, ১ আগস্ট ২০২১; ১১:৫৭ অপরাহ্ণ


Hay : The Kid Searching for God

ইবনে তোফায়েলের ‘হাই ইবনে ইয়াকজান’ বইয়ের অনুকরণে যে কার্টুন মুভিটা তৈরী করা,তার শুরুটা হয় ‘হাই’কে তার মা ভেলায় ভাসিয়ে দিচ্ছে এই দৃশ্যটা দিয়ে।

এই দৃশ্যটার মিল রয়েছে নবী মূসাকে(আ) তাঁর মা যেভাবে ফেরাউনের কবল থেকে রক্ষার জন্য আল্লাহর ভরসায় ভেলায় করে ভাসিয়ে দেয় তার সাথে। ভেলায় করে ভাসানোর কারনটা ছিলো,যদি হাই তার মায়ের আশ্রয়েই থাকতো তাহলে তার অত্যাচারী মামা তাকে মেরে ফেলতো। এ যেন এক নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচানোর জন্য আরেক নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া।

দুই মা তাদের সন্তানকে সমুদ্রে ভাসায় বা মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয় মূলত আল্লাহর জীবন দানের ক্ষমতায় আস্থাশীল হওয়ার কারণে। আর এটা মা হয়ে ভাবা খুবই কঠিন কাজ। মুসার মায়ের সাথে আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে তার সন্তানকে তারই নিকট আবার জীবিত ফিরিয়ে দিবে।

ফিরেয়ে দেওয়াও হয়। নেয়া হয় নবাগত শিশু ফিরিয়ে দেয়া হয় পয়গম্বর করে। হাইকে আবার ফিরিয়ে দেয়া হয় বা সে ফিরে আসে তবে তখন সে মুসার মতোই পয়গম্বর পর্যায়ে পৌঁছে যায়। এবং শুধু তথাকথিত জীবিতই ফিরিয়ে দেয়া হয় নি চিরন্তন জীবনের পয়গামবাহী পয়গম্বর করে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে।

সমুদ্রের যাত্রা কালে ‘হাই’ কেবলই নবজাতক, চিৎকারটাই কেবল তার ছিলো। হাইয়ের মা ভেলায় ভাসিয়ে যে চিৎকারটা দেয় তা চিৎকারই না,বরং মা হয়ে সকলকে জানান দেয়, হাই কেবল আমারই না সে তোমাদেরও সন্তান। মাতৃত্ব কেবল নারীরই নয় বরং সব সৃষ্টিতেই মাতৃত্ব থাকে! সমুদ্র পথের নব শিশুর খেলার সাথী হয় সামুদ্রিক পাখি, ডলফিন, পানি এবং আকাশের মেঘ তাকে ছায়া দেয়। ডলফিন কৃত্রিম ঢেউ সৃষ্টি করে তাকে তীরে যেতে সাহায্য করে।

আসলে কসমিক অরফানদের নির্দিষ্ট মা থাকে না পুরো জগতই তার জন্য মা হয়ে উঠে। ভেলা একটা সময় এসে কিনার পায়,তখন তাকে এমন ভাবে গ্রহণ করে যেনো সে প্রকৃতিরই সন্তান! (বাব আজিজের সে উক্তি “বিশ্বাসী কখনো পথ হারায় না” আর এই বিশ্বাসটা হাইয়ের মায়ের ছিলো)। এই জায়গায় যদি সমুদ্র যাত্রাকে সিম্বোলাইজ করা যায় নগ্ন হয়ে গেলে পোশাকে ব্যবস্থা কেউ না কেউ করে দেয়। আবার শূন্য হয়ে গেলে খোদা-ই পূর্ণ করে দেয়।

মুভির এই অংশে যখন ভেলা এসে পাড়ে লেগে যায় তখন সমুদ্রের পানিও নিচে নেমে যায় ভাটার টানে। প্রকৃতি হাই কে যেমন করে টেনে নেয় পুরো পথ, তার মাতৃত্বের দায়িত্বটাও নেয় হরিণ। হরিণকে এখানে সিম্বোলাইজ করা যায় দুই ভাবে- যে হরিণটা হোঁচট খেয়ে পরে যায় তাকে ধরা যায় দ্যা মেসেজ/ওহী হিসেবে। মেসেজ পেয়ে যে হরিণটা তাকে দেখতে আসে এবং নিয়ে নেয় তা মাতৃত্বের সিম্বল!

মাতৃত্বকে এমন ভাবে উপস্থাপন করা হয় যেন নীতির নীতিও তারই গোলাম! ‘হাই’ অবশেষে বিতাড়িত হয়েও অরণ্যের মধ্যে ঘর পায়। হাইকে আস্তে আস্তে মা শিখায় একক হয়ে চলা। মুভিটার এই গল্পের মধ্য দিয়ে ‘হাই’ কে যেভাবে ধরা হয়েছে এটাকে যদি ব্যাখ্যা করি তাহলে- মানবীয় জীবনকে দেখিয়েছেন কয়েকটি ভাগে।

হাইয়ের পুরো মানবীয় বয়সকে সাত করে ভাগ করা হলে দেখা যায়- প্রথম ও দ্বিতীয় ভাগে- হাই জানে কেবল কান্না করতে, হাসতে। মায়ের আঁচল ধরে তার উপর নির্ভর করতে। এই কান্না, হাসিকে যদি ব্যাখ্যা করি তাহলে-কান্না এবং হাসিই হলো অস্তিত্ব এবং অবস্থার জানান দেওয়ার ভাষা। তার মধ্যে কান্না হলো শক্তিশালী এবং গুরুত্বপূর্ণ। সে ক্ষেত্রে হাসি হালকা।

দ্বীপ জীবনের শুরুতে হাই নিজেকে সমগ্র সৃষ্টির মতো করেই ভাবতো,নিজেকে আলাদা করে তার অস্তিত্ব অনুভব করতে পারতো না। একটা সময় এসে সে পোশাক পড়ে, যা অন্য কোন প্রাণীর পরতে হয় না। তাদের লেজ থাকে, তাদের হাঁটার ধরণ ভিন্ন, নানা ভিন্নতা আছে তার মধ্যে, আর তখন সে এটা ভাবতে পারে। সে ভাবতে পারে এটাকে সিম্বোলাইজ করা হলে – মানুষ কেবল দ্বিতীয় স্টেজেই জানতে চায় সে কে?

সে ভিন্ন কেন? তাদের কি আছে যা তার নেই! এমন করে অনেক প্রশ্নের সম্মুখীন যেমন হয় তেমনি সে নানা ভাবে আঘাত প্রাপ্তও হয়। তবে হাই তার মায়ের বেলায় ছিলো অনড়। মাতৃত্ব কোন মা অস্বীকার করতে পারে না, পারে না কোন সন্তানও।

তৃতীয় ও চতুর্থ ভাগে ‘হাই’ যখন বুঝতে পারে সে তাদের নয়, তখন সে তাকে আবিষ্কার করতে চায়। তারপর সে হাত আবিষ্কার করে, এটাকে যদি সিম্বোলাইজ করা হয়-

মানুষ এবং জগতের মধ্যেই সব কিছু দেওয়া যা আবিষ্কার করতে হয়।আবিষ্কার করতে পারলেই তা নানান ভাবে ব্যবহার করা যায়। যেমন বন্য প্রাণীর আঘাত সামলাতে লাঠি আবিষ্কার করে, এই লাঠি তাকে খাবারের সন্ধান দেয়। নিজেকে জানতে পারলেই সব জানায় ঘর চিনে যায় পরিবর্তন হয় রুচিবোধেরও।

এক পর্যায়ে তার মায়ের গর্ভে আসে হরিণ শাবক। যদিও সে ভাবতো যে শাবক হয়তো তার রূপই পাবে। মায়ের সেই জন্ম দেওয়া হরিণ ছানাটাও তার জন্য বার্তা নিয়ে আসে তুমি আসলে আমাদের মত নও! এই বার্তার মধ্য দিয়ে ‘হাই’ যেমন তার চিন্তাকে ধরতে পারে তেমনি ভাবে সে নীতি শিখে ভালোবাসার মধ্য দিয়ে।

পঞ্চম ও ষষ্ঠ ভাগ– সে জলে নিজেকে দেখে বিস্ময়ের সাথে, যেটার মিল রয়েছে বাব আজিজ সিনেমার সাথে যেখানে রাজা জলে আত্মা দর্শন করে দরবেশ হয়ে উঠে। একটা মুহূর্তে এসে হাইয়ের মা মৃত্যু শয্যায় এবং মৃত্যু বরণ করে। ততক্ষণে সে জানে না মৃত্যু কি! সে খুঁজে বেড়ায় সবই আছে পার্থক্য কেবল ঠান্ডা এবং গরমে! আর তাতেই কেউ কথা বলে না!

হরিণীর মৃত্যু হাইয়ের কাছে যে বার্তা দিয়ে যায় তা হলো জন্মের পর মৃত্যু আছে। আর মৃত্যুর আগে সকল প্রাণীই অসুস্থ হবে তবে তার জন্য তার চিকিৎসা করতে হবে। ‘হাই’ সে বার্তাকে ব্যবহারিক রূপ দেন আর আবিষ্কার করেন চিকিৎসা বিজ্ঞান। মরে যাওয়ার পর হরিণী পঁচে যায়। পঁচনের মধ্য দিয়ে ঘ্রাণ ইন্দ্রিয়ের জগত সম্পর্কে সজাগ হয় ‘হাই’।

মৃত্যুর পর কোন কিছুকে কবরস্থ করার নিয়মটা সে শিখে কাক থেকে, মুভিতে দেখানো হয় একটা কাক অন্য কাককে হত্যা করে তারপর তাকে কবরস্থ করে। এ থেকে হাই তার মা হরিণীকে কবরস্থ করার নিয়ম শিখে যেটার মিল রয়েছে হাবিল কাবিলের কবরস্থ করার শিক্ষার সাথে।

সপ্তম ভাগ– হাই তার পুরো জীবদ্দশায় বিস্মিত হয়েছেন আবিষ্কার করেছেন নিজেকে সাদা কাগজের মতো শূন্য থেকে শুরু করে কাটিয়েছেন সাধনাময় জীবন। মানবীয় সমাজ ছেড়েও মানুষ হয়ে উঠেছেন আত্ম জিজ্ঞাসার পরশ পাথরে নিজেকে ঝালাই করে করে। হাই আবিষ্কার করেন প্রাকৃতিক বিজ্ঞান, চিকিৎসা বিজ্ঞান এবং পরবর্তীতে আধ্যাত্মিকতার চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে পরমের দিদার লাভ করেন।

মুভির শেষাংশে দেখানো হয় জাহাজে করে দ্বীপে একজন লোক আসেন যিনি মূলত দার্শনিকভাবে সত্য উদঘাটন করার কারণে সমাজ বিতাড়িত দার্শনিকদের প্রতীকী রূপ। তার কাছ থেকে হাই শিখলেন মানুষের ভাষা। তখন দেখা যায় প্রাকৃতিকভাবে হাইয়ের শূন্য থেকে প্রাপ্ত চূড়ান্ত সত্য এবং মানবীয় প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষিত একজনের সত্যে কোন ফারাক নেই। তখন দু’জনেই বিস্মিত হন। তারপর তারা জাহাজে করে নগরীতে ফিরে। নগরীর মানুষ হাইকে পয়গম্বর তুল্য ভাবে। পয়গম্বরদের মতোই হাই উম্মী অবস্থা থেকে চূড়ান্ত সত্যের ধারক হয়ে উঠে।

হাইকে জনতা মান্য করছে এইজন্য হাই বলে দর্শন এবং বিজ্ঞানের সত্যের সাথে পয়গম্বদের সত্যের মধ্যে কোন ফারাক নেই বরং একে অন্যের সহায়ক। এবং আরো বলে জনতার সত্যও বাকি দুই সত্যের মতোই। জনতা কেবল উপলব্ধি করে না।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন