, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১; ৯:১৮ অপরাহ্ণ


Professor Moinuddin Ahmed Khan

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সদ্যপ্রয়াত অধ্যাপক মুইনুদ্দীন আহমেদ খানের গবেষণা বিশ্লেষণ করে লিখেছেন মেহেদি হাসান।

ওস্তাদ মুঈনুদ্দীন আহমদ খান’র “চীনা দলিল দস্তাবেজে বাংগালা ও মুসলমান” প্রসঙ্গে যেকোন জাতিসত্ত্বার আত্মপরিচয় সংশ্লিষ্ট “চেতনা”র ওরিজন নিয়ে যেসব তত্ত্ব মারানোর চেষ্টা রয়েছে, সেগুলোরে ব্রডলি দুইটা ক্যাটাগরিতে বিশ্লেষণ করা যায়ঃ

১.আদিকালিক তত্ত্ব

২. বিশেষ গোষ্ঠীর হাতিয়ার-স্বরূপ তত্ত্ব।

বাংঙ্গালী, বাংলাদেশ ইত্যাদি নিয়ে “হাজার বছরের চিরায়ত সংস্কৃতি” র বয়ান মূলত আদিকালিক তত্ত্বের ভাল উদাহরণ। আবার, এই বয়ানের একটি ভেরিয়্যান্টও মাইক্রো বিশ্লেষণে ধরা পড়ে। এতে বলা হয়, জাতিসত্ত্বার আত্মপরিচয় সচেতনতা গড়ে উঠার জন্য “একটি অনন্য মূহুর্ত” দরকার হয় এবং এক্ষেত্রে সবসময় দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হয় এ কথা ঠিক নয়। আমাদের বাংলাদেশ ভূ-খণ্ডের জনগোষ্ঠীর জন্য ১৯৫২-৭১ হল সে অনন্য মূহুর্ত।অন্যদিকে, দ্বিতীয় তত্ত্বের ক্ষেত্রে বলা হয় একটি বিশেষ গোষ্ঠী একটি ভূ-খণ্ডের পৃথক পৃথক জনগোষ্ঠী সমূহের মধ্যে সংস্কৃতি, ভাষা, আচার-অনুষ্ঠান ইত্যাদিতে ভিন্নতা থাকা সত্ত্বে বিশেষ উদ্দেশ্য অভিন্ন রাজনৈতিক পরিচিতি গড়ে তোলার জন্য সংস্কৃতির বিশেষ ধরণের প্রতীকসমূহকে সুকৌশলে কাজে লাগায়; এজন্য এই আত্মপরিচয় সংশ্লিষ্ট সচেতনতাকে কৃত্রিমভাবে সৃষ্ট একটি সত্ত্বা মনে করা হয় ( ইমাজিনড কমিউনিটি)।

আমাদের ওস্তাদ ড.মুঈনুদ্দীন আহমদ খান তার একটি কিতাব Social History of the Muslims Bangladesh under the British Rule’র প্রথম অধ্যায়কে দুটি সেকশনে ভাগ করে উপস্থাপন করেছেন। এটির প্রথম অংশ হলঃ Section A: Prelude ( Some earlier Chinese References to Bangalah and the Muslims of Bangladesh)!

এটির স্যার কৃত একটি বাংলা তর্জমাও বিদ্যমান, যা আমাদের জানা মতে কোথাও প্রকাশিত হয় নাই। এ পরিপ্রেক্ষিতে দেখা যায়, ১৯৬৫ ঈসায়ীতে চীন সরকারের প্রত্নতত্ত্ব প্রতিষ্ঠানের তৎকালীন পরিচালক হ্ সিয়া নাই ( Hsia Nai)’র একটি ছোট রেসালাহ “ A Historical Sketch of the Friendship Between China and Pakistan”র সূত্রে স্যার চীনা ডিপ্লোমেটিক নথি পত্রের আর্কাইভে সংরক্ষিত কিছু ইউনিক ডকুমেন্ট পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন, যেগুলো ছিল মধযুগের বাংলার সুলতানদের সাথে চীনা সাম্রাজ্যের মধ্যেকার কূটনৈতিক সম্পর্ক সম্পর্কীয়। এবং এ কাজের বিশ্লেষণী ফলাফলগুলো পাওয়া যায় এই Section A-এ।এ ডকুমেন্টগুলো থেকে খুব স্পষ্টতই “দাওলাহ্” (de facto State) এবং “সলতনত” ( de-jure State) পার্থক্যের আলোকে ঐ সময়কার বাংলার সলতনতের ধরণ কি ছিল, তা নির্ণয় করা যায়।

ফলত, এ সময়েই ( Vernacular Millennium) কেন ভাষা হিসেবে বাংলার উত্থান ও এর সাহিত্যিক ফর্মগুলোর অগ্রগতি ত্বরান্বিত হয় এবং সুলতানদের বিশেষভাবে কেন এর পৃষ্ঠপোষকতা করতে হয় ইত্যাদি প্রশ্নের কিছু পটভূমিগত ও স্বাক্ষ্য-সাবুত ভিত্তিক উত্তর দেয়া সম্ভব। আবার, মুঘল পর্বেই বা কেন বারবার বাংলা অধিকার করার তাগিদ দেখা গেছে বিভিন্ন মুঘল সম্রাটদের সময়ে; এটা কি সাধারণভাবে শুধুই ফ্রন্টিয়ার বাংলাকে কেন্দ্রীয় মোঘল সাম্রাজ্যের অধীনে নিয়ে আসার ঘটনা নাকি চীন থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত বিশ্ববাণিজ্যে নিজের হিস্যা বুঝে নেয়া, তাতে যতটা সম্ভব হিস্যা বাড়ানো ইত্যাদির সাথেও সম্পর্কিত বিবেচনা ছিল? কারণ চীনা ডিপ্লোমেটিক নথি পত্রে দেখা যাচ্ছে, বাংলার সলতনত ঐ সময় বেশ ভালভাবেই ডি-ফ্যাক্টো “দাওলাহ” হিসেবে কার্যকর ছিল।

আরেকটি দিক হল, এসব বিষয়াদি বোধগম্য হওয়ার জন্য “ইতিহাস শাস্ত্র সম্বন্ধনীয় যে প্রকরণের ভাবধারা” এবং আন্তঃশাস্ত্রীয় যেসব এক্সপার্টিজ দরকার পড়ে, সেগুলোর একটি বড় শূণ্যতা পরিলক্ষিত হয় উপরোল্লিখিত ১ ও ২ নাম্বার ক্যাটেগরির তত্ত্বায়নগুলোতে। এগুলোতে আমরা দেখি, তথ্যসূত্রগুলোর এক্সটার্নাল ও ইন্টার্নাল পর্যালোচনার ভিত্তিতে ডাটা এক্সট্রাকট করা হচ্ছে এবং ফলে এসব “verified data remains still as information qua information, comparatively fluid and hence inevitably subjective in nature.”

আবার, মুসলিম রাজনীতি দর্শনের পরিভাষাগুলো সেসবের নিজস্ব কনটেক্সটে বুঝতে পারার এক্সপার্টিজ এবং ‘সামাজিক সংগঠন’, ‘আসাবিয়ত’ ইত্যাদি বিষয়ে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সমাজগুলোর ভিন্নধর্মী গঠন ও বিবর্তন ইত্যাদি বিষয়ে যে প্রগাঢ় অন্তর্দৃষ্টি দরকার পড়ে, সেগুলোর কোন কিছুই আমাদের আত্মপরিচয় সংশ্লিষ্ট সচেতনতার বয়ানে নেই।চীনা দলিল দস্তাবেজে উল্লেখিত “পেং-চিয়া-লো” থেকে তথাকথিত “বাঙ্গালী” শব্দটির আশ্চর্যজনক একটি জিনিয়লজি উস্তাদ মুঈন আনফৌল্ড করেন; চলুন উস্তাদ যেটিরে “এভিডেন্টশিয়াল ট্রিটমেন্ট অব দি সাবজেক্ট মেটার” নামে অভিহিত করেন, সে প্রকরণের একটি সেম্পলের মুখোমুখি হওয়া যাক! উস্তাদ বলেনঃ“…মিং রাজবংশের ইতিহাস অনুযায়ী, সম্রাট য়ং-লো এর রাজত্বের ষষ্ঠ বছরে ( ১৪০৮ ঈসায়ী) বাংলাদেশের অ্যই-য়া-সু-টিং ( গিয়াস-উদ-দীন আযম শাহ) এর একজন দূত চীনের দরবারে আগমণ করেন।

১৪১২ ঈসায়ীতে বাংলাদেশের (আর) একজন দূত চীনদেশে আগমণ করে সম্রাটকে তাঁর শাসনকর্তার মৃত্যু খবর প্রদান করেন। চীনা সম্রাট বিদেহী শাসনকর্তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করার জন্য একজন দূত প্রেরণ করেন এবং সাইফুদ্দিন, যিনি তাঁর পরে সিংহাসনে আরোহণ করেন, তাঁর নিকট সমবেদনা জ্ঞাপন করেন। এর প্রত্যুত্তরে পরিবর্তীজন ( সুলতান সাইফুদ্দিন) একটি জিরাফ ও কতেক চমকপ্রদ ঘোড়া উপহার দিয়ে ( চীন সম্রাটের নিকট) ধন্যবাদ জ্ঞাপন করার জন্য একজন দূত পাঠান।

১৪৩৮ ঈসায়ীতে বাংলাদেশের সুলতান চীন সম্রাটের নিকট আরো একটি জিরাফ পাঠান।…এগুলোর একটি জিরাফের ছবি সমসাময়িক দরবারের একজন শিল্পী অংকন করেছিল এবং এর একটি আজকাল চৈনিক ইতিহাসের জাদুঘরে দেখা যায়।…হ্ সিয়া নাই এর প্রবন্ধে উল্লেখিত প্রথম দস্তাবেজের সময়কাল যথা ঈসায়ী ১২০০-১২৫০, বাংলাদেশে মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যুগে পতিত হয় এবং “পেং-চিয়া-লো” নামে যে নতুন রাষ্ট্রটির উল্লেখ করা হয়েছে, ইহা চীনদেশের বাকরীতির পরিপ্রেক্ষিতে তিন প্রকারে উচ্চারণ করা যায়, যথা- পেং-চিয়া-লো, বেং-চিয়া-লো ও মেং-চিয়া-লো।

এই শব্দটি বাংলাদেশের আধুনিক চীনা নামের সাথে বেশ সামযণ্জ্যপূর্ণ, যা “মেং-আ-লা” রূপে উচ্চারিত হয়, যদিও চীনা ভাষা রীতিতে বেং-আ-লা অথবা পেং-আ-লা বলেও উচ্চারণ করা যায়।…লক্ষণীয় যে, চাও জু-কুয়া কর্তৃক রচিত “চুফান চিহ” পুস্তকের উদ্ধৃতি দিয়ে, হ্ সিয়া নাই “পেং-চিয়া-লো”কে একটি কিংডম বা রাজত্ব বলে উল্লেখ করেন।…স্মর্তব্য যে, আরবী-ফার্সীতে এদেশের নাম ছিল ‘মুলকে বাংগাল’ বা বাংগাল। আরবী কথ্য ভাষায় উহার উচ্চারণ হয়-বেংগাল।

আরবি ব্যাকরণ অনুযায়ী, মুলক ও বাংগাল উভয় শব্দই পুংলিঙ্গ। কিন্তু ১২০৪ বা ১২০৬ ঈসায়ীতে ইখতিয়ার উদ-দীন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজী যখন মুলকে বাংগাল দেশটিকে বিজয় করে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন করেন, তখন বাংগাল দেশটি বাংগালা রাষ্ট্রে পরিণত হয়। ইহাকে হিসেবে প্রশাসন বললে, ইহার আরবী নাম হবে মমলিকত বা দওলত, সরকার বললে আরবী নাম হবে, হুকুমত, সাংবিধানিক রাষ্ট্র বললে, আরবী নাম হবে খিলাফত যেমন পরবর্তী কালে সুলতান জালাল উদ-দীন করতে চেয়েছিলেন। আর অনুমোদিত রাজত্ব বললে ইহার আরবী হবে সলতানত, যেমন সলতনত-ই-বাংগালা নামে ইলিয়াস শাহী আমলে প্রচলিত হয়েছিল।

লক্ষ্যণীয় যে, রাষ্ট্রের উপরোক্ত পাঁচটি নামই স্ত্রীলিঙ্গ। অতএব, এগুলোর যেকোন একটি নামের সাথে এদেশের নাম যুক্ত হলে আরবী ব্যাকরণের নিয়ম অনুযায়ী বাংগাল ( পুংলিঙ্গ) শব্দটি বাংগালা বা বাংগালাহ্ ( স্ত্রীলিঙ্গ) আকারে রূপান্তরিত হতে বাধ্য।…আরবী ব্যাকরণের প্রেক্ষাপটে পেং-চিয়া-লো চীনা নামটি আরবী-পার্সী তথা ইসলামী নামে রূপান্তরিত করলে ইহা বাংগাল অথবা বাংগালা বা বাংগালাহ্ তে দাঁড়ায়। কিন্তু পেং-চিয়া-লো শব্দটি তিনপদী হওয়ায় বাংগাল এর চেয়ে বাংগালাহ্ হওয়া অধিকতর যুক্তিসংগত। আদতে বাংগাল নামটি উৎপত্তিমূলে বং+আল= বংগাল ছিল। ““…In this connection, it may be noted that the terms ‘Bong’ and ‘aal’ are indigenous Bengali words; may be originally ‘Tibetan’, ‘Cole’ or ‘Bhot Chinese’; if it is Arabicised, it becomes ‘Bengal’, ‘bong’ being changed to ‘bang’ and when it is further Arabicised as a conjunct of the feminine ‘Sultanat’ or State, it becomes ‘Bangalah’ with the Arabic feminine mark ‘ah’.Bangalah is thus a grammaticality Arabicised word. It is indeed an impossible word in terms of the Bengali or Sanskrit grammar.”

“…অতএব পেং-চিয়া-লো’কে যদি আমরা তিনপদী উচ্চারণের বৈশিষ্ট্য দিয়ে বিচার করি, তবে আরবী রাষ্ট্রের নাম বাংগালা তথা বাং+আল+আহ্-কেই একমাত্র সমকক্ষ বলে গ্রহণ করতে পারি।…সুতরাং প্রথমত, “মুসলিম আমলের বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বিদেশীয়দের মধ্যে চীনারাই সর্বপ্রথম লিপিবদ্ধ করে।

…দ্বিতীয়ত, চীন দেশের সাথে বাংলাদেশের সুলতানগণ যেরূপ সুসম্পর্ক স্থাপন করতে আগ্রহী ছিলেন, তেমনি চীন সম্রাটও মুসলিম বাংলার সৌহার্দ্য অর্জন করতে উদগ্রীব ছিলেন। ব্যবসা বাণিজ্যের সম্প্রসারণের জন্য উভয় পক্ষের আগ্রহই উহার মূল কারণ বলে মনে হয়।…তৃতীয়ত, বাংলাদেশে রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করার পর মুসলমানরা এদেশের ব্যবসা বাণিজ্যের উন্নয়নের দিকে বিশেষভাবে মনযোগ দিয়েছিলেন বলে উপরোক্ত চীনা দস্তাবেজ সাক্ষ্য বহন করে।…”

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন