, ১ আগস্ট ২০২১; ১০:১০ অপরাহ্ণ


Photo: Jacinda Ardern

জেসিন্ডা আরডার্ন দ্বিতীয় বারের মতো নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিন হয়েছেন। গত ১৭ অক্টোবর নিউজিল্যান্ডের সংসদ নির্বাচনে জেসিন্ডা আরডার্নের দল-লেবার পার্টি একাই পেয়েছে ১২০ আসনের মধ্যে ৬৪টি। ফলে লেবার পার্টি এককভাবেই সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। বিগত পঞ্চাশ বছরের ইতিহাসে লেবার পার্টি নিউজিল্যান্ডে এত ভালো ফলাফল কখনোই করতে পারেনি।নির্বাচনে লড়াইটা হয়েছে মূলত জুডিথ কলিন্সের ন্যাশনাল পার্টি ও জেসিন্ডা আরডার্নের দল লেবার পার্টির মধ্যে। জেসিন্ডার দল লেবার পার্টি পায় কাস্টিং ভোটের ৪৯% এবং প্রধান বিরোধীদল জুডিথ কলিন্সের ন্যাশনাল পার্টি বক্সে যায় ২৭% ভোট। বিগত চব্বিশ বছরের ইতিহাসে নিউজিল্যান্ডে এই প্রথম বারের মতো কোয়ালিশন ছাড়াই এককভাবে কোনো দল সরকার গঠন করতে যাচ্ছে।

১৯৯৬ সাল থেকে নিউজিল্যান্ডে একটি ব্যতিক্রমধর্মী সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা চলে আসছে। যার নাম মিক্স মেম্বার প্রোপরশনেট। এমএমপি নামেই এই সিস্টেমটি পরিচিত।এই সিস্টেমে একজন ভোটার দুটি ভোট দেন-একটি দেন পছন্দের দলকে। অন্যটি এমপি প্রার্থীকে। কাউকে নিউজিল্যান্ডের সংসদে এমপি হতে হলে হয় সরাসরি সংখ্যা গরিষ্ঠের ভোটে তাকে পাস করতে হবে অথবা কোন দলকে কাস্টিং ভোটের ৫% ভোট পেতে হবে।কোনো দলের একজন এমপি ও যদি পাস না করে এবং সেই দল যদি ৫% ভোট পায় তবুও ভোটের আনুপাতিক হারে সংসদে সেই দলের প্রতিনিধিত্ব বা এমপি থাকবে। সিস্টেমটা আসলেই প্রশংসার দাবি রাখে। বাংলাদেশেও এমন অনেক রাজনৈতিক দল আছে,সারা দেশে যাদের পাঁচ- দশ লাখ ভোট আছে কিন্তু এমপি নির্বাচনে একজনও পাস করতে পারে না। এমএমপি সিস্টেম চালু হলে অনেক ছোট ছোট দলের প্রতিনিধিরাও সংসদে যেতে পারতো।

নির্বাচনের এমন সিস্টেম বাংলাদেশেও অদূর ভবিষ্যতে চালু করার দাবী জানাই।রাজনীতিতে ভিন্ন মতের চর্চা যেভাবে বাড়ছে তার রিফ্লেক্সাশন সংসদে দেখতে চাইলে বর্তমান সংসদীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থায় মিক্স মেম্বার প্রোপরশনেট বা এমএনপি সিস্টেম প্রতিটি রাষ্ট্রের জন্যই সেরা বিকল্প হতে পারে।

নিউজিল্যান্ডের সংসদের মেয়াদ তিন বছর। ২০১৭ সালে ২৬ অক্টোবর ৩৭ বছরের তরুণী জেসিন্ডা আরডার্ন নিউজল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়ে সারা বিশ্বে হইচই ফেলে দিয়ে ছিলেন। ২০১৭ সাল থেকে জেসিন্ডা তার দল লেবার পার্টির সভাপতি হিসাবেও দায়িত্ব পালন করে আসছেন। ২০০৮ সাল থেকে তিনি এমপি নির্বাচিত হয়ে আসলেও আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসেন প্রথম বার প্রধানমন্ত্রী হয়ে। প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকালে সন্তান জন্ম দিয়েও তিনি আলোচনায় এসেছিলেন। নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্ট চার্জের মসজিদে সন্ত্রাসী হামলার পর মুসলমান সম্পর্কে পশ্চিমা বিশ্বের সংশয় সন্দেহকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নিজ দেশের মুসলমানদের পাশে দাঁড়িয়ে সেই কঠিন সময়েও সারা বিশ্বের প্রশংসা কুড়িয়েছেন। জেসিন্ডার বলিষ্ঠ নেতৃত্ব মুসলমানদের এটা বিশ্বাস করতে সহায়তা করেছে যে-না, তুমি একা নাও, আমিও আছি তোমার পাশে। তিনি তার দেশবাসীকে এটা বুঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন -তিনিও তাদেরই একজন। আক্রান্ত মুসলিমদের পাশে দাঁড়িয়ে সারা দুনিয়ায় তিনি সেই সময় সাহসী নেতৃত্বের মর্যাদায় আসীন হয়েছেন।নির্বাচনে সেই ঘটনার প্রভাবও নিশ্চয়ই পড়েছে।

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনটি মূলত সেপ্টেম্বরে হওয়ার কথা ছিল কিন্তু করোনা মহামারীর জন্য একমাস পিছিয়ে দেয়া হয়। মাস খানেক যাবত নিউজিল্যান্ডে একজন করোনা রোগীও সনাক্ত হচ্ছে না। এই সাফল্যের পেছনের মানুষটির নাম নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আরডার্ন। করোনা প্রাদুর্ভাবের শুরু থেকেই জেসিন্ডার প্রশাসন একের পর এক সফল উদ্যোগ নেয় এবং তার জনগণও সেই সফল উদ্যোগের ফলাফল পায়।করোনা মহামারীর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য জেসিন্ডা বিশ্বনেতাদের আগ্রহের কেন্দ্র বিন্দুতে পরিনত হয়েছেন আগেই। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের স্নাতক জেসিন্ডা নিউজিল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী হেলেন ক্লার্কের দপ্তরে প্রথমে একজন গবেষক হিসাবে যোগ দিয়েছিলেন।পরবর্তীতে ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের উপদেষ্টা হিসাবে কাজ করেছেন।ছাত্র জীবনেই নিজেকে জড়িয়ে ছিলেন রাজনীতিতে।নিউজিল্যান্ডের মানুষের সুখ দুঃখে জেসিন্ডা আরডার্ন এক বিশ্বস্ত ভাগীদারের নাম।

তাই তো করোনা মহামারীর এই সংকটময় সময়ের নির্বাচনেও জনগণ তার উপর আস্থা রেখেছে,ভোট দিয়েছে,নির্বাচিত করেছে।

মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে, মানুষের জন্য কাজ করে, একজন নারী সফল নেতৃত্বের মাধ্যমে সারা বিশ্বকে দেখিয়ে দিলেন -মহামারীর সময়েও কিভাবে মানুষের হৃদয় জয় করা যায়।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন