, ১৩ জুন ২০২১; ৯:০৯ অপরাহ্ণ


Source: Getty Image

মোঃ রাকিব হোসাইন

কিছু দিন আগে ইসরাইলের প্রেসিডেন্ট বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ঘোষণা দিলেন যে তিনি জুলাই মাস থেকে জর্ডান উপত্যকা (ওয়েস্ট ব্যাংক) দখল করবেন যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইতোমধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে। অনেক দেশ এই পদক্ষেপের তিব্র নিন্দা জানায় এবং ইসরাইলকে সতর্ক করে দিয়ে বলে যে এই অবৈধ দখল ইসরাইল- প্যালেস্টাইন বিরোধ আরো জোরদার করবে। ইসরাইলের জর্ডান উপত্যকা দখল কেনো অবৈধ? কেনো নেতানিয়াহু এই অবৈধ দখলের পক্ষে? প্রকৃতপক্ষে প্রভাবশালী দেশগুলি এই অবৈধ দখল ঠেকাতে কি করবে? নেতানিয়াহুর অবৈধ কর্মকান্ড ঠেকাতে ‘ইসরাইল বয়কট’ কতটা কার্যকরি? ইসরাইল বিতর্কে সাধারণ জনগনের দায়িত্ব কি হতে পারে? নাকি সাধারণ জনগনের কোনো কিছুই করার নেই? এই সকল প্রশ্নের উত্তর দেয়াই এই লিখার উদ্দেশ্য।

জর্ডান উপত্যকা দখল অবৈধ যে কারণে

১৯৬৭ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধে ইসরাইল জর্ডান উপত্যকা দখলে নেয়। অতীত নিয়মে যুদ্ধের সময়ে কোনো পক্ষ শত্রু বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত কোনো এলাকা নিজ আয়ত্তে অনতে পারলে পরে সে পক্ষ সেই এলাকার মালিক হয়ে তা শাসন করে। যেভাবে ব্রিটিশ বাহিনী বাংলাদেশ শাসন করেছিলো পলাশির যুদ্ধের পর। কিন্তু বিংশ শতাব্দিতে কিছু আন্তর্জাতিক আইন (চতুর্থ জেনভা কনভেনশন আরটিকেল ৪৯ এবং জাতিসঙ্ঘ রিজলুশন ২৩৩৪[২০১৬]) প্রতিষ্ঠিত হয় যা যুদ্ধের মাধ্যমে দখলকৃত অপর পক্ষের কোনো এলাকা শাসন করা অবৈধ ঘোষণা করে। এ কারণে নেতানিয়াহু দখলদারিত্বের ঘোষণা দেয়ার সাথে সাথেই আরব লিগ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জর্ডানের রাজা নেতানিয়াহুকে এই আগ্রাসন চালালে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যে প্রভাব ফেলবে তার ওপর হুঁশিয়ারি জানান দেয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও নেতানিয়াহু তার এই দখলদারিত্ব চালিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় যার কারণ হিসেবে তিনি ইসরাইলের নিরাপত্তার বিষয়টি  উল্লেখ করেন।

দখলদারিত্বের কারণ

দখলদারিত্বের সমর্থনকারিরা বলে থাকেন যে জর্ডান উপত্যকার সীমানাকে অন্যান্য আরব দেশে থেকে বিচ্ছিন্ন রাখলে ইসরাইলের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। যদি জর্ডান উপত্যকা অন্যান্য আরব দেশের (যেমন জর্ডান) সাথে সীমানা থাকে তাহলে সে সীমানা দিয়ে অস্ত্র পাচার হলে প্যালেস্টাইনের সশস্ত্র বাহিনীগুলোকে নিরস্ত্র করা যাবে না। প্যালেস্টাইনকে নিরস্ত্র করার মাধ্যমে ভবিষ্যতে ইসরাইলের ওপর প্যালেস্টাইনের সশস্ত্র আক্রমনের আশংকা হ্রাস করতে ইসরাইল জর্ডান উপত্যকা দখলের সিদ্ধান্ত নেয়। নিরাপত্তা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে একটি স্বাধীন ভূখণ্ডের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ করার মত অযৌক্তিক পদক্ষেপ ইসরাইল নেয়ার সাহস করতো কিনা সন্দেহ আছে যদি আমেরিকা তার সমর্থন না করতো।

এছাড়া ইহুদি ধর্মে জর্ডান উপত্যকার (যাকে প্রাচীন হিব্রু ভাষায় ‘জুদাইয়া ও সামারিয়া বলা হয়ে থাকে) গুরুত্ব অনেক তাই নেতানিয়াহু ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে এই এলাকা দখলে আনতে চায় যেনো পরে তার এই দখলদারিত্বের সফলতাকে রাজনৈতিক পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করতে পারে (যদিও প্রকাশ্যভাবে সে এই অভিপ্রায় ঘোষণা করেনি) । ডোনাল্ড ট্র্যাম্প তার এই পদক্ষেপকে পরিপূর্ণভাবে সমর্থন করে তাই ট্র্যাম্প থাকাকালীন সময়েই নেতানিয়াহু তার এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে চায়। কারণ আমেরিকার পরবর্তি প্রেসিডেন্ট এই পরিকল্পনা নাও সমর্থন করতে পারে।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ইতোমধ্যে নেতানিয়াহুকে নানা ভাবে সতর্ক করে। প্যালেস্টাইন আমেরিকা ও ইসরাইলের সাথে তার পূর্বে প্রতিষ্ঠিত সকল চুক্তি ও সম্পর্ক ছিন্ন করে, জর্ডানের রাজা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন যে এই দখলদারিত্বের পরিনতি ইসরাইলের জন্য সুখকর হবে না। আরবলিগ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইসরাইলকে প্রায় একই রকম সংকেত দেয়। প্রায় পৃথিবীর সকল রাষ্ট্র এর বিপক্ষে থাকলেও নেতানিয়াহুকে একমাত্র আমেরিকা নির্বিবাদে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে।

প্রকৃতপক্ষে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ইসরাইলের জন্য কতটুকু বাধা হয়ে দাঁড়াবে তা অনেকেই সন্দেহের চোখে দেখছেন। সাবেক ব্রিটিশ সংসদ সদস্য জর্জ গালয়ে (George Galloway) তার সাম্প্রতিক কালের এক সাক্ষাৎকারে বলেন যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন আর আরবলিগ প্রকৃতপক্ষে ইসরাইলের কিছুই করবে না (কারণ অতীতে ইসরাইল গোলান হাইট ও জেরুজালেম দখল করেছিলো, জির্ডান উপত্যকা বলতে গেলে ইসরাইল অনেক আগ থেকেই অল্প অল্প করে দখল করে রেখেছিলো কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ইসরাইলের কিছুই করেনি)। তবে জর্ডানের রাজার প্রতিক্রিয়া কি হবে তা এখনো নিশ্চিত করে বলা যায় না। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া কেমন হবে তা বলা মুশকিল। ইসরাইলি আগ্রাসন বন্ধের প্রচেষ্টায় অনেকেই ইসরাইলি পণ্য বয়কটের মত আন্দোলন সমর্থন করেন।

ইসরাইলি পণ্য বয়কটের কার্যকারিতা

প্রভাবশালী দেশগুলির নিয়মিত সতর্কতার অকার্যকারিতার কারণে “ইসরাইলি পণ্য বর্জন” আন্দোলন শুরু হয় কয়েক বছর আগে। বাংলাদেশ সহ সারা বিশ্বের সাধারণ জনগন যেনো ইসরাইলি আগ্রাসন বন্ধে চাপ সৃষ্টি করতে পারে সেই উদ্দেশ্য এই আন্দোলনের জন্ম যা “বিডিএস (Boycott, Diversify and sanction) মুভমেন্ট”। আশা করা হয়েছিলো যে সকল দেশের নাগরিকরা একসাথে ইসরাইল বয়কট করলে নেতানিয়াহু আগ্রাসন বন্ধে বাধ্য হবে। কিন্তু নানা কারণে এই আন্দোলন তেমন কোনো ফল দেয়নি। এই আন্দোলন প্যালেস্টাইন ও জর্ডান উপত্যকার বন্ধুর বিপরীতে শত্রুই বেশী সৃষ্টি করছে। প্রখ্যাত বুদ্ধিজীবী নোয়াম চমস্কি এই কৌশলের দুর্বলতা সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেন যে, “যদি ইসরাইলি পণ্য বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর বয়কট করা হয় কারণ ইসরাইল আগ্রাসন চালাচ্ছে তাহলে আমেরিকার বৈশ্বিক আতঙ্কবাজীর কারণে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়কে কেনো বয়কট করা হয় না?” অনেক ইসরাইলি নাগরিক ধারণা করছে যে এই আন্দোলনের লক্ষ্য হচ্ছে ইসরাইলকে উচ্ছেদ করা। আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিলো ইসরাইলের রপ্তানি কমানো কিন্তু গত কয়েক বছরে এই রপ্তানি আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনেক ইসরাইলি নাগরিক নেতানিয়াহুর আগ্রাসনের বিপক্ষে আছে কিন্তু আশংকা করা হচ্ছে যে বিডিএস মুভমেন্ট তাঁদের মাঝে প্যালেস্টাইন ও জর্ডান উপত্যকার প্রতি বিরূপ মনোভাব সৃষ্টি করবে। যেহেতু বিডিএস আন্দোলন একটি অনিশ্চিত ও বিপদজনক একটি কৌশল যা বিপরীত ফল দিতে পারে তাহলে উপায় কি?

আমাদের কর্তব্য

প্রায় কয়েক দশক আগে পৃথিবীর সকল দেশের চাপে আফ্রিকা তার বর্ণবাদী আচরণ পাল্টাতে বাধ্য হয় কিন্তু ঠিক একই ভাবে ইসরাইলি আগ্রাসন বন্ধ করা যাচ্ছে না কেনো? এর উত্তর খুঁজে পাওয়া যাবে সাধারণ জনগণ ও রাজনৈতিক প্রতিনিধির আচরণের মধ্যে। ১৯৮০ এর দিকে পৃথিবীর প্রভাবশালী দেশগুলির নাগরিকরা বর্ণবাদের বিরুদ্ধে অনেক আন্দোলন চালায় যা Anti-apartheid Movement নামে পরিচিত। গনতান্ত্রিক দেশের নাগরিকদের চাহিদা মেটানোই সে দেশের রাজনৈতিক প্রতিনিধিদের কাজ। তাই তখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তাঁদের স্বদেশের  নাগরিকদের দাবি মেনে বর্ণবাদ রুখে দাড়াতে সোচ্চার হয়। কিন্তু বর্তমানে ঘটছে ঠিক তার বিপরীত। সাধারণ জনগনের মাঝে ইসরাইলি আগ্রাসনের প্রতি তেমন মনোযোগ না দেয়ার কারণে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ইসরাইলের বিপরীতে ভারী কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার উদ্দীপক খুঁজে পাচ্ছে না। অনেক দিন হোলো ইসরাইল জর্ডান উপত্যকা দখলের ঘোষণা দেয় কিন্তু বিশ্বের খুব কম মানুষই এই নিয়ে আলোচনা করছে। তাছাড়া ইসরাইলকে আমেরিকা বিনা প্রশ্নে সমর্থন দিচ্ছে। আমেরিকাকে এই বিষয়ে চাপ দেয়ার মত ক্ষমতা ও আকাঙ্ক্ষা বিশ্বের বিশ্বের খুব কম দেশেরই আছে। রাশিয়া ক্রিমিয়া দখল করার পর সারা বিশ্ব তাকে বয়কট করে কারণ আমেরিকা এই বয়কটের পক্ষে ছিলো। এখন আবার সকল দেশ একসাথ না হলে ইসরাইলের ওপর কঠোর কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব নয়। আর সকল দেশ তখনই একসাথে হবে যখন বিশ্বের সকল নাগরিক ইসরাইলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হবে।

আশা করা যায় এই ইস্যুর প্রতি আমরা উদাসীন না হয়ে যথাযথ মনোযোগ দেবো। আমাদের সবার মনোযোগ ও সোচ্চার কন্ঠই পারে এই আগ্রাসন মূলক আচরণ রুখে দাঁড়াতে।

লেখকঃ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন