, ১ আগস্ট ২০২১; ১১:২৪ অপরাহ্ণ


Kazi Nazrul Islam
Kazi Nazrul Islam

বাংলাদেশের একটি স্কুলের শিক্ষার্থীকে জিজ্ঞেস করলেও বলতে পারবে বাংলাদেশের জাতীয় কবি কে? জাতীয় পর্যায়ে ও রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন আয়োজনে কাজী নজরুল ইসলামকে জাতীয় কবি হিসেবে লেখা হয়। তাঁর নামে দেশের ময়মনসিংহে সরকারীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়।

এই যে বিভিন্ন স্থানে তাঁর নামের পূর্বে স্পষ্ট করে জাতীয় কবি লাগানো হয় তার একটি অন্যতম কারণ হয়তো সরকারি কোন দলিলপত্রে জাতীয় কবি হিসেবে কাজী নজরুলের নাম নেই। কবিকে দেশে ফিরিয়ে আনার ৫০ বছর পরেও কোন এক অজানা কারণে রাষ্ট্রীয়ভাবে দেওয়া হয়নি কবির জাতীয় কবির স্বীকৃতিসূচক খেতাব।

রাষ্ট্র আধুনিক পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী এবং সংহত প্রতিষ্ঠান। পৃথিবীর প্রায় সব মানুষই ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় কোন না কোন রাষ্ট্রের হয় নাগরিক অথবা রাষ্ট্রের অধীনে বসবাস করে। আর রাষ্ট্র পরিচালিত হয় শক্তিশালী ডকুমেন্টেশনের মাধ্যমে।

সাধারণত যেকোন রাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন দিবস, চিহ্ন, প্রতীক কিংবা ব্যক্তিবর্গকে অফিসিয়ালি স্বীকৃতি জানানো হয় সরকারি গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে। এই গেজেট এই স্বীকৃতিগুলোর সার্টিফিকেট বা সনদ। গেজেট বা প্রজ্ঞাপন প্রকাশ ছাড়া মৌখিক বা রাষ্ট্রীয়ভাবে কোন ব্যক্তিকে কোন মর্যাদায় অভিষিক্ত করার কোনরূপ রাষ্ট্রীয় ভিত্তি নেই। যেহেতু আইনত রাষ্ট্রীয় ভিত্তি নেই তাই এই খেতাব তুলে নেওয়ারও কোন ব্যবস্থা নেই এবং যেকোন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এই দূর্বলতার সুযোগ নিয়ে অন্য কাউকে এই খেতাবে ভূষিত করা সম্ভব।

দুঃখজনক হলেও সত্য সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, জাতীয় আর্কাইভ, নজরুল ইনস্টিটিউট ও বাংলা একাডেমির কোথাও নজরুলকে জাতীয় কবি ঘোষণা করা সংক্রান্ত সরকারি কোনো প্রজ্ঞাপন বা অন্য কোনো দলিল পাওয়া যায়নি। কাজী নজরুল বাংলাদেশের জাতীয় কবি লোকমুখে প্রচারিত তথ্যের ভিত্তিতে, কাগজে-কলমে প্রাতিষ্ঠানিক কোন ঘোষণার মাধ্যমে নন।

উল্লেখ্য যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগে ১৯৭২ সালের ২৪ মে কবিকে সপরিবারে ভারত থেকে স্বাধীন বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়। বড় ছেলে কাজী সব্যসাচী ও তাঁর স্ত্রী উমা কাজী, ছোট ছেলে কাজী অনিরুদ্ধ ও তাঁর স্ত্রী কল্যাণী কাজী এবং তাঁদের সন্তানেরা এসেছিলেন কবির সঙ্গে।

বাংলাদেশে আসার পর কবির জন্য ধানমন্ডির ২৮ নং সড়কের ৩৩০-বি নং বাড়িটি সরকারি উদ্যোগে বরাদ্দ করা হয় এবং রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় কবিকে রাখা হয়। এর নাম দেওয়া হয় ‘কবি ভবন’ যেটিতে ১৯৮৪ সালের ১২ই জুনের নজরুল ইন্সটিটিউট অর্ডিন্যান্স এর অধীনে ১৯৮৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রতিষ্ঠিত হয় নজরুল ইনস্টিটিউট। বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে কবির অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৭৪ সালের ৯ ডিসেম্বর এক বিশেষ সমাবর্তনে কবিকে সম্মানসূচক ডিলিট উপাধিতে ভূষিত করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দে নজরুলকে স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদানের সরকারি আদেশ জারী করা হয়। ১৯৭৬ সালে কবিকে একুশে পুরস্কার প্রদান করা হয়। ২৯ আগস্ট ১৯৭৬ (১২ ভাদ্র ১৩৮৩) ঢাকার পিজি (পোস্ট গ্রাজুয়েট) হাসপাতালে (বর্তমানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়) কবি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। কবির জানাজায় উপস্থিত ছিলেন ১০ হাজারেরও বেশি মানুষ।  জানাজা নামায আদায়ের পরে রাষ্ট্রপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমমেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান, রিয়াল এডমিরাল এম এইচ খান, এয়ার ভাইস মার্শাল এ জি মাহমুদ, মেজর জেনারেল দস্তগীর জাতীয় পতাকামণ্ডিত নজরুলের মরদেহ বহন করে সোহরাওয়ার্দী ময়দান থেকে বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদ প্রাঙ্গণে নিয়ে যান। বাংলাদেশে তার মৃত্যু উপলক্ষে দুই দিনের রাষ্ট্রীয় শোক দিবস পালিত হয় এবং ভারতের আইনসভায় কবির সম্মানে এক মিনিট নিরবতা পালন করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদের উত্তর পাশে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে। ১৯৭৭ সালে কবিকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরষ্কারে ভূষিত করা হয়।

২০১৯ সালে প্রথম আলোতে প্রকাশিত এক রিপোর্টে জাতীয় কবির প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির বিষয়ে কাজী নজরুল ইসলামের নাতনি ও সংগীতশিল্পী খিলখিল কাজী বলেন, ‘কাজী নজরুল ইসলামকে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় কবির মর্যাদা দেওয়ার জন্য আমরা অনেকবার দাবি জানিয়েছিলাম। কিন্তু আজও সরকারি গেজেট আকারে আমার দাদুকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি।’

নজরুলজীবনী নিয়ে গবেষণা করছেন লেখক-গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদ। তিনি বলেন, নজরুলকে জাতীয় কবির মর্যাদা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সংসদে আইন পাস করেও এই স্বীকৃতি দেওয়া উচিত। কাজী নজরুলকে জাতীয় কবির প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিতে নজরুল ইনস্টিটিউটের উদ্যোগ নেওয়া উচিত বলে মনে করেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী। তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, স্বীকৃতির বিষয়টি অবশ্যই গেজেট আকারে প্রকাশ করা উচিত।’

নজরুল ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মো. আবদুর রাজ্জাক ভূঞা বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি বিষয়টি অবগত করতে মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু পরে তা আর চূড়ান্ত হয়নি।

এটা সত্যি যে সরকারি দলিলে বিভিন্ন প্রসঙ্গে নজরুলকে জাতীয় কবি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁকে জাতীয় কবি উল্লেখ করে বিশ্ববিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশও প্রণীত হয়েছে। কিন্তু এটি পরোক্ষ স্বীকৃতি। কিন্তু নজরুল পরিবারের সদস্য থেকে শুরু করে অনেকেই বলছেন, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি কেবল মৌখিক বিষয় নয়, আনুষ্ঠানিকতা ও সার্বভৌম শক্তির দাপ্তরিক ঘোষণার বিষয়টিও এর সঙ্গে যুক্ত। ভবিষ্যতের জন্য স্বীকৃতি সংরক্ষণের বিষয় থাকে। এসব বিবেচনায় আনুষ্ঠানিকভাবে নজরুলকে জাতীয় কবি ঘোষণার দাবিটি যৌক্তিক ও প্রয়োজন।

সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ বলেন, তাঁর মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের বিষয়টি নিয়ে কাজ শুরু করার কথা বলেছেন তিনি। খুব শিগগির এ বিষয়ে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ঘোষণার প্রক্রিয়া শুরু হবে।

বর্ণাঢ্য জীবনে কলকাতাই ছিল মূলত কবির কর্মস্থল। তবে কর্মক্ষম থাকা অবস্থায় তিনি ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, ফরিদপুর, বরিশাল, রংপুর, দিনাজপুর, বগুড়া, রাজশাহী, সিরাজগঞ্জ, নোয়াখালী, কুষ্টিয়া, সিলেটে এসেছিলেন। কবির জীবনে দুটি বিয়ে করেছিলেন এবং দুটোই কুমিল্লায়। কুমিল্লায় তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণ করা হয়েছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তাঁর গান ও কবিতা ছিল প্রেরণার উৎস।

আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় নজরুলকে প্রজ্ঞাপন ঘোষণা করে জাতীয় কবির মর্যাদা না দেওয়াটা আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রিতা কিন্তু এটি একই সাথে নজরুলের প্রতি একপ্রকার সচেতন অবহেলাও বটে। জাতীয় কবি বলা হলেও নজরুল ও তাঁর সৃষ্টিকর্ম নিয়ে বিশদ গবেষণা ও তাঁর অসাম্প্রদায়িক ও মুসলমানিত্বের চেতনার চর্চা খুব কমই হয়েছে। সে বিবেচনায় এটা নজরুলের কাজ ও লীগাসির প্রতি অবিচারও বটে।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন