মঙ্গলবার, ২ আগস্ট ২০২১; ৯:৩৩ পূর্বাহ্ণ


Imam Abu Hanifa Mosque
Imam Abu Hanifa Mosque

৭৬৭ সালে হানাফী মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম আবু হানিফা (র) কারাগারে  মৃত্যুবরণ করেন। তাকে বন্দী করার কারণ তিনি আল মনসুরের প্রধান বিচারপতির পদ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। কেউ কেউ বলেন আবু হানিফা আল মনসুরের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহের চেষ্টা করেন জন্য তাকে জেলখানার ভেতর মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়। ইতিহাসবিদ খাতিবের মতে তার জন্য লোকজন মৃত্যুর ২০ দিন পর্যন্ত অনবরত প্রার্থনা করেছিল।

কারাগারে নির্যাতনের স্বীকার হওয়া কিংবা অত্যাচারী শাসকের বিরাগভাজন হয়ে জীবন হারানো লোকেরাই সর্বকালে পৃথিবী বদলে দিয়েছেন। তেমনি একজন সুন্নী ইসলামের চারটি বিশুদ্ধ মাযহাবের অন্যতম প্রসিদ্ধ হানাফী মাজহাবের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম আবু হানিফা। আজকের ভিডিওতে আমরা ইমাম আবু হানিফার সংক্ষিপ্ত জীবনী তুলে ধরব।

ইমাম আবু হানিফার পূর্ণ পারিবারিক নাম ছিল নোমান ইবনে সাবিত ইবনে যুতা ইবনে মারযুবান। তিনি ৬৯৯ সালে উমাইয়া খলিফা আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ানের রাজত্বকালে ইরাকের কুফা নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা সাবিত বিন যুতী কাবুল, আফগানিস্তানের একজন ব্যবসায়ী ছিলেন। তার পিতার বয়স যখন ৪০ বছর তখন আবু হানিফা জন্মগ্রহণ করেন। বংশধরের দিক থেকে তাকে অ-আরবীয় বলে ধরা হয়ে থাকে কারণ তার দাদার নামের শেষে যুতী। প্রখ্যাত মুসলিম ইতিহাসবিদ খতীবে বাগদাদী আবু হানিফার নাতি ইসমাইল বিন হাম্মাদের বক্তব্য থেকে আবু হানিফার বংশ ব্যাখা দেন। অন্য আরেক ইতিহাসবিদ হাম্মাদ আবু হানিফাকে পারসিক বংশদ্ভূত বলে দাবি করেন। আবু হানিফার বংশ নিয়ে অনেক ব্যাখ্যা পাওয়া যায় তবে সবচেয়ে বেশি পরিচিত ও নির্ভরযোগ্য মত হলো তিনি কাবুলের পারসিক বংশদ্ভূত।

প্রথমত তিনি কুফা শহরেই ইলমে কালাম শিক্ষা করেন। ষোল বছর বয়সে তিনি পিতার সাথে হজ্জে গিয়েছিলেন এবং সেই একই বছরে পিতৃহারা হন। ২০ বছর বয়সে তিনি ইলমে দ্বীন শিক্ষার প্রতি মনোনিবেশ করেন। ইলমে আদব ও ইলমে কালাম শেখার পর তিনি ইলমে ফিকহ অর্জনের জন্য সমকালীন ফকিহ ইমাম হাম্মাদ -এর শিক্ষালয়ে অংশগ্রহণ করেন। ইমাম হাম্মাদ ছিলেন তার বিশেষ ওস্তাদ। তিনি ছাড়াও তার গুরুজনের সংখ্যা ছিল প্রায় চার হাজার।

ইমাম আবু হানিফার পৈত্রিক পেশা ছিল কাপড়ের ব্যবসা। ইরান থেকে শুরু করে ইরাক, সিরিয়া ও হেজায পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলব্যপী বিপুল পরিমণ মুল্যবান রেশমী কাপড়ের আমদানী ও রফতানী হতো। পৈত্রিক এই ব্যবসার সুবাদেই তিনি প্রচুর বিত্তের মালিক ছিলেন। তৎকালীন বিশিষ্ট ওলামাগণের মধ্যে সম্ভবত তিনিই ছিলেন প্রথম ব্যক্তি যিনি রাস্ট্রীয় পৃষ্টপোষকতা বা বিত্তবানদের হাদীয়া-তোহফা প্রাপ্তির পরোয়া না করে নিজ উপার্জনের দ্বারা জীবিকা নির্বাহ, এলেমের সেবা এবং তার নিকট সমবেত গরীব শিক্ষার্থীদের যাবতীয় ব্যয়ভার নির্বাহ করার ব্যবস্হা করতেন। (আল ফিকহুল আকবার, ভূমিকা, ইমাম আবু হানিফার জীবন ও কর্ম, ইসলামিক ফাউণ্ডেশন)।

তার অসামান্য দক্ষতা ও নিষ্ঠায় ব্যবসা প্রসারিত করার পাশাপাশি কাপড় তৈরির এক কারখানা স্থাপন করেন। যা কিছু দিনের মধ্যেই অনন্য হয়ে ওঠে। ব্যবসায় তার সততার পরিচয় পেয়ে দিগ্বিদিক থেকে লোকেরা তার দোকানে ভিড় জমাতেন। এভাবে তিনি জন মানুষের কাছে ব্যাপকভাবে পরিচিত লাভ করলেন। ব্যবসায়ীক কাজেই তাকে বিভিন্ন বাজার ও বাণিজ্য কেন্দ্রে যাতায়াত করতে গিয়ে একদিন ইমাম শাবীর (রহ) সাথে তার সাক্ষাত হয়ে যায়। প্রথম দর্শনেই ইমাম শাবী আবু হনীফার নিষ্পাপ চেহারার মধ্যে প্রতিভার স্ফুরণ লক্ষ করেছিলেন। ইমাম শাবী রহ. তাকে ইলমের ব্যাপারে উৎসাহিত করার আগ পর্যন্ত তিনি এ ব্যবসাকেই নিজের ক্যারিয়ার হিসেবে নিয়েছিলেন। (উসুলুদ্দিন ইনদা আবি হানিফা, পৃষ্ঠা- ৬৬)

ফিকাহ অধ্যায়নের এরপর তিনি হাদিস শিক্ষার জন্য তদানীন্তন হাদিসবেত্তাদের খিদমতে হাজির হন এবং শিক্ষা লাভ করেন। তখনও কোন প্রনিধান যোগ্য হাদিস গ্রন্থ সংকলিত হয়নি। কোন একজন মুহাদ্দিস সকল হাদিসের হাফিজ ছিলেন না। প্রথমে তিনি কুফায় অবস্থানরত মুহাদ্দিসদের থেকে হাদিস শেখেন। এরপর তিনি বসরা যান। সেখানে হজরত কাতাদাহ (রহ)-এর খিদমতে হাজির হন এবং হাদিসের দারস হাসিল করেন। তারপর ইমাম আবু হানিফা রহ. হজরত শুবা রহ.-এর দরসে যোগ দেন। তাকে হাদিস শাস্ত্রে ‘আমিরুল মুমিনিন’ বলা হয়। কুফা ও বসরার পর ইমাম আবু হানিফা হারামাইন শরিফাইন এর দিকে দৃষ্টিপাত করেন । প্রথমে তিনি মক্কা গেলেন এবং সেখানে তিনি হাদিসবিদ হজরত আতা ইবনে আবু রিবাহ রহ. -এর দরবারে যান এবং দরসে শামিল হয়ে শিক্ষা অর্জন করেন। ১১৫ হিজরিতে আতা রহ. ইন্তেকাল করলে হজরত ইকরামা রহ. -এর কাছ থেকেও হাদিসের সনদ লাভ করেন।

উম্মতের সর্বসম্মতিক্রমে ইমাম আবু হানিফা একজন তাবেই ছিলেন। আল্লামা ইবনে হাজার মক্কী বলেন, ‘ইমাম আবু হানিফা নিম্নে উল্লেখিত সাহাবিদের সাক্ষাৎ লাভ করেন:

  • হজরত আনাস ইবনে মালেক (ওফাত: ৯৩ হিজরি),
  • আবদুল্লাহ ইবনে আবী আওফা (ওফাত: ৮৭ হিজরি),
  • সহল ইবনে সা’আদ (ওফাত: ৮৮ হিজরি),
  • আবু তোফায়েল (ওফাত: ১১০ হিজরি),
  • আবদুল্লাহ ইবনে জুবায়দি (ওফাত: ৯৯ হিজরি),
  • জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (ওফাত: ৯৪ হিজরি) এবং
  • ওয়াসেলা ইবনুল আসকা (ওফাত: ৮৫ হিজরি)

ইমাম আবু হানিফা ফিকহ শাস্ত্রের আবিষ্কারক ছিলেন। ফিকহ ও ইসলামী আইন সংকলন ও সম্পাদনার জন্য তিনি ৪০ জন ফকিহ নিয়ে এক আইনজ্ঞ কাউন্সিল প্রতিষ্ঠা করেন। ওই যুগে যেসব মাসয়ালা-মাসায়িল সংকলন হয়েছিল, তার সংখ্যা ১২ লাখ ৭০ হাজারের ঊর্ধ্বে। ফিকহ শাস্ত্রে তার অবদানের ব্যাপারে ইমাম শাফেয়ি বলেন, ‘ফিকহ শাস্ত্রের সব মানুষ ছিলেন আবু হানিফার পরিবারভুক্ত। ‘(আছারুল ফিকহিল ইসলামী)।

ইমাম মালেক বলেন, ‘আবু হানিফা এমন এক ব্যক্তি, তিনি যদি ইচ্ছা করতেন, এই স্তম্ভটিকে সোনা প্রমাণিত করবেন, তবে নিঃসন্দেহে তিনি তা করতে সক্ষম। ‘ (জামিউ বয়ানিল ইলম) ।

তাই ইমাম আবু হানিফার নামযুক্ত মাসয়ালাগুলো ও মাযহাব দ্রুত সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে।

ইমাম আবু হানিফা হাদিস শাস্ত্রে অতুলনীয় জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। তিনি চার হাজার শাইখ থেকে হাদিস সংগ্রহ করেছেন। (আস সুন্নাহ, উকূদুল জামান)। ইমাম বোখারির অন্যতম ওস্তাদ মক্কী বিন ইব্রাহীম , যাঁর সনদে ইমাম বুখারি বেশির ভাগ ‘সুলাসিয়াত’ হাদিস বর্ণনা করেছেন। এই মক্কী বিন ইব্রাহীম ইমাম হানিফা -এর ছাত্র। তিনি ইমাম আবু হানিফা সম্পর্কে বলেন, ‘আবু হানিফা তার সময়কালের শ্রেষ্ঠ আলেম ছিলেন। ‘ (মানাকেবে ইমাম আজম রহ.) ।

আবিদ ইবনি সালিহ বলেন, ‘ইমাম আবু হানিফা হাদিসের নাসিখ ও মানসুখ নির্ণয়ের ব্যাপারে খুব সতর্ক ছিলেন। ‘ ইমাম আবু হানিফা তার শহরে যেসব হাদিস পৌঁছেছে তার মধ্যে মুহাম্মাদের(সা) তিরোধানের সময়কার সর্বশেষ আমল কী ছিল সেসব তার মুখস্থ ছিল।

ইয়াহিয়া ইবনে নাসর বলেন, ‘একদিন আমি ইমাম আবু হানিফা -এর ঘরে প্রবেশ করি। সেখানে তার কিতাব ভরপুর ছিল। আমি জিজ্ঞাসা করলাম এগুলো কী? তিনি বললেন, এগুলো সব হাদিসের কিতাব, যার মধ্যে আমি সামান্য কিছু বর্ণনা করেছি, সেগুলো ফলপ্রদ- (আস সুন্নাহ, উকদু জাওয়াহিরিল মুনীকাহ)

৭৬৩ আব্বাসীয় বংশের আল-মনসুর আবু হানিফাকে রাজ্যের প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগের প্রস্তাব দেন কিন্তু স্বাধীনভাবে থাকার জন্য তিনি প্রস্তাব প্রত্যাখান করেন। তার পরিবর্তে তার ছাত্র আবু ইউসুফকে প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়। প্রস্তাব প্রত্যাখানের ব্যাপারে আবু ইউসুফ আল মনসুরকে ব্যাখা দেন তিনি নিজেকে এই পদের জন্য উপযুক্ত মনে করছেন না। আল-মনসুরের এই পদ প্রস্তাব দেওয়ার পেছনে তার নিজস্ব কারণ ছিল, আবু হানিফা প্রস্তাব প্রত্যাখান করার পর মনসুর তাকে মিথ্যাবাদী হিসেবে অভিযুক্ত করেন। এই অভিযোগের ব্যাখ্যায় আবু হানিফা বলেন,

আমি যদি মিথ্যাবাদী হই তাহলে প্রস্তাব প্রত্যাখান করার ব্যাপারে আমার মতামত সঠিক, কারণ কিভাবে আপনি প্রধান বিচারপতির পদে একজন মিথ্যাবাদিকে বসাবেন। এই ব্যাখার উত্তরে আল-মনসুর আবু হানিফাকে গ্রেফতার করেন ও তাকে নির্যাতন করে কারাগারে বন্দি করে রাখা হয়। এমনকি বিচারকরা সিদ্ধান্ত নিতেন কে তার সাথে দেখা করতে পারবে।

৭৬৭ সালে আবু হানিফা কারাগারে মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর কারণ পরিষ্কার নয়। কেউ কেউ বলেন আবু হানিফা আল মনসুরের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহের চেষ্টা করেন এ জন্য তাকে জেলখানার ভেতর মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়। এটা বলা হয়ে থাকে যে, আবু হানিফার জানাযায় অনেক লোক সমাগম হয়েছিল। ইতিহাসবিদ খাতিবের মতে তার জন্য লোকজন মৃত্যুর ২০ দিন পর্যন্ত প্রার্থনা করেছিল। পরবর্তীতে, অনেক বছর পর বাগদাদের পাশে আধামিয়াতে আবু হানিফ মসজিদ নামে একটি মসজিদ প্রতিষ্ঠা করা হয় আবু হানিফার নামে।

১৫০৮ সালে সাফাভি সম্রাজ্যের শাহ ইসমাইল আবু হানিফা ও আব্দুল কাদের জিলানীর মাজার এবং অন্যান্য সুন্নি নিদর্শন ধ্বংস করে দেন। ১৫৩৩ সালে উসমানীয়রা পুনরায় ইরাক দখল করে ও মাজারসহ অন্যান্য সুন্নি নিদর্শন পুনর্নির্মাণ করে।

ইমাম শাফিঈ -র মতে: যে ব্যক্তি ফেকাহর জ্ঞান অর্জন করতে চায়, সে যেন ইমাম আবু হানিফা এবং তার ছাত্রদের সান্নিধ্য লাভ করে। কারণ ফেকাহর ব্যাপারে সকলেই আবু হানিফা-র মুখাপেক্ষী। ইমাম আবু ইউসুফ ইউসুফ বলেন, ‘ইমাম আবু হানিফা কেবলমাত্র কারাগারে বসেই ১২ লক্ষ ৯০ হাজারের অধিক মাসয়ালা লিপিবদ্ধ করেছেন’।

তথ্যসূত্রঃ

  1.  ড. আহমদ আমীন (লেখক), আবু তাহের মেসবাহ (অনুবাদক) (২০০২)। দুহাল ইসলাম (ইসলামের দ্বিপ্রহর)। ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ। পৃষ্ঠা ১৮০–২০১। আইএসবিএন 9840606816
  2. ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর। আল-ফিকহুল আকবার বঙ্গানুবাদ ও ব্যাখ্যা। ৩ আগস্ট ২০১৮ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা।
  3. ABŪ ḤANĪFA, Encyclopedia Iranica”। ১৩ সেপ্টেম্বর ২০০৯ তারিখে মূলথেকে আর্কাইভ করা

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন