, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১; ৯:১৫ অপরাহ্ণ


ইমাম হুসাইন (রাঃ) : এক অভূতপূর্ব চরিত্র ! যখনই অন্যায় ও অসত্য তার দাপট নিয়ে হাজির হয়, তাঁর সমুজ্জ্বল চরিত্র চলে আসে আমাদের মানসপটে। যুগে, যুগে ইয়াজিদ বা আবদুল্লাহ বিন যিয়াদদের প্রতিহত করবার জন্য তাঁর প্রতিরোধের ইতিহাস চলে আসবে সামনে। তিনি জীবন বিপন্ন করেছেন, সর্বোচ্চ ঝুঁকি নিয়েছেন। ত্যাগ স্বীকার করেছেন জান ও মালের; তবু অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা থেকে পিছু হটেননি। কারবালায় যে রক্তস্রোত বয়ে গেছে, তা সত্য-মিথ্যার লড়াইয়ের শ্রেষ্ঠ এক নিদর্শন! যতোকাল এই দ্বন্দ্ব থাকবে, ততোকালই তিনিই প্রাসঙ্গিক থাকবেন। তাঁর আলোকজ্জ্বল দ্যুতি নিভে যাওয়ার নয়।

পরিবারের মাত্র ৭২ জন সদস্য ছিল তাঁর সাথে। ছিলনা কোনো সামরিক প্রস্তুতি কিংবা পর্যাপ্ত রসদ। মরুভূমির তপ্ত বালুকায় তবু প্রায় এক সপ্তাহ অবরোধ করে রাখা হল তাদের। পানির জন্য শিশুদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠল বাতাস। সামনে চার হাজার সশস্ত্র সৈন্যের ব্যারিকেড। তাদের পেরিয়ে ফোরাতের জল নেবার কোনো অবকাশ নেই। ইমাম হুসাইন (রাঃ) ৩টি প্রস্তাব দিলেন ইয়াজিদ বাহিনীকে—

‘আমাকে পেছনে মদীনায় ফিরে যেতে দাও। অথবা ইয়াজিদের দরবারে নিয়ে চল, আমি স্বয়ং তার সাথে কথা বলব। কিংবা সেই সমস্ত জায়গায় আমাকে যেতে দেয়া হোক, যেখানে মুসলিম সেনাদল আল্লাহ’র রাস্তায় জিহাদে রত। আমি তাদের সাথে জিহাদে অংশ নিতে চাই।’

কুফায় চলে গেল বার্তা বাহক। প্রস্তাব শুনে আবদুল্লাহ বিন যিয়াদ পরিচয় দিলেন সর্বোচ্চ ক্রুরতার। বললেন, ‘অবশ্যই তাঁকে আমার কাছে এসে ক্ষমা চাইতে হবে। অন্যথায় যুদ্ধের কোনো বিকল্প নেই।’ যিয়াদের চরম ধৃষ্টতাপূর্ণ কথা জানার পর, ইমাম সিদ্ধান্ত নিতে দেরী করলেননা। হকের পথে থেকে উমাইয়াদের পদলেহী যিয়াদের কাছে ক্ষমা চাওয়ার মত মানুষ যে তিনি নন, এটাই সর্বজনীন সত্য। বস্তুত ইমাম হুসাইন (রাঃ) যে সুমহান ও উন্নত চরিত্রের উপরে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন, তাতে করে ক্ষমা চাওয়াটা কোনোভাবেই সম্ভব ছিলনা।

তাই মৃত্যু নিশ্চিত জেনেই তিনি লড়াইয়ের শপথ নিলেন। রাতে সঙ্গীদের সবার উদ্দেশ্যে ভাষণ দিলেন। তাঁকে ময়দানে রেখে, অন্যদের চলে যাবার স্বাধীনতা দিলেন। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী—একজনও মৃত্যু ভয়ে ইমামকে ছেড়ে যাননি। উপরন্তু ইয়াজিদ বাহিনীর অল্প কিছু সৈন্যসহ হুর নামের এক যোদ্ধা যোগ দিলেন ন্যায়ের পক্ষে। সারারাত ইবাদতশেষে, ইমাম তরবারী হাতে নিলেন সকাল বেলায়।৬৮০ খ্রিস্টাব্দের ১০ অক্টোবর, (৬১ হিজরীর ১০ মহররম) শুরু হল— পৃথিবীর সবচেয়ে প্রহসনের যুদ্ধ। একদিকে অশ্বারোহী ,তীরন্দাজ ও পদাতিক বাহিনীসহ উমর বিন সাদের নেতৃত্বে থাকা হেভিওয়েট চার হাজার সৈন্য। আর অন্যদিকে ১০০ জনের চেয়েও কম একটি ক্ষুদ্র দল। যারা ইতিমধ্যেই ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় দৈহিকভাবে দুর্বল। তবে দুর্বল ছিলনা সত্যাশ্রয়ীদের হৃদয়। তাই প্রচন্ড যুদ্ধ করলেন প্রতিটি সদস্য। কেউই ইমামকে আগে শহীদ হতে দিতে চাননি; বরং নিজেরাই একে একে শহীদ হলেন সবাই।

কারবালা যুদ্ধের একটি কাল্পনিক চিত্র

শেষ বিকেলের রণক্ষেত্রে—ইমাম ব্যতিত আর কেউই অবশিষ্ট থাকলনা সত্যের পক্ষে। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) এর প্রাণপ্রিয় দৌহিত্র, শেরে খোদা হযরত আলী ও নারীকূল শিরোমণি হযরত ফাতিমা (রাঃ) এর আদরের সন্তান—যার শরীরে নবীজীর পবিত্র রক্তের উত্তরাধিকার বইছিল—সেই ইমাম এবার একাই মুখোমুখি হলেন বিপক্ষের পুরো সৈন্যদলের বিরুদ্ধে। পেছনে পরিবারের নারী আর শিশুদের তাঁবু। একের পর এক আঘাতে জর্জরিত হলেন তিনি। শরীরে থেকে ঝরতে থাকল পবিত্র রক্তের ধারা।

বর্ণনাকারীদের মতে —

‘তাঁর আগে বা পরে আর কোনো মানুষকে পুরো একটা সেনাদলের বিরুদ্ধে এতোটা সাহস আর পরাক্রম নিয়ে ‍যুদ্ধ করতে দেখা যায়নি। মনে হচ্ছিল যেন এক অসম সাহসী সিংহ তাঁর সমস্ত শক্তি নিয়ে একদল হিংস্র নেকড়ে বাহিনীর বিরুদ্ধে হুংকার ছেড়ে লড়ছিল। তিনি যেদিকেই তরবারি চালিয়েছিলেন—ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল শত্রুদল।’

তারপর, এক পর্যায়ে ক্লান্ত হয়ে পড়লেন। পানির তৃষ্ণায় ফোরাতের কাছে গেলেন। কিন্তু জল আর পান করা হলনা। তার আগেই তীরবিদ্ধ হলেন ইমাম। রক্তক্ষরণে অবসন্ন সেই মহান পুরুষকে তখন চাইলেই শত্রুরা হত্যা করতে পারত। কিন্তু কেউই নবী দৌহিত্রের হত্যার দায় নিতে চাইছিলনা। সবার মাঝেই বেশ একটা দ্বিধাবোধ করছিল।

ইতিহাসখ্যাত ফোরাত নদী


অবশেষে শিমার বিন যুল জওশান নামের এক সেনা কমান্ডার তার নিকৃষ্ট বাহিনী নিয়ে ইমামের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। বর্শার আঘাতে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন সত্যের সেনাপতি। তরবারি দিয়ে চারদিক থেকে তাঁকে আঘাত করা হল। আর তারপর সিনান ইবনে আনাস নামক এক নরপশু ইমামকে জবাই করে শিরোচ্ছেদ করে ফেললো। শহীদ হলেন—বিশ্বনবীর হৃদয়ের ধন। সেই সাথে কারবালার বালুকা সিক্ত হল ইমামের রক্তধারায়।

তাঁর পবিত্র মস্তক নিয়ে, কুফায় রওনা হল ইয়াজিদ বাহিনী। সেখান ঘোড়ার পায়ের নিচে শহীদদের লাশ অবমাননার পর, দামেস্কে ইয়াজিদের দরবার অবধি নবী বংশের সাথে যা যা করা হয়েছে—তা মানবতার এক কলঙ্কিত ইতিহাস।শহীদদের লাশ ও তাদের ব্যথিত পরিবারের সাথে এরচেয়ে ঘৃণিত অপরাধ জগতে কমই সংঘটিত হয়েছে। ইয়াজিদ মৌখিক কিছু সান্তনার সংলাপ দিয়ে নারী শিশুদের মদীনায় পাঠানোর ব্যবস্থা করে। কিন্তু বিচার হয়নি আবদুল্লাহ বিন যিয়াদ, উমর বিন সাদ, শিমার, সিনান বা সেনাদলের অন্য কোনো সদস্যের।ইমাম হুসাইন (রাঃ) ও তাঁর সঙ্গী-সাথীদের হত্যার কোনো সুষ্ঠু তদন্ত বা বিচার হয়নি। এ থেকেই বুঝে নিন ইয়াজিদ এর ভূমিকা ও আবদুল্লাহ বিন যিয়াদের পৈশাচিকতা।

ইমাম হুসাইন (রাঃ) এর সমাধি

সবাইকে তাদের পদে বহাল রেখে, ইয়াজিদ বরং নিজেদের রাজতান্ত্রিক উমাইয়া শাসনকেই সুদৃঢ় করার কাজ করে গেছেন। অথচ ইমামের অবস্থান ছিল তাদের অন্যায়ভাবে ক্ষমতা দখল ও অবৈধ শাসনের বিরুদ্ধে। তিনি যুদ্ধ করার কোনো মানসিকতা কিংবা সামরিক প্রস্তুতি নিয়ে কারবালায় যাননি। তবু তাঁকে পরিবারসহ শহীদ করে দেওয়া হয়। যাই হোক, পৃথিবীতে যতোকাল সত্য-মিথ্যার লড়াই থাকবে, ইমামের আত্মত্যাগ ও শহীদী চেতনাও ততোকালই বিদ্যমান থাকবে। যখনই কোনো জালিম তার পাশবিক শাসন নিয়ে হাজির হবে, তখন তার মোকাবেলায় হযরত ইমাম হুসাইন (রাঃ) এর অসম সাহসী আত্মত্যাগ সেখানে প্রেরণা যোগাবে আলোকবর্তিকার মত। মানবতার জন্য সুশাসন ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠায় নবী দৌহিত্রের এই অপরিসীম ত্যাগ—দিয়ে যাবে সমুজ্জ্বল চেতনার শিক্ষা। কারবালার মরুতে রক্তের দাগ, সে তো মুছে গেছে বহুকাল আগেই; কিন্তু ইমামের রক্তের তেজ—সত্যাশ্রয়ীদের বুক থেকে কখনোই মুছবেনা।

সহায়ক গ্রন্থাবলী :

১) আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া : ইমাম ইবনে কাসির

২) মৃত্যুর দুয়ারে মানবতা : মাওলানা আবুল কালাম আজাদ

৩) Massacre of Karbala : Yasir Qadhi (Lecture)

৪) ইমাম শাবী, আল ওয়াকিদি প্রমুখ ইতিহাসবিদদের বিবরণ।

৫) Arabs in History : Bernard Lewis

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন