, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১; ৯:৫০ অপরাহ্ণ


Photo: France’s Emmanual Macron and Turkey’s Recep Tayyip Erdogan

বর্তমানে ফ্রান্স এবং তুরস্কের মধ্যে যা হচ্ছে, সেটাকে আসলে কোনভাবেই ‘মৌলিক ধর্মযুদ্ধ’ বলা যাবে না, বরং একধরনের ‘রাজনৈতিক ধর্মযুদ্ধ’।

অনেকেই হয়তো জেনে থাকবেন, ফ্রান্সের পূর্ব আফ্রিকার কলোনিগুলোর একটা বিশাল অংশ এক সময় অটোমানদের অধীনে ছিল। অটোমানরা বিভিন্ন সময়কালে ফ্রান্সের কাছে সে সাম্রাজ্য হারায়। ফ্রান্স কলোনীগুলোকে বুঝিয়ে, মেরে, কেটে নিজের মত করে সাজায়, যার সুবিধা দেশটি এখনো পেয়ে যাচ্ছে। এই কলোনীগুলোর সম্পদের একটা বিশাল অংশ এখনো ফ্রান্স ভোগ করে, এবং যুগ যুগ ধরে এই কলোনীগুলোতে একনায়করা শাসন করে গেছে, শুধুমাত্র ফ্রান্সের অনুপ্রেরনায়। যদিও গনতন্ত্র আর বাক স্বাধীনতার গল্প ছাড়তে ফ্রান্স পিছপা হয়না।

বর্তমান তুরষ্ক আগের তুরষ্কের চেয়ে বেশ ভিন্ন। সামরিক এবং আর্থিক দিক দিয়ে শক্তিশালী বর্তমান তুরষ্ক চেষ্টা করছে, এর পুরোনো সাম্রাজ্যে কিছুটা হলেও তার আগের প্রভাব ফিরিয়ে আনতে। শক্তিশালী যেকোন রাষ্ট্রই তাই করে, হাজার হাজার বছর ধরে তার ভূরি ভূরি ইতিহাস আছে। এবং সেই চেষ্টার কিছু সফলতাও ইদানিং তুরষ্ক পেয়েছে।সত্যিকার অর্থে, ফ্রান্স এটা নিয়ে ভয়ে আছে। ভয়ের কয়েকটা সম্ভাব্য কারনঃ

  • প্রভাব হারানোর ভয়;
  • মার্কেট এবং সম্পদের উপর অধিকার হারানোর ভয়; এবং
  • ইসলামিক জাগরনের ভয়।

আবার শুধুমাত্র প্রভাব বাড়ানোটাই তুরষ্কের একমাত্র লক্ষ্য নয়। ফ্রান্সের যেখানে হারানোর ভয়, তুরষ্ক সেখান থেকেই লাভবান হওয়ার আশা করছে। যেমন, তুরষ্ক মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে শিল্প খাতে সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ এবং দিন দিন উন্নত খাতে এর শিল্পায়ন বাড়ছে। একই সঙ্গে ন্যাটোর দ্বিতীয় শক্তিশালী দেশ তুরষ্ক সামরিক শিল্পেও বেশ উন্নত দেশে পরিনত হচ্ছে। ব্যাপার হচ্ছে, তুরষ্কের পন্যের মার্কেট দরকার, যারা কিনা অনবরত এই দেশ থেকে কিনতে থাকবে। ১.৮ বিলিয়নের মুসলিম মার্কেট একটা বেশ বড় কিছু, যা তুরষ্কের এখন অনেক বেশী প্রয়োজন। এক্ষেত্রে নিজের দেশের আশেপাশে থাকা আরব এবং আফ্রিকার দেশগুলো তার প্রথম পছন্দ, যেখানে প্রভাব সৃষ্টির মাধ্যমে তুরষ্ক তার পন্যের বাজার বাড়াতে পারে। এখানেই ফ্রান্সের সঙ্গে তুরষ্কের লাগছে।

মজার ব্যাপার হলো, অনেকেই অনেক কিছু ভাবছে, এবং বলছে। কিন্তুই কেউই চিন্তা করে দেখছে না, ফ্রান্স এবং তুরষ্ক – দু’টোই সেক্যুলার রাষ্ট্র! তাহলে দুই সেক্যুলার রাষ্ট্র ধর্ম নিয়ে ঝগড়া করছে কেন?

এর উত্তর খুবই সোজা। তার কারন দু’দেশেই যারা ক্ষমতায় আছেন, যাদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ম্যাকরন এবং এরদোগান, তারা ধর্ম বিতর্কের উপর ভিত্তি করে নিজ নিজ দেশে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে চাচ্ছেন। এটা মোটামুটি সবাই জানে, আর্থ-সামাজিক কারনে ফ্রান্সে ম্যাকরনের জনপ্রিয়তা নিচের দিকে নামছে। করোনার যে অবস্থা, তাতে ২০২২ সালের নির্বাচনের আগে আর্থিক অবস্থা উন্নত করা ম্যাকরনের পক্ষে সম্ভব নয়। ফ্রান্সের স্যোশালিষ্ট সরকারের অর্থমন্ত্রী থাকা অবস্থায় ২০১৬ সালে পদত্যাগ করে, নিজে নতুন দল গঠন করে, ২০১৭ সালে মাত্র ৩৯ বছর বয়সে ফ্রান্সের ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সী প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন।

নতুন দলের আদর্শ বেঁচে নিয়েছিলেন মধ্যপন্থা, কিন্তু গত ৩ বছরের কর্মকান্ডে এখন ফ্রান্সের সবাই জানে, ম্যাকরন এখন অনেকটাই ডানপন্থী। আগামী নির্বাচন ভোট ভাগাভাগীতে ম্যাকরন কোন ঝুঁকি নিতে চাচ্ছেন না, তার কারন ফ্রান্সের চরম ডানপন্থী দল ‘ন্যাশনাল র‍্যালি’ ইউরোপের অন্য দেশগুলোর মতোই বেশ জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। ম্যাকরন সেই ভোটে ভাগ বসাতে চাচ্ছেন। সুতরাং ইমিগ্রেন্ট, যাদের বেশীরভাগই মুসলিম, তাদের বিরুদ্ধে একটা শক্ত অবস্থান দাঁড় করানোই হচ্ছে ম্যাকরনের এখনকার এজেন্ডা। আবার ফ্রান্সের মুসলমান কলোনীগুলোতে শাসকদের বিরুদ্ধে যারা সংগ্রাম করছেন, তাদের বেশীরভাগই ইসলামপন্থী।

এই ইসলামপন্থীরা ক্ষমতায় আসুক, এটা ফ্রান্স চায়না, এবং এদের অনেকের সঙ্গেই তুরষ্কের ভালো সম্পর্ক। ঠিক এই কারনেই মুসলমান এবং ইসলাম নিয়ে ম্যাকরনের বিতর্কিত কথাবার্তা। অন্যদিকে এরদোগানের রাজনীতির ভিত্তিই হচ্ছে ধর্ম। এটা করেই উনি জনপ্রিয় হয়েছেন, এবং বারবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হচ্ছেন। সামরিক ক্যু-এর চেষ্টা করেও তাকে সরানো যায়নি। কিন্তু তুরুষ্কের অর্থনীতিও ইদানিং খারাপ যাচ্ছে, যার অন্যতম উদাহরন তার্কিশ লিরার ব্যাপক মূল্য হারানো। এটা এরদোগানের জন্য একটা ঝুঁকি। সুতরাং অর্থনীতিকে ঠিক করতে এরদোগানের কিছু গল্প দরকার, যার উদ্দেশ্য হবে মার্কেট সৃষ্টি করা, এবং তার নিয়ামক হবে ধর্ম। একই সঙ্গে এরদোগান দেশের বাইরের সরকার বিশেষ করে পশ্চিমা এবং আরব দেশগুলোতে চরম অজনপ্রিয় একজন মানুষ। এটা উনার তুরষ্ককে আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে দাঁড় করানোর প্রচেষ্টার কারনে হতে পারে অথবা উনার ইসলামীক মনোভাবের কারনেও হতে পারে।

যেখানে ম্যাকরন চাচ্ছেন ইসলামকে বিতর্কিত করে এবং চাপে রেখে নির্বাচনী বাঁধা দূর করতে এবং ফ্রান্সের বাইরে দেশটির ক্ষমতা ধরে রাখতে, সেখানে এরদোগান চাচ্ছেন ইসলামকে আরো জনপ্রিয় করে নিজের ক্ষমতা ধরে রাখতে এবং দেশের বাইরে তুরষ্কের ক্ষমতা বাড়াতে। অর্থাৎ দু’জনেই মনে করছেন, এই ‘রাজনৈতিক ধর্মযুদ্ধ’ দু’জনকেই নিজেদের দেশে আরো বেশী অজনপ্রিয় হওয়ার হাত থেকে বাঁচাবে, আবার দেশের বাইরে প্রভাব ধরে রাখতে অথবা বাড়াতে সাহায্য করবে।

এই ধরনের ‘রাজনৈতিক ধর্মযুদ্ধ’ নতুন কিছু নয়, বরং এটা সব জায়গাতে এবং সবসময়েই হচ্ছে। কিন্তু মনে হচ্ছে, ম্যাকরন ডানপন্থীদের চাইতেও বেশী ডানপন্থী হতে চাচ্ছেন, কারন উনার বক্তব্য এবং প্রতিক্রিয়াশীলতার প্রতি অন্ধসমর্থন বেশ অপরিপক্ক এবং ব্যাপকভাবে বিতর্কিত। মাত্র ৪২ বছর বয়সে ফ্রান্সের মতো একটা দেশ সামলানোর জন্য আসলে আরো পরিপক্কতার প্রয়োজন, যার কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত ধর্ম নিয়ে উসকানী বাদ দেয়া এবং কলোনিয়াল মনোভাব দূর করা।

অন্যদিকে, তুরষ্ককে যদি সত্যি একটা শক্তিশালী দেশ হতে হয় এবং সেই লক্ষ্যে নির্ভুলভাবে পৌঁছাতে হয়, তাহলে ‘এরদোগান’-কেন্দ্রিক গল্পের একটা বিরতি দরকার, যেখানে থাকবে আরো বেশী গনতন্ত্র এবং প্রতিবেশীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন