শনিবার, ২ জানুয়ারি ২০২১; ১২:৩৮ পূর্বাহ্ণ


এক দশক আগেও পবিত্র রমজানকে আমরা রোজার মাস বলেই সম্বোধন করতাম। ইদানিং রমজান মাসকে শুদ্ধ আরবিতে অনেকেই ‘রামাদান’ বলে ডাকছেন। আরবি রামাদান শব্দটি মূল রামিদা বা আররামাদ থেকে এসেছে যার অর্থ প্রচন্ড উত্তাপ কিংবা শুষ্কতা। অন্যদিকে ‘রোজা’ শব্দটি ফারসি ‘রোজ’ থেকে এসেছে যার আরবি প্রতিশব্দ সাওম صوم বা সিয়াম যার শাব্দিক অর্থ কোনো কাজ থেকে বিরত থাকা।

পারিভাষিকভাবে সুবেহ সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সব ধরনের পানাহার ও যাবতীয় যৌনাচারসহ অশ্লীলতা, অপচয়-অপব্যবহার এবং অন্যায় আচরণ ও অত্যাচার-অবিচার থেকে বিরত থাকার নাম রোজা। যেহেতু দিনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এই আমলটি পালন করা হয়, তাই একে রোজা বলা হয়। প্রথম কখন ও কোন রোজা ফরজ ছিল এ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেন, ১০ মহররম অর্থাৎ আশুরার রোজাই সর্বপ্রথম ফরজ রোজা ছিল। আবার কারো কারো মতে, আইয়ামে বিজ অর্থাৎ প্রত্যেক চন্দ্র মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে রোজা ফরজ ছিল।

বস্তুত রোজা রাখার বিধান সর্বযুগেই ছিল। হজরত আদম (আ.) থেকে শুরু করে হজরত মোহাম্মদ (সা.) পর্যন্ত সব নবী-রাসূলের যুগ এবং অন্যান্য ধর্মেও রোজার বিধান পাওয়া যায়।

ইতিহাসে প্রথম রোজা :

রোজার সূচনা কবে থেকে হলো, সে-সম্পর্কে ধর্মীয় ইতিহাসের বাইরে খুব একটা জানা যায় না। ইংল্যান্ডের বিখ্যাত দার্শনিক হার্ভার্ট স্পেন্সার নিজের বই ‘প্রিন্সিপলস অফ সোশিয়লজি’ (Principles of Sociology)- তে কতগুলো বন্য সম্প্রদায়ের উদাহরণ এবং জীবন বৃত্তান্তের ওপর গবেষণা করে লিখেছেন যে, রোজার প্রাথমিক মানদণ্ড এভাবেই হয়তো হয়ে থাকবে যে আদিম বন্য যুগের মানুষ স্বভাবতঃই ক্ষুৎ-পিপাসায় আক্রান্ত থাকতো এবং তারা মনে করতো যে, আমাদের আহার্য বস্তু আমাদের পরিবর্তে এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মৃতদের নিকট পৌঁছে যায়। কিন্তু অনুমানসিদ্ধ উপাত্তকে যুক্তি ও বুদ্ধির আওতাভুক্ত লোকেরা কখনো স্বীকার করে নেয়নি। (এনসাইক্লোপেডিয়া অব ব্রিটানিকা (১০/১৯৪)।

মুসলিমদের বিশ্বাস অনুযায়ী মহান রাব্বুল আলামিন প্রথম মানব হজরত আদম (আ.) এর ওপর রোজার বিধান আরোপ করে মানব ইতিহাসে সর্বপ্রথম রোজার প্রচলন শুরু করেন। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন,

হে ইমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর। যাতে তোমরা খোদাভীরু হতে পার।

-(সূরা : বাকারা, আয়াত : ১৮৩)

এ আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা আলুসি (র.) এর তাফসির গ্রন্থ ‘রুহুল মাআনি’তে উল্লেখ করেছেন যে, উপরোক্ত আয়াতে ‘মিনকাবলিকুম’ দ্বারা হজরত আদম (আ.) থেকে শুরু করে হজরত ঈসা (আ.) পর্যন্ত সব নবী-রাসূলের জামানা বুঝানো হয়েছে। কোরআন ও হাদিস গবেষণা করলে রোজার ইতিহাস সম্পর্কে যতদূর জানা যায়, মহান আল্লাহ তায়ালা হজরত আদম (আ.)-কে জান্নাতে প্রেরণ করে একটি গাছের ফল খেতে নিষেধাজ্ঞা জারি করে বিশেষ এক ধরনের রোজা রাখার নির্দেশ প্রদান করলেন। এ ব্যাপারে দয়াময় আল্লাহ তায়ালা মহাগ্রন্থ আল কোরআনে ইরশাদ করেন,

হে আদম! তুমি এবং তোমার স্ত্রী জান্নাতে বসবাস করতে থাক এবং সেখানে যা চাও, যেখান থেকে চাও, পরিতৃপ্তসহ খেতে থাক, কিন্তু তোমরা গাছের কাছে যেও না। (যদি যাও বা তার ফল ভক্ষণ কর) তাহলে জালিমদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে।“ (সূরা বাকারা, আয়াত৩৫) 

মুফাসসিরে কেরামগণ বলেন, এটাই ছিল মানব ইতিহাসের প্রথম রোজা। হজরত আদম (আ.) ও হজরত হাওয়া (আ.) শয়তানের প্ররোচনার শিকার হয়ে ওই গাছের ফল ভক্ষণ করেছিলেন এবং এর পরিণামে মহান আল্লাহ তায়ালা তাদের ভূ-পৃষ্ঠে পাঠিয়ে দিলেন। অতঃপর তারা উক্ত ভুলের জন্য ভীষণভাবে অনুতপ্ত হন, তওবা করেন এবং এর কাফ্ফারাস্বরূপ ধারাবাহিক ৪০ বছর রোজা রেখেছিলেন। 

অন্যান্য নবীদের জমানায় রোজা :

হজরত আদম (আ.) এর পর অন্য সব নবী-রাসূলের জমানায়ও রোজার বিধান ছিল। তবে তাদের রোজা পালনের পদ্ধতি ভিন্নতর ছিল। হজরত নুহ (আ.) এর ওপরও রোজা ফরজ ছিল; রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, হজরত নুহ (.) শাওয়াল ১০ জিলহজ ব্যতীত সারা বছর রোজা রাখতেন। (ইবনে মাজাহ)

হজরত মুসা (আ.) এর ওপর তাওরাত কিতাব অবতীর্ণ হওয়ার আগে তিনি ৩০ দিন রোজা রেখেছিলেন। অতঃপর মহান আল্লাহ তায়ালা তার ওপর ওহি নাজিল করলেন এবং আরো দশ ১০ দিন রোজা রাখার নির্দেশ প্রদান করলেন। হজরত ইদ্রিস (আ.) বছরজুড়ে প্রতিদিন রোজা রাখতেন। হজরত দাউদ (আ.) একদিন পর পর রোজা রাখতেন।

রমজানের সঙ্গে রোজার ঐতিহাসিক সম্পর্ক :

হাসান বসরি (রহ.) বলেন, পূর্ববর্তী উম্মতদের ওপরও পূর্ণ একমাস রোজা ফরজ ছিল। একটি মারফু’ হাদিসে রয়েছে, রাসূল (সা.) বলেছেন, তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতদের ওপর রমজানের রোজা ফরজ ছিল। (তাফসিরে ইবনে কাসির, (২/৫০১), সংশ্লিষ্ট আয়াতের তাফসির)।

আল্লামা আলুসি (রহ.) বলেন,  কিতাবিদের ওপরও রমজানের রোজা ফরজ ছিল। তারা তা বর্জন করে বছরে একদিন উপবাস পালন করে, যেদিন ফেরাউন লোহিত সাগরে নিমজ্জিত হয়।

পরবর্তী সময়ে ইহুদিদের দেখাদেখি খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ও একই দিনে রোজা পালন করে। অবশ্য তারা এর সঙ্গে আগে-পিছে আরো দুইদিন সংযোজন করে নেয়। এভাবে নানা সময়ে বাড়াতে বাড়াতে তাদের রোজার সংখ্যা পঞ্চাশের কোটায় পৌঁছে।

আবার গ্রীষ্মকালে রোজা রাখা কষ্টসাধ্য হলে তারা তা পরিবর্তন করে শীতের মৌসুমে নিয়ে আসে। মুগাফ্‌ফাল ইব্‌ন হানযালা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে, রাসূল (সা.) বলেন, খ্রিষ্টানদের ওপর রমজানের একমাস রোজা ফরজ হয়েছিল। পরবর্তীকালে তাদের জনৈক সম্রাট অসুস্থ হয়ে পড়লে তারা এ মর্মে মান্নত করে যে, আল্লাহ তাকে রোগমুক্ত করলে রোজার মেয়াদ আরো দশ দিন বাড়িয়ে দেব। এরপর পরবর্তী সম্রাটের আমলে গোশত খেতে গিয়ে বাদশাহর মুখে রোগব্যধি দেখা দিলে তারা অতিরিক্ত সাতদিন রোজা মানত করে। পরে অন্য সম্রাট বলেন, তিন দিন আর ছাড়বো কেন? এবং তিনি এও বলেন যে, এ রোজাগুলো আমরা বসন্তকালে পালন করব। এভাবে রোজা ত্রিশের সংখ্যা অতিক্রম করে পঞ্চাশের কোটায় পৌঁছে যায়। (রুহুল মাআনি ও তাফরিরে রাযি, সূরা বাকারা ১৮৩ নম্বর আয়াতের তাফসির)।

৭৪৭ সালের একজন আরব লেখক আবু যানাদ জানান যে, উত্তর ইরাকের আল জাজিরা অঞ্চলে অন্তত একটি মান্দাইন সমাজ ইসলাম গ্রহণের আগেও রমজানে রোজা রাখত। এমনকি কথিত আছে, ইব্রাহিম (.)-কে দেয়া সহিফাও নাজিল হয়েছিল রমজানের   তারিখে। তাওরাত এসেছিল রমজান, যাবুর ১২ রমজান আর ইঞ্জিল ১৩ রমজান। যদিও আরবের বাহিরে রমজান মাস হিসেব করা হতো না, কিন্তু এই হিসেবটা ভিন্নজাতিক পঞ্জিকার সঙ্গে মিলিয়ে স্থির করা হয়েছে বলে বলা হয়।

ইসলামে রোজা :

মহানবী (সা.) মদিনায় আগমন করার পর শুধু আশুরার রোজা রাখতেন। হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) মদিনায় হিজরত করে দেখলেন, মদিনার ইহুদিরা মহররমের ১০ তারিখে রোজা রাখে। তিনি তাদের জিজ্ঞাসা করলেন, আজকে তোমরা কিসের রোজা রাখছ? উত্তরে তারা বলল, আজ সেই দিন যেদিন মহান আল্লাহ তায়ালা হজরত মুসা (আ.) ও তার কওমকে ফেরাউনের কবল থেকে মুক্ত করেছিলেন আর ফেরাউনকে সদলবলে নীল দরিয়ায় ডুবিয়ে মেরেছিলেন। ফলে শুকরিয়াস্বরূপ এ দিন মুসা (আ.) রোজা রেখেছিলেন। তাই আমরাও এ দিন রোজা রাখি। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, আমরা তোমাদের থেকে মুসা (আ.) অনুসরণের অধিক হকদার। এরপর তিনি আশুরার দিন রোজা রাখলেন এবং সাহাবায়ে কেরামদের রোজা রাখার নির্দেশ প্রদান করলেন। (বোখারি, মুসলিম)।

সর্বোপরি ১০ শাবান দ্বিতীয় হিজরিতে মহান আল্লাহ তায়ালা রমজানের রোজা ফরজ মর্মে পবিত্র কোরআনে আয়াত নাজিল করেন। রোজা ফরজ করার উদ্দেশ্য সম্পর্কে আল্লাহ তায়লা পবিত্র কোরআনের সূরা বাকারার ১৮৩ নম্বর আয়াতের শেষে বলেন, হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের ওপর, যেন তোমরা পরহেজগারি (তাকওয়াহ) অর্জন করতে পার। 

মুসলিম রীতিতে রোজা পাঁচ প্রকার

  • ফরজ রোজা:

যা আবার চার প্রকার-

  • রমজান মাসের রোজা।
    • কোন কারণ বশত রমজানের রোজা ভঙ্গ হয়ে গেলে তার কাযা আদায়ে রোজা।
    • শরীয়তে স্বীকৃত কারণ ব্যতিত রমজানের রোজা ছেড়ে দিলে কাফ্ফারা হিসেবে ৬০টি রোজা রাখা।
    • রোজার মান্নত করলে তা আদায় করা।
  • ওয়াজিব রোজা: নফল রোজা রেখে ভঙ্গ করলে পরবর্তীতে তা আদায় করা ওয়াজিব।
  • সুন্নত রোজা: মহরম মাসের নয় এবং দশ তারিখে রোজা রাখা।
  • মোস্তাহাব রোজা: প্রতি চন্দ্র মাসের ১৩, ১৪, এবং ১৫ তারিখে, প্রতি সাপ্তাহের সোম ও বৃহস্পতিবারে, কোন কোন ইমামের মতে শাওয়াল মাসে পৃথক পৃথক প্রতি সপ্তাহে দুটো করে ছয়টি রোজা রাখা মোস্তাহাব। তবে ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে এক সাথে হোক কিংবা পৃথক পৃথক হোক শাওয়ালের ছয়টি রোজা মুস্তাহাব।
  • নফল রোজা: মোস্তাহাব আর নফল খুব কাছাকাছির ইবাদত। সহজ অর্থে নফল হলো যা ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নত নয় এমন ইবাদত পূণ্যের নিয়তে করা। রোজার ক্ষেত্রেও তাই।

হিন্দুদের রোজা (উপবাস):
বিভিন্ন জাতি-ধর্মনির্বিশেষে সবার মধ্যেই রোজা পালনের ইতিহাস পাওয়া যায়। বেদের অনুসারী ভারতের হিন্দুদের মধ্যেও ব্রত অর্থাৎ উপবাস ছিল। প্রত্যেক হিন্দি মাসের ১১ তারিখে ব্রাহ্মণদের ওপর ‘একাদশীর’ উপবাস রয়েছে। এ হিসাবে তাদের উপবাস ২৪টি হয়। কোনো কোনো ব্রাহ্মণ কার্তিক মাসে প্রত্যেক সোমবার উপবাস করেন। কখনো হিন্দু যোগীরা ৪০ দিন পানাহার ত্যাগ করে চল্লিশে ব্রত পালন করেন।

চীনা সম্প্রদায়ের রোজা:
প্রাচীন চীনা সম্প্রদায়ের লোকেরা একাধারে কয়েক সপ্তাহ রোজা পালন করত এবং খ্রিষ্টান পাদরিদের ও পারসিক অগ্নিপূজকদের এবং হিন্দু যোগী ইত্যাকার ধর্মাবলম্ব্বীদের মধ্যে রোজার বিধান ছিল। পারসিক ও হিন্দু যোগীদের রোজার ধরন ছিল এরূপ, তারা রোজা থাকা অবস্থায় মাছ-মাংস, সবজি, তরকারি ইত্যাদি ভক্ষণ করা থেকে বিরত থাকত বটে; কিন্তু ফল-মূল এবং সামান্য পানীয় গ্রহণ করত।

এ ছাড়া অন্য ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে রোজা পালনের ধারা অব্যাহত ছিল।

মানবশুদ্ধির জন্য আদিম যুগ থেকেই অনেক গোত্র, বর্ণ, সম্প্রদায় এবং বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীর মধ্যে রোজা প্রচলিত ছিল। যদিও ধরন ও প্রক্রিয়াগতভাবে এতে কেবল সংখ্যা, নিয়মকানুন ও সময়ের ব্যবধান কিছুটা ভিন্নতর ছিল।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন