, ২০ জুন ২০২১; ১:০৬ পূর্বাহ্ণ


এ কে খন্দকারের “১৯৭১: ভেতরে বাইরে” বইটি মুক্তিযুদ্ধের উপরে লিখিত এযাবৎকালের সর্বাধিক আলোচিত ও সমালোচিত বই। বইটিতে একদিকে যেমন একজন প্রত্যক্ষ্যদর্শীর বর্ননা দেয়া আছে তেমনি আছে উৎসবিহীন নান বিতর্কের অবতারনা। এ কে খন্দকারের “১৯৭১: ভেতরে বাইরে” বইটা পড়ার রিভিউ লেখার লোভ সামলানো সত্যিই দায়। তাই সেই দায় এড়ানোর ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যতগুলো বই এ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছে এবং আমার দৃষ্টি গোচর হয়েছে, তার মধ্যে এই বইটাকে এক শব্দে ‘ব্যতিক্রম’ বললে বোধহয় অত্যুক্তি হবে না। কারণ-

  • বইটি মুক্তিযুদ্ধকালিন প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ের কোন কর্মকর্তা কর্তৃক লিখিত প্রথম বই।
  • বইটিতে মাঠ পর্যায়ের আলোচনা তুলনামূলকভাবে খুব কমই স্থান পেয়েছে। মূলত এখানে আলোচনা করা হয়েছে প্রশাসনের শীর্ষপর্যায়ের বিভিন্ন দিকনির্দেশনা, প্রশাসনিক কর্মকান্ডের আলোচনা সমালোচনা, বহির্বিশ্বের সাথে সম্পর্ক ইত্যাদি বিষয়ে।
  • বইটি লেখা হয়েছে সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে, যেখানে বেশিরভাগ বই রচনা করা হয়েছে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে।
    বইটিতে এমন অনেক বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, যা পূর্বে দৃষ্টির আড়ালেই ছিল।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে লেখা সর্বমোট ২৩২ পৃষ্টার বইটিকে শুরুতে ভূমিকা আর শেষে উপসংহার ব্যতিত যথাক্রমে ১৯৭১ঃ জানুয়ারি থেকে ২৬ মার্চ, স্বাধীনতার ঘোষণা ও অস্থায়ী সরকার গঠন, মুক্তিযুদ্ধে যোগদান, মুক্তিযুদ্ধ, মুজিব বাহিনী, নৌ-কমান্ডো, বিমানবাহিনী, যৌথ নেতৃত্ব গঠন, বীরত্বসূচক খেতাব, পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ শিরোনামে ১০টি অধ্যায়ে বিভক্ত করা হয়েছে। সবশেষে মুক্তিযুদ্ধকালিন বিভিন্ন বিষয়ে ৮টি গুরুত্বপূর্ণ দলীল সংযুক্ত করা হয়েছে।

এ পর্যায়ে উল্লেখ করার চেষ্টা করবো বইটার ইতিবাচক দিকগুলো-

অন্যান্য অনেক মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ‘গবেষক’ এর ন্যায় লেখক মুক্তিযুদ্ধকে জাতির মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টির কোন উপাদান হিসেবে ব্যবহার করেন নি।
যখন একশ্রেণীর ইতিহাস গবেষক মুক্তিযুদ্ধের সঠিক তথ্য লুকিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে মনের মাধুরি মিশিয়ে জাতির সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন, তখন একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে লেখকের এমন সময়োপযোগি সিদ্ধান্ত অবশ্যই ইতিবাচক।

স্বাধীনতার ঘোষণা সংক্রান্ত চলে আসা বিতর্কের ব্যাপারে বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা করেছেন তিনি। এ ব্যাপারে কোনটি সত্য বা কোনটি মিথ্যা এ ব্যাপারে তিনি যুক্তির কষ্টিপাথরে সত্য উন্মোচনের প্রয়াস পেয়েছেন।

ইয়াহিয়া খানের ঢাকা ত্যাগ, মুক্তিযুদ্ধ-পূর্ব সময়ে রাজনৈতিক নেতাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে দ্বিধা-সংকোচ, মুক্তিযুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয় অর্জনে দীর্ঘ সময় লাগার কারণ, ভারতীয় প্রশাসনের সাথে বাংলাদেশ প্রশাসনের বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা, বিভিন্ন বিষয়ে ভারতীয় প্রশাসনের সহযোগিতা-অসহযোগিতা, মুক্তিযুদ্ধকালিন সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনের সমন্বয়হীনতা, মুক্তিযুদ্ধকে দলীয়করণ কিংবা নির্দিষ্ট দলীয় গন্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ করণের জন্য একটি গোষ্ঠীর হীন প্রচেষ্টা প্রভৃতি বিষয়ে বইটাতে আলোচনা করা হয়েছে, যা মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে নতুন মাত্রা যোগ করবে। লেখক যে সব ঘটনা উল্লেখ করেছেন, তার বেশিরভাগই তার সাথে সংশ্লিষ্ট, যা তার বক্তব্যের গ্রহণযোগ্যতাকে অবশ্যই নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

বইটির যেসব দিক নেতিবাচক বা দুর্বলতা মনে হয়েছে তা হচ্ছে,

  • লেখক বইয়ের শুরুর দিকে বারংবার উল্লেখ করেছেন যে, রাজনৈতিক নেতাদের সাথে তার সরাসরি কোন যোগাযোগ ছিল না, কিন্তু এরপরেও তিনি তখনকার রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ব্যাপারে এমনভাবে নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন, যা অযাচিত মনে হয়েছে।
    মুক্তিযুদ্ধ যতটা সামরিক বিষয়, ঠিক ততটাই রাজনৈতিক। কিন্তু এই বইয়ে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে মুক্তিযুদ্ধকে মূল্যায়ন করা হয় নি বললেই চলে।
  • মুক্তিযুদ্ধের সময়ে ভারতীয় জনগণ ও প্রশাসনের সহযোগিতা অবশ্যই স্বীকার করতে হবে। কিন্তু লেখক তার লেখার মাধ্যমে যেভাবে ভারতীয়দের মুখাপেক্ষিতার কথা উল্লেখ করেছেন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে রীতিমত ভারতের ‘অনুগ্রহের দান’ এ পরিণত করেছেন (বলে মনে হয়েছে), তার যথার্থতা প্রশ্নাতীত নয়।
  • বইয়ের ‘নৌ-কমান্ডো’ অধ্যায়ে নৌ কমান্ডোদের তৎপরতা উল্লেখ করতে গিয়ে লেখক বইয়ের লেখার ধারা ঠিক রাখতে পারেন নি। মুক্তিযুদ্ধের ডেপুটি চীফ অব স্টাফ হওয়ার পরেও এই পর্যায়ে তিনি পর্যাপ্ত তথ্য দিতে সক্ষম হন নি।
  • বইয়ে গণবাহিনী ছাড়া অন্যান্য বাহিনীগুলোর মধ্যে একমাত্র মুজিব বাহিনী ছাড়া অন্য কোন বাহিনী সম্পর্কে তিনি বিবরণ দেন নি। অথচ মুক্তিযুদ্ধকালীন ও মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী লেখকের অবস্থান হিসেব তার কাছ থেকে এ ব্যাপারে আরো বিশদ ও তথ্যবহুল আলোচনা আশা করাই যায়।

রিভিউর ইতি টানবো বইয়েরই একটি উদ্বৃতি ও একটি প্রশ্ন দিয়ে, যেই প্রশ্ন দিয়ে লেখক বইটি শেষ করেছেন। লেখক বইয়ের উপসংহারে লিখেছেন,

“আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে লাখ লাখ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা ভিড় করে আছে। যুদ্ধের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ছিল সাধারণ মানূষের দুঃখ, কষ্ট, আনন্দ, বেদনা ও ত্যাগ। মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানূষের আশা আকাঙ্ক্ষা, ধৈর্য্য এবং ত্যাগের ফলে দেশ স্বাধীন হয়েছে। এটা কোন ব্যক্তিবিশেষের ত্যাগের বিনিময়ে বা একক কোন দলের জন্য হয় নি। এটি ছিল আমাদের সম্মিলিত প্রয়াস। তাই সম্মিলিতভাবে বিজয় অর্জন করার লক্ষ্যে আমাদের শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত যে আমরা যদি এই দেশকে এগিয়ে নিতে চাই, তাহলে মুক্তিযোদ্ধাদের মতো আমাদেরও একতাবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে”।

লেখক যে প্রশ্ন দিয়ে বইটি শেষ করেছেন এবং যে প্রশ্ন রেখেই এই রিভিউ লেখা শেষ করব, তা হল, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অপরিসীম ত্যাগ-তিতিক্ষার মাধ্যমে স্বাধীনতার যে নতুন সূর্যের উদয় ঘটেছিল এই মাটিতে, তার কতটুকু আলো মানুষের কাছে পৌছেছে? কতটুকু সুফল পাচ্ছে দেশের মানুষ স্বাধীনতার? বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণ বাস্তবিক অর্থে নিজেদেরকে স্বাধীন মনে করতে পারছে তো?

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন