারাত্মক শাস্তিযোগ্য অপরাধ।… প্রকৃতপক্ষে ঢাকা নগরীতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় অশোভন মন্তব্যের মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়িয়ে দেবার প্রয়াস বিপজ্জনক পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। মুসলমান ছাত্রবৃন্দ এই ঘটনায় খুবই ক্ষুব্ধ হয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও খুব দ্রুত এই পরিস্থিতির অবসান ঘটাতে সক্রিয় হন। উপাচার্য ল্যাংলীর নেতৃত্বে ঢাকা হল, জগন্নাথ হল এবং মুসলিম হলের প্রাধ্যক্ষগণ সম্মিলিতভাবে এই ঘটনার সঠিক তদন্তের মাধ্যমে ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে বাদলকৃষ্ণ গাঙ্গুলী এ. এন. কাপ্পানা ও ড. এন. এম. বসুর ক্লাসে যে আপত্তিকর ও অশোভন মন্তব্য করেছিলো সে সময় ক্লাসে মাত্র দু’জন মুসলমান ছাত্র ছিলো।এ. এন. কাপ্পানার ক্লাসে বাদলকৃষ্ণ গাঙ্গুলীর অশোভন মন্তব্য ও পরিস্থিতির বিবরণ দিযেছে প্রথম বর্ষ বিজ্ঞানের ছাত্র ওয়ালিউল্লাহ পাটোয়ারী। তার বিবরণ অনুযায়ী :”… আমি ক্লাশে গেলে পরই আমাদের ক্লাশের বাদল কৃষ্ণ গাঙ্গুলী তাহার হিন্দু বন্ধুবর্গের নিকট বলিতে থাকে – ‘আমি আজ ক্লাশ attend করিতে আসি নাই, কেবল তোমাদিগকে organize করিতে আসিয়াছি। মুসলমান শালাদের যন্ত্রণায় থাকা দায় হইয়া উঠিয়াছে। তাহাদিগকে ধ্বংস করিতে হইবে। মহাশয়, মোহাম্মদ আলী সৌকৎ আলীকে বিশ্বাস করিতে পারিলাম না আর ঢাকার নবাবকে বিশ্বাস করিব? সে ত মতলবিয়া চাউলের বেপারী। কলিকাতার এক নম্বর devil স্যার আবদুর রহিম আর ঢাকার আবদুল হাফিজ এই দুই গুন্ডাকে ধ্বংস করিতে না পারিলে হিন্দু সমাজের আর শান্তি নাই। গাড়োয়ান শালাদিগকে সম্পূর্ণরূপে বয়কট করিতে হইবে। মহাশয়, আমি কি করিয়াছি জানেন? আমাদের পাড়ায় এক গৃহস্থ মোছলমান আছে – তাহার জ্বালানী কাঠের দোকান আছে। আমি কোন হিন্দুকে তাহার দোকান হইতে কাঠ কিনিতে দিইনা। সেদিন যখন সে রাস্তা দিয়া যাইতেছিল আমরা শালাকে আক্রমণ করি এবং বলি আমাদের রাস্তা দিয়া যাইতে পারিবি না। তাহাকে মারিয়া ফেলিবার উপক্রম করিয়াছিলাম কিন্তু আমাদের পাড়ার এক হিন্দু ভদ্রলোক আসিয়া তাহাকে ছাড়াইয়া নেয়, নচেৎ মারিয়া ফেলিতাম। এই কথা যখন বলিতে থাকে তখন আমাদের Teacher Mr. A. N. Kappana ক্লাশে আসেন। তাহাকে বকবক করিতে শুনেন এবং বাদলকে জিজ্ঞাসা করেন ‘Why do you murmur?’ সে তখন বলে ‘Sir, আর শান্তি নাই Sir. মুসলমানদের যন্ত্রণায় আর থাকিতে পারিবনা। তাহাদের শাস্তি করিতে না পারিলে আর শান্তি হইবে না। Sir, কলিকাতার স্যার আবদুর রহিম ও ঢাকার আবদুল হাফিজ এই দুজনই সমস্ত গুন্ডামীর মূল।’ ইহাতে আমাদের Mr. A. N. Kappana বলে উঠেন “Can you prove this in the law court?” সে বলে ‘না Sir’। ‘তবে এসব কথার ভিত্তি কি? তোমার ক্লাশে এসব কথা বলা উচিৎ নয়।’ ‘Sir, আমি কিছুতেই শান্ত হইতে পারিতেছি না।’ তখন Mr. Kappana বলেন “Religion” বড় উন্মাদক জিনিস – মুসলমানেরা ধর্মের নামে উন্মত্ত হইয়া উঠে। ইহার পর রীতিমত ক্লাশ চলে আর কোন কথাবার্তা হয় নাই।” [ Letter from Waliullah Patwary to Ahmed Fazlur Rahman, Provost, Muslim Hall, 14 September, 1926. File-BM, Serial No. 523, Dhaka University Record Room. ]ড. এন. এম. বসুর ক্লাসে বাদলকৃষ্ণ গাঙ্গূলীর মন্তব্য ও কথোপকথনের বিবরণ দেয় প্রথম বর্ষ বিজ্ঞানের ছাত্র মুহম্মদ ইসমাইল হোসেন। তার বর্ণানুযায়ী -“… আমরা যখন ১২টা ৩০ মিনিটের সময় ডাক্তার N. M. Bose এর ক্লাসে আসি তখন তিনি জিজ্ঞাসা করেন ‘তোমাদের ঢাকা হলের কতজন arrest হইয়াছে?’ তখন বাদলকৃষ্ণসহ সকলে বলিয়া উঠে ‘কই আমাদের কেহ গেরেফতার হয় নাই।’ তখন ডা: N. M. Bose বলেন ‘তোমাদের না অরুণ মুখার্জী arrest হইয়াছে?’ তখন বাদল বলিয়া উঠে ‘পুলিশ তাহাকে innocent declare করিয়া ছাড়িয়া দিয়াছে।’ আবার ডা: N. M. Bose বলেন, ‘তোমরা ঢাকা হলের ছাত্ররা নাকি মুসলিম হলের একজন দারোয়ানকে মারিয়াছ?’ তখন তাহারা উত্তর দেয় ‘আমরা মারি নাই।’ তার পর তিনি নাথ মেসের কথা জিজ্ঞাসা করেন। তখন একজন বলে আহতদের মধ্যে না কি দুইজন মারা গিয়াছে। তখন ডা: বোস বলিলেন ‘অশিক্ষিত লোক কয়েকজন হিন্দু মারিয়াছে তাই বলিয়া তোমরা কি নিরীহ পথিক মারিবে ও শিক্ষিত লোক হইয়া টাউনের দিকে দৌড়াদৌড়ি করিবে?’ তখন সুকুমার সেন ও বাদলকৃষ্ণ কি পরামর্শ করিতেছিল। আমাদের ডা: N. M. Bose তাহাদিগকে জিজ্ঞাসা করেন ‘তোমরা কি পরামর্শ করিতেছ? তখন তাহারা বলিয়া উঠে ‘Sir আমরা শ্রীকৃষ্ণ নই যে প্রেম করিব। আমাদের স্বজাতিদিগকে মারিবে আর আমরা চেয়ে থাকব! আমাদের যদি ছোরা থাকিত তবে মুসলমানদের সহিত যুঝিয়া equilibrium produce করিতাম।’ ইহার পরে ডা: বোস আমাদিগকে জিজ্ঞাসা করেন ‘তোমরা নিজেদের influence exert করিয়া ইহা বন্ধ করিতে পার না?’ উত্তরে বলিলাম যে, ‘আমাদের ইহাদের সঙ্গে কোন সম্বন্ধ নাই এবং তাহাদের উপরে আমাদের কোন control নাই।’ তখন বাদলকৃষ্ণ বলে ‘Sir, তাহারা গুন্ডাদিগকে থামাইবে কেন? Sir Abdur Rahim ও আজিজ গুন্ডাদিগকে ত back করিতেছে।’ Dr. Bose remarked : “This is wrong”. তারপর Dr. Bose বলেন যে ‘তোমরা সকল হলের ছাত্ররা কোন agreement করে নিতে পার না?’ তখন বাদলকৃষ্ণ বলিল ‘উহাদের লক্ষ্য হইল ঢাকা হল ও জগন্নাথ হল। তাহারা ভয়েই ত অস্থির।” [ Letter from Md. Ismail Hossain to Ahmed Fazlur Rahman, Provost, Muslim Hall, 14 September, 1926. File-BM, Serial No. 523, Dhaka University Record Room. ]… ১৯৩৭ সালের ৭ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নোটিশ বোর্ডে দেখা গেল একটি পোষ্টার যেখানে ইসলাম ধর্ম ও মুসলমান সম্প্রদায় সম্পর্কে খুবই আপত্তিকর মন্তব্য লেখা ছিল। এই ঘটনা খুব সঙ্গত কারণেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলিম ছাত্রদের উত্তেজিত করে। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও হিন্দু-মুসলমান ছাত্রনেতৃবৃন্দের দ্রুত হস্তক্ষেপে ঘটনাটি কোন সাম্প্রদায়িক রূপ পরিগ্রহ করতে পারেনি।… উপাচার্য ড. রমেশচন্দ্র মজুমদারের বিবরণানুযায়ী ১৯৩৭ সালের ৭ সেপ্টেম্বর বেলা ১টার সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নোটিশ বোর্ডে ফুলস্কেপ কাগজে মুসলমান সম্প্রদায়ের প্রতি অশালীন, অশোভন ও অত্যন্ত আপত্তিকর মন্তব্য সম্বলিত লিফলেটটি দেখতে পাওয়া যায়। অত্যন্ত সঙ্গত কারণেই বহু সংখ্যক মুসলমান ছাত্র সমবেত হয়। কিন্তু নোটিশ বোর্ড বন্ধ থাকায় লিফলেটটি খুব ভালভাবে দেখা যাচ্ছিলো না। এ সময় প্রক্টর ড. সুধীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য নোটিশ বোর্ড খুলে লিফলেটটি নিজের দখলে নিয়ে আসেন। মুসলিম ছাত্রবৃন্দ লিফলেটটি দেখতে চাইলে প্রক্টর তার অপারগতা প্রকাশ করেন। ফলে মুসলিম ছাত্রদের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পায় এবং প্রায় ১৫০ জন ছাত্র প্রক্টরকে ঘিরে দাঁড়ায়। তারা লিফলেটের প্রতিলিপি দাবী করে। উপাচার্য ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সাথে পরিস্থিতি মোকাবিলা করেন।… ১৯৩৮ সালের জানুয়ারী মাসে সংস্কৃত বিষয়ের প্রথম বর্ষের ছাত্র প্রবোধচন্দ্র রায় শ্রেণীকক্ষের ‘ব্লাক বোর্ডে’ একটি স্বরচিত সংস্কৃত শ্লোক লিখে বিপদে পড়ে। অনিচ্ছাকৃত হলেও শ্লোকটি মুসলমান ছাত্রদের অনুভূতিতে আঘাত করে। প্রবোধন্দ্র রায় শ্রেণীকক্ষের ব্লাক বোর্ডে লিখেছিলো :”আকারান্তা মায়া লিঙ্গা, কথম তর্হি পিতা ভ্রাতা কচিৎ কচিৎ ব্যভিচারী যথা ছাগীর মুখে লম্বা দাড়ী।”বিষয়টি নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা গ্রহণে উদ্যত হলে প্রবোধচন্দ্র রায় ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং একই সাথে এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে না বলে প্রতিশ্রুতি দেয়। শেষ পর্যন্ত এই ঘটনাটি সকলে ভুলে যায়।… ১৯৪১ সালের মার্চ হতে জুন মাস পর্যন্ত ঢাকায় চলে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে মারাত্মক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। রক্তক্ষয়ী এই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সূচনা হয় “হোলী” খেলা দিয়ে। অভিযোগ করা হয় যে বোরখা পরিহিতা একজন মুসলমান মহিলাকে শাঁখারী বাজারে রঙ দেয়া হয়েছিলো। [ Reports of the Dacca Riots Enquiry Committee, (Alipore : Bengal Government Press, 1942), p. 2. ]এই পরিস্থিতিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় খোলা ছিল এবং বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় সাধারণভাবে ভীতি ছিল এবং ছাত্রবৃন্দ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার বাইরে কোন কোন স্থানে দাঙ্গাকারীদের দ্বারা নিগৃহীতও হয়েছিল। এসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে কলঙ্ক লেপন করা হল সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার মাধ্যমে। ১৩ এপ্রিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মোতাহার উদ্দীন আহমেদ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার মধ্যে দুপুর বেলা ছুরিকাহত হয়ে মৃত্যু মুখে পতিত হন। এই নিষ্ঠুর হত্যাকান্ড ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি করে, বিশেষভাবে সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে তীব্র প্রতিক্রিয়া এবং উত্তেজনার প্রকাশ ঘটে॥”

— ড. রতনলাল চক্রবর্ত্তী / ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রন্থিত ইতিহাস (১৯২১-১৯৫২) ॥ [ দি ইউনিভার্সেল একাডেমী – ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ । পৃ: ২১৪-২১৭ / ২৬৪-২৬৫ / ২৬৮-২৭০ ]

প্রবন্ধটি গ্রন্থনা করেছেন কায় কাউস।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন