, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১; ১০:১৪ অপরাহ্ণ


ফটোঃ প্রতিকী
‘বরং নিজেই তুমি লেখোনাকো একটি কবিতা—’ অ্যাকাডেমির বিরুদ্ধে আমাদের সমকালীন কবিদের অনেকেই জীবনানন্দ দাশের এই বাক্যটি নানা আদলে ব্যবহার করেন। অ্যাকাডেমি বলতে প্রতিষ্ঠান, আর কবি বলতে সকল শাখার সাহিত্যিকদের বোঝাতে চাইছি। সমকালীন কবি এবং অ্যাকাডেমির মধ্যে যেন একটা দূরত্ব অনুভব করছি। উভয় পক্ষের প্রতি আন্তরিকতাসূত্রেই এই দূরত্ব বা বিরোধের কার্যকারণ খোঁজার চেষ্টা করছি। 
আমার জানা মতে, অ্যাকাডেমির স্বীকৃতি নিয়ে কোনো মহৎ সাহিত্য কি, সাহিত্যই রচিত হতে পারে না। অন্য অনেক কিছু হতে পারে — গবেষণা, সামাজিক, রাজনৈতিক পরিবর্তন ইত্যাদি; কিন্তু সাহিত্য নয়, কবিতা নয়। হ্যাঁ, সাহিত্যসংশ্লিষ্ট অ্যাকাডেমিগুলোতে সাহিত্য-কবিতা নিয়ে গবেষণা হয়, লেখালেখি হয়। সেইসব কাজ তার নিজস্ব রীতি মেনে সম্পন্ন হয়।
প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা উত্তরাধুনিক কালের একটা ট্রেন্ড। সবাইকে প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই থাকতে হবে এমন কোনো কথা নাই। আবার প্রতিষ্ঠানের ভেতর ঢুকে তার অন্দরমহল-কোনাকানচি দেখেও প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা করা যায়। প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত সবাই ‘প্রতিষ্ঠানমণ্ডুক’ হয়ে যায়, সে কথাও বোধহয় বলা যায় না।
আমি ব্যক্তিগত একটা কথা শেয়ার করি। একটি পিরিওডিকাল চলচ্চিত্রে অভিনয় করার পাবলিক বিজ্ঞাপনে সাড়া দিয়ে অডিশন দিতে গিয়েছিলাম। ছবির পরিচালক বাংলাদেশের একজন কবি, বড় কবিই। আমি সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক পরিচয়ে যাই নাই। তারপর আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক জেনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের এক হাত দেখে নিলেন তিনি। আমার অবশ্য তেমন গায়ে লাগে নাই। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার শ্রেণির প্রতি আমার বিশেষ  ভক্তি-পিরিত নাই। আমি তাঁর কথা এনজয় করলাম। তাঁর ক্ষ্যাপাটে আলাপ আমার ভালো লাগলো। আমি তাঁর কবিতারও একজন পাঠক। পরে অবশ্য তাঁর সাথে আমার দূরত্ব থাকে নাই। তাঁর নাম বলাই যায় — টোকন ঠাকুর।
২০২০ এর বইমেলায় কবি মারজুক রাসেলের কবিতার বই ‘দেহবণ্টনবিষয়ক দ্বিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষর’ কয়েক হাজার কপি বিক্রি হয়। তার মানে এতগুলো মানুষ  তাঁর কবিতার পাঠক । আমিও কিনেছি সেই বই, পড়েছি। কেমন লেগেছে, সেটা এখন এই আলাপের বিষয় না। বিষয় হচ্ছে অনেকে নাকি মারজুক রাসেলের কবিতার বইয়ের এই বিক্রিকে ‘কবিতাউন্মাদনা’ এবং কবিকে ‘গরিব পাঠকে’র ‘হিরো আলমে’র সাথে তুলনা করেছে। এক টিভি অনুষ্ঠানে  কয়েকজন কবি এর দায় চাপালেন অ্যাকাডেমির ওপর। বিএ, এমএ, এমফিল, পিএইচডি-ওয়ালারাই নাকি এই প্রোপাগান্ডা ছড়িয়েছে। কিন্তু আমার  পরিচিতমহলের কবিতাসংশ্লিষ্ট অ্যাকাডেমিক কাউকে এই বইয়ের বিপক্ষে কথা বলতে দেখি নাই। দায়টা তাহলে কার? আমাদের লেখক-পাঠকদের একটু ভেবে দেখতে হবে, আমাদের পাঠক কারা। বাংলা বিভাগের ছাত্র-শিক্ষকরা কেবল কবিতার পাঠক না। বরং এর বাইরে কবিতা ও সাহিত্যের এক বিপুল পাঠক শ্রেণি আছে। কিন্তু সেই শ্রেণির কতো অংশ এই পুঁজিসর্বস্ব ও ধর্মনিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্রসমাজে ‘উদার’ ও ‘প্রগতিশীল’ মন নিয়ে কবিতা পড়তে পারে? ফলে  রক্ষণশীল ও পরশ্রীকাতর শ্রেণিকে অ্যাকাডেমিক শ্রেণির সাথে গুলিয়ে ফেললে বোধহয় ভুল হবে। 
এবার কবিদের আরও কিছু অভিযোগের কথা বলতে চাই। যেমন বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টাররা সমকালীন গল্প-কবিতা পড়েন না, লেখেন না; লেখেন কেবল মৃতদের নিয়ে। ব্যক্তিগত আলাপে, পাঠচক্র-চাচক্র কিংবা ফেসবুকে কোনো কোনো কবি-কথাসাহিত্যিকের উচ্চারণে কখনো কখনো এমন কথা শোনা যায়।  এইসব ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার বলতে মনে হয় বাংলা বা ইংরেজি বিভাগের মাস্টাররাই আওতাভুক্ত হন। আরও অভিযোগ — বিশ্ববিদ্যালয়ের এই মাস্টাররা কবিতা লিখতে জানেন না। তাঁরা কেবল গৎবাঁধা সিলেবাস পড়ান।  আমার কথা হলো — যার কাজ যা, সে তা-ই করবে। একজন শিক্ষকও কবি হতে পারেন। তবে শিক্ষক জন্যই তিনি কবি  হয়েছেন তা-ঈ না। আর সমকালীন সকল কবির কাব্যালোচনা এই শিক্ষকদের করতেই হবে কেন?
উপরিতলের অনেক বিরোধ, দূরত্ব ও অভিযোগের কথা হলো। আমি কিন্তু কবি ও অ্যাকাডেমির মধ্যে সম্মিলন ও যৌথায়নই দেখি। আর অ্যাকাডেমি বলতে সাহিত্যসংশ্লিষ্ট বিভাগকেই যদি বোঝাই, তাহলে দেখা যাক প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণায় সমকালীন কবিরা কীভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে পিএইচডি ও এমফিল গবেষণা অপরাপর অ্যাকাডেমিক রীতি মেনেই সম্পন্ন হয়।
আমার সাম্প্রতিক এ-সংক্রান্ত এক পর্যবেক্ষণে যা পেলাম তাতে দেখা যাচ্ছে, কবিতা বিষয়ে বিশ শতকের তিরিশ-চল্লিশের দশক নিয়ে বিস্তর কাজ হয়েছে। বাংলাদেশের ষাটের দশকের কবিতা নিয়ে কাজ করেছেন বায়তুল্লাহ্ কাদেরী। তিনি নিজেও নব্বইয়ের একজন কবি। ষাটের দশকের কবিতা ও জাতীয়তাবাদী চিন্তা নিয়ে আরেকটি প্রাগ্রসর কাজ করেছেন কুদরত-ই-হুদা। একুশ শতকের গবেষকরা বাংলাদেশের সত্তর-আশি-নব্বইয়ের দশকের কবিদের নিয়ে অ্যাকাডেমিক গবেষণা করছেন। আলাদাভাবে অসংখ্য প্রবন্ধতো লেখা হয়েছেই,  গবেষণাপত্রের সূচিপত্রেও সমকালের সক্রিয় কবি ও কবিতার উল্লেখ আছে। যেমন ২০১৩ সালের এক গবেষণার অধ্যায়বিন্যাসে আশির দশকের খোন্দকার আশরাফ হোসেন, মাসুদ খান, সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ, আমিনুর রহমান সুলতান এবং নব্বইয়ের বায়তুল্লাহ্ কাদেরী, মুজীব ইরম, টোকন ঠাকুর, শামীম রেজা, ওবায়েদ আকাশ উল্লিখিত হয়েছেন। এছাড়াও একাধিক গবেষণার ভেতরে উপর্যুক্ত কবি ছাড়াও নব্বইয়ের দশকের চঞ্চল আশরাফ, সরকার আমিন, আলফ্রেড খোকন, ব্রাত্য রাইসু, শোয়াইব জিবরান প্রমুখ কবি আলোচিত হয়েছেন।
আমার পড়ামতে, অ্যাকাডেমির সাথে যুক্ত কানিজ ফাতেমা বর্ণার নব্বইয়ের দশকের কবিতা নিয়ে প্রবন্ধটিও সমৃদ্ধ রচনা, যা বাংলা একাডেমি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। ২০২০ সালে প্রকাশিত বাংলা বিভাগের শিক্ষক সিরাজ সালেকীনের একটি বই ‘কবিতায় নৃগোষ্ঠী : মূলত কেন্দ্র থেকে দেখা’তে একুশ শতকের প্রথম ও দ্বিতীয় দশকের অন্তত ২৫ জন কবির কবিতার উল্লেখ আছে। সত্তর-আশি-নব্বইয়ের উল্লেখ তো আছেই। একই বছর প্রকাশিত ‘শতাব্দীসন্ধির কবিতা : দিশা ও বিদিশা’য় বাংলা বিভাগের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক বেগম আকতার কামাল আশি ও নব্বইয়ের দশকের স্বতন্ত্র আটজন কবিতা নিয়ে বিশদ ও নবমূল্যায়নধর্মী যে আলোচনা করেছেন, তাতে অ্যাকাডেমির সাথে কবিদের দূরত্বতো দেখি না। একুশ শতকের কবিতা নিয়েও সেই বইয়ে একটি পৃথক পরিচ্ছেদ/প্রবন্ধ আছে। 
এখন প্রশ্ন হতে পারে, একুশ শতকে যাঁরা লিখছেন, তাঁরা আরও বেশি আলোচিত হচ্ছেন না কেন অ্যাকাডেমিক পরিমণ্ডলে? আমি বলবো, গবেষণার জন্য খানিকটা সময় দিতে হয়। ষাটের দশকের কবিতা নিয়ে নব্বইয়ের দশকে কাজ শুরু হয়েছে। সত্তর-আশির দশক নিয়ে একুশ শতকের শূন্য দশকেই শুরু হয়েছে। নব্বইয়ের দশক নিয়ে এখন নানামাত্রিক কাজ চলমান। অ্যাকাডেমির সাথে যুক্ততা সূত্রেই জানি, একুশ শতকের কবিতা নিয়েও কাজ শুরু হয়ে গেছে। এ-তো গেল একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটিমাত্র বিভাগের কথা; এমন অনেক কাজ হচ্ছে বাংলাদেশের অন্যান্য অ্যাকাডেমিগুলোতেও।
এবার দৃশ্যমান কিছু ঐক্যের কথা বলা যাক। দীর্ঘমেয়াদী বা স্বল্পমেয়াদী অনেকগুলো লিটল ম্যাগ বা সাহিত্যপত্র ঢাকা থেকে বের হয়। সেখানে তো অ্যাকাডেমিক ও ননঅ্যাকাডেমিক লেখকদের এক মহামিলনমেলা। হয়তো কোনো কবি পত্রিকার সম্পাদক, নিচ্ছেন বাংলার শিক্ষকের প্রবন্ধ-গল্প-কবিতা। কর্পোরেট ‘সাহিত্যহাউজ’গুলো থেকেও যে রঙচঙা ম্যাগাজিন বের হয় সেখানেও এ যুগ্মীভবন। আবার অনেক শিক্ষক নিজ উদ্যোগে পত্রিকা বের করেন। সেখানে লেখার জন্য ননঅ্যাকাডেমিক কবিদের কাছেই তো কবিতা চান। কবি কবিই। পেশা দিয়ে তাঁকে আলাদা করা যায় না। যেমন বলা যায় আশির দশকের গুরুত্বপূর্ণ কবি খোন্দকার আশরাফ হোসেনের কথা — একই সঙ্গে কবি, শিক্ষক ও সফল সম্পাদক। সমকালে এ-তালিকায় যুক্ত হবেন খালেদ হোসাইন, মহীবুল আজিজ,  সিরাজ সালেকীন, শহীদ ইকবাল, হিমেল বরকত, সাজ্জাদ সুমন, শামীম রেজা, তারেক রেজা, জফির সেতু, তারানা নূপুর — আরও অনেকে।
এখন কথা হলো প্রতিষ্ঠানের কি সীমাবদ্ধতা নেই? আছে; অবশ্যই আছে। প্রতিষ্ঠান তো সিলেবাস ধরেই পড়াবে। কিন্তু সময়ের সাথে তাকেও পরিবর্তিত হতে হবে। তা না হলে  অ্যাকাডেমিক দিক থেকেই সে পিছিয়ে পড়বে। সিলেবাসের বিষয়ে কবিদের অভিযোগ — বিশ্ববিদ্যালয়ে জীবিত কবি-লেখকদের পড়ানো হয় না। আমি বলতে পারি, আমি ছাত্র থাকাকালে জীবিত শওকত আলীর উপন্যাস পাঠ্য হিসেবে পেয়েছি। আল মাহমুদের ‘সোনালি কাবিন’ পাঠ্য হয়েছিল তাঁর মৃত্যুর আগেই। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর প্রবন্ধ অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্য। হুমায়ূন আহমেদ, যিনি নাকি অ্যাকাডেমিক পাঠক্রমে অনেকটাই অচ্ছুত ছিলেন, তিনি এবং তাঁর উপন্যাস-গল্পও এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে মূল পাঠক্রমে অন্তর্ভুক্ত। পরিবর্তন হচ্ছে। সরাসরি পাঠ্য না হলেও পাঠ্যভুক্ত আছেন আশি ও নব্বইয়ের অনেক কথাসাহিত্যিক ও কবি। আমি আবারও বলি, সিলেবাসে থাকা না-থাকায় একজন কবির কিচ্ছু যায় আসে না। বরং পাঠকস্বীকৃত কবি-কবিতা-গল্প-উপন্যাস একসময় পাঠ্য হবেই। তবে সময় দিতে হবে। আর প্রতিষ্ঠানে কী কী কাজ হচ্ছে, সে-সম্পর্কে কবিরা ওয়াকিবহাল চাইলে থাকতে পারেন, না-ও পারেন। 
আর লেখাপড়ার দীনতা এখন সর্বত্র। সাহিত্যের বিভাগগুলোও এই আর্থ-রাজনৈতিক কাঠামোর বাইরে না। একসময় বাংলা বিভাগে ছাত্র ভর্তি হতো বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি আগ্রহ থেকে। বিশেষত ষাট ও সত্তরের দশকে বাঙালি জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ অনেক মেধাবী তরুণ বাংলা বিষয় নিয়ে বিএ-এমএ ক্লাসে ভর্তি হয়েছিলেন। এখন ছেলেমেয়েরা ভর্তি হয় সিরিয়ালের ওপর নির্ভর করে। এর মধ্যে কেউ কেউ স্বেচ্ছায়ও আসে। তারপর সরকারি চাকরির জন্য ছোটে। পছন্দতালিকার সবশেষে থাকে শিক্ষাক্যাডার। ফলে আগের সরকারি কলেজের শিক্ষক শওকত ওসমান, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, আবদুল মান্নান সৈয়দ কিংবা আবদুল্লাহ আবু সাঈদ বর্তমান বাস্তবতায় পাওয়া কঠিন। তারপরও সোহেল হাসান গালিব, আলমগীর টুলু, কুদরত-ই-হুদা, মোস্তফা হামেদী, জিনাত জাহানদের মতো ব্যতিক্রমও কেউ কেউ আছেন। তবে সেটা সরকারি চাকরির কৃতিত্ব নয়, স্বকৃত। একজন স্কুলশিক্ষক কায়েস আহমেদ কিংবা সরকারি আমলা সাঈদ আহমদ বা শহীদুল জহিরও হয়ে উঠতে পারেন গুরুত্বপূর্ণ সৃষ্টিশীল লেখক। 
আমি মনে করি কবি ও অ্যাকাডেমির মধ্যে বাস্তবিক বিরোধ নাই; থাকলে যা আছে, তা হলো মানসিক বিরোধ। আর আছে খানিকটা দূরত্ব। কাজের ধরনগত বৈভিন্ন্যও এর একটা কারণ হতে পারে। দুই শ্রেণির কাজ একেবারে অভিন্ন নয় — কেউ কারো প্রতিপক্ষও নয়।
প্রত্যাশা এই — কবি ও অ্যাকাডেমির মধ্যে দূরত্ব অবসিত হোক। আর দূরত্ব যদি থেকেও যায়, সমান্তরাল রেলের মতো পরস্পরকে নিয়েই চলুক।
এখন আমাকে বলেন, অ্যাকাডেমির সঙ্গে কবিদের বিরোধটা কোথায়?

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন