, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১; ৯:৪০ অপরাহ্ণ


নিউইয়র্কে তারেক মাসুদ, সলিমুল্লাহ খান ও আলম খোরশেদ

তারেক মাসুদের প্রয়াণ দিবসে তার সম্পর্কে দু’একটি কথার শুরুতেই তার বন্ধু সলিমুল্লাহ খানের সাথে বিরোধ সম্পর্কে কিছু বলি। তারা দুজনই আহমেদ ছফার ভক্ত ছিল।

“সলিমুল্লাহ তখন খুব পোস্টমর্ডানিজম লিখছে। যাতে ভাষার খুব কাটাছেঁড়া করেছিলো সলিমুল্লাহ, সেটাকে নিয়ে তারেকের মন্তব্য সেমিওটিক হেয়ার স্পিটিং আপার্টি.…মানে চুলচেরা বিশ্লেষণ আর কি, তো এই শব্দ নিয়ে মজা আর কি। তখন সলিমুল্লাহ ঠিকই টের পেয়ে গেছে, তারেক খোটাটা তাকেই দিয়েছে।”

এ নিয়ে দুজনার মধ্যে ঝগড়া ও কথা কাটাকাটি পরবর্তীতে পারস্পরিক দূরত্ব তৈরি করেছিল।

সলিমুল্লাহ খান তার লেখায় তারেক মাসুদের যেমন প্রশংসা করেছেন, আবার এনলাইটেনমেন্টকামী ‘মানব ব্যবসায়ী’ ওরফে ‘হিউম্যানিজম’ অর্থাৎ স্বাধীনতা ব্যবসায়ীদের সাথে আপোষের অভিযোগ তুলেছেন। সলিমুল্লাহ খানের মতে, মাদ্রাসা শিক্ষাই আমাদের সমস্ত অনুন্নতির মূল, এটা সৎ যুক্তি নয়। মাদ্রাসা হতে আনুর মুক্তি আর বাংলাদেশের জাতীয় মুক্তি এক নয়।

তবে ‘মাটির ময়না'(২০০২) সিনেমার মূল বার্তা শুধু এটাই, এমনটা কখনো মনে হয়নি। ধর্মীয় টানাপোড়েন যেমন এখানে ছিল, রাজনৈতিক সংঘাত, সাংস্কৃতিক বৈচিত্রতা, চিত্ররূপময় বাংলাদেশ, পারিবারিক ও জাগতিক দ্বন্দ্বের দৃশ্যমান প্রতিচ্ছবি ‘মাটির ময়না’।

নদীতে বাঙালি মুসলমানের লাশ ভাসতে থাকে, শকুনের খাবার হয় মানুষের দেহ, জ্বলতে থাকে মানুষের সাজানো সংসার, তবুও কাজী সাহেবের মনে হয় না এসব পাকিস্তানিরা করতে পারে না। হারাম বলে নিজ সন্তান আমেনাকে জ্বরের সময় এলোপ্যাথিক চিকিৎসা না করিয়ে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যকে ত্বরান্বিত করলেন।

রোকনের অসুখের চিকিৎসায় মাদ্রাসা শিক্ষকরা যেভাবে জ্বীনের আছর পড়েছে বলে ভৌতিকভাবে চিকিৎসা করিয়েছেন, তা তারেক মাসুদ নিজে যদি কাকরাইলের কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা না নিয়ে আসতেন তবে তার পক্ষে এতো নিপুণভাবে তুলে ধরা এবং এমন অভিনব বিষয় নিয়ে কাজের সার্থকতা পাওয়া কঠিন হতো।

হাফিজ আর আমি তারেক মাসুদের মায়ের সাথে ফরিদপুরের ভাঙ্গায় দেখা করতে গেলে অশ্রুসজল চোখে আমাদের বলেছিল — “বাবা, আমি ‘মাটির ময়না’ দেখেছি আর হাউমাউ করে কেঁদেছি, এ যে তারেকের, আমার, ওর বাবার আর আমার মৃত কন্যা আসমার গল্প!”

ভারতবর্ষের নামজাদা চিত্রবিশারদ বাবা গাস্ত রোবের্জ ‘মাটির ময়না’কে সত্যজিতের ‘পথের পাঁচালী’র সমান বলে আখ্যায়িত করেছেন। আনু আর তার বোনের চরিত্র, অপু আর তার বোন দুর্গার আদল পেয়েছে। দুই সংসারেরই বোনের মৃত্যু সংসারে আগুন লাগিয়েছিল। তবে অপুর সংগ্রামের প্রেক্ষাপট আর আনুর সম্পূর্ণ ভিন্ন।

‘পথের পাঁচালী’তে হিন্দু নিম্ন মধ্যবিত্তের পাঁচালী, ওখানে গোটা বাঙালি নিম্ম মধ্যবিত্তের পাঁচালীটা নেই, থাকা সম্ভব নয়। বাকি বাংলার যে গল্প, বিশেষ করে মুসলমান বাঙালি নিম্নমধ্যবিত্তের গল্প, সেই গল্পের অংশবিশেষ হলেও ‘মাটির ময়না’য় উঠে এসেছে।
‘কাগজের ফুল’ নির্মিত হলে হয়তো আরো পরিষ্কারভাবে ফুটে উঠতো ‘৪৭-এর পর থেকে বাঙালি মুসলানমাদের সংগ্রামের চিত্র এবং তারেক মাসুদের মনোভাব।

‘মাটির ময়না’ সিনেমার মেকিং নিয়ে একটা পোস্টস্ক্রিপ আছে ইউ টিউবে। দেখলে বুঝা হয় কত আত্নত্যাগ ও সাধনা দিয়ে এই অসামান্য সিনেমাটি নির্মাণ করেছেন।
তবে এই সিনেমার চেয়ে ‘মুক্তির গান'(১৯৯৫) ও ‘আদম সুরতে’র (১৯৮৯) মূল্য কোন অংশে কম নয়।

‘মুক্তির গান’ তারেক মাসুদকে একজন সুদক্ষ ও পরিণত নির্মাতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
এই ডকুফিশনটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রামাণ্য দলিল। এতে ফুটে উঠেছে মুক্তিযুদ্ধকালীন নিরীহ বাঙালির উপর বর্বর হামলার দৃশ্য, যে হামলার প্রতিটা বুলেট ক্রয়ের অর্থে আমাদের কষ্টার্জিত অর্থ ছিল। এ প্রামাণ্য চিত্রে উঠে এসেছে পাশ্ববর্তী দেশ ভারতের আশ্রয়কেন্দ্রে দিশেহারা বাংলাদেশিদের মানবেতর জীবনের মধ্যেও উদ্ভাসিত দেশের স্বপ্ন, মুক্তির স্বপ্ন।

এই প্রামাণ্যচিত্রের মূল ফুটেজ(প্রায় ২০ ঘণ্টার) সংগ্রহ করেন মার্কিন নির্মাতা লেয়ার লেভিন তারেক মাসুদ ও তার দলবল সাথে নিয়ে। নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি বাংলাদেশের দুর্দশার চিত্র চিত্রায়ণ করেন। তিনি এ সময় পায়ে গুলিবিদ্ধও হন।
এই প্রামাণ্য চিত্র মুক্তি পেলে মুক্তিযুদ্ধের এই জীবন্ত দৃশ্য দেখার জন্য মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ে। তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনাও পাবলিক লাইব্রেরিতে এসেছিলেন ‘মুক্তির গান’ দেখার জন্য।

চলচ্চিত্রকে জীবনের ধ্রুবতারা বলে মনে করা তারেক মাসুদ ‘আদম সুরত’ দিয়ে সিনেমা যাত্রা শুরু করেন। এই সিনেমাটি নির্মাণের জন্য তাকে দেশের বাইরে বিভিন্ন জায়গায় দীর্ঘ সময় দিতে হয়েছে, কেননা শেখ মোহাম্মদ সুলতান বা এস.এম. সুলতানের জীবনের একটা অংশ করাচি, লাহোর, কাশ্মীর ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অবস্থান করেছিলেন।
অনেকে মনে করেন ‘আদম সুরত’ কিংবদন্তি শিল্পী এস.এম. সুলতানের জীবনী নিয়ে নির্মাণ করা ডকুমেন্টারি। আসলে ব্যাপারটি তা নয়।

ছবিটি সুলতানের চোখ দিয়ে দেখা গ্রাম বাংলার কৃষি ও গ্রামীণ সংস্কৃতি নিয়ে। যা সুলতানের শিল্প সাধনারও মূল উপজীব্য বিষয় ছিল এবং প্রামাণ্য চিত্রটি তার উপর নির্মিত না হয়ে এভাবে নির্মিত হয়েছিল সুলতানের ইচ্ছাতেই।

৪৭ মিনিটের এই প্রামাণ্য চিত্রটির নির্মাণ কাজ শুরু হয় ১৯৮২ সালে এবং শেষ হয় ১৯৮৯ সালে। একটু সহযোগিতা পেলে এতো দীর্ঘ বছর লাগার কথা না।

সলিমুল্লাহ খানের ভাষায় বলা যায়, ‘ঢাকার কুপমণ্ডূক মধ্যম শ্রেণীর খাইয়া পরিয়া এহেন ছবিতে হাত দেওয়া সহজ ছিল না। কি করিয়া তারেক এই অসাধ্য সাধন করিলেন তাহা আজও ভাবিয়া শেষ করিতে পারি নাই।’

এটা ভাবলে অভিভূত হতে হয়, এস.এম. সুলতানের মতো একজন জীবন্ত কালপুরুষ কথা বলছে, তার পিছনে তারেক মাসুদ। সেই নড়াইলের চিত্রা পাড়ের পোড়া প্রাচীন বাড়িতে জীবন্ত সুলতানের সাথে অসংখ্য বেজি, বিড়াল, সাপ, কুকুর বসে আছে। সুলতান নিজেই রঙ তৈরি করে বিশাল ক্যানভাসে ছবি আঁকছে আর তারেক মাসুদ ‘আদম সুরত'(The Inner Strength) তৈরি করছে। এমন দৃশ্য আমরা কেবল কল্পনায় আঁকতে পারি।
মানুষের ভালোবাসার ক্যানভাসে বেঁচে থাকো তারেক মাসুদ।

লেখার ঋণ:
১. তারেক মাসুদ: বিস্মৃতি ও স্মৃতি: সলিমুল্লাহ খান
২. যদ্যপি আমার গুরু: আহমদ ছফা
৩.আমি তারেকের বিবর্তনের ইতিহাসটাকে বোঝার চেষ্টা করতাম: আলম খোরশেদ
৪. জীবনপঞ্জিতে তারেক মাসুদ: মোঃ মোস্তাক খান

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন