শনিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১; ৬:১৯ অপরাহ্ণ



সুফীরা তাদের কবিতা বা গানে শারাবের রূপকটা সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করে। এর পেছনের কারণটা কি? শারাব বলতেই বা কি বুঝান তারা?
সুফিদের একটা বিষয় খুবই পরিষ্কার যে তারা মানুষের মুখোশ উন্মোচন করে ভেতরকার মানুষটাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে বেশি। অর্থাৎ মানুষ সত্তাগতভাবে যে অবস্থাতেই থাকুক না কেন সেটা তুলে ধরা বা তুলে ধরতে উদ্ভুদ্ধ করে। যদিও মানুষের প্রকৃতি হলো নিজেকে কামনা বাসনার বশিভূত করে নানান স্থান কালে নানান রূপ ধরা।

মানুষ তাই প্রকাশ করতে চায় যা সে নয়,তাই বলতে বা বুঝাতে চায় যা সে নিজেই ধারণ করে না। মনোবিদ্যায় একটা ধারণা আছে,নগ্ন সত্তা(ওথেনটিক সেল্ফ) নামে,এরই ঠিক বিপরীত একটা ধারণা হলো আবৃত সত্তা(ফেইক সেল্ফ); সুফীরা মানুষকে তার নগ্ন সত্তাকে প্রকাশিত করতে বলে। নগ্ন সত্তাকে প্রকাশ করার বস্তুগত উপকরণ হলো শারাব। শারাব পান করলে মানুষের অনবদমিত অবচেতন মনের দরজা খোলে যায়। মানুষ মূলত যা বিশ্বাস করে যা ভাবে চিন্তা করে যে দৃষ্টি ভঙ্গি পোষণ করে তা তখন প্রকাশিত হয়ে পড়ে। অর্থাৎ মানুষ তখন বিশুদ্ধ সত্তার নিকটবর্তী হয়।

মানুষ অপর মানুষের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে নিজেকে আড়াল করার জন্য যে সব পর্দা ধারণ করে শারাব পানে তা নাই হয়ে যায়। আর এজন্যই সুফীরা শারাবের রূপক ব্যবহার করে বেশি। শারাবের আরেকটা রূপক অর্থ হলো জীবন চেতনা। শারাব পানে মানুষ চাঙা এবং নির্ভয় অনুভব করে এই দিক বিবেচনায়ও শারাবের রূপকটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কোরআনিক স্পিরিটেও গাফেল বা তামসিকতা এবং মোনাফেকি(যা নয় তা প্রকাশ করা) হলো আধ্যাত্মিকভাবে মানবীয় মনস্তত্ত্বের অন্ধকারময় অবস্থার সর্বনিম্ন পর্যায়। এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্যও রূপক আকারে শারাবের আকাঙ্খা করেন সুফীরা।

নীটশের ‘বার্থ অব ট্রাজেডি’ বইতে এপোলোনিয়ান এবং ডাইনোসিয়ান নামে শিল্পের দুটো শাখা দেখানো হয়। এপোলোনিয়ান প্রত্যয়টা এসেছে গ্রিক সূর্য দেবতা এপোলোর নাম থেকে। এই শাখার সার হলো শিল্পের স্থির কাঠামোবদ্ধ তরীকা আর ডাইনোসিয়ান শাখার সার হলো শিল্পের বহুমাত্রিক সৃষ্টিশীলতা। এতে শিল্পী তার উপলব্ধিকে যেভাবেই প্রকাশ করুক না কেন তাই শিল্প। ডাইনোসিয়ান হলো শারাব,নৃত্য,উন্মাদনা বা তন্ময়তার দেবতা। বলে রাখা ভালো তারা দু’দেবতাই দেবরাজ জিউসের সন্তান। এপোলোনিয়ানে শিল্পের কাঠামোই প্রধান আর ডাইনোসিয়ানে শিল্পীর উপলব্ধি এবং তার আবেগ অনুভূতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

উত্তরাধুনিকতাবাদী সোররিয়ালিস্ট এবং পরাবাস্তববাদী শিল্পের মূল স্পিরিটও এসেছে ডাইনোসিয়ান স্পিরিট থেকে। এইসব দিক বিচার করলেও সুফীদের শারাব রূপকটার গূঢ়ার্থ অনুধাবন করা যায়। শারাবের আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো,শারাবে আগুন এবং পানির মিশ্রণ থাকে। অর্থাৎ এতে দুই বিপরীতমুখী উপাদানের সহাবস্থান থাকে। যাকে ল্যাটিন শব্দে বলা হয় Coincedentiaoppositirrum। মানুষ মূলতই দুই বিপরীতের মিশ্রণ। মানুষের আত্মা ঊর্ধ্বমুখী এবং তার শরীর নিম্নমুখী। ভারতীয় দর্শনে মানুষ জীবাত্মা এবং পরমাত্মার মিশ্রণ। এই দিক বিবেচনায় শারাব মানুষেরই রূপক।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন